সুনির্মল বসু স্মরণে

বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখকের নাম রয়েছে, যাঁদের রচনা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বহু প্রজন্মের শৈশবের অংশ হয়ে উঠেছে। কবি সুনির্মল বসু তাঁদের অন্যতম। তাঁর ছড়া, কবিতা, গল্প, কিশোরপাঠ্য রচনা কিংবা ভ্রমণকাহিনি, সবকিছুর মধ্যেই ছিল সহজ ভাষার সৌন্দর্য, ছন্দের সজীবতা এবং শিশুমনের স্বাভাবিক জগতের প্রতি গভীর আস্থা। তিনি শিশুদের জন্য লিখেছেন, কিন্তু তাঁর সাহিত্য কখনোই শিশুদের প্রতি অবজ্ঞার ভঙ্গিতে রচিত নয়। বরং শিশুমনকে তিনি দেখেছেন বিস্ময়, কৌতূহল ও কল্পনার এক স্বতন্ত্র ভুবন হিসেবে। এই কারণেই বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান স্থায়ী ও স্বতন্ত্র।

১৯০২ সালের ২০ জুলাই, ১৩০৯ বঙ্গাব্দের ৪ শ্রাবণ, বিহারের গিরিডিতে তাঁর জন্ম। শ্রাবণী পূর্ণিমায় জন্ম হওয়ায় পরিবারের দেওয়া প্রথম নাম ছিল নির্মলচন্দ্র। পরে তিনি পরিচিত হন সুনির্মল বসু নামে। পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুরের মালখানগর। সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। পিতামহ গিরিশচন্দ্র বসু ছিলেন সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। মাতামহ মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতা সম্পাদনা করতেন বিপ্লবী পত্রিকা নবশক্তি এবং ‘পাহাড়িয়া পাখি’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। পারিবারিক এই পরিবেশ তাঁর সাহিত্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

তবে কেবল উত্তরাধিকারই তাঁর সাহিত্যিক সত্তার ভিত্তি নয়। শৈশবের প্রকৃতি তাঁর সৃজনশীলতার আরেকটি বড় উৎস। সাঁওতাল পরগণার পাহাড়, অরণ্য, ঝরনা, ঋতুর রূপান্তর এবং গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ তাঁর অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কখনো কৃত্রিম অলংকার হয়ে ওঠেনি। প্রকৃতি সেখানে জীবন, খেলা, কৌতূহল এবং শিশুর বিস্ময়ের অংশ। এই বৈশিষ্ট্য তাঁর সমগ্র সাহিত্যজুড়ে লক্ষ করা যায়।

কৈশোরেই সাহিত্যচর্চার সূচনা। আশা পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। পরে প্রবাসীসহ বিভিন্ন সাময়িকপত্রে লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। একই সময়ে চিত্রকলার প্রতিও তাঁর গভীর আকর্ষণ জন্মায়। ম্যাট্রিকুলেশন শেষে কলকাতার সেন্ট পলস কলেজে ভর্তি হলেও অসহযোগ আন্দোলনের আবহে নিয়মিত শিক্ষাজীবন থেকে সরে আসেন। পরে শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। সাহিত্য ও চিত্রকলার এই দ্বৈত অনুশীলন তাঁর ভাষাকে দৃশ্যমানতা এবং কল্পনাকে বহুমাত্রিকতা দিয়েছিল।

বাংলা শিশুসাহিত্যের বিকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়, উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শিশুদের জন্য এক নতুন সাহিত্যধারা গড়ে ওঠে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার এবং সুকুমার রায় সেই ধারাকে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠা করেন। সুনির্মল বসু সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হলেও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় স্বতন্ত্র। তাঁর রচনায় ভাষার সংগীতধর্মিতা যেমন প্রবল, তেমনি রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে শিশুমনের সহজ সম্পর্ক, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট আবিষ্কার এবং আনন্দকে সাহিত্যের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করার এক সচেতন প্রয়াস।

সুনির্মল বসুর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো তাঁর ভাষা। তিনি ভাষাকে কঠিন করেননি, আবার শিশুসুলভ করে সরলীকরণও করেননি। সহজ শব্দ, স্বাভাবিক বাক্যগঠন এবং ছন্দময় প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে তিনি এমন এক ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, যা শিশু সহজেই গ্রহণ করতে পারে, অথচ সাহিত্যিক গুণ হারায় না। বাংলা শিশুসাহিত্যে এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ ছিল না। তাঁর সাফল্য এখানেই যে, ভাষার স্বচ্ছতা কখনো শিল্পের পরিপন্থী হয়ে ওঠেনি।

ছড়া রচনায় তাঁর দক্ষতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষার ধ্বনি, মিল এবং উচ্চারণের স্বাভাবিক গতিকে তিনি এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে, তাঁর বহু ছড়া মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। শিশুরা সেগুলো পড়েছে, আবৃত্তি করেছে এবং স্মরণে রেখেছে। এই জনপ্রিয়তা কেবল বিষয়বস্তুর জন্য নয়; শব্দের সংগীতধর্মিতা এবং ছন্দের প্রাণশক্তিও এর অন্যতম কারণ।

সুনির্মল বসুর সাহিত্যকে কেবল জনপ্রিয়তার বিচারে মূল্যায়ন করলে তাঁর অবদান পুরোপুরি ধরা পড়ে না। বাংলা শিশুসাহিত্যের বিকাশে তিনি এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন, যখন শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রটি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছিল। একদিকে রূপকথা, অন্যদিকে শিক্ষামূলক পাঠ্য, আবার কোথাও নীতিকথার আধিক্য। এই পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্মল বসু শিশুদের জন্য এমন এক ভাষা নির্মাণ করেন, যেখানে আনন্দ, কৌতূহল, প্রকৃতি ও কল্পনা সমান গুরুত্ব পায়। তাঁর রচনায় শিক্ষা আছে, কিন্তু তা কখনো ঘোষণার ভঙ্গিতে উচ্চারিত হয় না; গল্প, ছড়া কিংবা কবিতার স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যেই তা আত্মপ্রকাশ করে।

বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে সুকুমার রায়ের নাম উচ্চারিত হয় তাঁর অনন্য কল্পনাশক্তি ও ননসেন্স সাহিত্যের জন্য। সুনির্মল বসুর সাহিত্য সেই পথ অনুসরণ করেনি। তাঁর রচনার ভুবন ছিল বাস্তবের অনেক কাছাকাছি। গ্রামবাংলার প্রকৃতি, পাখি, গাছপালা, নদী, ঋতুর পরিবর্তন, শিশুদের খেলা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। এই পরিচিত জগতই তাঁর সাহিত্যকে শিশুদের কাছে স্বাভাবিক ও আপন করে তুলেছে।

তাঁর কবিতা ও ছড়ায় শব্দের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ছন্দ তাঁর কাছে কেবল মাত্রাবিন্যাস নয়; ভাষার স্বাভাবিক চলন। মিলের ব্যবহার কখনো কৃত্রিম মনে হয় না, আবার ধ্বনির পুনরাবৃত্তিও নিছক কৌশল হয়ে ওঠে না। ফলে তাঁর রচনা পড়তে গিয়ে মনে হয়, শব্দগুলো যেন নিজেদের স্বাভাবিক সুরেই এগিয়ে চলেছে। এই সংগীতধর্মিতাই তাঁর ছড়াকে দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের মুখে মুখে বাঁচিয়ে রেখেছে।

সুনির্মল বসু বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, রূপকথা, নাটক, আত্মজীবনী, সব ক্ষেত্রেই তিনি লিখেছেন। তবে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে শিশুসাহিত্য। হাওয়ার দোলা, কথাশেখা, ছন্দের টুংটাং, পাতাবাহার, পাহাড়ে জঙ্গলেসহ তাঁর বহু গ্রন্থ বাংলা শিশুসাহিত্যের ধারাবাহিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এগুলোর মধ্যে ভাষার বৈচিত্র্য যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বিষয়ের বিস্তার। তাঁর আত্মজীবনী জীবনখাতার কয়েক পাতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই গ্রন্থে তিনি নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সমকালীন সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিমণ্ডলেরও একটি মূল্যবান চিত্র তুলে ধরেছেন। একজন লেখকের আত্মজীবনী হিসেবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়।

সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মূল্যায়নেও সুনির্মল বসুর সাহিত্যিক মর্যাদার পরিচয় পাওয়া যায়। বনফুলের মন্তব্য ছিল, শিশুদের জন্য না লিখলেও তিনি বাংলা সাহিত্যে একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতেন। এই মন্তব্য তাঁর জনপ্রিয়তার প্রশংসা নয়; ভাষা ও সাহিত্যবোধের স্বীকৃতি। জাদুশিল্পী পি. সি. সরকারের মন্তব্যও স্মরণীয়। শব্দের জাদু দিয়ে শিশুদের মুগ্ধ করার ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করেই তিনি সুনির্মল বসুকে নিজের চেয়েও বড় জাদুকর বলে অভিহিত করেছিলেন। বিভিন্ন স্মৃতিচারণে এই ঘটনাগুলো তাঁর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ ও সমকালীনদের শ্রদ্ধার পরিচয় বহন করে।

সুনির্মল বসুর ব্যক্তিজীবনেও শিল্প ছিল অবিচ্ছেদ্য। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি চিত্রকলার প্রতিও তাঁর সমান অনুরাগ ছিল। শিল্পীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব তাঁর লেখাতেও পড়েছে। তাঁর অনেক কবিতা ও গদ্য পড়লে দৃশ্যকল্প স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাঠক যেন শব্দের পাশাপাশি একটি ছবিও দেখতে পান। বাংলা শিশুসাহিত্যে এই দৃশ্যমানতার গুণ তাঁর রচনাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

১৯৫৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সুনির্মল বসুর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা শিশুসাহিত্য একজন নিবেদিতপ্রাণ স্রষ্টাকে হারায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে প্রমথনাথ বিশীর একটি রূপক বিশেষভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। ভাষ্যটি বিভিন্ন সূত্রে সামান্য ভিন্ন হলেও তার মর্মার্থ একটিই। সমকাল সুনির্মল বসুর প্রয়াণকে বাংলা শিশুসাহিত্যের জন্য এক গভীর ক্ষতি হিসেবে দেখেছিল।

জন্মের এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও সুনির্মল বসু বাংলা ভাষার শৈশবকে আলোকিত করে চলেছেন। বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর রচনা প্রমাণ করে, শিশুর জন্য লেখা কোনো গৌণ সাহিত্য নয়। ভাষা, কল্পনা, শিল্পবোধ ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে এই সাহিত্যধারা স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। সেই ধারার অন্যতম প্রধান নির্মাতা হিসেবে সুনির্মল বসুর স্থান আজও অম্লান।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!