১৬ মে ১৯৭১: যুগীশো, পালশা ও হাসামদিয়া গণহত্যা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ১৬ মে একটি শোকাবহ দিন। এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকারদের সহায়তায় রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার যুগীশো ও পালশা গ্রাম এবং ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার হাসামদিয়া গ্রামে ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকারদের সহায়তায়, কিছু ক্ষেত্রে আল-শামস ও আল-বদর বাহিনীর সদস্যদেরও এই ধরনের দমনমূলক ও নৃশংস কর্মকাণ্ডে সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখতে দেখা যায়। এসব হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পুরো জনপদের নিরীহ মানুষের নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

যুগীশো গণহত্যা:
১৬ মে ভোরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছয়টি ভ্যান রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার যুগীশো গ্রামে প্রবেশ করে। সেনাদের আগমনের খবর পেয়ে গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা, প্রাণভয়ে নিকটবর্তী জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। কিন্তু স্থানীয় রাজাকার ও তাদের সহযোগীরা মিথ্যা আশ্বাস দেয় যে, আগের মতো হিন্দু-মুসলমানের সমন্বয়ে শান্তি কমিটি গঠন করা হবে এবং কারও কোনো ক্ষতি করা হবে না। এই আশ্বাসে বিশ্বাস করে লুকিয়ে থাকা মানুষদের যুগীশো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।

এখানেই ঘটে নির্মম প্রতারণা। বিদ্যালয়ে সমবেত হওয়ার পর পাকিস্তানি সেনারা হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা করে ফেলে। ৪২ জন সনাতন ধর্মাবলম্বীকে বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে একটি কুঁড়েঘরের কাছে নিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও যারা তখনও বেঁচে ছিলেন, তাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে লাশগুলো পাশের ডোবা ও পুকুরপাড়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের পর গ্রামজুড়ে চলে লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ।

এই গণহত্যায় স্থানীয় কিছু সহযোগীর নামও উঠে আসে। স্থানীয় পোস্টমাস্টার আবদুল কাদের-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি লুকিয়ে থাকা মানুষদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে বের করে আনতে ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি মোজাফ্ফর মাস্টার-এর নামও পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। স্থানীয় রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের মানুষ শনাক্ত করা এবং গ্রামবাসীদের জড়ো করতে সহায়তা করে।

পালশা গণহত্যা:
যুগীশোর পাশের গ্রাম পালশাও একই দিনের হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। যুগীশো ও পালশা ভৌগোলিকভাবে খুব কাছাকাছি অবস্থিত; কার্যত একই জনপদের অংশ হিসেবেই দুটি গ্রাম পরিচিত। ফলে যুগীশোতে হামলার পর পালশার মানুষও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কিন্তু এখানেও শান্তি ও নিরাপত্তার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষদের ডেকে আনা হয়।

পালশা গ্রামের মানুষদেরও একই কৌশলে জড়ো করে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা নিরস্ত্র মানুষদের ওপর আক্রমণ চালায়। যারা বেঁচে গিয়েছিল, তাদের অনেকেই পরে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। গ্রামে লুটপাট, বাড়িঘর ধ্বংস এবং আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এই ঘটনার ফলে পালশা গ্রামের সামাজিক কাঠামো দীর্ঘদিনের জন্য ভেঙে পড়ে।

হাসামদিয়া গণহত্যা:
একই দিনে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার হাসামদিয়া গ্রামেও পাকিস্তানি বাহিনী ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। প্রায় তিন শতাধিক পাকসেনা যশোর থেকে রেলপথে বোয়ালমারীতে এসে পৌঁছায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুজিব বাহিনীর নেতা শাহ মোহাম্মদ আবু জাফরকে আটক করা। তাঁকে না পেয়ে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালায়।

স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় হাসামদিয়া, রামনগর, রাজাপুর, ময়েনদিয়া ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ৩৩ জন নিরীহ মানুষকে আটক করা হয়। পরে নির্মম নির্যাতনের পর তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এই হত্যাযজ্ঞে স্থানীয় সহযোগী হিসেবে আবুল কালাম আজাদ-এর নাম উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা করেছিলেন।

মানুষ হত্যার পাশাপাশি হানাদাররা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় আগুন লাগিয়ে অর্ধশতাধিক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। বাজারে লুটপাট চালিয়ে বহু দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়। ফলে পুরো এলাকা জনশূন্য ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

এই তিনটি গণহত্যা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন অভিযানের অংশ ছিল। স্থানীয় রাজাকার ও দোসরদের সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনের পরিকল্পিত অভিযান বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। একই সঙ্গে গ্রামবাসীদের বিভ্রান্ত করে একত্রিত করা, ধর্ম অনুযায়ী আলাদা করা এবং তারপর হত্যা করা, এই ধাপগুলো প্রমাণ করে এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যা।

দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই তিনটি গণহত্যা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর দমননীতির একটি ধারাবাহিক অংশ। গ্রামবাসীদের মিথ্যা আশ্বাসে একত্র করা, ধর্ম অনুযায়ী আলাদা করা এবং তারপর হত্যা করা— এই ধাপগুলো স্পষ্টভাবে একটি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয় রাজাকার ও দোসরদের সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনের অভিযান বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না।

এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো অঞ্চলজুড়ে আতঙ্ক ও শূন্যতা নেমে আসে। গ্রামের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে যায়, আর মানুষের সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে দূরত্বের ভারে ম্লান হয়ে আসে। এসব অঞ্চলের মাটির নিচে আজও চাপা পড়ে আছে একাধিক জীবনের অসমাপ্ত গল্প।

তথ্যসূত্র:
এ কে এম কায়সারুজ্জামান (সম্পাদিত) যোগীশো ও পালশা গণহত্যা, গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট, ঢাকা, বৈশাখ ১৪২৫ / মে ২০১৮।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!