২ জুন ১৯৭১: সাঘাটা, কুশলডাঙ্গী ও কাজীপুরের গণহত্যা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২ জুন একটি গভীর শোকের দিন। এই দিনে গাইবান্ধার সাঘাটা, ঠাকুরগাঁওয়ের কুশলডাঙ্গী হাট এবং মেহেরপুরের কাজীপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের হাতে সংঘটিত হয় একাধিক নির্মম গণহত্যা। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ, যাদের অধিকাংশই কৃষক ও শ্রমজীবী, তারা এই আক্রমণের শিকার হন। এই হত্যাযজ্ঞ ছিল একটি পরিকল্পিত সহিংস দমননীতির অংশ।

গাইবান্ধার সাঘাটায় ফুলছড়ি অ দলদলিয়া অঞ্চলের গণহত্যা:
গাইবান্ধার সাঘাটায় ফুলছড়ি ও দলদলিয়া গ্রামে এপ্রিল মাস থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী অবস্থান নেয় এবং টিটিডিসি ভবনে একটি ক্যাম্প স্থাপন করে। সেখান থেকে নিয়মিতভাবে গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হতো। স্থানীয়দের জোরপূর্বক ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো এবং বহু লাশ গণকবরে চাপা দেওয়া হয়।

এই ধারাবাহিক সহিংসতার চূড়ান্ত রূপ নেয় ২ জুন ১৯৭১ সালে, যখন সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নের দলদলিয়া গ্রামে রাতে হামলা চালানো হয়। ঘুমন্ত গ্রামবাসীর ওপর আক্রমণ, ঘরবাড়ি লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। এরপর বহু মানুষকে আটক করে ফুলছড়ি ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়।

এই গণহত্যায় নিহত ২৩ জন শহীদের নাম হলো ভুবন মোহন সরকার, বসন্ত সরকার, বাচ্চা সরকার, শরৎ সরকার, নিশিকান্ত সরকার, কামিনী মোদক, মহেন্দ্র সরকার, শচীন সরকার, অশ্বিনী মোহন্ত, দেবক সরকার, শ্রীরাম মোহন্ত, ভিক্ষুরাম সরকার, গগন সরকার, নিবারণ সরকার, রতিকান্ত সরকার, রাজ চন্দ্র সরকার, বনবাস সরকার, রুহিনী সরকার, রাখাল সরকার, গজেন্দ্র সরকার, গজেন সরকার এবং দুর্গাপুর গ্রামের আকালুরাম চৌধুরী

ঠাকুরগাঁও জেলার কুশলডাঙ্গী হাট গণহত্যা:
একই দিনে ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কুশলডাঙ্গী হাটে আরেকটি ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়। ঝিকরা, বেলসারা, বানিয়াবস্তি এবং আশপাশের গ্রামের মানুষ হাটে অবস্থানকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা সেখানে আক্রমণ চালায়। গ্রামবাসীদের ধরে হাটের মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একত্রিত করা হয় এবং সেখানেই গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে একই স্থানে গণকবর দেওয়া হয়। এই হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় কিছু সহযোগী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়।

এই ঘটনায় যেসব শহীদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন তারা ফনির, পিতা শেরেলী, বেলসারা, তারার উদ্দীন, পিতা আকালু, ঝিকরা, শিয়ালু, পিতা দোলেল, ঝিকরা, গইসু, পিতা ভাদু, ঝিকরা, নিয়াজু, পিতা পবেদ, ঝিকরা, ইসলাম, পিতা খোরশেদ, ঝিকরা, মুসলিম, পিতা মানবর, ঝিকরা, পরেদ, পিতা আনকোর, ঝিকরা, ধুম বকস, পিতা লবানু, ঝিকরা, পিছল, পিতা ভাকাতু, ঝিকরা, আলিমউদ্দীন, পিতা দমিজউদ্দীন, ঝিকরা, বিলাতু, পিতা দমিজ উদ্দীন, ঝিকরা, কালদি, পিতা খাপো, দলুয়া, কাবলী, ঝিকরা, নুর ইসলাম, পিতা খোরশেদ, ঝিকরা, জাহিরউদ্দীন, পিতা ইসাদ আলী, ঝিকরা, নিশার, ঝিকরা, আব্দুল গফুর, পিতা নফিল, বানিয়াবস্তি এবং লালু, পিতা করমত উদ্দিন, ঝিকরা।

মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার কাজীপুর গণহত্যা:
মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম কাজীপুরে ৩০ মে এবং ২ জুন দুই দফায় গণহত্যা সংঘটিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ নিরাপত্তার কারণে ভারতে চলে গেলেও অনেকে জীবিকার তাগিদে গ্রামে থেকে যান এবং কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকেন।

৩০ মে পাকিস্তানি সেনারা বামুন্দি ক্যাম্প থেকে এসে মাঠে কাজ করা কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে গুলি করে হত্যা করে। এরপর ২ জুন সকালে টহল চলাকালে গ্রামের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা আরও তিনজন সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। সব মিলিয়ে এই গ্রামে মোট সাতজন মানুষ প্রাণ হারান।

কাজীপুর গণহত্যায় নিহত শহীদরা হলেন দেলজান মণ্ডল, পিতা আহাদ আলী মণ্ডল, খাতের মণ্ডল, পিতা আজাহার মণ্ডল, জহুর শেখ, পিতা তুষ্টু শেখ, রূপচাঁদ আলী, পিতা বিশারত রায়, ছুরাত মণ্ডল, পিতা কালু মণ্ডল, আব্দুল লতিফ, পিতা হারুন ফারাজি এবং ইয়াছিন আলী, পিতা ছাদু ফারাজি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভেতরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গ্রামীণ জনপদের ট্র্যাজেডি, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়েছিল। দলদলিয়া, কুশলডাঙ্গী হাট এবং কাজীপুরের ঘটনাগুলো সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। এসব ঘটনার অনেক তথ্য আজও অসম্পূর্ণ, অনেক নাম অনির্দিষ্ট, তবু তাদের স্মৃতি ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ ২য় ও ৬ষ্ঠ খণ্ড
সংগ্রামের নোটবুক

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!