১৯ মে ১৯৭১: বটিয়াঘাটা-বাদামতলা ও সেনদিয়া গণহত্যা

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবের পাশাপাশি গভীর বেদনার অধ্যায়। ১৯৭১ সালে এই দিনে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার ফুলতলা, দেবীতলা ও বাদামতলা এবং মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার সেন্দিয়া এলাকায় ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়। একই দিনে সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞগুলো স্থানীয় ইতিহাসের পাশাপাশি জাতীয় ইতিহাসেও গভীর ক্ষতের চিহ্ন রেখে গেছে।

খুলনার বটিয়াঘাটা-বাদামতলা অঞ্চলের গণহত্যা:
খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার ফুলতলা, দেবীতলা, বসুরাবাদ এবং বাদামতলা এলাকায় ১৯৭১ সালের ১৯ মে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের দ্বারা গণহত্যা চালানো হয়। সকালবেলা গানবোটে করে পাকিস্তানি সেনারা ফুলতলা বাজারের কাছে পৌঁছে এবং রাজাকারদের সহায়তায় গ্রামে প্রবেশ করে। স্থানীয় মানুষ তখন প্রাণভয়ে আশপাশের গ্রামে পালিয়ে যায়। তবে দুইজন মানুষ গ্রামে থেকে যান। একজন ছিলেন বৃদ্ধ রাজেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং অন্যজন ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন রামলাল। পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে ঢুকে তাদের হত্যা করে এবং পুরো গ্রাম অগ্নিসংযোগ করে ধ্বংস করে দেয়।

এরপর সেনারা দেবীতলা ও বসুরাবাদ এলাকায় প্রবেশ করে। দেবীতলায় তারা উপেন্দ্রনাথ বিশ্বাসসহ বহু মানুষকে হত্যা করে। তারা গ্রামজুড়ে লুটপাট চালায় এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। নদী ও খাল পারাপারের সময়ও মানুষ হত্যা করা হয়। পার্বতী নামের এক নৌকার মাঝিকে খাল পার করানোর পর গুলি করে হত্যা করা হয়।

সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ ঘটে বাদামতলা বাজার এলাকায়। ফুলতলা ও দেবীতলা থেকে পালিয়ে আসা মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনারা শান্তি কমিটির সদস্য রাজাকার কমান্ডার হাবিবুর রহমান জোয়ারদার এবং তার বাহিনীর সদস্য খোরশেদ, জাফর, কামালসহ বেশ কয়েকজনের সহায়তায় তাদের ঘিরে ফেলে। পরে নলিয়ার ভিটা এলাকায় অনেক মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেখানে শতাধিক মানুষ নিহত হয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী এই এলাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়।

এছাড়াও বাগেরহাট, রূপসা, ফকিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শরণার্থীরাও নিহত হয়। অনেক শহিদের নাম আজও জানা যায়নি।

মাদারীপুর রাজৈর উপজেলায় সেনদিয়া গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ। ছবি সংগৃহীত।

মাদারীপুরে সেনদিয়া গণহত্যা:
একই দিনে ১৯ মে ১৯৭১ সালে মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার সেনদিয়া, পলিতা, ছাতিয়ানবাড়ী এবং খালিয়া এলাকায় আরেকটি ভয়াবহ গণহত্যা ঘটে। পাকিস্তানি সেনারা টেকেরহাট ঘাঁটি থেকে লঞ্চে এসে এবং স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় এই অঞ্চলে প্রবেশ করে।

গ্রামের মানুষ প্রাণ বাঁচাতে আখক্ষেত, ঝোপঝাড় এবং জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। যারা পালাতে পারেনি তাদের ধরে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে হত্যা করা হয়। ফকিরবাড়ির ভিটা, বাওয়ালি ভিটা, বাঁশবাগান, খালপাড় এবং পুকুরঘাট এলাকায় মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অনেককে পরিবারের সামনে হত্যা করা হয়। অনেককে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করা হয় এবং অনেককে গুলি করে মারা হয়।

এরপর আখক্ষেতে লুকিয়ে থাকা মানুষদের ওপর ব্রাশফায়ার করা হয়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত হয়। হত্যার পর অনেক লাশ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে এবং পরে স্থানীয়রা সেগুলো গণকবর দেয়।

এই গণহত্যাগুলো যুদ্ধের সাধারণ সংঘর্ষের সীমা অতিক্রম করে মানুষের জীবন ও জনপদ ধ্বংসের এক নির্মম সহিংস বাস্তবতা হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে।#

তথ্যসুত্র:
১। ১৯৭১: গণহত্যা ও নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট, বাদামতলা স্মৃতিফলক সংক্রান্ত নথি ও প্রতিবেদন।
২। খোরশেদ আলমের জবানবন্দী, ডুমুরিয়া, খুলনা, সংগ্রহ: রাশেদুর রহমান (সম্পা.), খুলনা ১৯৭১: অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান।
৩। অচিন্ত্য বিশ্বাসের সাক্ষাৎকার, ফুলতলা, বটিয়াঘাটা, ২০১২।
৪। মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মৌখিক ইতিহাস ও সাক্ষাৎকারভিত্তিক সংগ্রহ।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!