আসলাম একটা জাতীয় দৈনিকে কাজ করেন বছর পাঁচেক হল। চাকরি পাবার পর থেকে প্রত্যেক রোজার ঈদে মায়ের জন্য শাড়ি, বাবার জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবী নিয়ে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে ফেরেন। এ বছর আসলামের মনে হল, আচ্ছা আমি তো আমার ইচ্ছেমত মা-বাবার জন্য শাড়ি, পাঞ্জাবি নিয়ে যাই। কিন্তু মা-বাবাকে তো জিজ্ঞেস করিনা, উনাদের কিছু লাগবে কি’না। মা যে শাড়ি পেয়ে খুব খুশি হন, সেটা বোঝা যায়। বাবা কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না। শুধুমাত্র একই পাঞ্জাবি দুই ঈদের জামায়াতে পরে যান, কিন্তু কেমন যেন সংকোচ নিয়ে। ঈদ্গাহ থেকে ফিরেই পাঞ্জাবি-পায়জামা চেঞ্জ করে লুঙ্গি আর সাদা গোলগলা গেঞ্জি পরেন। তাই এবার ঈদের আগে আসলাম মাকে জিজ্ঞেস করেন,
– তোমার জন্য ঈদে কি আনব?
– তোর যিডা ভাল মনে হয় আনিস। তবে একটা ম্যাশিন আছে না…আরে ওই যে আম, কলা, পেঁপে সবকিছুর শরবত বানানো যায়।
আসলাম হাসেন।
– হাসিস ক্যান?
– তুমি কোথায় দেখছ এই মেশিন?
– সিডা তোর জানা লাগবে না, পারলি আনিস, না হলি দরকার নেই।
আনব। তুমি বলছ, কেন আনবো না?
– না হাসলি তো, তাই কলাম।
আসলাম বুঝতে পারেন , মা জুসারের কথা বলছেন, এইটা মা কোথায় দেখছেন সেটাও তিনি অনুমান করতে পারেন ।
– এমনি হাসছি, এবার আব্বাকে দাও। বাবাকে একই কথা জিজ্ঞেস করার পর বাবা বলেন
– আমার… আমার জন্যি?
আসলাম বুঝতে পারেন, বাবা একটা কিছু বলতে চাইছেন কিন্তু মা’র সামনে বলতে পারছেন না।গত ঈদে মাকে একটা এন্ড্রোরয়েড ফোন কিনে দিয়েছেন, বাটন ফোন টা বাবার কাছেই থাকে। তবে সেটার ব্যবহার খুবই কম। আসলাম ছাড়া মা-বাবাকে ফোন করে খবর নেবার মানুষও কম। বাবাকে ওই নম্বরে ফোন করে জিজ্ঞেস করতে হবে। ফোনটা আবার মা না ধরলেই হয়। আজ হাটবার। বাবা নিশ্চয় বিকালে হাটে যাবেন। তিনটার পর বাবাকে ফোন দিলে তখন নিশ্চয় হাটে যাবার মেঠোপথে নিরিবিলিতে বাবার চাওয়াটা বলতে পারবেন। তিনি বাবাকে বলেন, আচ্ছা তুমি ভাব, আমি বিকালে তোমাকে ফোন দিব। বলে ফোন রেখে আবার কাজে মন দিতে গিয়েও মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে যায়। মার সাথে কথা বলে যতটা খুশিতে মন ভরে উঠেছিল, বাবার গলা শুনে মনটা ততটাই মনটা খারাপ হয়ে যায়। অফিসের ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে আবার নিজের টেবিলে বসেন। দুইটার মধ্যে অফিসের কাজ গুছিয়ে নিচে গিয়ে লাঞ্চ করে আসেন। রমজানে অফিসে রান্না হয় বটে। কিন্তু আজ নাকি বাবুর্চির শরীরটা ভাল নেই, তাই রান্না হয় নাই। লাঞ্চ করে অফিসে ফিরতেই ৩ টা বেজে যায়। এক কাপ লাল চা নিয়ে অফিসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাবাকে ফোন করেন। বাবা বোধহয় এই ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলেন। রিং হতেই কল রিসিভ করেন, কিন্তু কথা শুরু করতে হয় আসলামকেই।
– এখন বল, তোমার কি লাগবে।
– আমার… আমার…
– বল… এখন তো মা সামনে নেই।
– না, যিডার কথা কব, সিডা তোর মা সামনে না থাকলিও কতি কেমন লাগদেছে
– তুমি বল…
– তুই শুনলি মন খারাপ করবি…কিন্তু তুই আর তোর মা ছাড়া তো আমার আর কেউ…
বাবা কথা শেষ করতে পারেন না…
আসলাম বুঝতে পারেন, বাবা কাঁদছেন। তার নিজেরও চোখ ভিজে ওঠে, গলা বুজে আসে। যে বাবা গত বছর রমজানের আগে পর্যন্ত বলতেন, আমি কি আর তোর কামাই খাতি বসে থাকি? আমার কত ছেলে-মেয়ে, ভাইপো-ভাইঝি, নাতি-পুতি…সেই বাবা তার পৃথিবীটা এক বছরের মধ্যে এত ছোট করে ফেলেছেন? আসলে বাবা তো ফেলেন নি, তাকে ফেলতে হয়েছে বড় মনঃকষ্টে।
নিজেকে সামলে নিয়ে আসলাম বলেন,
– কি হল আব্বা? বল না, তোমার কি লাগবে?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা যে উত্তর দিলেন তাতে আসলাম আর নিজেকে সামলাতে পারেন নাই। বাবার ফোনটা কেটে ব্যালকনির স্লাইড দরজাটা টেনে দিয়ে তিনি নিজেও কিছুক্ষণ কান্না করেন।
আসলামের বাবা তাদের গ্রামের স্কুলের দপ্তরী। আসলাম সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন, প্রত্যেক রোজার ঈদে রমজানের ছুটিতে স্কুলের ঘন্টাটা বাড়িতে নিয়ে আসতেন। সেহরীর আগে বাবা কোনো এলার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠে সারা পাড়া জুড়ে ঘন্টা বাজাতেন, যাতে সবাই ঘুম থেকে উঠে সময়মত সেহরী খেতে পারেন। পাড়ার শেষ মাথায় একটা খাল আছে, সেই খালের ওপারে গ্রামের অন্য পাড়া। খালে প্রায় সারা বছরই পানি থাকে। তাই খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ জোরে জোরে ঘন্টা বাজিয়ে বাবা বাড়ি ফিরতেন। ছোটবেলা থেকে আসলাম দেখে এসেছে, সে রোজা রাখল কি রাখল সেইটা নিয়ে তার মা-বাবার খুব মাথাব্যথা ছিল না। বাবাও খুব নিয়মিত রোজা রাখতেন এমন নয়; মা রাখতেন। কিন্তু বাবা রোজা রাখেন আর নাই রাখেন ঘন্টা নিয়ে পাড়া ঘুরানি (দাড়ি হবে না) দিতে তার কোনোদিন মিস হত না।
মা মজা করে বলতেন, ঘন্টাওয়ালা রোজাদার। বাবা শুধু হাসতেন।
আসলাম একটু বড় হয়ে একবার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আব্বা তুমি কেন শীতির মধ্যি কষ্ট কোরে পাড়া ঘুরে ঘন্টা বাজাতি যাও? আর তুমি নিজিও তো নিয়মিত রোজা রাখো না। প্রত্যুত্তরে বাবা যেটা বলেছিলেন, সেই কবেগার কথা কিন্তু আসলামের এখনও মনে আছে।
বাজান, আমাগের গিরামের বেশিরভাগ মানুষির বাড়িতে ঘড়ি নেই। খালের ওপারে মসজিদের মুয়াজ্জ্বিন অবশ্য মায়িকি ডাকাডাকি করেন, কিন্তু গ্রামের মুসল্লিদের মধ্যে দলাদলি। মায়িকডার যা অবস্থা সে ডাক সব সময় এইপার পর্যন্ত আইস্যে পৌঁছোয় না… কিন্তু নিজের রোজা রাখা-না রাখার বিষয়ে বাবা কোনো উত্তর সেদিন দেন নাই।
এরপর আসলাম আর এ বিষয়ে বাবাকে কখনও জিজ্ঞেস করেন নাই। যেবার আসলাম এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হলেন, সেইবার রোজার ঈদে রমজানের ছুটিতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাকি বলেছিলেন সামাদ মিয়া ছেলে তো বড় হয়েছে, এবার ঘন্টা বাজানো বন্ধ কর। ওর নতুন বন্ধু-বান্ধব হবে। তারা জেনে হাসাহাসি করলে ছেলের ভাল লাগবে না। হেড স্যারের কথা বাবা মাথা নিচু করে শুনেছিলেন বটে কিন্ত ঘন্টা ঠিকই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন এবং প্রতিরাতে বাজাতেন।তবে আসলাম যেবার ঢাকাতে এসে অনার্সে ভর্তি হলেন সেবার রোজার ঈদের আগে বাবা আসলামকে জিজ্ঞেস করেন,
– আচ্ছা বাজান, তুমি তো বড় হইচাও, আমি যে স্কুলির ঘন্টা আইনে সেহরীর সময় বাজাই, তাতে তোমার মা যেমন আমারে নিয়ে হাসাহাসি করে, গিরামের আর পাঁচজনও হয়ত করতি পারে আড়ালে। আমি গাই মাখিনে। তবে এখন তো আমার জীবন শুধু আমার না, তুমার যদি খারাপ লাগে আমারে কতি পার, আমি আর বাজাবো না।
প্রত্যুত্তরে আসলাম বলেছিলেন, কেন আব্বা, ছেলে বড় হয়েছে বলে তোমার ভাল লাগা-মন্দ লাগা বলে কিছু থাকবে না, তা কেন হবে? তুমি বাজাবা, আমার কোনো আপত্তি নেই। আব্বার মুখের দিকে তাকিয়ে আসলামের মনে হয়েছিল, তিনি এই উত্তরটাই আশা করেছিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসলাম দেখেন বিদ্যুৎ নাই। বাড়িতে ঢুকে আসলামের কানে আসল, মা-বাবার মধ্যে তাকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছে।
মা বাবাকে জিজ্ঞেস করছেন হঠাত ছেলেরে জিজ্ঞেস করতি গেলে যে…
কি?
এই যে ঘন্টা বাজাবা কি বাজাবা না…
শোন, সেই ছোটবেলায় যে স্কুলি যাতাম, কি পড়িছি, ছারেরা কি পড়াইছেন সেসব কথা কি আর মনে আছে। কিন্তু আমাগের একজন ছার ছিলেন, নাম কালিপদ ভৌমিক। ছারের কাজই ছিল, আমরা যারা লিখা-পড়াই তেমন ভাল না, তাদের পিছনে সময় ব্যয় করা। তাতি লাভ খুব হইছিল এমন না। কিন্ত ছারের কিছু কথা মনে থাইকে গেছে। ছার কতেন, শোন সামাদ মেয়ে হলি কখনও অল্প বয়সে বিয়ে দিবি নে, ছেলের বয়স আঠারো হলি তার মতামত নিবি। ছেলের সাথে বন্ধুর মত মিশবি। আমি দপ্তরী। ওপরওয়ালা চালি ছেলে আমার ভাল চাকরি-বাকরি করবে, ওর সাথে কি আর বন্ধুর মত মিশা হবে? কিন্তু ওর মতামত নিতি, ইচ্ছে-অনিচ্ছে জানতি তো আর সমস্যা নেই।
আসলাম ভাবেন, প্রত্যেক মানুষের একটা আলাদা জীবন দর্শন থাকে, আমরা সন্তানেরা শুধুমাত্র লেখাপড়াই একটু এগিয়ে গেলে গ্রামের মানুষদের তো বটেই, নিজের মা-বাবার জীবন দর্শনও আর জানতে চাই না, বুঝতে পারি না। মা আর কথা বাড়ান না।
আসলাম গলা খাকারি দিয়ে বাড়িতে ঢোকেন। রাতে তিনজন একসাথে খেতে বসেন। আসলামের মনে হয় এই প্রথম বাবা আসলামের সামনে মাকে বলেন ওরে আরেকখান মাছ দ্যাও, আসলাম কিছু বলার আগেই বাবা আবার বলে ওঠেন, নে, খা…নদীর মাছ পালাম বাজারে, দামডা ইক্টু বাড়তিই নিল। তুই আইছিস তাই আর হিসেব করিনি। মা এবং আসলাম দু-জনেই অবাক হন। বাবা কখনও এভাবে বলেননি, আবেগ প্রকাশ করেননি ছেলের সামনে।
যে বছর আসলাম চাকরিতে জয়েন করেন, ঠিক সেই পরের বছর শহর থেকে আসলামদের বাড়ির পাশের রাস্তা যে রাস্তা পাড়ার শেষের খালের ধারে গিয়ে শেষ হয়েছে, উপজেলা সদর থেকে এই খাল পর্যন্ত পাকা হয়ে যায়। রাস্তা উদ্বোধনের মাস খানেক পর, একদিন মা ফোন করে জানান, জানিস গাজী বাড়ির মনির আছে না, আরে হাসান গাজীর বড় ছেলে…
হুম চিনছি, কি হয়েছে বল।
উগের যে জমি ছিল আমাগের বাড়ির ওইপাশে রাস্তার সাথে সেখেনে আইস্যে বাড়ি করতেছে। ভিতি’র কাজ শুরু হয়ে গেছে। উরা টাকাঅলা মানুষ কয়দিন আর লাগবে বাড়ির কাজ শেষ হতি।
হাসান গাজী তাদের গ্রামের সবচেয়ে ধনী এবং ধূর্ত লোক। বাড়ি গ্রামের খালের ওপারে। পুরো গ্রামের উপর তার দখল, গ্রামের মুসলমান সম্প্রদায়ের অর্ধেক মানুষ এপারে, অর্ধেক ওপারে। বর্ষায় নৌকা পেরিয়ে শুক্রবারে ওপারে জুম্মার নামায পড়তে যেতে হয়। বছরের অন্য সময় অস্থায়ী বাঁশের সাঁকো। এপারের লোকেরা একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও শুধুমাত্র উনি ভেটো দেবার কারণে এপারে একটা মসজিদের কাজ শুরু করতে পারেন নাই। সেই হাসান গাজীর ছেলে হবেন, তাদের প্রতিবেশী। খবরটা শুনে আসলামের কেমন যে যেন অস্বস্তি হয়। কিন্ত পরক্ষণেই ভাবেন, তার মা-বাবা নির্বিবাদী মানুষ। তাদের সাথে কখনও কারো ঝামেলা হবার কথা নয়। খুব স্বাচ্ছন্দ্যে না চললেও আর্থিকভাবেও তারা কারো উপর নির্ভরশীল নন। নানান যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও পুরো দিনটাই ঘুরেফিরে বিষয়টা তার মন এবং মাথা দখল করে থাকে। সেবার ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে আসলাম বুঝতে পারেন, গাজীদের এইটা শুধু বাড়ি হচ্ছে না, বরং তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি জানান দেবার এক বিশাল আয়োজন। এলাকার লোকজনের আলাপে আসলাম জানতে পারেন কোরবানি’র ঈদের পরে নাকি বিশাল আয়োজন করে এই বাড়ি উদ্বোধন হবে। ঈদের জামায়াতের দিন, হাসান গাজী ঈদপগাহ-তে নিজে এগিয়ে এসে আসলামের সাথে কোলাকুলি করেন। বাড়ি উদ্বোধনের অগ্রিম দাওয়াত দিয়ে রাখেন। আসলাম একটু অবাক হন। তিনি গ্রামের স্কুলের দপ্তরীর ছেলে, যতই বিদ্যা অর্জন করুক তিনি যে গাজী বংশের বুকে বুক মেলানোর উপযুক্ত নন সেইটা হাসান গাজী’র চেয়ে ভাল কেউ জানেন না। আসলাম বুঝতে পারেন গাজীর এই কৃত্রিম মোলাকাতের পেছনে সম্ভবত কারণ হল, আসলামের সাংবাদিক পরিচয়। ঈদ শেষে ফিরে এসে আসলাম নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। দেশে একটা জাতীয় সংকটের কারণে কোরবানির ঈদে তার বাড়ি ফেরা হয় না। ঈদের পর মায়ের মুখে এবং ফেসবুকের কল্যাণে বন্ধুদের পোষ্ট থেকে গাজী মঞ্জিল উদ্বোধনের খবর জানতে পারেন। আসলাম একটু অবাক হন দেশের একটা জাতীয় দৈনিকও এই বাড়ি উদ্বোধনের খবর প্রকাশ করেছে। বছর ঘুরে আবার রমজান এল। চতুর্থ রমজানের দিন দুপুরবেলা মায়ের ফোন
– বাজান, তুই কি এক-দুই দিনের জন্য বাড়ি আসতি পারবি?
– কেন? আমি তো ঈদের ছুটিতে আসছিই।
– তখন না আসলিও হবে, যদি পারিস আয়, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে।
– কি ঝামেলা মা?
– তোর বাবা যে সেহরীর সময় ঘন্টা বাজায় না…তাতে নাকি মনিরের মাইয়ের ঘুম ভাঙ্গে যায়, তোর বাবারে নিষেধ করিল।
– তারপর?
– কাল রাতির বেলা ঘন্টা নিয়ে বাইর হওয়ার সময় আমি নিষেধ করলাম, কোলো গ্রামের মধ্যি বাজাবো না। খালের ধারে যাইয়ে কিছুক্ষণ বাজায়ে চলে আসবানে।
– আইজ তোর বাবারে ডাইক্যে মনির নাকি কয়েছে, তোর বাবা গাজীদের নিষেধ অমান্য করেছে, তার জন্যি নাকি তোর বাবারে শাস্তি পাতি হবে। ইফতারির পরে হাসান গাজী আবার তোর বাবারে ডাইক্যে পাঠায়েছে।
– আমার কেমন জানি ভয় কোরতেছে।
– বাবা কোথায়?
– আমার পাশেই আছে।
ফোনটা বাবাকে দাও। এই আলাপের মধ্যে আসলাম ঠিক করে ফেলেন তাদের পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি্কে জানাতে হবে, সম্পাদককে দিয়ে পুলিশ সুপার এবং তাদের থানার ওসিকে ফোন করাবেন। ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা বাবাকে আসলাম অভয় দিতে যাবেন, তুমি চিন্তা কোরো না, ভয় পেয়ো না তার আগেই বাবা তাকে বলেন,
– বাজান তুমার চিন্তা করতি হবে না। তুমার মা খামাখাই ভয় পাচ্ছে। হাসান গাজী আমারে ডাইকেছে আমি দেখা করে আসি, যদি ঝামেলা মনে করি, আমি তুমারে জানাবানে।
বাবার গলা শুনে কোনো উদ্বেগ আসলাম বুঝতে পারেন না। আসলাম ভাবেন, বাবার হয়ত প্রভাব-প্রতিপত্তি নেই কিন্তু তাদের গ্রামের, এলাকার মাটি-মানুষ, প্রকৃতিকে তার বাবা খুব ভাল করেই চেনেন। তাই আচ্ছা বলে ফোন রেখে নিজের কাজে মন দেন। রাতে বাসায় ফিরে একবার মাকে ফোন করেন, বাবা বাসায় ফিরেছেন কি’না?
– না। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে বাজান।
– বাবা ফোন নিয়ে যাননি, ফোনটা তুমি বাবাকে দিতে আইজ।
– আমি নিতি কলাম, কোলো লাগবে না।
– বাবা ফিরলে ফোন দিও। আর চিন্তা কোরো না।
– আচ্ছা।
আসলাম অপেক্ষা করতে থাকেন মায়ের ফোন আসে না। তাদের বাড়ি থেকে হাসান গাজীর বাড়ি এক কিলোমিটারের মত হবে। মাঝকানে খাল, নতুন বাড়িতে মনির গাজী উঠেছে। কিন্তু হাসান গাজী ওপারের বাড়িতে আছেন। এইটা হয়ত দু-পারেই তাদের প্রভাব পোক্ত করার একটা কৌশল। রাত ১০ টার দিকে মায়ের নম্বর থেকে ফোন। মা নিচু গলায় কথা বলেন। আসলামের শংকা বাড়ে।
মা তাকে নিশ্চিন্ত করেন।
– ভয়ের কিছু নেই, হাসান গাজী তুমার বাবারে নাকি কইয়েছে, তুমি এতদিন ধরে যে কাজ কোরে আসতেছ সেইডে বন্ধ করতি কোয়ে মনির ঠিক করে নাই। তুমি তুমার কাজ করবা, আমি মনিররে কোয়ে দিছি।
– এইটুকুর জন্যি বাবার ফিরতি এত দেরি হল? আর তুমি এত নিচু গলায় কথা বলছ কেন?
– দেরী কেন হোলো সেইডে এখনও জিজ্ঞেস করতে পারিনি। গাজী কি কইল সেইটা শোনার জন্যি তোমার আকবার কাকা, গফুর কাকা, রহিম ভাই সবাই আইয়েছে। তুমার বাবা তাগের সাথে কথা কচ্ছে।
আপাপত নিশ্চিন্ত হলেও আসলাম ভাবেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা প্রত্যাহার দুই ক্ষেত্রেই তার বাবাকেই গিয়ে গাজীদের দরবারে হাজির হতে হয়। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা আর স্বাধীন হতে পারলাম কই?
এত কিছুর পরও রমজান মাসে সেহরির সময় বাবার ঘন্টা পিটানো বন্ধ করেন নাই। কিন্তু গত বছর রমজানের দ্বিতীয় দিন, একদল ছেলে তার বাবাকে এসে বলেন, তিনি আর রাতে সেহরির সময় ঘনটা বাজাতে পারবেন না।
বাবা নির্বিবাদী মানুষ, সাধারণত কারো সাথে তর্কে জড়ান না, তবে সবার সব কথা মেনে নেন এমন না। কিন্তু সেদিন কি হয়েছিল কে জানে? হতে পারে এই জেনারেশনের এভাবে পারবেন না বলে হুকুমজারি বাবা মানতে পারেন নাই। কারণ গ্রামের স্কুলের দপ্তরী হলেও ছেলে-মেয়েদের উপর তার দাবী ছিল, দখল ছিল। প্রয়োজনে ধমকানো, কৃত্রিম রাগ দেখা্নো এগুলিকে বাবা উপভোগ করতেন। বিশেষ করে নাইন-টেনের ছেলেমেয়দের সাথে। হয়ত বাবার মনে হয়েছে, এদের বয়স কি ওদের চেয়ে অনেক বেশি? হয়ত ওদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল, যারা গ্রামের স্কুল থেকে সদ্য পাশ করা কিংবা বেরিয়েছে দু-এক বছরের মধ্যে। তাই বাবা প্রশ্ন করে বসেন,
– কেন পারব না?
– পারবেন না, কারণ এখন যামানা আগায়ে গেছে। এখন ঘন্টার শব্দে ঘুম ভাঙ্গার দরকার নাই
– কিন্তু আমি যাগের জন্যি বাজাই, তারা তো কেউ কইনি যে ঘন্টা বাজানো লাগবে না।
– কোয়েছে, আপনি শোনেননি।
– একজন মানুষ আইন্যে দ্যাখাও কিডা কয়েছে?
– কারো আনা লাগবে না, আপনি বাজাবেন না, এইডাই চূড়ান্ত কথা।
এরই মধ্যে গ্রামের অন্য লোক এসে জড় হয়েছে। বাবাকে কেন জানি জিদে পেয়ে বসেছিল, বাবাও চড়া গলায় বলেন,
– আমি বাজাবো…
এরপরে আর বাবার কথা কারো কানে পৌঁছায়নি
– আমরা নতুন করে দেশ স্বাধীন করছি জানোস না…
– তোর ছেলেরে জিজ্ঞেস করিস, আমরা কারা…
– ব্যাটা ঘন্টা বাজাস, তুই কি হিন্দু?
– রোজাও তো রাখিসনে ঠিকঠাক…
– ঘন্টা বাজায়ে ভন্ডামি করিস?
মা এসে বলতে গেছিল, বাজান তোমরা যাও, আমি উনারে কবানে যাতে আর না…
মায়ের কথা শেষ হবার আগেই মা-বাবা দু’জনকেই গালিগালাজের ফোয়ারা ছুটতে থাকে।
ঘটনাটা বেলা ১১ টার দিকে। সেদিনই বন্ধের মধ্যে হেডস্যারকে ডেকে স্কুলে মিটিং বসানো হয়, স্কুলের সম্পদ বাড়িতে রাখার দায়ে বাবাকে বরখাস্ত করা হয়। আসলামকে ফোন করে বলা হয় এই নিউজ যেন আগামীকাল তার পত্রিকাতে ছাপা হয়। আসলামের পত্রিকার সম্পাদক ডিভিশনাল কমিশনারকে ফোন করলে তিনি জানান, চিন্তার কিছু নেই উনার চাকরি বহাল থাকবে। নিরাপত্তার ইস্যু থাকলে আমি পুলিশ সুপারকে বলে দিতে পারি। যদিও আপনি নিজেই জানেন এই মুহুর্তে পুলিশের ক্ষমতা কতটুকু।
রোজার ছুটি শেষে বাবা আর স্কুলে যাননি। যদিও স্কুল থেকে বাবাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল।
ঈদে আসলাম মায়ের জন্য শাড়ি আর জুসার, বাবার জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবি, পিতলের ঘন্টা আর হাতুড়ি নিয়ে বাড়িতে ফেরেন। ঘন্টা-হাতুড়ি হাতে পেয়ে বাবার দুচোখ বেয়ে জল গড়াতে থাকে। প্রথমে মা কিছুটা অবাক হলেও মুহুর্তেই তার চোখও জলে ভরে ওঠে।#




