পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম হরতান। প্রকৃতি যেন সবদিক থেকে এই গ্রামের বাসিন্দাদের বঞ্চিত করে রেখেছে। গ্রামের নব্বই শতাংশ মানুষই কৃষি নির্ভর। অথচ এলাকার রুক্ষ মাটিতে ফসল ফলাতে তাদের মাথার ঘাম পায়ে পড়ে। পাথুরে মাঠে জল সেচের জন্য কোনো প্রকল্প নেই।
বর্ষাকালে যদি ভালো বৃষ্টিপাত হয় তবে পাহাড়ি টিলা থেকে নেমে আসা সাময়িক ঝরনার জলে মাটির উপরিভাগ কিছুটা ভিজে যায় ঠিকই কিন্তু মাটির গভীরের তৃষ্ণা তা শুষে নিতে দেরি করে না।
এখানে চাষীদের জন্য, কৃষি কাজের জন্য কোন সরকারি প্রকল্পের জলাধার নেই। নেই পানীয় জলের কোন সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা। ফলে মাটির মতো এখানকার মানুষগুলোর তৃষ্ণা চিরকালীন ও গভীর। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য জলের চাহিদা মানুষের অনেকগুলি মৌলিক চাহিদার মধ্যে সর্বপ্রথম। অথচ সেদিকে সরকারের কোনো নজর নেই। নেই কোনো প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। যা ও একটা কোন ঐতিহাসিক যুগে তৈরি হয়েছিল–সেখানে নেই কোনো ডাক্তার বা নার্স। ওষুধ তো দূর অস্ত। কোনো এক কালে নাকি ছিল। এখন দু কামরা বিশিষ্ট সেই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি একটি ভুতুড়ে বাড়ি হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন আগাছার পোশাকের আড়ালে তাকে আর চিহ্নিত করার উপায় নেই। নানা রকম বিষধর সাপ আর জন্তু জানোয়ারের আস্তানায় পরিণত হয়েছে সেটা।
এই গ্রামে ‘নেই’ এর তালিকা দীর্ঘ। নেই কোনো মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ও। এই একবিংশ শতাব্দীতে যা ভাবনার অতীত। যা ও একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে সেখানে মাত্র একজন বৃদ্ধ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকই বিদ্যালয়টা চালান। তিনি অবসর নেওয়ার পর আর কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকাই নিয়োগ করা হয়নি। স্বভাবতই ঢক্কা নিনাদিত মিড ডে মিলের কোনো বালাই এখানে নেই। শরীরে শতছিন্ন পোশাকের মতো ক্ষুধাও এখানে শরীরের অঙ্গ।
রাস্তাঘাট যানবাহনের কোনো বালাই নেই। অসুস্থ মানুষকে সবাই মিলে কাঁধে করে এবড়ো খেবড়ো রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে নিয়ে যেতে হয় জয়পুরে। অথচ রাস্তায় সবসময় হাজার বিপদের সম্ভাবনা। তবুও জীবন বয়ে যায় নিজস্ব গতিতে মরা, পচে ও হেজে যাওয়া নদীর মতো।
তারা এদেশে প্রজার মতো থাকে। তারা বুঝতেই পারেনা যে তারা এ দেশের নাগরিক। একটা বিশেষ ঋতুতে তারা বোঝে যে তারা নাগরিক। না, এই ঋতু প্রাকৃতিক ঋতু নয়। রাজনৈতিক ঋতু। দেশে নির্বাচনের ঋতু। এই ঋতুতেই তাদের নাগরিক বলে মনে করা হয়। তখন তাদের গ্রামে কত যে কোকিল আর কাকের আনাগোনা শুরু হয়ে যায় তার হিসাব থাকে না। তখন তারা নিজেদের শরীরে নিজেরাই চিমটি কেটে বুঝে নেবার চেষ্টা করে তারা এখনো বেঁচে আছে বটে এবং মানুষই বটে।
অথচ সারা বছর ভুখা পেটে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে যেটুকু ফসল ফলাতে পারে তাতেই দিনে একবার সাথে বনের লতাপাতা ,মূল , কন্দ খেয়ে দিন কেটে যায়। এই খবর ঐ কাক আর কোকিলেরা রাখে না। রাখার দরকারও নেই।
এত যন্ত্রণার মধ্যেও বর্তমানের সর্বনাশা এক বিপদের আগ্রাসন তাদের স্থবির করে দেয়। তা হলো ডিজিটাল জগতের ধারালো নখের থাবা। কোথা দিয়ে কিভাবে যে নিজেদের বাপ ঠাকুরদার চৌদ্দ পুরুষের জমি কে বা কারা রেকর্ড করে নিচ্ছে অদৃশ্যে, তার হদিস পাওয়া মুশকিল। তবুও তাদের জীবন চলে প্রাণ ধারণের নিয়মে যেমন চলে পশুদের জীবন। বুকের ভিতর ধুকপুকানিটাতেই তারা টের পায় যে এখনো তাদের দেহ যন্ত্রটা সচল আছে। তাদের জীবনে ‘নেই’এর সংখ্যাটি অনেক লম্বা চওড়া। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে পানীয় জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান সব ক্ষেত্রেই শুধু নেই আর নেই! নেই কর্তৃপক্ষের নজর এবং এই অঞ্চলের উন্নতির কোন আগ্রহ। এতো ‘নেই’ এর মধ্যে এক মহান সম্পদ তাদের আছে। তা হলো , গ্রামবাসীর মনের সরলতা এবং পাথরের মত নিরেট এক মজবুত ঐক্যবদ্ধতা।
নির্বাচন নাকি গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব। অথচ এখানকার মানুষের কাছে তা কোনদিনই মনে হয়নি। আগুন জমছিল অনেক আগে থেকেই। কিন্তু এই অসহায় মানুষগুলি তাদের ন্যূনতম দাবি দাওয়া বারবার সরকারের কাছে পেশ করেও বিন্দুমাত্র সুরাহা পায় নি। ফলে তাদের বারবার মনে হয়েছিল, মনে সন্দেহও দানা বেঁধেছিল—তারা এই দেশের, এই পৃথিবীর মানুষ বটে তো? নাকি অন্য কোনো এক অজানা গ্রহের বাসিন্দা?
(দুই)
চৈত্র মাস। আকাশ থেকে আগুন ঝরছে।
চারিদিকে জমি জমা ফেটে চৌচির। গাছের পাতারা শুকিয়ে হলুদ বর্ণ ধারণ করছে।
নিজের মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে বসে পাড়ার মোড়ল পঞ্চান্ন বছর বয়সী সূরজ ভূমিজ ভাবছিল অন্য কথা। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আকাশে পঞ্চমীর চাঁদ। সেই চাঁদের আলোয় সূরজ ভূমিজের কাঁচা পাকা চুল আর মোটা গোঁফের রূপটা যেন চে গুয়েভারার বা সিধু কানুর মুখটাকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় সে ডুবে থাকে। হঠাৎ হাতের লাঠিটা বাগিয়ে সে তাদের সুনির্দিষ্ট ভাষায় জোরে একটা হাঁক পাড়তেই কিছুক্ষণের মধ্যে তার উঠোনে ছেলে, বুড়ো, মেয়ে, মদ্দা সবাই এসে হাজির।
সবার চোখেমুখে এক আতঙ্কিত প্রশ্ন। কিন্তু কেউ সাহস করে কিছু বলতে পারছে না বা জিজ্ঞাসা করতে পারছে না। মোড়লের চোখ দুটো যেন আগুনের গোলার মত জ্বলছে। অনেকক্ষণ সবাই চুপচাপ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর বুকে সাহস এনে গলাটা একটু খাঁকাড়ি দিয়ে গ্রামের জোয়ান মদ্দ চাঁদ মুন্ডা সভয়ে জিজ্ঞাসা করল,
—সর্দার, কি খবর বটে ?
চাঁদের কথায় সবার দিকে সূরজ ভূমিজ একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল,
— কান খুইল্যে শুইন্যে লে সব্বাই…
— কি ক’ ছিস?
— বিহা বাড়ির উৎসবে নেমন্তন্ন না কইরল্যে কেউ যায়?
— না রে, কে যাবেক? তা কার বিহা বটে ?
— কারো বিহা না।
— তবে কি ক’ছিস?
—- উয়ারা ক’ছে ভোট নাকি উদিগের গণতন্ত্রের উৎসব। মোদের নাকি ঐ উৎসবে লাগতি হবেক। আরে উয়ারা মোদের কুনোদিন গণতন্ত্রের মানুষ মনে কইরেছ্যে নাকি?
সূরজ ভূমিজের প্রশ্নে সবাই সমস্বরে উত্তর দিল।
— না, সর্দার।
গ্রামের সবথেকে ছটফটে এবং সবার প্রিয় মেয়ে ফুলমনি বলল,
—কুনোদিনই করেক নাই।
সবার উত্তর শুনে সূরজ মোড়ল বলল,
— তেবে মোদের ই খামোখা উৎসবে যাওয়া ঠিক হব্যেক ?
মোড়লের প্রশ্নে উপস্থিত সবাই কিছুক্ষণের জন্য থমকালো। সাময়িক নীরবতার পর সবাই প্রায় একসঙ্গে এবং একই সুরে বলল,
— না, না। মোরা ভোট দিত্যে যাইবেক না।
মোড়লের মোটা কাঁচাপাকা গোঁফের নীচে যেন এক টুকরো হাসি ঝুলে রইল। যারা মোড়লকে চেনে তারা জানে এই হাসি কী ভয়ঙ্কর কথা বলে।
মোড়ল বলল,
— হা, ইটাই ঠিক। ইটাই হবে বটেক।
মোড়ল ঝালিয়ে নেবার জন্য আবার বলল,
— জবান দিচ্ছিস তো!
— পাক্কা কতা মোড়ল।
— যা, সব ঘরকে যা। পরশুদিন মোরা কেউ ভোট দিবক নাই। কেউ বেইমানি কইরল্যে কিন্তুক ভালু হব্যেক নাই।
— হা সর্দার তাকে মোরা দেইখ্যে লিব।
মোড়লকে কথা দিয়ে সবাই যে যার ঘরে ফিরে গেল।
মোড়ল সূরজ ভূমিজের চিন্তা যেন অনেকটাই দূর হলো। সবাই এখন তাদের ঘরে চলে গেছে। আরো কিছুক্ষণ চাঁদের আলো শরীরের মেখে সূরজ ভূমিজ তার মাটির দাওয়াতেই শরীরটা এলিয়ে দিল।
তার চোখ আকাশের বাঁকা চাঁদের দিকে।
(তিন)
ভোটের দিন সন্ধ্যাবেলায় টিভির বিভিন্ন চ্যানেলের টক শো তে বড় বড় পণ্ডিতরা একের পর এক বলে চলেছেন ভোট নিয়ে। তাদের মতে এবারকার ভোট নাকি প্রকৃতই গণতন্ত্রের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর এত ভোট কখনো পড়েনি।। গড়ে প্রায় তিরানব্বই শতাংশের উপরে ভোট পড়েছে। এটা ভাবা যায় না। সত্যিই মানুষ গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছে। গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। টিভি, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অভাবনীয় উৎসবের সাফল্যে যখন সবাই চওড়া হাসি ছড়িয়ে বাইঠ দিচ্ছেন ঠিক তখনই একটা ছোট খবর হেড লাইনে চলে এলো।
” পুরুলিয়ার জয়পুরের হরতান গ্রামের ১৬৩ নম্বর বুথে ভোটের হার শূন্য শতাংশ।”
বিভিন্ন চ্যানেলে বসে থাকা বিজ্ঞ জনেদের মুখের চেহারা নিমিষেই যেন পাল্টে গেল। আলোচনার ঔজ্জ্বল্য কেমন যেন মিইয়ে গেল। এক অসহনীয় নীরবতা বিরাজ করছিল টিভির পর্দায়।
বিজ্ঞ জনেরা গণতন্ত্রের এই উৎসবের যারা জয়গান গাইছিলেন তারা হায় হায় করে উঠলেন। এরমধ্যে আবার অনেকেই বিরোধী দলের চক্রান্ত দেখতে শুরু করলেন। অনেকেই বললেন,ভোট না দেওয়াটা অন্যায়।
খবরটা সর্দার সূরজ ভূমিজ পেয়েছিল। তার কাছ থেকে তাদের গ্রামের সবার কাছেই খবরটা গেল। সবাই ভাবল, ‘ ইতো দিন্যে বাবু মুশাইগো কানে জল ঢ্যুকেছ্যে। হা,হা,হা। মোদের সর্দারের বুদ্ধি বটেক।”
অন্যদিকে সূরজ ভূমিজ মনে মনে বলল,
— আরে ই টাউনের বাবুরা তুরা তো বুলিস ভোট মোদের অধিকার। মুই মোর অধিকার না লিতেই পারি। কি ক’ছিস বাবুর দল? মুই বুলি কি ই বার তুরা তুদের মেরুদণ্ডটা একটুস মেরামত কইরে লে না রে!#




