জিঞ্জিরা গণহত্যা: লক্ষ্যবস্তু ছিল ২৫ মার্চ কালরাতে বেঁচে যাওয়া মানুষ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের জিঞ্জিরা গণহত্যা এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে শুরু হওয়া হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণ বাঁচাতে মার্চের শেষের দিকে এই জিঞ্জিরা হয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের মতো কেন্দ্রীয় নেতারা। জিঞ্জিরায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, শাজাহান সিরাজ, শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকীর মতো ছাত্রনেতারা। সেই সঙ্গে অসংখ্য সাধারণ মানুষও আশ্রয় নিয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা, শুভাঢ্যা ও কালিন্দী ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যারা সেই রাতের হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে গিয়েছিল, তারাই পরিণত হয় পরবর্তী গণহত্যার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে।

১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল, শুক্রবার ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে এই অঞ্চলে আক্রমণ চালায়। এর আগের রাতেই তারা বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী এলাকায় অবস্থান নেয় এবং মিটফোর্ড হাসপাতাল ও আশপাশের স্থানে মর্টার ও মেশিনগান বসায়। ভোরে ফ্লেয়ার ছুড়ে আক্রমণের সংকেত দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে গানবোটে করে সেনারা জিঞ্জিরা, শুভাঢ্যা ও কালিন্দীর বিভিন্ন গ্রামে প্রবেশ করে। এরপরই শুরু হয় এক ভয়াল হত্যাযজ্ঞ, যা চলে প্রায় দুপুর পর্যন্ত।

এই আক্রমণ ছিল পরিকল্পিত এবং কৌশলগতভাবে পরিচালিত। একদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে গানবোটের টহল, অন্যদিকে বিলের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া, ফলে মানুষের পালানোর কোনো পথ ছিল না। আতঙ্কিত মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে দৌড়াচ্ছিল, তখন তাদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। অনেকেই কাঁটাতারের বেড়ায় আটকা পড়ে নির্মমভাবে নিহত হন। খোলা মাঠ, গ্রাম, সড়ক— সব জায়গাই পরিণত হয় মৃত্যুকূপে।

এই গণহত্যার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল এর লক্ষ্য নির্বাচন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতদের অধিকাংশই ছিল ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ থেকে পালিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থী মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকা সম্পর্কে জানলেও আশ্রিতরা ছিল অপরিচিত ও দিশেহারা, ফলে তারা সহজ শিকারে পরিণত হয়। পাকিস্তানি বাহিনী সচেতনভাবেই এই দুর্বল ও অসহায় জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।

এলাকাটি সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকাও আক্রমণের অন্যতম কারণ ছিল। একই সঙ্গে এখানে আওয়ামী লীগের নেতারা, মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্রনেতাদের উপস্থিতির খবর পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। ফলে এলাকাটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় গণহত্যার নির্মমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ঢাকা জেলা কমান্ডার মোস্তফা মহসীন মন্টুর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক হাজার মানুষ সেদিন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিল আশ্রিত। গণহত্যার পর মাঠ, ঘাট ও ডোবায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অসংখ্য লাশ, যা পরে গণকবরে দাফন করা হয়।

জিঞ্জিরার মনু মিয়ার ঢালে একসঙ্গে প্রায় সাড়ে চারশ মানুষকে জড়ো করে ব্রাশফায়ার করা হয়। মান্দাইল ডাক সড়কের পাশে একটি পুকুরপাড়ে ৬০ জনকে হত্যা করা হয়। কালিন্দী গ্রামের একটি বাড়িতে ১১ নারীকে হত্যা করা হয়। এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা একত্রে একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

নারীদের ওপর নির্যাতনও ছিল এই হত্যাযজ্ঞের অংশ। ধর্ষণ, লাঞ্ছনা এবং অমানবিক নির্যাতন এই ঘটনাকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর স্মৃতিচারণায় যে বিভীষিকাময় দৃশ্য বর্ণনা করেছেন, তা এই গণহত্যার নির্মমতার এক জ্বলন্ত সাক্ষ্য।

প্রত্যক্ষদর্শী নাজমা বেগমের বর্ণনায় উঠে আসে মানুষের অসহায়তা ও আতঙ্কের চিত্র। তিনি জানান, কীভাবে মানুষ সন্তান কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছিল, কীভাবে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়ছিল শরীর, আর চারদিকে লাশের স্তূপ জমে উঠেছিল। অনেকেই পানির ভেতর, কবরের পাশে কিংবা ঝোপঝাড়ে লুকিয়েও রক্ষা পাননি।

এই গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও সাধারণভাবে ধারণা করা হয় আড়াই হাজার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হন। অনেক লাশ নদীতে ভেসে যায়, অনেককে অচেনা অবস্থায় গণকবরে দাফন করা হয়, ফলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।

গণহত্যার পর পাকিস্তানি সামরিক প্রশাসন এই ঘটনাকে দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে প্রচার করে। ৩ এপ্রিল ১৯৭১ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সমর্থিত পত্রিকায় মর্নিং নিউজের শিরোনাম “Action against miscreants at Jinjira” এই মিথ্যাচারেরই প্রমাণ। বাস্তবে এটি ছিল নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর চালানো এক বর্বর গণহত্যা।

জিঞ্জিরা গণহত্যা ছিল বাঙালি জাতিকে দমন ও নিশ্চিহ্ন করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের লক্ষ্য করে পরিচালিত এই আক্রমণ মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ।

জিঞ্জিরা গণহত্যা আমাদের ইতিহাসের এক রক্তাক্ত স্মৃতিগাথা। আমাদের স্বাধীনতার মূল্য এবং মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন শিক্ষা বহন করে এই ঘটনা। এই ইতিহাস সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!