বরাকের ১১ শহীদ ও বাংলা ভাষার জয়গাথা

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন ভারতের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। সেই দিনে ভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে ১১ জন মানুষ প্রাণ হারান।

বরাক উপত্যকা বলতে সাধারণত অসমের কাছাড়, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি জেলাকে বোঝানো হয়। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চল বৃহত্তর সিলেট জেলার অংশ ছিল। ব্রিটিশ আমলে সুরমা ভ্যালি ডিভিশনের অধীনে কাছাড় ও সিলেটকে এক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সিলেট জেলার একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায় এবং অবশিষ্ট অংশ নিয়ে করিমগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয়। কাছাড় জেলা ভারতের অংশে থেকে যায়। এই অঞ্চল নিয়েই গড়ে ওঠে বর্তমান বরাক উপত্যকা।

এই উপত্যকার জনসংখ্যার বড় অংশই বাংলাভাষী। ১৯৭১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এখানে বাংলাভাষীর সংখ্যা ছিল ১৩ লক্ষের বেশি, যেখানে হিন্দি, মণিপুরি, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, ডিমাসা এবং অসমিয়া ভাষাভাষীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

১৯৬০ সালে অসম সরকার অসমিয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত বরাক উপত্যকার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ শিক্ষা, প্রশাসন এবং দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার ব্যবহার ছিল স্বাভাবিক ও ব্যাপক।

এরপর ধীরে ধীরে আন্দোলন সংগঠিত হয়। প্রথমে আলোচনা ও সভা, পরে সংগঠিত প্রতিবাদ এবং শেষ পর্যন্ত সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষ তাদের দাবি জানাতে থাকেন। দাবি ছিল একটাই, বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে হবে।

১৯৬১ সালের ১৯ মে সিলচর রেলস্টেশনে সত্যাগ্রহ কর্মসূচি নেওয়া হয়। সকাল থেকে হাজার হাজার মানুষ সেখানে জড়ো হন। আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কেউ স্লোগান দিচ্ছিলেন, আবার অনেকে নীরবে অবস্থান করছিলেন।

দুপুরের পর পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। সেই গুলিতে ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে আরও দুইজনের মৃত্যু হলে মোট শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ জনে।

২০ মে শহীদদের মরদেহ কাঁধে করে শিলচর শহরে শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ২১ মে আরও একটি শোক মিছিল হয়। এরপর পুরো বরাক উপত্যকা জুড়ে শোক, প্রতিবাদ এবং আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে আন্দোলনের চাপ এবং জনমতের কারণে সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে জেলা পর্যায়ে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। এটি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯ মে ১৯৬১ সালের শহীদ হয়েছিলেন কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল, হিতেশ বিশ্বাস, সুকোমল পুরকায়স্থ, সত্যেন্দ্র দেব, কানাইলাল নিয়োগী, বীরেন্দ্র সূত্রধর, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, সুনীল সরকার এবং কুমুদরঞ্জন দাস।

কমলা ভট্টাচার্য ছিলেন এই আন্দোলনের একমাত্র নারী শহীদ। মাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি প্রাণ দেন। শিলচরে ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করতেন এবং সিলেট থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি।

শচীন্দ্র পাল ছিলেন মাত্র উনিশ বছরের তরুণ। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থেকে আসা একটি পরিবারের সন্তান তিনি।

কানাইলাল নিয়োগী ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী রেলকর্মী। ময়মনসিংহ থেকে আসা এই মানুষটি স্ত্রী ও সন্তান রেখে শহীদ হন।

কুমুদ দাস ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। জুরি থেকে উদ্বাস্তু হয়ে শিলচরে এসে তিনি শ্রমজীবী জীবন যাপন করছিলেন।

তরণী দেবনাথ ছিলেন বয়ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক তরুণ। ১৮৪৭ সালে দেশভাগের পর শিলচরে এসে বসবাস করতেন তিনি।

হিতেশ বিশ্বাস ছিলেন খুব অল্প বয়সী এক যুবক, যিনি ত্রিপুরার খোয়াই থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসেন।

চণ্ডীচরণ সূত্রধর কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। হবিগঞ্জ থেকে এসে শিলচরে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

সুনীল সরকার ছিলেন মুন্সিবাজার থেকে আসা এক পরিবারের সন্তান, যিনি ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সুকোমল পুরকায়স্থ ছিলেন করিমগঞ্জের বাগবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর পরিবারও যুক্ত ছিল।

বীরেন্দ্র সূত্রধর ছিলেন এক অভিজ্ঞ কাঠমিস্ত্রি, যিনি জীবিকার জন্য বিভিন্ন স্থানে কাজ করেছেন।

সত্যেন্দ্র দেব ছিলেন মাত্র চব্বিশ বছর বয়সী এক তরুণ, যিনি শিলচরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন।

এই ১১ জন মানুষের মৃত্যু বরাক উপত্যকার ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে যায়। তাঁদের আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।

পরবর্তীতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, আলোচনার প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক চাপের ফলে সরকার বাংলা ভাষাকে বরাক উপত্যকার জেলা পর্যায়ে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন ছিল পরিচয় রক্ষার সংগ্রাম। এই সংগ্রাম প্রমাণ করে ভাষা মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

বরাকের ১১ জন শহীদের স্মৃতি বাংলা ভাষার ইতিহাসে একটি স্থায়ী অধ্যায় হয়ে থাকবে। তাঁদের আত্মত্যাগের স্মৃতি যতদিন থাকবে, বাংলা ভাষার এই জয়গাথাও ততদিন মানুষের মনে বেঁচে থাকবে।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!