বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের ০৬ (ছয়) কোটির অধিক মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলী উদ্বেগজনকভাবে প্রচণ্ড ভীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। রাজনৈতিক অপরিণামদর্শিতার কারণে অর্থনীতি, সংস্কৃতি, জীবন-যাপনে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সংখ্যালঘু সনাতন পন্থী হিন্দু, বিপরীত মতপন্থী, নিম্নবর্গীয় মানুষ, অন্যান্য সংখ্যালঘু জনজাতি-আদিবাসী, বৌদ্ধ, খৃস্টান, মুক্তচিন্তার ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, মব-সন্ত্রাস, প্রতিপক্ষের সাথে সংঘাত, গায়েবি মামলায় যখন বিপর্যস্ত, তখন বিদেশ থেকে ১০মাসে ৬৪ হাজার কর্মী ফেরত এসেছে। এমনকি বিগত ১০ মাসে ৪হাজার প্রবাসীর মরদেহ ফেরত আসার তথ্য পাওয়া গেছে ।

আরো সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, একের পর এক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিজিএমইএ-র তথ্যে চট্টগ্রামে ৬৯৯টি কারখানার মধ্যে ৬১০ টি সচল থাকলেও ৩৪৮টি কার্যক্রম চালু আছে। নভেম্বর বিজিবিএ’র তথ্য অনুযায়ি গত দেড় বছরে প্রায় ২০০ তৈরি পোশাক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে, প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের বৈশ্বিক অসমতা-২০২৬ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট সম্পদের ৪.৭ শতাংশের মালিক ৫০ শতাংশের জনগণ, ১০ শতাংশের হাতে ৫৮ শতাংশ মালিকানা, শীর্ষ ১ শতাংশের নিকট মোট সম্পদের চারভাগে ১ভাগ মালিকানা। দেশে দরিদ্রের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। অতি দরিদ্র ৯.৩৫ শতাংশ। ১৮ শতাং যেকোনো সময় অতি দরিদ্র হয়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে জানা যায়- দেশে দরিদ্র সীমার নিচে যেতে পারে ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ।

দেশের এইসব ভয়ানক দূরাবস্থার সময়কালে যেসব ঘটনাবলি দেখা যায়, তার মূল সংকটকে শাসকবর্গ, আমলা-কামলারা প্রলেপ দিয়ে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে থাকে । রাষ্ট্রের সেইসব তথ্য সংবাদের প্রকাশের ঝুঁকিতে পড়েছে সংবাদপত্র ও মিডিয়া। প্রথম আলো, ডেলি স্টারে অগ্নিসংযোগ শুধুমাত্র নিছক কোন ঘটনা নয়। এমনকি ছায়ানট, উদীচী, নালন্দার মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সমাজে-রাষ্ট্রের এসব ঘটনা তথ্য প্রযুক্তির যুগে বিশ্বব্যাপি মানুষ দেখছে।

দেশব্যাপী বেশ কিছু ঘটনাবলিতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আদর্শের ভিন্নতায়, ধর্মের নানা রঙ ছড়িয়ে যেসব অগ্নিসংযোগ হচ্ছে, হত্যাযজ্ঞ দেখা যায়, তা-কি জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে না? সম্প্রতি ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড, পোশাক শ্রমিক দীপু, শিশু আয়েশাকে পুড়িয়ে হত্যা, বিভিন্ন ঘরবাড়ি-প্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার মতো নৃশংসতার মাধ্যমে জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতারের কিছু কিছু সংবাদ দৃশ্যমান হলেও, সার্বিক পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়।

রাষ্ট্রের দরিদ্রগোষ্ঠীর সংখ্যা যখন আনুপাতিক হারে বেড়ে যেতে থাকে, তখন সামাজিক সংকট তীব্র হবেই। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ও কর্মসূচি কি? দেশের যেদিকে দৃষ্টি দেবেন, অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার, ভোটের মাধ্যমে ভবিষ্যতের সরকার কি পারবে এই পরিস্থিতির নিরসন করতে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ক্ষমতাধর সাম্রাজ্যবাদী দেশের আনুকূল্য পাবার চেষ্টা করে। যার ফলে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কৌশলের ভেতর শোষক – শোষিত বিষয়টি অধিকাংশ দলের মধ্যে স্পষ্ট কোন নির্দেশনা থাকে না। সভ্য দুনিয়ায় যেভাবে শ্রমদাস বৃদ্ধি পাচ্ছে, শরনার্থী-বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা বাড়ছে, তাদের পুর্নবাসনের নামে যেসব প্রতিশ্রুতি, ঘোষণা দেখা যায়, তা মানসিক দাসত্বে পরিণত করে। সংস্কার ও উন্নয়ন নামক কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতির ভেতর মূল শোষণ-ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না। এছাড়াও কতিপয় প্রচার গ্রুপ দ্বারা ইতিহাসের বয়ানে পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা জনমনে মানসিক দাসত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। তথাপি সাময়িকভাবে সংকট থেকে উত্তরণে স্বপ্ন দেখে সাধারণ মানুষ। সেই স্বপ্নের ধারায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়তো আশু সমাধানের মানসিক প্রশস্তি আনতে পারে, কিন্তু মূল সংকট নিষ্পত্তি হবে কিনা, তা বলা কঠিন।

সামগ্রিক অবস্থায় অদূর ভবিষ্যতে শ্রমজীবীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামগ্রিক কাঠামোর পরিবর্তন করতে পারে। রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতর স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৈষম্যের অবসানে জনগণের সিংহভাগ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে। অর্থনৈতিক সাম্য ছাড়া দেশের সংকট কখনোই অবসান হবে না। তথাপি রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সুবিধাবাদ ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ পরিহার করে ক্ষুধার্ত, নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত অব্যাহত রাখবে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!