গবেষক: নাসরিন আহমেদ
তত্ত্বাবধায়ক: ড. অনাথবন্ধু চ্যাটার্জী
বিভাগ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
প্রতিষ্ঠান: সিকম্ স্কিলস্ ইউনিভার্সিটি
প্রকাশনা: সময়ের শব্দ
ISSN: 2704-1387
প্রকাশের তারিখ: ২৮ আগস্ট ২০২৬
সারসংক্ষেপ:
ভারতবর্ষে আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ মূলত ঔপনিবেশিক শাসনকালে ঘটলেও তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসন, ইউরোপীয় বসতি ও সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফলে সাধারণ ভারতীয়, বিশেষত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, স্যানিটেশন ও প্লেগ নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক স্বাস্থ্যনীতি অনেক সময় সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের রূপ নেয়। অপুষ্টি, খাদ্যঘাটতি ও মহামারির ফলে জনজীবনে মৃত্যুহারও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
এই ঔপনিবেশিক স্বাস্থ্যচিন্তার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বাস্থ্যকে ব্যক্তি-শরীরের রোগমুক্তির সংকীর্ণ ধারণায় আবদ্ধ রাখেননি। তিনি স্বাস্থ্যকে সমাজ, শিক্ষা, পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানবিক সম্পর্কের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত একটি সামগ্রিক বিষয় হিসেবে দেখেছিলেন। ‘সমাজদেহ’-এর ধারণার ভিত্তিতে তিনি মনে করতেন, জনস্বাস্থ্যের স্থায়ী উন্নতির জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মনির্ভরতা ও সচেতনতা অপরিহার্য। শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের পল্লিউন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, সমবায় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমন্বিত করার যে প্রয়াস তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা আধুনিক অংশগ্রহণমূলক জনস্বাস্থ্যচিন্তার সঙ্গে গভীর সাদৃশ্য বহন করে। ১৯৭৮ সালের আলমা-আটা ঘোষণায় স্বাস্থ্যকে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত অবস্থা এবং জনগণের অংশগ্রহণকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় তার পূর্বাভাস লক্ষ করা যায়। অতএব, রবীন্দ্রনাথের জনস্বাস্থ্যচিন্তা কেবল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়; মানবকেন্দ্রিক, সমাজভিত্তিক ও সমন্বিত আধুনিক স্বাস্থ্যচিন্তারও এক গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূত্র।
মূল শব্দ: ঔপনিবেশিক জনস্বাস্থ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জনস্বাস্থ্যচিন্তা, সমাজদেহ, পল্লিউন্নয়ন, স্বাস্থ্যসচেতনতা, স্বাস্থ্য ও সমাজ, ম্যালেরিয়া, মহামারি, টিকাদান, স্যানিটেশন, জনগণের অংশগ্রহণ, আত্মনির্ভরতা, শ্রীনিকেতন, আলমা-আটা ঘোষণা।
ভারতবর্ষে আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সূচনা সাধারণত ব্রিটিশ শাসনকাল থেকেই চিহ্নিত করা হয়। হাসপাতাল নির্মাণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ আইন, টিকাদান ব্যবস্থা এবং নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের সময়েই গড়ে ওঠে। কিন্তু এই স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি আদতে ছিল সাম্রাজ্যিক শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অর্থাৎ যে ব্যবস্থাকে ‘জনস্বাস্থ্য’ বলা হচ্ছিল, তার কেন্দ্রে ছিল না উপনিবেশের সাধারণ মানুষ; বরং ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসন, ইউরোপীয় বসতি এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা। ফলে জনস্বাস্থ্য ধারণাটি ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় এক ধরনের বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছিল। নামে জনস্বাস্থ্য, কিন্তু বাস্তবে সাধারণ জনগণের জন্য তা ছিল সীমিত ও পরোক্ষ। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, “ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার সময়ে ভারতবর্ষ শুধু মৃত্যু তাড়িত দেশ (death ridden) ছিল তা-ই নয় এক মৃত্যুজর্জরিত (death ridden) ছিল। ভারতবর্ষের লোকসংখ্যার ৪০ শতাংশ ৫ বছর বয়স পার হওয়ার আগেই মৃত্যুর মুখে পড়ত, ২০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর ৫০ শতাংশ বাঁচতেন, আর ৬০ বছর বয়সের পর মাত্র ১৫ শতাংশ টিকে থাকতেন।” ১
বলাবাহুল্য, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভারতীয়রা নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়নি; ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রজা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ ছিল না। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাও সেই ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতো। ইউরোপীয় বসতি ও সামরিক শিবিরের জন্য উন্নত স্যানিটেশন, পরিষ্কার পানীয় জল, হাসপাতাল ও চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও গ্রামীণ ভারত প্রায় সম্পূর্ণ অবহেলিত ছিল। স্থানীয় পুরসভা বা নগর সংস্থাগুলির হাতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব থাকলেও তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল সীমিত। ফলে শহর ও গ্রাম, ইউরোপীয় ও দেশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসুবিধার বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায় যে, ঔপনিবেশিক জনস্বাস্থ্যের সূচনা হয়েছিল মূলত সামরিক প্রয়োজন থেকে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে সংক্রামক রোগের প্রকোপ ছিল অত্যন্ত বেশি। ম্যালেরিয়া, কলেরা, আমাশয়, যকৃতের রোগ এবং অন্যান্য উষ্ণমণ্ডলীয় রোগে বিপুল সংখ্যক সৈন্য মারা যেত। গবেষণা থেকে জানা যায় যে, কোম্পানির সেনাবাহিনীতে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর হার অপেক্ষাকৃত কম হলেও রোগে মৃত্যুর হার ছিল বহুগুণ বেশি। এই পরিস্থিতি ব্রিটিশ প্রশাসনকে বাধ্য করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে। তাই সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য রক্ষা ও প্রশাসনিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
একথা মনে রাখতে হবে যে, এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন করা হয়। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে নানা বিধান কার্যকর করা হয়, যার মধ্যে সংক্রামক ব্যাধি আইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সৈন্যদের মধ্যে যৌনরোগের বিস্তার রোধ করতে পতিতালয় ও যৌনকর্মীদের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট এলাকায় নিবন্ধিত নারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতো এবং তাদের চলাচলও নিয়ন্ত্রিত হতো। এই ধরনের আইন জনস্বাস্থ্য রক্ষার নামে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি রূপ হিসেবে কাজ করেছিল।
ঔপনিবেশিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক আচরণের ওপর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মনে করত যে, বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রধান উৎস। কুম্ভমেলা, তীর্থযাত্রা বা বিভিন্ন উৎসবকে তাই সন্দেহের চোখে দেখা হতো। সংক্রামক রোগের আশঙ্কায় এসব অনুষ্ঠানে টিকাদান, স্বাস্থ্যপরীক্ষা বা জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বহু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের সংঘাত সৃষ্টি হয়। কারণ এসব পদক্ষেপ অনেক সময় ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতো।
“ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার সময়ে অপুষ্টি ও রোগের প্রকোপ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ঘটার অন্যতম কারণ ছিল খাদ্যদ্রব্যের অপেক্ষাকৃত কম জোগান। বাংলা দেশের ক্ষেত্রে এই কথাটা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ছিল। একটি হিসেব মতে ১৯১১ এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে মাথাপিছু খাদ্যের জোগান বাংলা দেশে ৩৮ শতাংশ কমে যায়। এর ফলে শরীরের রোগের সঙ্গে যোঝার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমতে থাকে ও নানা রকমের রোগের প্রকোপ ও তজ্জনিত মৃত্যু বাড়তে থাকে। বীরভূমের খাদ্যঘাটতি কতটা ঘটেছিল তার সঠিক হিসেব এখনও নেই। কিন্তু খাদ্যঘাটতি যে নানা কারণে কমছিল তা আগে আলোচনা করেছি। বীরভূমের ক্ষেত্রে খাদ্যঘাটতি শুধু বাইরে চালান হয়ে যাওয়ার জন্য নয়, ক্রমাগত প্রাকৃতিক যে সংকটের মধ্যে দিয়ে জেলা চলছিল তা বড়ো এক অংশের মানুষের দৈনন্দিন গ্রাসাচ্ছাদন করার ক্ষেত্রে রীতিমতো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল।” ২
ফলে বীরভূমসহ বঙ্গের বিভিন্ন জেলায় মৃত্যুর বীভৎস লীলা ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা খুবই চিন্তার বিষয় ছিল। বিষয়টি কেবলমাত্র বাংলার নয়, সমস্ত ভারতবর্ষের নিরিখে যথেষ্ট দুশ্চিন্তার কারণ ছিল।
“রবীন্দ্রনাথ স্বাস্থ্যের একাধারে একটি সামাজিক দিক ও বৈজ্ঞানিক দিক আছে তা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন আমরা যে নিয়মবিধি জীবনযাত্রার বিচ্ছিন্ন কিছু ক্ষেত্রে মানি তা স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে মানি না। কাসুন্দি তৈরি করতে গিয়ে যে স্বাস্থ্যবিধি ও শুচিতা রক্ষা করে চলা হয় সেই একই শুচিতা ও স্বাস্থ্যবিধি আমাদের পারিপার্শ্বিকের পরিচ্ছন্নতা ও সমাজের বৃহত্তর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থেকে যায়। ফলে অন্যান্য বিষয়ের মতো স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও দৃষ্টিভঙ্গি খণ্ডিত ও ব্যক্তিগত স্বার্থসম্পর্কিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।” ৩
পল্লিউন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং গুরুত্ব সহকারে তা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করবার চেষ্টা করেছেন। অরাজনৈতিকভাবে হলেও তাঁর এই ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে আরও একটি উদ্ধৃতি উপস্থাপন করা যায়, যা তাঁর আত্মসচেতনতা ও সক্রিয়তার বিভিন্ন দিক চিহ্নিত করে।
“প্রথমজীবনে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিয়ে যেমন ব্যস্ত থেকেছেন তেমনই তাঁর এই লব্ধজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নিজের চতুষ্পার্শ্বের পীড়িত ও মুমূর্ষুদের সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ছিল তাঁর নেশা। নানা সময়ে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকে পরিবারের পীড়িতদের পীড়ার নিরসনের কাজে লাগিয়েছেন। এমনকি আশ্রমের সূচনাপর্বে ছাত্রদের চিকিৎসার জন্য একটি হোমিয়োপ্যাথি ওষুধের বাক্স তাঁর নির্দেশমতো ছাত্রাবাসে মজুত থাকত। কবির লেখার টেবিলে এইরকম আর-একটি বাক্স মজুত থাকত। অশ্রমিকদের রোগের চিকিৎসা করে অনেকসময়ে তিনি তাঁদের নিরাময় করে তুলেছেন এর ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে তিনি বায়োকেমিক ওষুধের উপর নির্ভর করতেন বেশি। কবির যত বয়স বেড়েছে সমাজের স্বাস্থের সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্বাস্থ্যের জন্য অধীত জ্ঞানকে ব্যবহার করার প্রবণতা বেড়েছে। শুধু জনসাধারণের স্বাস্থ্য নয় নিজেকে কর্মক্ষম রাখার জন্য তাঁর ব্যাকুলতার প্রকাশ ছিল তীক্ষ্ণ।” ৪
প্রসঙ্গত বলতে হয়, গুটিবসন্ত প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ঠিক কেমন পরিস্থিতি ও দ্বন্দ্ব ছিল তা আলোচনা সাপেক্ষে উপস্থাপন করা যেতেই পারে। পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আবিষ্কৃত টিকাদান পদ্ধতি চালু করার আগে ভারতীয় সমাজে গুটিবসন্ত প্রতিরোধের দেশীয় পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। স্থানীয় টিকাদাররা গুটিবসন্তের শুকনো ক্ষত থেকে সংগৃহীত উপাদান ব্যবহার করে টিকা দিতেন এবং এর সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় আচারও যুক্ত ছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন এই পদ্ধতিকে অবৈজ্ঞানিক মনে করে জেনারের আবিষ্কৃত টিকাদান পদ্ধতি চালু করতে চাইলে বহু ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিরোধ দেখা দেয়। এই সংঘাত মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব ছিল না; বরং এটি ছিল সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাসের সংঘর্ষ।
উল্লেখ্য, ঔপনিবেশিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে কঠোর রূপ দেখা যায় প্লেগ মহামারীর সময়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে প্লেগের প্রকোপ বাড়লে প্রশাসন কঠোর আইন প্রণয়ন করে। সন্দেহভাজন রোগীদের জোরপূর্বক পৃথকীকরণ, ঘরবাড়ি তল্লাশি, সম্পত্তি ধ্বংস করা, এমনকি বাড়িঘর ভেঙে ফেলার ক্ষমতাও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু জায়গায় প্রতিবাদ ও অশান্তি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ রোগের ভয়ের চেয়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে বেশি ভয় পেত।
এই জটিল ঐতিহাসিক পরিস্থিতির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জনস্বাস্থ্য বিষয়ে এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি কেবল রাষ্ট্রীয় নির্দেশ বা আইনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমাজের অভ্যন্তর থেকে উদ্যোগ এবং মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সমাজ নিজেই একটি জীবন্ত সত্তা, যার সুস্থতা নির্ভর করে তার সদস্যদের সচেতনতা ও সহযোগিতার ওপর। এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ম্যালেরিয়া প্রসঙ্গে বলেছেন, “প্রতি বৎসর কত লোক জন্মাচ্ছে কত লোক মরছে, সংখ্যা কত বৃদ্ধি হচ্ছে, এটা বড়ো কথা নয়; যারা টিকে রইল তারা মানুষের মতো রইল কি না সেইটে বড়ো কথা। তাদের কার্যকারিতা, মাথা খাটাবার শক্তি আছে কি না সেইটে বড়ো কথা।… শারীরিক দুর্বলতা থেকে মানসিক দুর্বলতা আসে।… যার কেবল কোনরকমে বেঁচে থাকা চলে, জীবন ধারণের জন্য যা দরকার তার বেশি একটু উদ্বৃত্ত হয় না, তার প্রাণে বদান্যতা থাকে না। প্রাণের বদান্যতা না থাকলে বড়ো সভ্যতা সৃষ্টি হতে পারে না। যেখানে প্রাণের কৃপণতা সেখানে ক্ষুদ্রতা আসবে।” ৫
রবীন্দ্রনাথের এই স্বাস্থ্যভাবনা বর্তমান সময়ের স্বাস্থ্যবিধি ও পরিকল্পনার সঙ্গে অসামান্য সাযুজ্য বিধান করে। আধুনিক কালের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বেশ ছন্দ রক্ষা করতে সক্ষম। সমাজ ও সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজন কতখানি, তিনি প্রতিটি মানুষকে গভীরভাবে উপলব্ধি করাতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সচেতনতা। রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক সমাজরূপকাররা এ বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী নন।
একথা অনস্বীকার্য যে, রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় ‘সমাজদেহ’ ধারণাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করতেন যে, সমাজের সমস্যা সমাধানে সমাজকেই সক্রিয় হতে হবে। বাইরের সাহায্য সাময়িকভাবে উপকার করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী উন্নতি ঘটাতে পারে না। তাই তিনি গ্রামোন্নয়ন, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যকে একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত করে দেখেছিলেন।
শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে তাঁর পল্লিউন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। গ্রামবাসীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যবিধি, সমবায়চেতনা এবং স্বনির্ভরতার ধারণা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য ছিল এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে মানুষ নিজের শক্তিতে নিজের উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হবে।
রবীন্দ্রনাথ সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সামাজিক দায়িত্বের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, অতীতে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথার কারণে ধনী ব্যক্তিরা সমাজকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করতেন। যেমন, পুকুর খনন, রাস্তা নির্মাণ বা ধর্মশালা প্রতিষ্ঠা। এসব উদ্যোগ গ্রামীণ সমাজে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করত। কিন্তু ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পদ সঞ্চয় প্রধান হয়ে ওঠায় সেই সামাজিক ব্যয় ক্রমশ কমে যায়। এই প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ একদিকে সমাজের আত্মনির্ভরতার ওপর জোর দিলেও অন্যদিকে সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির দায়িত্ববোধের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছিলেন। তাঁর মতে, সমাজের উন্নয়ন কেবল রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না; সমাজের অভ্যন্তরেও দায়িত্ববোধ জাগ্রত হতে হবে।
পরবর্তীকালে আধুনিক জনস্বাস্থ্য চিন্তায়ও এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। ১৯৭৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলমা-আটা ঘোষণায় বলা হয়েছিল যে, স্বাস্থ্য কেবল রোগমুক্ত অবস্থার নাম নয়; বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বিত অবস্থা। সেই ঘোষণায় আরও বলা হয়েছিল যে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এই ধারণা আধুনিক জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।
এই ঘোষণার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার একটি গভীর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসা বা হাসপাতালের বিষয় নয়; এটি শিক্ষা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই জনস্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য সমাজের অভ্যন্তর থেকেই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
পরিশেষে বলতে হয়, ঔপনিবেশিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা একদিকে আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করলেও অন্যদিকে তা ছিল সাম্রাজ্যিক স্বার্থের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এর বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ একটি মানবকেন্দ্রিক ও সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্যচিন্তার দিকনির্দেশ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ আধুনিক জনস্বাস্থ্য নীতিতেও মানুষের অংশগ্রহণ, সামাজিক সচেতনতা এবং সমন্বিত উন্নয়নের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই অর্থে রবীন্দ্রনাথের জনস্বাস্থ্যচিন্তা কেবল ঐতিহাসিক নয়; বরং তা আধুনিক স্বাস্থ্যনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূত্র হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে অনস্বীকার্য যে, স্বাস্থ্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি কেবল শারীরিক সুস্থতার সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং তা সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবসভ্যতার সামগ্রিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আধুনিক অর্থনীতিবিদেরা যেখানে স্বাস্থ্যকে প্রধানত উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় হিসেবে দেখেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথ স্বাস্থ্যকে মানুষের সৃষ্টিশীলতা, সহযোগিতা ও মানবিক বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে সুস্বাস্থ্য মানে শুধু রোগমুক্ত শরীর নয়, বরং এমন এক সুসংগঠিত সামাজিক পরিবেশ যেখানে মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতা, ঐক্য ও মানবিক সম্পর্কের মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজজীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই কারণেই তিনি পল্লিসমাজের পুনর্গঠন ও সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকে একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন। অতএব, স্বাস্থ্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা আধুনিক বস্তুবাদী ধারণার সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর মানবসভ্যতার সার্বিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত এক গভীর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে মনোযোগী ও গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল।
তথ্যসূত্র:
১. C.B. Mamoria, ‘Human Waste in India’, Modern Review, Feb, p. 113–21, 1952.
২. দীক্ষিত সিংহ, ‘রবীন্দ্রনাথের পল্লিপুনর্গঠন’, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০ মে ২০১০, পৃষ্ঠা: ৩১৭।
৩. তদেব, পৃষ্ঠা: ৩১৮।
৪. তদেব, পৃষ্ঠা: ৩১৮।
৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘সমবায়ে ম্যালেরিয়া নিবারণ’, ১৯২৪, রবীন্দ্র রচনাবলী, ২৭তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৬৯, বিশ্বভারতী, ১৯৭৪।




