মহাশ্বেতা দেবী: পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আদিবাসী দ্রৌপদীর প্রতিবাদ

যখন উপমহাদেশে নিষ্ঠুর ধর্ষণ হয় তখন মনে পড়ে ‘দ্রৌপদী’ গল্পের কথা।
মহাশ্বেতা দেবী আজ একশো পূর্ণ করলেন।

মহাশ্বেতা দেবী কেবল একজন কথাসাহিত্যিক নন, বরং একজন সমাজসচেতন বুদ্ধিজীবী ও সক্রিয় মানবাধিকারকর্মী। তাঁর লেখার কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে ভারতের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী— বিশেষত আদিবাসী সমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, শোষণ ও লাঞ্ছনার ইতিহাস। এই প্রেক্ষিতে আদিবাসী নারী তাঁর সাহিত্যে এক বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে, কারণ শ্রেণি, জাতি ও লিঙ্গ—এই ত্রিবিধ প্রান্তিকতার বোঝা বহন করে আদিবাসী নারী সমাজের সবচেয়ে নিপীড়িত অংশ হিসেবে চিহ্নিত।

মহাশ্বেতা দেবীর আদিবাসী নারী কেবল নিপীড়নের শিকার নয়, বরং প্রতিরোধ ও চেতনার এক জীবন্ত প্রতীক। ‘দ্রৌপদী’ গল্পে তিনি আদিবাসী ও প্রান্তিক নারীর দেহকে রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে এই দেহই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। মহাশ্বেতার নারীচেতনা করুণার নয়, প্রতিবাদের; সহানুভূতির নয়, সহযোদ্ধার।

গল্পটি কেবল একটি নারীর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নয়; বরং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর রাষ্ট্রীয় হিংসার প্রতীকী ভাষ্য।

গল্পের নামচরিত্র দোপ্‌দি, পুরাণের দ্রৌপদীর নামবাহী হলেও সে আধুনিক বাস্তবতার সন্তান। সাতাশ বছর বয়সী ‘দোপ্‌দি’ আদিবাসী নারী দুলাল মাঝির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় শোষণ ও জমিদার-মহাজনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে যুক্ত। ১৯৭১ এ ‘অপরেশন বাকুলি’ থেকে অর্জন সিং ও পুলিশের চোখ এড়াতে তারা ছদ্মনাম গ্রহণ। তার ও দুল্‌নর নাম হয়েছিল ‘উপী মেঝেন, মাতং মাঝি’! তারা আত্মগোপনে থাকে। এর আগে দুল্‌নের মৃত্যু ঘটেচে। ‘সোমাই আর বধুনা হারামি’ মতো সহযোদ্ধারাই শেষ পর্যন্ত ‘দোপ্‌দি’কে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।’ এখানেই গল্পটি দেখায়— শোষণ কেবল বাইরের নয়, লোভ ও দুর্বলতার কারণে ভেতর থেকেও আন্দোলন ভেঙে পড়ে। দোপ্‌দি’ গ্রেপ্তার হওয়ার পর গল্প নতুন মাত্রা পায়।

সেনানায়কের নির্দেশে তার উপর চালানো হয় নির্মম শারীরিক ও মানসিক যৌন নির্যাতন। ‘বানিয়ে নেওয়া’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে মহাশ্বেতা দেবী রাষ্ট্রীয় ধর্ষণকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। এখানে নারীর দেহ শুধুমাত্র ভোগের বস্তু নয়—ক্ষমতার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র। দ্রৌপদীর রক্তাক্ত শরীর, ক্ষতবিক্ষত স্তন ও নিঃশেষিত চেতনা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভাষায় রূপান্তরিত হয়।

পুরাণে দ্রৌপদী পাশাখেলায় বাজি হয়ে রাজসভায় অপমানিত হলেও শ্রীকৃষ্ণের অলৌকিক সহায়তায় তার লজ্জা থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু আধুনিক ‘দ্রৌপদী’ গল্পে কোনো দেবতা নেই, নেই কোনো অলৌকিক উদ্ধার। এখানে রাষ্ট্রই সর্বোচ্চ ক্ষমতা, আর সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ভার একা নারীর উপরেই ন্যস্ত।

তবু এই চরম নির্যাতনের মধ্যেও পরাজিত হয় না। নগ্ন, রক্তাক্ত শরীর নিয়েই সে সেনানায়কের সামনে দাঁড়ায়— এটাই তার প্রতিবাদ। পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে সে প্রমাণ করে যে নারী শরীরকে দখল করা গেলেও চেতনাকে দখল করা যায় না। এখানে নগ্নতা লজ্জার নয়, বরং প্রতিরোধের অস্ত্র হয়ে ওঠে।

পবিত্রতার আবরণ ছেড়ে বাস্তব শোষণের কাঠামোর মধ্যে প্রকাশিত আদিবাসী নারী। আদিবাসী নারী প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু প্রকৃতির মতোই তাকে ভোগ্য ও দখলযোগ্য। তিনি আদিবাসী নারীর কণ্ঠস্বরকে সরাসরি উচ্চারণের সুযোগ করে দেন, যা মূলধারার সাহিত্যে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিল।

মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় আদিবাসী নারী কেবল একটি সাহিত্যিক বিষয় নয়; সামাজিক দলিল ও প্রতিবাদী ভাষ্য। তাঁর চেতনায় দেশের শাসনব্যবস্থা, ইতিহাস ও উন্নয়নের তথাকথিত সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক সংকটকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

‘দ্রৌপদী’ গল্পের মূল বিষয়বস্তু নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে আদিবাসী সমাজের ওপর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিপীড়নের নির্মম বাস্তবতা। আদিবাসী নারী ও প্রান্তিক মানুষের ওপর পরিচালিত শোষণ, সহিংসতা এবং ক্ষমতার দমনমূলক কাঠামোর স্বরূপ এই গল্পে উন্মোচিত হয়েছে। সাঁওতাল রমণী ‘দোপ্‌দি মেঝেন’ (দ্রৌপদী) কেবল নিপীড়নের শিকার নয়, বরং প্রতিরোধের প্রতীক। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের পর সে তার লাঞ্ছিত শরীরকে লজ্জার বস্তু না করে প্রতিবাদের ভাষায় রূপান্তরিত করে। ‘দোপ্‌দি’র নগ্ন, আহত শরীরই হয়ে ওঠে পিতৃতান্ত্রিক, সামরিক ও শোষক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক অস্ত্র। এই প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে ‘দোপ্‌দি’ নিজেকে এক defiant সত্তায় রূপান্তরিত করে, যা প্রচলিত নারী-ভাবনা, লজ্জাবোধ এবং ক্ষমতার কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে চ্যালেঞ্জ করে ও ভেঙে দেয়।

নারীবাদী, সাবোল্টার্ন ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের আলোকে, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের পাঠ অনুসরণ করে মহাশ্বেতা দেবীর এই গল্পে ‘দোপ্‌দি’র লাঞ্ছিত শরীর কীভাবে লজ্জার স্থান থেকে প্রতিরোধের রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তরিত হয়, তা তাৎপর্যপূর্ণ। স্পিভাক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ Can the Subaltern Speak?-এ দেখিয়েছেন যে সাবোল্টার্ন নারী প্রায়শই প্রতিনিধিত্বের বাইরে থেকে যায়—তা র কণ্ঠ দমিত হয়, বিকৃত হয় অথবা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে পড়ে।

গল্পে ‘দোপ্‌দি’ সেই নীরব সাবোল্টার্ন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সহিংসতার চূড়ান্ত মুহূর্তে সে ভাষাহীন শরীরকেই ভাষায় রূপান্তরিত করে। ধর্ষণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে যে শরীরকে পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র লজ্জার প্রতীক বানাতে চায়, সেই শরীরই ‘দোপ্‌দি’র হাতে হয়ে ওঠে প্রতিরোধের মাধ্যম। নগ্ন শরীর নিয়ে সেনানায়কের সামনে দাঁড়ানো ‘দোপ্‌দি’ র আচরণ পিতৃতান্ত্রিক লজ্জাবোধের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে উল্টে দেয়। এখানে লজ্জা আর নারীর নয়; লজ্জা স্থানান্তরিত হয় ক্ষমতার কেন্দ্রে।

স্পিভাক এই রূপান্তরকে পাঠ করেন এক ধরনের “counter-violence” বা প্রতিসহিংসতা হিসেবে— যেখানে ” সহিংসতার ভাষাকে আত্মসাৎ করে সেটিকেই শাসকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। ‘দোপ্‌দি’ র উক্তি, “তুমি আমাকে খুলে ফেলতে পারো, কিন্তু আবার কীভাবে পোশাক পরাবে?” নারী শরীরকে ভোগ্য বস্তু হিসেবে দেখার পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চূর্ণ করে।

এখানে সভ্য রাষ্ট্র ব্যবস্থার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুর দমননীতির রূপ উন্মোচিত হয়েছে। গল্পটি কেবল একটি নারীর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নয়; বরং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর রাষ্ট্রীয় হিংসার প্রতীকী ভাষ্য।

উপসংহারে বলা যায়, ‘দ্রৌপদী’ গল্পে মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসী শোষণ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও নারীর দেহ-রাজনীতিকে একসূত্রে বেঁধেছেন। ‘দোপ্‌দি’ কেবল একটি চরিত্র নয়— সে আধুনিক ভারতের শোষিত, নির্যাতিত অথচ অবিচল প্রতিবাদী নারীর প্রতীক। এই গল্পের মধ্য দিয়ে লেখিকা দেখিয়েছেন, প্রকৃত বিদ্রোহ কখনো অস্ত্রের নয়, বরং অদম্য মানবিক চেতনার।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!