১১ মার্চ ১৯৭১: সর্বস্তরের অসহযোগে স্থবির হয়ে পড়ে পাকিস্তানি প্রশাসন

১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চের একাদশতম দিনে পূর্ববাংলাজুড়ে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে অসহযোগ আন্দোলন আরও বিস্তৃত রূপ লাভ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা অনুসরণ করে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। ফলে পূর্ববাংলায় পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে পড়ে।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যেই সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়। ১১ মার্চ এসে এর ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাইকোর্টের বিচারপতি, সচিবালয়ের কর্মকর্তা, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কর্মস্থল বর্জন করেন। সচিবালয়, মুখ্য সচিবের বাসভবন, প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ অনেক সরকারী ও আধাসরকারী ভবনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। এর ফলে বেসামরিক প্রশাসনের বড় অংশ কার্যত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে শুরু করে।

ঢাকাসহ সারা দেশে মিছিল ও সমাবেশে মুখর ছিল জনজীবন। স্বাধীনতার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ জনগণ পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন নির্দেশ অমান্য করে আন্দোলন চালিয়ে যায়। দেশের বিভিন্ন আদালতের কার্যক্রমও এদিন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা স্বাধীনতার দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে কর্মস্থল থেকে সরে দাঁড়ান, যা পাকিস্তানি প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সরবরাহ ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর রসদ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর স্বাভাবিক সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। সিলেটে রেশন সংগ্রহ করতে যাওয়া সেনাবাহিনীর একটি কনভয়কে স্থানীয় মানুষ বাধা দেয়। যশোরেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক কর্তৃপক্ষ ১১৪ নম্বর সামরিক আদেশ জারি করে। এতে সরকারি সম্পদের ক্ষতি করা বা সেনাবাহিনীর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে তা আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

এদিন বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাসভবনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ন্যাপ (ওয়ালী) পূর্ববাংলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পাঞ্জাব আওয়ামী লীগ সভাপতি এম. খুরশীদ, কাউন্সিল মুসলিম লীগের নেতা মমতাজ দৌলতানার বিশেষ দূত পীর সাইফুদ্দিন এবং ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি কে. উলফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে মিলিত হন। এসব বৈঠকে তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও দিনটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে একটি তারবার্তা পাঠান। বার্তায় তিনি দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তান একটি গুরুতর সংকটের মুখোমুখি এবং দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সংকট নিরসনে সমঝোতার পথ খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে গণঐক্য আন্দোলনের নেতা এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান বলেন, পূর্ববাংলার পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান কার্যত ঢাকার প্রশাসনিক বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর না করা হলে পাকিস্তানের দুই অংশকে একসঙ্গে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় ন্যাপপ্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান সাত কোটি বাঙালির নেতা এবং তার নির্দেশ মেনে চলাই এ সময়ের দাবি। লক্ষ্য অর্জনের জন্য সব রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এক সভায় বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানোর আহ্বান জানায়। আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের একদিনের বেতন ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একই সময়ে শিল্পী মুর্তজা বশীর পাকিস্তান সরকারের আয়োজিত একটি চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং দেশের অন্য শিল্পীদেরও তা বর্জনের আহ্বান জানান।

তবে এদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্থিরতার ঘটনাও ঘটে। কুমিল্লা কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশের গুলিতে পাঁচজন কয়েদি নিহত হয়। বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙে ২৪ জন কয়েদি পালিয়ে যায় এবং গুলিতে দুইজন নিহত হন।

সব মিলিয়ে ১৯৭১ সালের ১১ মার্চ ছিল এমন একটি দিন, যখন অসহযোগ আন্দোলনের শক্তিতে পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি প্রশাসনিক কাঠামো বড় ধরনের সংকটে পড়ে। প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন স্তরে অটল বাঙালির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার লক্ষ্যে বাঙালি জাতির অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় এই দিনের ঘটনাবলি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!