বন্ধুবান্ধবরা বলে, “তোমার জীবনী লেখ”। সহকর্মীরা বলে, ”রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাগুলি লিখে রাখ, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে”। আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, “বসেই তো আছ, লেখ না তোমার জীবনের কাহিনী”। বললাম, “লিখতে যে পারি না; আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি”।
উপরের কথাগুলি আজ থেকে শতবর্ষেরও আগে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এক বিস্ময় মানবের, যিনি উচ্চারণে আঞ্চলিক, পোশাকে দেশীয় এবং মননে বাঙ্গালি, রাজনীতিতে বৈশ্বিক চিন্তার ধারক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ইউনিয়ন ছিল ফরিদপুরের সর্ব দক্ষিণের ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে, মধুমতি। যে পরিবারের তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, নানা কারণে সেই পরিবার দেশের অগ্রসর মানুষদের কাছে পরিচিত ছিল। কিন্তু মধুমতির জোয়ার-ভাটার মতই বঙ্গবন্ধুর পূর্বসূরীদের জীবনে এক সময় ভাটা দেখা দেয়। কিভাবে বিত্ত-বৈভব, সুনামের জোয়ার ভাটায় পরিণত হল, তা নিয়ে সমকালীন চারণ কবিদের গান আছে। কিন্তু শেখ পরিবারের পূর্বসূরী শেখ মুজিব, কখনও সেই হৃত গৌরব পূনরুদ্ধারে মনোনিবেশ করেন নাই। কারণ তিনি আরো বড় পরিবার, গোটা বাঙ্গালি জাতি তথা বাংলার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন। তিনি বাঙ্গালির জীবনে এক নব জোয়ার এনেছিলেন। তাই তাঁকে নিয়েও লেখা হয়েছে, গল্প, গান, কবিতা। জাতি হিসাবে আমাদের দূর্ভাগ্য তাঁকে নিয়ে আমাদের লিখতে হয়েছে বিষাদগীতিও। বাঙ্গালির জীবনে নবজোয়ার বয়ে আনা বঙ্গবন্ধুকেই নয়া বন্দোবস্তের নামে বাঙ্গালির একাংশ আজ খারিজ করতে চাইছেন। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙ্গে, বত্রিশের বাড়ি ভেঙ্গে, দল হিসেবে আওয়ামলীগকে নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে, তাঁর কর্ম, রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাসকে, তাঁর কীর্তিকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যাবে কি যাবে না, সেটা ইতিহাসই বিচার করবে।
যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে ২০২৪ সালের কথিত ছাত্র-জনতার গণ অভ্যূত্থান ঘটানো হল, এই দেশে বাঙ্গালি জাতির প্রতি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তোলা মানুষটির নামই তো শেখ মুজিব। নয়া বাংলাদেশের কথা বলে গা থেকে ছাত্রত্বের গন্ধ না যেতেই বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে বিশাল অংকের টাকা খরচ করে নির্বাচন করা ছাত্র-যুবকেরা কি জানেন, ১৯৪৯ সালে টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে শেখ মুজিবের দলের প্রার্থীকে জয়লাভ করানোর জন্য ছাত্ররা নিজেদের শখের ঘড়ি, কলম বিক্রি করে দিয়েছিলেন? আজকে ছাত্ররা বলছেন, তা তো বঙ্গবন্ধুরই কথা, কাজ, কীর্তিকে অনুকরণ কিন্তু তাঁর অবদানকে অস্বীকার করে।
তারা তো বঙ্গবন্ধুকে খারিজ করতে চাইবেনই। কারণ তাদের কোনো রাজনৈতিক দর্শন নেই, আদর্শ নেই। যে জনতাকে তারা মাঠে নামালেন, যাদের আবেগকে কাজে লাগালেন তাদের সাথে কোনো সংযোগ নাই। একটা ঘটনার কথা বলি। ১৯৪৯ সালের জুলাই মাসের দিকের ঘটনা একদিন রাতের বেলা বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ মহাকুমা সদর থেকে রাত দশটায় একজন মাঝির নৌকায় টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। সারাদিন পুলিশের সাথে হ্যাঙ্গামা, জনসভা, নেতাকর্মীদের সাথে সাক্ষাৎ, আলাপ, নির্দেশনা সবকিছু মিলিয়ে তিনি ক্লান্ত। তাই নৌকাতে চড়েই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। মধুমতির একদিকে ফরিদপুর। অন্যদিকে যশোর ও খুলনা জেলা। নদীটা একটা জায়গায় খুব চওড়া। সেখানে প্রায়ই ডাকাতি হয়। চারজন লোক মাঝিকে জিজ্ঞেস করলেন, আগুন আছে কি’না। এইটা তাদের কৌশল। আগুন নিতে নৌকার লোকেরা কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, নৌকা কোথায় যাবে? মূলতঃ তারা ডাকাত ছিল। মাঝি বললেন, টুঙ্গিপাড়া।
নৌকায় কে?
শেখ মুজিব।
ডাকাতেরা মাঝিকে তাদের বৈঠা দিয়ে আঘাত করে বলল, শালা, আগে বলতে পার নাই, নৌকায় শেখ সাহেব আছেন! আর গণ অভ্যূত্থানে নেতৃত্ব দেওয়াদের একাংশকে এখন রাতের বেলা রাস্তাঘাটে দেখলে মানুষেরা মবের ভয় পান, ডাকাতির ভয় পান।
১৯৬৯ সালের অক্টোবর মাসে বঙ্গবন্ধু তিন সপ্তাহের জন্য ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন। ম্যানচেস্টারসহ একাধিক জায়গাতে তাঁর পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতেই দেশে কারফিউ জারি করা হয়। সরকারি হিসাব মতে ৭ জন লোককে হত্যা করা হয়। তিনি তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নেন, দেশে ফেরার। বিবিসি বাংলার সাংবাদিক আ ন ম সিরাজুর রহমান তাঁকে প্রশ্ন করেন, মুজিব ভাই আপনি এখানে বেশ কিছুদিন থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলেন, হঠাৎ চলে যাচ্ছেন। কেন যাচ্ছেন বলবেন কি?
শেখ মুজিব সবিস্তারে উত্তর দেন। কিন্তু সেই বক্তব্যের সার সংক্ষেপ হল, যখন দেশে গোলমাল হচ্ছে তখন আমি বিদেশে বেড়াতে পারি না। দেশের মানুষের প্রতি যেমন ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা, তেমনি দেশের বাইরে অবস্থানরত মানুষের প্রতিও ছিল তাঁর দারুণ মমত্ববোধ। সেই সফরেই তিনি বার্মিংহাম প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমি আশা করি, তোমরা ব্রিটিশ জনগন তোমাদের সভ্যতা এবং ঐতিহ্য অনুসারেই আমার লোকদের সাথে ভাল ব্যবহার করবা এবং আশাবাদী তোমরা নিশ্চয় সেটা করবে।
অথচ দেশে হামের টিকা না দেওয়ার ফলে শত শত শিশুর প্রাণহানি হল, দেশের বাইরে থেকে নিগৃহীত নারী-পূরুষের লাশ আসতে লাগল, তাতে কারো মুখে কোনো রা নেই। এ কোন নয়া বন্দবস্ত? এজন্যই কি আপনারা বঙ্গবন্ধুকে খারিজ করতে চান? দলে ভারী হওয়ার জন্য জোট করলেন জামায়াত-শিবির-রাজাকারদের সাথে? ১৯৬৯ সালের ২২ অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাক প্ত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান ধর্মপ্রাণ। ইসলাম ধর্মের ক্ষতিসাধন তারা কোনোক্রমেই বরদাশত করিবে না। কিন্তু ইসলামের দোহাই দিয়ে যে চেনা মুখগুলি শুধুমাত্র ছয় কোটি বাঙ্গালি মুসলমানকে অবিরাম ধোঁকা দিয়া আসিতেছে, তাহাদেরও বঞ্চিত মানুষেরা কোনো দিন ক্ষমা করিতে পারে না।
পরিস্থিতি কিন্তু আগের মতই। শুধু ধোকা খাওয়া মানুষের সংখ্যাটা বেড়ে তিনগুণ হয়েছে।
সত্তরের দশকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে একটা কথা খুব চালু ছিল, ডেভিড ফ্রস্ট যার সাক্ষাৎকার নেয়নি সে কিসের বিখ্যাত। দুনিয়ার তাবৎ বাঘা রাজনীতিবিদদের তিনি সাক্ষাৎকার নিতেন। ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার নেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারের শুরুতে ফ্রস্ট বলেন, নতুন একটি জাতির জন্ম হয়েছে, আর আজ সেই নয়া জাতির প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে কথা বলবেন। এটা গত কয়েক মাসের রক্তপাত নিয়ে তাঁর গল্প, যে রক্তপাত থেকে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ।
সেই নয়া জাতিকে, সেদিনের সেই নতুন বাংলাদেশকে পেছনের দিকে টানতে হলে, অন্ধকারের দিকে ফেরাতে হলে বঙ্গবন্ধুকে খারিজ না করে তো উপায় নেই। এইটা মেটিকিউলাস ডিজাইনের কারিগরেরা, কুশীলবেরা খুব ভাল করেই জানেন। তাই তাদের মিশন হল, যত রকমের কৌশল এবং অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করা, তার কর্ম এবং কীর্তিকে খারিজ করা। সেটা সম্ভব কি’না সে ভার ইতিহাসই বহন করুক। এই দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে আমি, আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তারা আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুকে জানাই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।#




