২৫ মার্চ ১৯৭১: রক্তে লেখা কালরাত্রি 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অন্ধকারতম অধ্যায়। সেই ভয়াল রাত ঢাকার আকাশ অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছিল, মানবতার বিবেককেও রক্তাক্ত করেছিল। “অপারেশন সার্চলাইট” নামে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যে অভিযান চালায়, তা ছিল সুপরিকল্পিত গণহত্যা, বাঙালি জাতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার নির্মম প্রয়াস। সেই রাতের প্রতিধ্বনি আজও বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি ও চেতনার ভেতর অনুরণিত হয়।

এর আগের ঘটনাপ্রবাহ ছিল অনিবার্য সংঘাতের দিকে ধাবমান এক রাজনৈতিক প্রতারণার কাহিনী। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মানুষ তাদের গণরায় স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু হয়। ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা পরিস্থিতিকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সারা বাংলায় শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। এরপর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ জাতিকে স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানায়। পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পূর্ব বাংলায় অচল করে দেয়। বাঙালিরাই কার্যত পূর্ব বাংলার নিয়ন্ত্রণ নেয়। কিন্তু একই সময়ের আড়ালে চলতে থাকে এক গভীর ষড়যন্ত্র, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনা ও অস্ত্র আনা, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ, এবং অপারেশন সার্চলাইট-এর চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

২৫ মার্চ রাত ছিল সেই প্রস্তুতির নির্মম বাস্তবায়ন। ঢাকাকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও এই হত্যাযজ্ঞ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি; ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালানো হয়। জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন আবাসিক হলে শত শত নিরস্ত্র ছাত্রকে হত্যা করা হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ গড়ে তোলা পুলিশ সদস্যদের ওপর ভারী অস্ত্রে আক্রমণ চালিয়ে বহুজনকে হত্যা করা হয়। পিলখানায় ইপিআর সদস্যদের ওপরও একইভাবে আঘাত আসে। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা ও অন্যান্য শহরেও সমন্বিতভাবে হামলা চালানো হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী কেউই রেহাই পায়নি। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে উঠে এসেছে, শুধু সেই রাতেই ঢাকায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। বাঙালি জাতির চিন্তা ও নেতৃত্বের ধারক, তাদের লক্ষ্য করে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানী সামরিক জান্তা।

এই নির্মম ইতিহাসের প্রতিটি পংক্তির পেছনে আছে অগণিত নিঃশব্দ আত্মত্যাগ। যাদের রক্তে গড়া  বাংলাদেশের স্বাধীনতা, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, পুলিশ ও বুদ্ধিজীবী সহ সকল শহীদদের আজ বিনম্র চিত্তে ও শ্রদ্ধা সাথে স্মরণ করছি। প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব তাঁদের স্বপ্ন ও অসমাপ্ত লড়াইকে হৃদয়ে ধারণ করে সত্যকে অমলিন রাখা, ন্যায়বিচারের পথে অবিচল থাকা এবং স্বাধীনতার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা।

এই হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অভ্যন্তরীণ সহযোগিতাও। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পাশে দাঁড়িয়েছিল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো। তারা রাজনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে দমন করতে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রেখেছিল। এই ইতিহাসের ভার আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে অমোচনীয় দাগ হয়ে রয়েছে। যে শক্তি একসময় গণহত্যার সহযোগী ছিল, তার রাজনৈতিক পুনর্বাসন ও প্রভাব বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি জাতির জন্য গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়, যা রাজনৈতিক বাস্তবতার, নৈতিকতার এবং ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী বেদনা, পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা না চাওয়া। বিভিন্ন সময়ে অনুশোচনার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও, রাষ্ট্রীয়ভাবে দায় স্বীকার ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা আজও করেনি পাকিস্তান। ইতিহাসে বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র নিজেদের অতীতের অপরাধ স্বীকার করে নৈতিক শক্তি অর্জন করেছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেই নৈতিক সাহসের অভাব শুধু ভুক্তভোগীদের নয়, তাদের নিজেদের ইতিহাসকেও অসম্পূর্ণ ও কলংকিত করে রেখে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। গত ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে উত্থাপিত প্রস্তাব, যেখানে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি কেবল কূটনৈতিক সাফল্যের বিষয় নয়, সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অংশ। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইতিহাসকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেয়, ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা তৈরি করে, এবং ভুক্তভোগী জাতির ন্যায়বিচারের দাবিকে শক্তিশালী করে।

স্বীকৃতি বা স্মরণ যথেষ্ট নয়; বিচারই হলো সর্বোচ্চ ন্যায়ের মানদণ্ড।বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা কার্যকরও হয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া এখনও অসম্পূর্ণ। অনেক অপরাধী বিচারের বাইরে রয়ে গেছে, অনেক সত্য এখনও অনুলিখিত। বিচার বিলম্বিত হলে তা আংশিকভাবে অস্বীকারের সমান হয়ে দাঁড়ায়। একটি জাতি যদি তার ইতিহাসের নৃশংসতম অধ্যায়ের বিচার সম্পন্ন করতে না পারে, তবে সেই ইতিহাস বারবার বিকৃত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

২৫ মার্চ দিনটি শোকের পাশাপাশি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জনের মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে এবং সেই মূল্যকে অস্বীকার করা কত বড় অন্যায়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের বিষয় হয়ে গেলে চলবে না; তা হতে হবে নৈতিক অবস্থানের ভিত্তি।

বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন আরও সুসংহত কূটনৈতিক উদ্যোগ, যাতে ১৯৭১ সালের গণহত্যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। একই সঙ্গে প্রয়োজন ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণভাবে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ করা। পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা দাবি জানানোও এই প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত। এসব দাবি কোনো প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

যে রাতের অন্ধকারে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছিল, সেই রাত আজও আমাদের সামনে প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? যতক্ষণ না এই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর হ্যাঁ হয়, ততক্ষণ ২৫ মার্চ আমাদের রক্তাক্ত ইতিহাস ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি চিরন্তন সংকল্পকে স্মরণ করিয়ে দেয়।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!