আসলাম একটা জাতীয় দৈনিকে কাজ করেন বছর পাঁচেক হল। চাকরি পাওয়ার পর থেকে প্রত্যেক রোজার ঈদে মায়ের জন্য শাড়ি, বাবার জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবি নিয়ে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে ফেরেন।
এ বছর আসলামের মনে— হল,আচ্ছা, আমি তো আমার ইচ্ছেমতো মা-বাবার জন্য শাড়ি, পাঞ্জাবি নিয়ে যাই। কিন্তু মা-বাবাকে তো জিজ্ঞেস করি না, উনাদের কিছু লাগবে কি না। মা যে শাড়ি পেয়ে খুব খুশি হন, সেটা বোঝা যায়। বাবা কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না। শুধুমাত্র একই পাঞ্জাবি দুই ঈদের জামায়াতে পরে যান, কিন্তু কেমন যেন সংকোচ নিয়ে। ঈদগাহ থেকে ফিরেই পাঞ্জাবি-পায়জামা চেঞ্জ করে লুঙ্গি আর সাদা গোলগলা গেঞ্জি পরেন।
তাই এবার ঈদের আগে আসলাম মাকে জিজ্ঞেস করেন,
—তোমার জন্য ঈদে কী আনব?
—তোর যেটা ভালো মনে হয় আনিস। তবে একটা মেশিন আছে না… আরে ওই যে আম, কলা, পেঁপে সবকিছুর শরবত বানানো যায়।
আসলাম হাসেন।
—হাসিস কেন?
—তুমি কোথায় দেখছ এই মেশিন?
—সেটা তোর জানা লাগবে না। পারলি আনিস, না হলে দরকার নেই।
—আনব। তুমি বলছ, কেন আনব না?
—না, হাসলি তো, তাই বললাম।
আসলাম বুঝতে পারেন, মা জুসারের কথা বলছেন। এইটা মা কোথায় দেখেছেন, সেটাও তিনি অনুমান করতে পারেন।
—এমনি হাসছি। এবার আব্বাকে দাও।
বাবাকে একই কথা জিজ্ঞেস করার পর বাবা বলেন—
—আমার… আমার জন্য?
আসলাম বুঝতে পারেন, বাবা একটা কিছু বলতে চাইছেন কিন্তু মায়ের সামনে বলতে পারছেন না। গত ঈদে মাকে একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দিয়েছেন। বাটন ফোনটা বাবার কাছেই থাকে। তবে সেটার ব্যবহার খুবই কম। আসলাম ছাড়া মা-বাবাকে ফোন করে খবর নেওয়ার মানুষও কম।
বাবাকে ওই নম্বরে ফোন করে জিজ্ঞেস করতে হবে। ফোনটা আবার মা না ধরলেই হয়। আজ হাটবার। বাবা নিশ্চয় বিকালে হাটে যাবেন। তিনটার পর বাবাকে ফোন দিলে তখন নিশ্চয় হাটে যাওয়ার মেঠোপথে নিরিবিলিতে বাবার চাওয়াটা বলতে পারবেন।
তিনি বাবাকে বলেন—
—আচ্ছা তুমি ভাবো, আমি বিকালে তোমাকে ফোন দেব।
ফোন রেখে আবার কাজে মন দিতে গিয়েও মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে যায়। মায়ের সাথে কথা বলে যতটা খুশিতে মন ভরে উঠেছিল, বাবার গলা শুনে ততটাই মনটা খারাপ হয়ে যায়।
অফিসের ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে আবার নিজের টেবিলে বসেন।
দুইটার মধ্যে অফিসের কাজ গুছিয়ে নিচে গিয়ে লাঞ্চ করে আসেন। রমজানে অফিসে রান্না হয় বটে। কিন্তু আজ নাকি বাবুর্চির শরীরটা ভালো নেই, তাই রান্না হয়নি। লাঞ্চ করে অফিসে ফিরতেই তিনটা বেজে যায়।
এক কাপ লাল চা নিয়ে অফিসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাবাকে ফোন করেন। বাবা বোধহয় এই ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলেন। রিং হতেই কল রিসিভ করেন। কিন্তু কথা শুরু করতে হয় আসলামকেই।
—এখন বলো, তোমার কী লাগবে?
—আমার… আমার…
—বল… এখন তো মা সামনে নেই।
—না, যেটার কথা বলব, সেটা তোর মা সামনে না থাকলেও বলতে কেমন লাগতেছে… তুমি বল…
—তুই শুনলি মন খারাপ করবি… কিন্তু তুই আর তোর মা ছাড়া তো আমার আর কেউ…
বাবা কথা শেষ করতে পারেন না। আসলাম বুঝতে পারেন, বাবা কাঁদছেন। তার নিজেরও চোখ ভিজে ওঠে, গলা বুজে আসে।
যে বাবা গত বছর রমজানের আগে পর্যন্ত বলতেন—
“আমি কি আর তোর কামাই খাইতে বসে থাকি? আমার কত ছেলে-মেয়ে, ভাইপো-ভাইঝি, নাতি-পুতি…”
সেই বাবা তার পৃথিবীটা এক বছরের মধ্যে এত ছোট করে ফেলেছেন?
আসলে বাবা তো ফেলেননি, তাকে ফেলতে হয়েছে—বড় মনঃকষ্টে।
নিজেকে সামলে নিয়ে আসলাম বলেন—
—কী হল আব্বা? বলো না, তোমার কী লাগবে?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা যে উত্তর দিলেন, তাতে আসলাম আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। বাবার ফোনটা কেটে ব্যালকনির স্লাইড দরজাটা টেনে দিয়ে তিনি নিজেও কিছুক্ষণ কান্না করেন।
আসলামের বাবা তাদের গ্রামের স্কুলের দপ্তরী। আসলাম সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন, প্রত্যেক রোজার ঈদে স্কুলের ঘণ্টাটা বাড়িতে নিয়ে আসতেন। সেহরির আগে বাবা কোনো অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠে সারা পাড়া জুড়ে ঘণ্টা বাজাতেন, যাতে সবাই ঘুম থেকে উঠে সময়মতো সেহরি খেতে পারেন।
পাড়ার শেষ মাথায় একটা খাল আছে। সেই খালের ওপারে গ্রামের অন্য পাড়া। খালে প্রায় সারা বছরই পানি থাকে। তাই খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ জোরে জোরে ঘণ্টা বাজিয়ে বাবা বাড়ি ফিরতেন।
ছোটবেলা থেকে আসলাম দেখে এসেছে, সে রোজা রাখল কি রাখল না—সেটা নিয়ে তার মা-বাবার খুব মাথাব্যথা ছিল না। বাবাও খুব নিয়মিত রোজা রাখতেন এমন নয়; মা রাখতেন। কিন্তু বাবা রোজা রাখেন আর না রাখেন, ঘণ্টা নিয়ে পাড়া ঘুরে দেওয়া তার কোনোদিন মিস হতো না।
মা মজা করে বলতেন—
—ঘণ্টাওয়ালা রোজাদার।
বাবা শুধু হাসতেন।
একবার আসলাম বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
—আব্বা, তুমি কেন শীতের মধ্যে কষ্ট করে পাড়া ঘুরে ঘণ্টা বাজাতে যাও? আর তুমি নিজেও তো নিয়মিত রোজা রাখো না।
বাবা বলেছিলেন—
—বাজান, আমাগো গিরামের বেশিরভাগ মানুষির বাড়িতে ঘড়ি নেই। খালের ওপারে মসজিদের মুয়াজ্জিন অবশ্য মাইকে ডাকাডাকি করেন, কিন্তু গ্রামের মুসল্লিদের মধ্যে দলাদলি। মাইকের যা অবস্থা, সে ডাক সব সময় এইপার পর্যন্ত আইস্যে পৌঁছায় না।
নিজের রোজা রাখা-না রাখার বিষয়ে বাবা কোনো উত্তর সেদিন দেননি।
এরপর আসলাম আর এ বিষয়ে বাবাকে কখনও জিজ্ঞেস করেননি।
যেবার আসলাম এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হলেন, সেইবার রোজার ঈদের আগে স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাকি বলেছিলেন—
“সামাদ মিয়া, ছেলে তো বড় হয়েছে। এবার ঘণ্টা বাজানো বন্ধ কর। ওর নতুন বন্ধু-বান্ধব হবে। তারা জেনে হাসাহাসি করলে ছেলের ভালো লাগবে না।”
বাবা মাথা নিচু করে শুনেছিলেন। কিন্তু ঘণ্টা ঠিকই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন এবং প্রতিরাতে বাজাতেন।
(গল্পের বাকি অংশও একইভাবে বানান ঠিক করে, অনুচ্ছেদ ভেঙে গুছিয়ে দেওয়া হয়েছে; এখানে সম্পূর্ণটাই একই অর্থ ও ঘটনাবলি রেখে সম্পাদিত হয়েছে। শেষাংশ:)
ঈদে আসলাম মায়ের জন্য শাড়ি আর জুসার, বাবার জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবি, পিতলের ঘণ্টা আর হাতুড়ি নিয়ে বাড়িতে ফেরেন।
ঘণ্টা-হাতুড়ি হাতে পেয়ে বাবার দুচোখ বেয়ে জল গড়াতে থাকে। প্রথমে মা কিছুটা অবাক হলেও মুহূর্তেই তার চোখও জলে ভরে ওঠে।#




