১. বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও মুক্তির প্রত্যাশা, রাজনৈতিক অধিকার, স্বাধীনতা পুঁজিবাদের বাজার অর্থনীতিতে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের শ্রমিকদের অবস্থা কতটা বিপন্ন হয়েছে, তার একটা পরিসংখ্যান দেয়া যেতে পারে। ” তিন বছরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বর্তমানে আরো কারখানা ঝুঁকির মুখে রয়েছে ‘(বিজিএমইএ- র তথ্য, কালের কণ্ঠ, ২৬ এপ্রিল ২০২৬)। ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট প্রতিবেদন- “বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তহীনতায় গত এক বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও রূগ্ন হয়েছে। …কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, শিল্প পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক বছরে সাভার, গাজীপুর, চট্রগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৫ শতাধিক কারখানা বন্ধ ও রূগ্ন হয়েছে। বন্ধ কারখানার ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক বেকার হয়েছেন। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৮ আগস্ট ২০২৫)। এছাড়াও বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, অসংখ্য কারখানা বন্ধ হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর বৃহৎ শিল্প কারখানা বেক্সিমকো, গাজী, এস আলমসহ অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষি শ্রমিকদের অবস্থাও মোটেও সন্তোষজনক নয়। কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি ৪৫.৪% ( শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২, বিবিএস)। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বরের প্রতিবেদন– “সারা দেশের আনুমানিক এক কোটি ২০ মানুষ মৎস্য খাতের সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত এবং ১৪ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি মৎস্য খাত নির্ভর হলেও শ্রমিকদের আইনগত সুরক্ষা ও জীবনরক্ষা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল এবং তাদের জন্য নেই সামাজিক নিরাপত্তামূলক পর্যাপ্ত কর্মসূচি।’ (Dhaka Post)। এভাবে তথ্য দেখলে অনুভব করা বাংলাদেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী শ্রমিক এবং শ্রমবাজারের সাথে জড়িত। তাদের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।” বিশ্বব্যাংক গত ( ২৫ এপ্রিল ২০২৫) বুধবার বাংলাদেশের হালনাগাদ পরিস্থিতি নিয়ে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করে জানায় বাংলাদেশে এ বছর আরও ৩০ লাখ মানুষ ‘অতিদরিদ্র’ হবে। অতি দরিদ্রের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। …বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হতে পারে ১ কোটি ৫৮ লাখের মতো। আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হতে পারে ৩ কোটি ৯০ লাখের মতো।’ (২৬ এপ্রিল ২০২৫, সময়ের আলো)।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসি– পাওয়ার এ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষায় উল্লেখিত হয়েছে, ২০২৫ সালে ‘দেশে দারিদ্রের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে অতি দারিদ্র্যের হার তিন বছর আগের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে।’ (২৫ আগস্ট ২০২৫, দ্য ডেলি স্টার)।
বাংলাদেশের ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে বাংলাদেশের শ্রমিকদের আহার, জীবন যাপন, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ ন্যূনতম মৌলিক অধিকার ব্যাপকভাবে বিপন্ন, তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না। এমতাবস্থায় উত্তরণের পথ কি? সেক্ষেত্রে বিশ্ব শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ঘটনা ও করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।
২. বিশ্বের সাধারণ জনবাসীর উপর নিপীড়নসহ হিংস্রতার ভয়াবহ ইতিহাস, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মানবিক বিপর্যয় এবং অদ্যাবধি যুদ্ধ বিধ্বস্ততার মধ্যে সাম্রাজ্যবাদের উত্থান, নয়া উপনিবেশ সৃষ্টির যেসব ধারা-পন্থা অবলোকন করা যায়, তা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ ইতিহাস।
নয়া উপনিবেশিকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বের শ্রমজীবী এক হও, লড়াই করো” শ্লোগানে বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক ও সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রাটদের ঐক্যবদ্ধ হবার দিন ‘পয়লা মে’ বিশ্ব শ্রমজীবী দিবস। এই বিপ্লবের সফল উদ্ভাবন ও বিজয় সমাজতন্ত্রে।
রাষ্ট্র কাঠামোর সুবিধাবাদী, লুটেরাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সংকল্পের দিন। একটি চূড়ান্ত বিপ্লবী অভ্যুত্থানের জন্য মার্কসবাদ-লেনিনবাদে দীক্ষা গ্রহণ করে Long Live Revolution’ এর পতাকা উড়িয়ে জয়বার্তার সংগ্রামে অংশগ্রহণের দীর্ঘ পথে একটি অভিযাত্রা।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসটি দয়া, দাক্ষিণ্য, করুণার দিবস নয়। এই দিবস অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের দিবস। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তদের নিকট দিবসটি নিছক করুণার, কিছুটা উদারতার দিবস হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। শিল্প কলকারখানার মালিকরাও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতি দয়ার স্টাটাস দিয়ে মহান দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সামগ্রিক বিষয়টি রাষ্ট্রের সাথে জড়িত, একটি অধিকারের দিবস। যার সফল বিজয়ের মাধ্যমে লুটেরা পুঁজিবাদ ধ্বংস হবে।
সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদের জটিল মনোপলি থেকে তথা পুঁজিপতিদের একচেটিয়া ভাগ-বাটোয়ারা থেকে পৃথিবী মুক্ত হবে। অতি মুনাফার দুবৃত্তদের আধিপত্যের বিলোপ সাধিত হবে।
সাম্রাজ্যবাদের ফিনান্স গোষ্ঠীর প্রচণ্ড উলম্ফন, নৈরাজ্য , অস্ত্রবাজি, সামরিক হস্তক্ষেপ, বিরোধ ইত্যাদি এতোটাই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে, যার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বৈপ্লবিক সংগ্রাম হবে। সেই সংগ্রামের প্রথম পর্বে যুক্ত হয়েছে বা হতে চলেছে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকার সকল গণতান্ত্রিক, সোশ্যালিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক শক্তি। এমনকি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বের সোশ্যালিস্ট সংগঠন, সমাজতন্ত্রের সংগ্রামীরা বিশ্বের মহাবিপ্লবের সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে অবতীর্ণ হতে চলেছে। কারণ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিপুল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী ফুলেফাঁপা দুবৃত্ত পুঁজিপতিদের নৃশংসতা থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু অতি কৌশলে প্রথম বিশ্বের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের মেকি আদলে ভয়ানক শোষণ ব্যবস্থায় কতিপয় পুঁজিপতিরা সরকার পরিচালনা করে। কাঠামোগত বিন্যাসে কোন শ্রমজীবীর আদৌ মুক্তি, অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। তথাপি সেইসব রাষ্ট্রের শাসক পুঁজিবাদীরা এবং নয়া আমলে বহুজাতিক কোম্পানি, প্রযুক্তি দৌরাত্মের কর্পোরেট কোম্পানির মালিকরা মিলিমিশে ‘নয়া কৌশল’ উদ্ভাবন করেছে। সেই কৌশল হলো রাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে তাদের জোট সক্রিয়। যারা দীর্ঘ বছর স্থানীয় শ্রমজীবীদের নিষ্পেষণ করছে। এই অপরাজেয় শক্তি বিশ্বের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ কার্যকর করতে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
নয়া উপনিবেশবাদের কৌশল হলো আফ্রিকা, ল্যাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে অবতীর্ণ করা। এরকম পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র অস্ত্র রপ্তানি করে আয়ের পথ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা ‘ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র’ রক্ষার অছিলায় কৃত্রিম অভ্যুত্থান ঘটায়, কোথাও কোথাও সশস্ত্র অভিযানের মাধ্যমে তাদের স্বার্থ বাস্তবায়ন করে। ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, লেবানন, যুগোশ্লাভিয়া, সুদান, লেবাননসহ বহু দেশে মার্কিনী হামলা, আক্রমণ হয়েছ। তাদের আজ্ঞাবহ জোট মার্কিনী নৃশংসতার সাথে অভিযানে যুক্ত থেকেছে। এমনকি আর্থিক পুঁজিসংঘ– বিশ্বব্যাংক, আইএম এফ, এডিবি ইত্যাদি ব্যাংক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পলিসি বাস্তবায়ন করে। হাল আমলে তা আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তির দৌরাত্ম, যুদ্ধাস্ত্র, ক্ষেপনাস্ত্রসহ মানব বিধ্বংসী ভয়ংকর উপকরণ বিপর্যস্ত করে তুলছে। এই বিপর্যয় বিশ্বের সকল দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি ফিলিস্তিন, ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। যার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ, ভুক্তভোগী দেশগুলো অনুভব করছে।
বিশ্বের সকল শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যার মূলে একটি দ্বান্দ্বিক শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে জয় লাভের কৌশল গড়ে তুলতে হবে। পুঁজির মালিকানাকে সামাজিক মালিকানায় পরিণত করে শোষকদের শোষণ অবলুপ্ত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। একটি ঐতিহাসিক যুগের আবর্তন সূচিত হয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক নিয়মবদ্ধতার প্রয়োগ ও পুনর্গঠন অব্যাহত রাখা দরকার। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কৃষক ও শ্রমজীবীর অবধারিত জোট, যা অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করে তোলে। পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক পথে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করার মাধ্যমে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে।
ইতিহাসের বিবরণে দেখুন, প্যারিস কমিউনের পর কিভাবে শাসকগোষ্ঠী শ্রমিকদের ব্যাপকভাবে হত্যা করেছিলো। এ যাবৎকাল বিশ্বের মৌলিক পরিবর্তনে শ্রমজীবীরাই জীবন দিয়েছে। শ্রমজীবী আন্দোলন সূচিত হয়েছিলো ১৮৪৭ সালে, কমিউনিস্ট লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কার্ল মার্কসের যুগান্তকারী ভাবনায় ১৮৪৮ সালের শ্রমজীবী রাষ্ট্র ব্যবস্থার ইশতেহার অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির মেনোফেস্টো প্রকাশিত হয়। যা ছিল বিশ্বে একটি বৈপ্লবিক ইশতেহার। মার্কস-এঙ্গেলসের যৌথ জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সমাজতান্ত্রিক দর্শন, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার রূপরেখার একটি চূড়ান্ত বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম শ্রমজীবী রাষ্ট্র গঠিত হয়। অক্টোবর মহাবিপ্লবের প্রধান রূপকার ছিলেন কমরেড লেনিন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কতন্ত্রে গঠিত হয়েছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন।
কেউ হয়তো ভাবছেন, এই যুগে সমাজতন্ত্রের ধ্বস নেমেছে। আসলে কি তাই? তার আগের ইতিহাস কি? ১৯২৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৯৫টি দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিলো । এই সংখ্যা অদ্যাবধি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল দেশে কমিউনিস্ট বা সোশ্যালিস্ট বা লেবার পার্টির তৎপরতা অপ্রতিরোধ্য গতিতে বিস্তৃত হয়েছে। প্রায় সিংহভাগ দেশে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়।
আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী দিবস তথা মে’ দিবস স্বাধীনতা ও প্রগতির পথে সমাজতন্ত্রের উত্থানে একটি বিশ্ব-বিপ্লব সংঘটিত হতে পারে। পারমানবিক শক্তিধর দেশের শ্রমিকদের অসন্তোষ প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। তাঁদের দ্বারাই অর্থাৎ মহান শ্রমিকদের দ্বারাই পারমাণবিক দেশের বিধ্বংসী অস্ত্র অকার্যকর হয়ে যাবে।
বিশ্বের সকল শ্রমজীবীর মে দিবস, শোষকদের পরাজয়কে ত্বরান্বিত করবে। পুঁজিবাদীরাই এইযুগে ভয়ংকর দাস মালিক, রাষ্ট্রের উপর আধিপত্যের ন্যাক্কারজনক অবস্থা সৃষ্টি করেছে। এমন শোষক শ্রেণির রাষ্ট্র বিলুপ্তির অব্যাহত সংগ্রামকে উদ্দীপ্ত করে শ্রমিক দিবস। সোশ্যালিস্ট বা প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্রই সর্বজনীন রাষ্ট্র, সকল জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়। অবসান ঘটে রাজতান্ত্রিক, উদারনৈতিক, উত্তরাধিকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি; সামরিক ও ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্রের।
সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশিক আগ্রাসন থেকে মুক্তিলাভের জন্য বিশ্বে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কোয়ালিশন হওয়া প্রয়োজন। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৮৬৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লন্ডনের সেন্ট মার্টিন হলে ‘ শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির উদ্বাধনী ভাষণ ‘ প্রদান করেন। সেই ভাষণে তিনি ‘ শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির জন্য রাজনৈতিক জয়কে মহান কর্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেন। শ্রমজীবীদের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সমিতি গঠন করেন। এই অধিবেশনে পর আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতির জন্য ১৩টি নিয়মাবলির ঘোষণাপত্র স্বতন্ত্র পুস্তিকা রচনা করেন। যার নির্দেশনা অনুযায়ী ১৮৬৬ সালে প্রথম আন্তর্জাতিকের জেনেভা কংগ্রেস ৩-৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই অধিবেশনে বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডের এবং শ্রমিক সমিতির প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। শ্রমজীবী আন্দোলনের ইতিহাসে এই অধিবেশন তাৎপর্যপূর্ণ। এই কংগ্রেসে কার্ল মার্কস প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনা উপস্থাপন করেন। প্রথম আন্তর্জাতিকের লসেন কংগ্রেস ১৮৬৭ সালের ২-৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম আন্তর্জাতিক সমিতির ১৮৭৬ সালে অবসান হয়। এই সমিতির নেতৃত্ব দেন মার্কস। তাঁর অভিভাষণ, পুস্তিকা শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায়।
আমেরিকায় ১৮৬৬ সালের আগস্টে বাল্টিমোর কংগ্রেসে জাতীয় শ্রমিক ইউনিয়ন গঠিত হয়। সেই অধিবেশনের অভিভাষণ কার্ল মার্কস লিখেছিলেন। ১৮৭০ সালে সমিতির অধিকাংশ সদস্য আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতিতে যোগদানের পক্ষে থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি। তবে শ্রমিকদের ৮ ঘন্টা শ্রম দিবস, স্বাধীন রাজনীতি, নারী শ্রমিকদের আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের ইতিহাসে মার্কসের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ভিত্তির উপর বিভিন্ন দেশে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। বিশেষ করে মার্কসের ‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও’– শ্লোগানের মাধ্যমে শ্রমিকরা আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমজীবীদের আন্দোলন ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের কংগ্রেসে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগোর প্রতিবাদ আন্তর্জাতিতকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ১৯০৪ সালে আমস্টারডামে সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দৈনিক আটঘন্টা কাজের সময় এবং বিশ্বের সকল দেশে পয়লা মে শ্রমিকদের মিছিল সমাবেশ করার আহবান জানানো হয়। এই ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে বিভিন্ন দেশে সরকার ও ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলো নানারকম উৎসবে দিবসটি পালন করবে। কিন্তু শ্রমজীবীদের জীবন মান উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা কি গ্রহণ করবে?
বাংলাদেশ ও বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। বিপণ্ন, হতদরিদ্র শ্রমজীবীদের মুক্তির লক্ষ্যে বিশ্বের সকল দেশের শ্রমজীবীদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নতুনভাবে আন্তর্জাতিক গঠন করে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, পুঁজিবাদের নৃশংসতা থেকে মুক্তির অব্যাহত সংগ্রাম করার প্রস্তাব নেওয়া দরকার। শ্রমিক দিবসে সুন্দর সুন্দর কথা বলে বুর্জোয়া ধনপতিরা বিভ্রান্তি ছড়ায়। দয়া করুণার মাধ্যমে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা একটা ‘ফাঁকা’ বুলি মাত্র। বিশ্বে শ্রমিক আন্দোলনে সুবিধাবাদের সাময়িকভাবে জয় প্রত্যক্ষ করা যায়। তবে দীর্ঘ পরিক্রমায় শ্রমজীবীদের ঐক্য গড়ে উঠবে এবং সোশালিস্ট রাষ্ট্র কাঠামোয় সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সার্থক হবে।#




