জঙ্গলের গা ঘেঁষে পাহাড়চূড়োর মতন অনন্ত নরম আকাশে, বসন্ত যেন উড়ে এসেছে মিহি রঙের গুঁড়ো আবিরের মতো। ওপাশে আপার তেন্দু ফরেস্ট আর এ পাশে পরপর চা বাগান পেরিয়ে গরুমারা ন্যাশনাল পার্ক। মাঝে বিগত যৌবনা কোন স্থানীয় রমণীর মতন, নিমগ্ন আলোড়নে ক্ষীণ রেখাটি হয়ে এঁকে বেঁকে বয়ে চলেছে মূর্তি নদী! শরীর জুড়ে তার অসংখ্য যাযাবর নুড়ি পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যেন কুচি কুচি জোনাকির দানা! হিমালয়ের পাদদেশে আষ্টে পৃষ্টে জড়ানো আবছা কুয়াশা ঘেরা বিস্ময় আর মহাশূন্য থেকে খড় কুটো মুখে করে নেমে এসে, সারাদিন উড়ে উড়ে-ঘুরে ঘুরে বেহিসেবী পথ খুঁজতে থাকা ক্লান্ত বসন্তবৌরীর মায়া শিসের মৌতাত হয়ে, বয়ে চলেছে সে বিহানবেলার আনন্দবিলাসী কোন এক নেশাতুর ম্যাজিক বিভঙ্গের লোভে। এ আকাশ সে আকাশে এখন আগুন খোঁজে কামতাপুরী ভাওয়াইয়া গানের সুর! এমন সুন্দর একখানি মধুময় ভূমিখণ্ডের সাথেই তো জন্ম জন্মান্তরের ঋণে জড়িয়ে যাওয়া যায়! গলায় এক আঁজলা অঞ্জলী জড়িয়ে গেয়ে ওঠা যায়, “এই অরণ্য, নদী, পর্বত, নুড়ি পাথরে ভরা এই ভূখণ্ড, আমার দেশ! আমার একার দেশ! “মোর দেশ, মোর স্বর্গ!”
কাল রাতে চা বাগানে চিতা বেরিয়েছিল। আজ সকালে এ বাড়ির গোয়াল ঘরের সামনে চিতার পায়ের ছাপ দেখেছে পার্বতী বর্মন। পার্বতী এ বাড়ির বড় বৌ। সকাল বেলায় গোয়ালে ধবলী গরুর দুধ দোয়াতে গিয়ে, আধমরা রক্তাক্ত অবস্থায় গরুটাকে পড়ে থাকতে দেখে সে। দুদিনের বাছুরটাকে মুখে করে তুলে নিয়ে গেছে বাঘটা। সেই নিয়ে চিৎকার করে সে বাড়ি মাথায় করেছে। তার ত্রাহি চিৎকার শুনে আশেপাশের ঘর থেকে লোকজন ছুটে এসে ছোটখাট একটা ভিড় জমিয়ে ফেলেছে ওদের উঠোনে। হিংস্র শ্বাপদের গবাদি পশু শিকার এই জঙ্গলে হয়তো খুব সাধারণ একটা ঘটনা! আকছার ঘটে! তবু যে এই ঝুপড়িটার চারপাশে এই যে এতো উদ্বেলতা, বিচলিত গুঞ্জন, বিষয়বস্তুর বিষণ্ণতা ব্যতিরেকে ভাঙা ভাঙা কিছু রাজবংশী শব্দের স্থানিক বিস্ফোরণ এবং এই স্বভাবসুন্দর মায়াবী প্রকৃতি আর তার গা সওয়া নিষ্ঠুরতার প্রশ্নে বেশ স্বস্তিদায়ক মধ্যবর্তী নিজস্ব একটা বলয় তৈরী করে নিতে চাওয়া, এগুলোকে শুধুই রহস্যময়ী এই অরণ্যের মাঝে ওঁৎ পেতে থাকা তামাম বিপদসংকূলতাকে, এদের নিজেদের যূথবদ্ধতার বর্ম দিয়ে আটকে দেবার একটা মরিয়া প্রচেষ্টা বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারতো। এই রহস্যময়ী অরণ্যের প্রাচীন সুর, স্বর আর শীতল আলস্যের গায়ে অনুচ্চারে লেগে থাকা বেদনার পারম্পরিক দ্বন্দ্বের আখ্যানে, ট্রাজিক উপাদান হিসেবে হয়তো তাকে আরও ভাল মানাতো। কিন্তু যারা জানার তারাই শুধু জানে, এই লঘু জীবনে শুধু বয়ে যাওয়া কিছু মুহূর্তের কাছে কোলাহলপ্রিয় এই জটলাটা ঠিক কতটা আরামদায়ক এবং কিছু ক্ষেত্রে কতকটা মুখরোচকও! সেখানে শোক কিংবা ভীতি প্রদর্শন আর প্রাধান্য পায় না বরং নিরাপত্তাহীনতা, সংশয় কিংবা উদ্বেগ এসবের মাঝেই প্রকৃতির স্থিতিশীল নির্জনতা আর নির্বিকার খাদ্যশৃঙ্খলের মাঝে পড়ে, নিজেদের আব্রুহীন জীবনে সে যেন এক অবান্তর উদযাপন হয়ে ওঠে! সীমিত সাধ্যের এইসব জীবনগুলোয় ঘটে যাওয়া এরকম অধিকাংশ ঘটনায় যখন নিজেদেরই কোন হাত থাকে না, তখন এইসব গল্প করে বা গল্প শুনে তবু তো মানবিক অনুভূতিগুলো সজাগ থাকে পূর্ণমাত্রায়! কাল জঙ্গলে কাঠ কাটতে যাবার সময় পার্বতী হাতির পালের মুখে পড়েছিল। সে কথা হাত পা নেড়ে এরই মধ্যে সে সকলকে বলতে শুরু করেছে। হাতি প্রায়ই এখানে জঙ্গল ছাড়িয়ে বসতির কিনারায় এসে পড়ে। সরু পাথুড়ে রাস্তায় এসে এমনভাবে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সাক্ষ্যাৎ মাশান দেব! মৃত্যুর ঠিক আগের রূপকের খোঁজে, মিছিল করে জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে ফেরার পথ ভুলেছে। আসলে এই হিরণ্ময় উন্মুক্ত অরণ্যের মাঝে এদের আসা যাওয়া তো এমনই! জঙ্গল যেন শুধু এদেরই! এই চরাচর জুড়ে খেলা করে বেড়ানো বালিহাঁস, ডাহুক, চোখগেল, পাপিয়া, দলছুট হাতিদের দল, এরাই তো জঙ্গলের গর্ভকাল নির্ধারণ করে। ডুয়ার্সের এই জঙ্গলটা বারবার যেন এই আদিম বন্যতাকে জন্ম দেয়, সযত্নে বড় করে তোলে, শারীরবৃত্তিয় শৃঙ্খলে বেঁধে পথভোলাদের ঘরে ফেরায়। আবার এদের গর্ভেই হয়তো সংক্রামিত প্রেম আর ভালোবাসার অনর্গল সঙ্গমে নতুন করে জন্ম নেয় এই মোহক বনাঞ্চল! এদেরই পাপহীন দেহে বিমর্ষ শিশুটির মতো ঘুমিয়ে থাকার ভান করে মুখ গুঁজে, চোখ বুজে পড়ে থাকে। চন্দ্রাহত জ্যোৎস্নায় প্লাবিত এ জগৎ সংসারে, রাতচোরা হুতোমের ধূসর চোখে জঙ্গলের সেই ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে, কমলা জেগে থাকে সারারাত। তার ঝুপড়ির কয়েক কিলোমিটারের ভেতর কলকল কলাকৌশল আর স্রোতস্বীনি জাদুটোনার হাত ধরে তখন এক আচ্ছন্ন ঘুমের আবেশ তৈরী হয়। স্মৃতির নক্ষত্রেরা শিশিরভেজা জলছবি আঁকে তার ভাবনার ভিতর, নিদ্রাবিহীন স্বপ্নের ভিতর।
ঘরে তার প্রায় ডজন খানেক ছেলে মেয়ে। সাতটি ছেলে, পাঁচটি মেয়ে। শেষেরটির বয়স এখন কুড়ি দিন। নেহাতই দুধের শিশু! তবে তাতে ওর স্বামী হীরেন ঠিক যেন নিশ্চিন্ত হতে পারে না! আসলে এরা শুধু তো সন্তান নয় ওদের কাছে বরং এরা এই বর্মন দম্পতির জন্য এদেশে ক্রমশঃ বাড়াতে থাকা মৌলিক অস্তিত্ত্বের শিকড়! এই বনাঞ্চল, পায়ের নীচের পাতালকক্ষ, মাথার উপরে অনন্ত সীমাহীন নক্ষত্রবীথি, পরিব্যাপ্ত মহাকাশ এসবের মাঝে প্রতিস্থাপন করা একটা নিজস্ব ‘আমি’কে স্থায়ী নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার অলংকার! প্রতিবার পোয়াতি হলে সদরের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয় কমলা। প্রতিবার বাচ্চার সাথে নতুন সরকারি কাগজ। আসলে কমলা-হীরেন-পার্বতী মায় পুরো এই বর্মন পরিবার, এমনকি এই জনপদের অধিকাংশ বাসিন্দাই তো এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নয়! এদের অনেকেই কয়েক যুগ আগে পরিযায়ী হয়ে চলে এসেছে বাংলাদেশ থেকে। কেউ আবার এসেছে আসাম থেকে। এদের স্বাভাবিক জীবনভঙ্গিমায়, স্বত্ত্বায়, প্রবণতায় এপার ওপার মিলে মিশে গেছে খুউব সহজ বিবর্তনে। এদের শৈশব কৈশোর হয়তো সনাতনী জল হাওয়ার মতোই ভাগ হয়ে গেছে দেশকালের সীমানায়। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, সুর এগুলোকে কি এতো সহজে ভাগ করা যায়? ইদানীঙ সরকারি অফিস থেকে ভোটের কাজ করতে এসে বাঁকা চোখে তাকায় ওরা এদের দিকে। সে দৃষ্টিতে কখনো কখনো কপট চাতুরীর সাথে চিনির মতো গুলে থাকা মৌলিক বঞ্চনাবাদের ভ্যাজাল দৃষ্টিকটুভাবে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে! প্রতি রাতে তাই হীরেনের পুরুষ শরীর জেগে ওঠে, সদ্য খোলস ছাড়া চা বাগানের রাজগোখরোর মতন! বর্ষার মেঘের মতো ছড়ানো চুলে কুসুমিত কামিনী তেলের হাহাকার নিয়ে পড়ে থাকা কমলার লোলচর্মসার শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে সে হাতড়ায় কামড়ায়! তার আঙুলের প্রতিটা নখে লেখা হতে থাকে লালা, মাংস আর রক্তের অযুত সহজপাঠ! আকাঙ্খার উন্মাদ আগুন জ্বলে যেন! কমলার স্তনের বোঁটা বেয়ে দুধ বেরিয়ে এসে ভিজে যায় চারপাশ! হীরেনের দাপাদাপি তবু থামে না! যেন কাঁটা বসানো ক্ষুরধার লিঙ্গ তার! কমলার জরায়ুর বেদনা ভুলতে দিতে চায়না সে কোনোমতে! ঢুকিয়ে, পেঁচিয়ে প্রতিদিন নতুন করে খনন করে চলে সে কমলার যোনিদেশ! তিরতির করে কাঁপতে থাকা লম্ফের আলোয় সে গমন পথে রাতের অবয়ব ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে ওঠে! ফুলে ওঠা ঠোঁট, শরীর জোড়া কালো কালশিটে, ঝুলে যাওয়া স্তনবৃন্তে কস্তুরীহীন, চিনচিনে, হেঁচড়ানো সম্ভ্রমহীনতা নিয়ে দূরে কান পাতে কমলা। রাতের বুক চিরে তখন পাথরে পাথরে জলের ধাক্কা লাগার শব্দ, জঙ্গলের নিস্তরঙ্গ নীরবতা এড়িয়ে নিশাচর পাখিদের ডাক, নিশিকৃষ্ণতিথিতে অদ্ভুত লয়ে নিরলস জৈবিক কসরতে ব্যস্ত ঝিঁঝিঁ পোকার ঝমাঝম নগরকীর্তন, আশ্লেষী হায়নার পিশাচ হাসি এসবের পাশাপাশি ঝুপড়ির ঠিক বাইরেটা থেকে লোহার শিকলের একটা হালকা ঠুনঠুন শব্দ ভেসে আসে। জঙ্গলের ভেতর গাছপালার গভীরতা ভেদে যেমন আলো আঁধারি বাড়ে কমে, ঠিক তেমন নদীর বুক বেয়ে বয়ে চলা বিভ্রান্ত হাওয়াটার ধাক্কায় শব্দগুলোর গভীরতা যেন কমতে থাকে! কেমন ফাটা ফাটা অস্পষ্ট হয়ে মাত্রা হারিয়ে ফেলে শেষে! ফি বছর হীরেনের স্থায়ী নাগরিকত্ত্বের পক্ষে দাখিল করতে চাওয়া চামড়া মাংসের কাগজপত্রগুলোকে নিজের গর্ভ দিতে না পাড়ার পাপ ধুয়ে ফেলতে ফেলতে, কমলা যেন দেখতে পায় বাইরে বাঁধা হাতিটা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে এখন! ঘন ঘন মাথা নাড়ছে! পিছনের দুপায়ের মাঝে শিকলটাকে হ্যাচকা টানে খুলে ফেলতে চাইছে! এ আজ নতুন কিছু না। কমলা দেখেছে প্রায় প্রতি রাতেই এই সময়টায় হাতিটা যেন ক্রমশঃ অস্থির হয়ে ওঠে। ওদের সঙ্গমের তীব্রতা যত বাড়ে তত যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে সে! মাস ছয়েক হোল মূর্তি বিট অফিস থেকে হাতিটাকে দিয়ে গেছে হীরেনের জিম্মায়। জলদাপাড়া ফরেস্ট অফিস যখন হস্তীশাবকটিকে ওর মায়ের থেকে আলাদা করার পদ্ধতি শুরু করেছিল তখন হয়ত সেটির বয়স চার বছর! ফি বছরই এই কাজ চলে। মায়ের থেকে আলাদা করার সময় মা হাতিটির অস্থিরতায় তটস্থ থাকতে হয় বনদপ্তরের সকলকে! এসময় তাকে শান্ত রাখে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য কুনকি হাতির দল। এসবই কমলা শুনেছে হীরেনের মুখে। হীরেন বেশ কয়েক বছর ধরে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে একটা পার্ট টাইম কাজ বাগানোর ধান্দায় ছিল। মাহুত হবার ট্রেনিং নিয়েছে সে বেশ কিছুদিন। নিজে হাতে হাতি বাঁধার দড়ি বানিয়েছে। ওর মতন আরো অনেকেই ট্রেনিং নিয়েছে যদিও। তার পর প্রধান মাহুত বাসের আলীকে হাত করে, এটা সেটা ফাই-ফরমাস খেটে দিয়ে, কিশোরগঞ্জের দোক্তা পাতা সাপ্লাই দিয়ে, আস্তে আস্তে মাহুত হবার বিশ্বাস সে অর্জন করেছে। এখন সে নিজেই বুক ফুলিয়ে, ছুঁচলো গোঁফের আগা সরু করে বলে, “হামরা বর্মন! মাহুতের জাত! মোর দাদা পরদাদা আসাম থাকি হাতি ধরি আনি, পোষ মানি খেলা দেখাইত।” হাতিটাও দিব্যি এখন হীরেনের পোষ মেনেছে। হীরেনই বলতে গেলে এখন ওর ‘মাহুত বন্ধু’! হাতিটাকে সেই এখন চান করায়, খেতে দেয়, তার পিঠে চেপে জঙ্গল, নদীর ধার চড়তে বেরোয়। রোজ একবার বিট অফিসে রিপোর্ট করে আসে। সেসময় রাখালিয়া বাঁশিতে সুর তোলে হীরেন। তার বাঁশির সুরে জঙ্গলের শাল-সেগুন-গামার গাছে জন্ম নেয় কয়েকশো চুমুর রোমান্টিকতা! হয়তো ওর না বলা ভালোবাসাগুলো অব্যক্ত প্রেম আর ব্যর্থযাপনের কবিতা হয়ে তাতে মিশে থাকে। যেন এক আদিম অরণ্যমানবের সবুজ হারানো উদাস কথকতা, দূরের পাহাড়ের গায়ে তোলা অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসে, এক ফোঁটা গাঢ় বাদামী রঙের জাদু ধ্বনি হয়ে! হাতিটা সত্যি দিব্যি পোষ মেনেছে হীরেনের! পেছনে বাড়ি মেরে ‘বোট’ বললে হাটু গেঁড়ে বসে পড়ে! হাতের বেতের লাঠিটা দিয়ে একটু খুঁচিয়ে ‘মাইল’ বললে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে! আবার একটু চেঁচিয়ে ‘তিরে’ বললে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে! হাতিটার সামনে গিয়ে হীরেন ‘ধের’ বললে কেমন শুঁড়ে করে পেঁচিয়ে ধরে ওকে! ব্যালেন্স করে ওর কাঁধে চড়ে বসে হীরেন। প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে এসবই দূর থেকে লক্ষ্য করে কমলা। হাতিটার পেছনের পা দুটো একটা মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা এখনো! পাটের দড়িটা রোদে পুড়ে জলে ভিজে হলদে হয়ে গেছে। দড়িটা সোজা উঠে হাতিটার পেটের তলা দিয়ে ঘুরিয়ে লেজের তলায় পাক দিয়ে বাঁধা। একে মাহুতদের ভাষায় ‘জাঙ্গিয়া’ বলে। এই বাধনটার ফলে তার লেজটা একটু উঁচু হয়ে আছে এবং লেজ নাড়লে হাতিটার ঈষৎ কালচে যোনিদেশ বেরিয়ে পড়ছে মাঝে মাঝে। হাতিটা এখন আপন মনে আখের ছোলা চিবোচ্ছে। ধীর পায়ে সেটার কাছে এগিয়ে যায় কমলা। প্রশিক্ষণের প্রথম কয়েক মাস গলার কাছে রশি দিয়ে কষে বাঁধা থাকে। একে বলে ‘ফাঁদ’! তাছাড়াও বুকের কাছ থেকে জড়িয়ে সামনের পা দুটোও বাঁধা থাকে। তাকে মাহুতেরা বলে ‘বুক ফারা’। হীরেনের মুখে শুনেছে কমলা, পোষ মানানোর প্রথম দিনের কথা! সে দৃশ্য বড় নির্মম! হাতিটার চারটে পা চারটে খুঁটির সাথে বেশ মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে এই বাঁধনগুলো পড়াবার কাজ চলে। সেসময় হস্তীশাবকটির কান ফাটানো চিৎকারে পুরো জঙ্গল কেঁপে ওঠে! অনেক টানা হ্যাঁচড়ার পর স্ব-যাপনের যুদ্ধে হেরে যায় হাতিটি! তার শূন্য, ক্লান্ত শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে! স্তব্ধ হয় তার যাবতীয় তর্জন গর্জন! স্মৃতি ঘোলাটে হয়, অনুজ্জ্বল চোখদুটো জুড়ে তার ঘুম নেমে আসে। হাতিটার গায়ে বাঁধনগুলো হয়তো তখন কষে বসে গেছিল! সে দাগ এখনো সুস্পষ্ট! জায়গাগুলোয় হাত রাখে কমলা। ওর হাতের তালুর নীচে কয়েকটা অমসৃণ বলিরেখা ভেসে চলে যায়। ওর হাতের নাগালের ভিতর হাতিটার পিঠের শুকিয়ে যাওয়া ফোস্কাগুলো জেগে থাকে শুধু, শুকনো পাথরের গায়ে ঋতুর হাত ধরে জন্ম নেওয়া, অদৃশ্য ফাটলের অন্ধকার নিয়ে। মাকে ছেড়ে আসার শোক, শৈশব হারিয়ে ফেলার অভিমান আর লড়াই করে বেঁচে থাকার অহংকার এসব নিয়েই কবে যেন বড় হয়ে গেছে এই হস্তীশাবক। সে এখন তার মাহুতকে ভোলাতে জানে। সময় সময় নাকরা করে ব্যস্ত করে তুলতে পারে। পৃথিবীর বুকে এর থেকে বড় ভালোবাসার দৃশ্য হয়তো আর কিছু নেই! শুধু কমলা কাছে এলেই হাতিটা পিছন ফিরে দাঁড়ায়! মুখ ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে! কমলা যেন ওর কতকালের সতীন! এই মুহূর্তে হাতিটার সাথে একটা চেনা অচেনার আত্মময়তা অনুভব করে কমলা। শিরা ধমনীতে বহমান নিঃশব্দ সে আবেগ, মূর্তির কুলুকুলু স্রোতের মতোই স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ! একদিন মা বাপের ঘর ছেড়ে সেও এসেছিল হীরেনের কাছে। ঘরকন্যার সুখ পেতে জঙ্গলের বুকে হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় শিয়ালকাঁটার মতোই হয়তো সেও ভেসে এসেছিল। এখন গোটা শীতকাল জুড়ে পেয়ে বসা স্মৃতির অবসন্নতা আর মূর্তির প্রায় নিশ্চিহ্ন শরীর জুড়ে বেছানো ঠান্ডা বিছানার চাদর চিরে, সদ্য যুবতীর সোহাগের ওম এনে দেওয়া চৈত্র শেষের তপ্ত রোদকে ফিকে করে দিয়ে, ডেকে যায় শুধু নিখাদ ভালোবাসার লোভে কপাল পোড়ানো, কুলত্যাগী কোন এক চরিত্রহীনা কোকিলা! কমলার নিজের বিয়ের দিনের গীত মনে পড়ে যায়।
“বালির বাবার বাড়ি রে।
কলা সারি সারি রে।।
কোথা গিয়া পাইলা মধু।
বৈদেশী ভ্রমরা রে।।”
কুশে বাঁধা পড়েছিল দুটো হাত। আলতা চিহ্ন মাখামাখি সে হাতের রেখা যেন তখন তৃপ্ত মধুভান্ডের মতোই পূর্ণ! এতদিন এই যুগল পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু সেই লগনে রূপবতী লাবণ্যে যেন পুনর্জন্ম হয়েছিল কমলার। মধুল গান, সারি গান, পান-তামুল, খৈ ছেটানো আর কলা গাছের সারিকে স্বাক্ষ্মী রেখে, উজ্জ্বল প্লাবনে ভেসে গেছিল কমলার যৌবনবতী শরীর, ডাগর ডাগর চোখ, ডিঙি নৌকার মতন বাঁকানো মুখ, ভারী বুক, টিকোলো চিবুক! যেন চাঁদের আলোয় ভিজছে বনস্থলী! ফেলে আসা জীবনের যাবতীয় দুঃখ গন্ধকে মুছে ফেলে সে যেন তখন এক নতুন জীবনের আলোয় ফেরা। পাথুরে পথের ধুলো জড়িয়ে আরো নব নব প্রাণে ছড়িয়ে পড়া তেল হলুদের গন্ধমাখা আঁচলে। ওর ভাতারকে সেই প্রথমবার দেখে ওর পছন্দ হয়েছিল খুব। বেশ নির্মেদ, পেশীবহুল, টানটান চেহারা যেন ফুট ছয়েক লম্বা ধনুকের একটা ছিলা। দেখলেই কেমন যেন ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। মরদ হীরেনকে দেখে কমলার নরম বুকে তীব্র কর্ষণ ইচ্ছা জেগে উঠেছিল সেদিন! ঠিক ততক্ষণ কর্ষণ যতক্ষণ না অবধি ফাঁপা কুয়োয় জমে থাকা ধাতুরস দুকূল ছাপিয়ে গৃহস্থের বাড়ি ভাসিয়ে দেয়। শ্বশুরবাড়িতে এসে বৌ দেখানোর সময় এই পার্বতীই ওর মুখ দেখে বলেছিল, “এ ছয়রি মায়া জানেই! আজি থেকেই মোর দেবর বশ হল!” আঁকা বাঁকা সর্পিল পথে স্থিরচিত্রের মত স্থির হয়ে যাওয়া যায় এমন একটা জড়তা ছিল সেদিন পার্বতীর চোখের চাহনিতে! তারপর চোখে ঈষৎ বাঁকা দৃষ্টি এনে সামনে রাখা ধানের গোছা থেকে বেশ কিছুটা ধান মুঠো করে নিয়ে, ওর সিঁথিতে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সে দৃশ্যে এসে সজোরে ধাক্কা দিয়ে একখানা আস্ত রামধনু এঁকে দিয়ে গেছে তখন, টলটলে দু একটা ভবঘুরে হাওয়ার স্মৃতি! পাশে বসা পুরুষটির মুখে তখন নির্নিমেষ তৃপ্তির হাসি। আসে পাশে শুধু পক্ককেশ রাজবংশী বৃদ্ধা গোষ্ঠীর মুখরিত গুঞ্জন। আশীর্বাদ পর্ব সেরে পার্বতী তার দেবর আর দেবরানীর কপালে আলতো করে চুমু দিয়েছিলো। শ্রাবনের জলভরা মেঘ যেমন স্রোত নিয়ে আসে মূর্তির বুকে, জঙ্গল ঋতুমতী হয়, ওজন লাগে তার ভারী শরীরে, ঠিক তেমন একটা সমর্পিত স্তনভারে পার্বতীর শরীরটা ঝুঁকে পরেছিলো সামনের দিকে। অনিমেষ মায়ায় ভরা সে চুম্বন! যেন অনেক দূর দিয়ে ভেসে গেছে নির্বাক কল্পনারা! দিনের দূরগামী আলোর গভীরে যেন তাতে বোনা হয়ে আছে, ক্রোধ-ভয় আর সমবেদনার রূপবতী অক্ষর! এর পরের সাংসারিক জীবনে অবশ্য পার্বতী আর বিশেষ সদ্ভাব রাখেনি কমলার সাথে! জঙ্গলে কাঠ কুড়ানো, শুয়োর গরু প্রতিপালন, রাত জেগে হাতির হাত থেকে ক্ষেত পাহারা দেওয়া, এসব কাজ সমানে সমানে ভাগ হয়ে গিয়েছে। এমনকি বিষুয়ায় আটকলাই-বাটকলাই ভেজে বাড়ির চালে ছড়ানো, ঘরের দরজায় পিয়াজ-রসুন-পানিমুদ্রি পাতা-বেতের ডাল ঝোলানো ইদ্যাদি লোকাচার কিংবা বকা পিঠা, পাকন পিঠা, চিতই পিঠা বা নাড়ু বানানো এইসবই ওরা করেছে হাসিমুখে। সবার সামনে দেখিয়েছে ওরা কত ভাল আছে! মিলে মিশে আছে! কিন্তু কমলা ঠিকই বুঝতে পারে ওর বিয়ের পর থেকেই ভিতরে ভিতরে একটা জং ধরা কাতরতায় ডুবে গেছে পার্বতী! নিজের অসম্পূর্ণতাকে চেপে রেখে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকে, অপছন্দকে গ্রহণ করলে যেমন হয় কিংবা যেমনটা হয় নিজের একান্ত পছন্দকে বুকে পাথর চেপে পর করে দিলে! কমলার কাছে এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই তাই আর এসব নিয়ে ভাবলে কষ্টও হয়না ওর! হাতে হাতে তিল আর খেঁজুর গুড় জড়ো করে ঢেঁকিতে দেয় পার্বতী আর তালে তালে পা চালায় কমলা। যেন একই পুরুষের সাথে সফল আসক্ত একটি সঙ্গমের পর কোনো কাল্পনিক নাগরদোলার দুই মাথায় চড়ে বসেছে দুই নারী! একদিকে শর্তাধীন নীরবতা আর অন্যদিকে অশুচী একাকীত্ত্ব! দুজনেই আপাত ক্রিয়াশীল কিন্তু ভেতরে ভেতরে কি ভীষণ হিসেবী! যেন চরম ব্যক্তিগত কোন সুখে বা অসুখেও কেউ কাউকে একবার জিজ্ঞেস করবে না, “কেনে আছো?” (কেমন আছো?)
এখানে এখন ধূসর আকাশ মাথার ওপর ঝুলে থাকে সুঠামদেহী কোন পরপুরুষের মতন! তার গায়ে মেঘেরা লেগে থাকে লুকোনো কোন বিষণ্ণতা নিয়ে। অলক্ষ্যে ভিজে ওঠে বাতাস। শ্যামলা রঙের বিকেলবেলাটায় যেন পুরোনো কোন কান্নার গন্ধ মিশে থাকে। এখানে এখন জন্ম-মৃত্যু-যৌনতা-নাগরিকত্ত্ব চাপা পরে থাকে ছেঁড়াফোড়া শুকনো পাতার মতন। পাথুরে মাটির গা বেয়ে উল্লাস আর বিষাদের লুকোচুরি খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়া মূর্তি নদীর শীতল জলে পা দিলে, এই ক্ষরতপ্ত বসন্তের বিকেলবেলাতেও হালকা শীত শীত ভাব হয়। নদীর পশ্চিমের তট বরাবর ধানক্ষেত নেমে গেছে ধাপে ধাপে। এসময় বেশ অনেকক্ষণ ধরে বেশ অনেকটা ওপর থেকে, পরিশ্রমী চিলের আতসী চোখে মূর্তিকে দেখলে মনে হয়, অন্ধকারের গভীর থেকে উঠে আসা শীর্ণকায় এক বালুপথ! যেন ঋতুমতী নিঃসঙ্গ তরুণীটি! আশেপাশের পরিচিত সবকিছুর ছোয়াঁচ বাঁচিয়ে সে একাকী হেঁটে চলেছে দূরে, কিছু রঙিন ফুল আর সুগন্ধীর বন্ধুত্ত্বের আশায়। দিনের আলো শেষে বিকেলের ছায়াতেই অন্ধকার নামে একটু একটু করে। নোনাধরা দুপুরের শেষে নিষ্প্রাণ যৌবনের মতো একা তেতে পুড়ে শেষ হয়ে যেতে পারে এমন একটা জীবন অবশিষ্ট থাকে শুধু! ঠিক সেই রকম একটা জীবনকে সাথে করে আজ নদীর ধারে এসেছে কমলা। সেই জীবনের যে রং চোখে দেখা যায়, সেই রং নয় বরং চোখের আড়ালে গাঢ় হয়ে ঝিম ধরে যে রং সেই রং নিয়ন্ত্রণ করে বেঁচে থাকার ছলাকলা! এতক্ষণ ঠিক সেই রঙের পৃথিবীটাকে একটা কাঁচের বোতলে বন্দী করে তাতে চোখ রেখেছিল কমলা। এদিক সেদিক থেকে কিচির মিচির পাখির ডাক ভেসে আসছে। ওরা গান গাইতে চাইছে বোধহয়! ভালোবাসার গান! ঠিক তখনি তাকে আবার দেখা গেল! পরনের সেমিজটা হাঁটুর উপর গুটিয়ে, একটা সুরতি মোষের পিছু পিছু গোড়ালি জল ডিঙিয়ে মূর্তি পারাপার করছে সে। মূর্তি নদীর জলে বোনা ঝাপসা আয়নায় তার কোন স্পষ্ট ছায়া পড়ে না! তার পায়ে পায়ে খেলা করে যায় বোরোলি মাছের ঝাঁক! দৃশ্যটার ভেতর অনেকখানি মায়া, অনেকখানি জাগতিক মাদকতা লুকিয়ে থাকে যেন! সেদিকে দেখতে দেখতে বুঝি কমলার মনের ভেতর শিরশিরে বাতাস বয়! বুকের মাঝে অজস্র খঞ্জনি বেজে ওঠে ঝনঝন! সব আনন্দ যেন ঠেসে জমা হয়েছে দৃশ্যটায়! এ দৃশ্য যেন তার বহুদিনের চেনা। যেন এর আগেও কয়েক হাজারবার দেখেছে সে। তবু আজ আবার তাকে দেখে ছন্নছাড়াভাবে স্বাধীন হবার বোধটা বুঝি আবার সজীব হয়ে উঠলো কমলার মনের ভেতর। সে যেন দেখতে ঠিক সেরকম, যেমনটা সংসারের শুরুর দিনগুলোতে কমলাকে দেখতে ছিল। ডাগর ডাগর চোখ, ঈষৎ ভারী বুক, বাঁকানো চিবুক, ডিঙি নৌকার মতন মুখ। বহু কাঙ্খিত ঘুমের ভাব থেকে সরে আসা একটা নিষ্পলক চাহনি নিয়ে সে যেন ওকে ওর গতজন্মের কথা বলে। জীবনের অলিগলি, ভুলভুলাইয়া পথে হারিয়ে যাওয়া অতীত খুঁড়ে, স্বযত্নে তুলে আনে একখানা আধপোঁড়া স্বপ্নের ফালি। ওকে দেখলেই খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে কমলার! কিরকম একটা বৃষ্টি শুরু হয় ভেতর ভেতর! প্রথমে ঝিরঝিরে, তারপরে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে বেগ। মনে মনে বেজে ওঠে রংপুরী ভাওইয়ার সুর।
“মইষাল রে, তোর মইষের গলার ঘন্টি
বাজে ঠুন ঠুনাইয়া রে…
সেই ঘন্টির শব্দে মোর পরান
কান্দে উঠে গুমরাইয়া রে।“
কিন্তু তারপর আর সুর মেলে না, তাল কেটে যায়! চৈত্র শেষের ঝোড়ো হাওয়ায় অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে তার জট পাকিয়ে যাওয়া রুক্ষ্ম চুল। তার খোঁপা থেকে নদীতে পড়ে ভেসে যায় গোলাপী রঙের এক নাম না জানা ফুল। কমলাকে দেখে সে মাঝনদীতে দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ঈষৎ স্তনভারে সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে তার শরীর। অর্ধ উন্মীলিত বক্ষদেশের নীচে তার নির্মেদ কটিদেশ বেরিয়ে রয়েছে, শাল জঙ্গলে পথ হারানো ভীরু হরিণীর মতো! না সেখানে মাতৃত্ত্বের কোন চিহ্ন নেই! হাত দুয়েক দূরত্ত্বে মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্থির দুটো মানুষকে জড়িয়ে ধরে, ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকানো এই হিম হিম কালবেলায় রচিত হয় এক অসীম, অপার মায়ার মাধুকরী। ও সুমিত্রা! নামটা অবশ্য কমলারই দেওয়া। খুব ছোটবেলায় যখন কমলার মা মারা গেল বসন্ত রোগে সেদিন প্রথম ওকে দেখেছিল কমলা। তারপর থেকে বেনের পুতুল নাচের আসরে, কাউনিয়ার বাড়ির আনাচে কানাচে, একা পুকুর ঘাটে, সন্ধ্যেবেলা তুলসীতলায়, ঋতু আসার আগে বা খুব নিকটজনকে দাহ করে ফিরে অশুচী হয়ে যাবার সময়ে আবার নিকট পরিবার পরিজনের হাতে ‘খারাপ’ হতে গিয়ে, ওর নিজের না বলা কথায়, বলে ফেলা সব কথায়, স্মৃতির পাতা হাতড়ে, সব খানে কমলা শুধু তাকেই দেখতে পায়। যৌবনের প্রথম মিলন কামনায় চঞ্চলা কিশোরীর মতন প্রবল কামজ্বরে পুড়েছে কমলা ওকে ঘিরে। ওদের দেহতাপে পুড়ে গেছে সেই গৃহস্থ দুপুরগুলো! আজও রাতের অন্ধকারে যখন ওর শোবার ঘরে বাঁধ ভাঙা রতির সন্ত্রাস চলে, ওর যোনিদেশে আঁকা হয় ভবিষ্যৎ নাগরিকত্ত্বের স্থায়ী বন্দোবস্ত, যখন ওর বুকে হৃৎপিণ্ডের দৌড়োনো বেড়ে যায় প্রায় দুন্দুভি শব্দের বেগে, ওর নিম্নাঙ্গে ধেয়ে আসে রাতনিবিড়ের নিটোল চাকভাঙা মহুলের গন্ধতরল, ঠিক সেই সময় কাঁপা কাঁপা আলোয় তাকে প্রহেলিকার মতন ঘরের এককোণে বসে থাকতে দেখেছে কমলা! প্রেমিক চোখে ওর নাভির গভীরে আলতো জিভের ছোঁয়ায় দেশ-কাল-মানুষের মানচিত্র আঁকতে দেখেছে! সম্ভোগ শেষে হীরেন ওকে ছেড়ে দেবার পর ওর যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরটার পাশে এসে বসেছে সুমিত্রা। ওর বিবশ শরীর জুড়ে বুলিয়ে দিয়েছে ময়ূর পালক। উন্মুক্ত জিহবা দিয়ে চেটে নিয়েছে ওর সব রক্ত-স্বেদ-বেদনা-ক্লান্তি! নরম হাতের পরশে ওর চোখ জুড়ে নেমে এসেছে বহু কাঙ্খিত হেমন্তের রাত! ঠিক যেন ওর মায়ের স্পর্শ! ওর কানে কানে এসে সে শুনিয়েছে, ছেলেবেলায় কমলার বাবার গলায় শোনা গাড়িয়ালের গান,
“ও মুই নাই ওর আর না জাইম গাড়িয়াল
তোমার গাড়িত চড়ি।
তোমার গাড়ির হাঙরাত বাজি
ছিরি গেইল মোর বিয়ার শাড়ি।”
সুর, গান এসব কমলার রক্তে! ওর বাবা নিজেই কত ভাওইয়া রচনা করেছেন! সুর দিয়েছেন! তা হয়তো কোথাও লেখা-জোকা নেই। মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ঘুরে প্রচলিত তকমা পেয়ে গিয়েছে। কামতাপুরের আকাশ, বাতাস, ভাষা, লোকগানের সুর, পাখির শিস এই সব কিছুর ওপর ওদের আকণ্ঠ ঋণ! তাই তো মাতৃসম ভাষার বঞ্চনার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের দেশ গড়ার জন্য বাপ বেটায় মিলে সুর ছেড়ে বন্দুক নিয়েছিল হাতে। পুলিশের গুলি খেয়ে লাশ হয়ে ভেসে গেছিল বুড়িবাসরার জলে। দেশ বানায় মানুষ, মানুষই মানুষের স্বাধীনতার সীমানা বাঁধে! সেই মানুষ আবার সুরও তো বাঁধে! সুরের সাথে মিলেমিশে যেতে পারলে মানুষ নদী হয়ে যায়! স্রোতের মতন ঝর্ণা হয়ে গড়িয়ে পরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে! খুব তীক্ষ্ণ একটা পাখির শিস ভেসে আসছে এখন। সুরটা বড় চেনা লাগে কমলার। ইষ্টিকুটুম! দূরের সজনে গাছে পাতায় মোড়া পিঁপড়ে বাসা, হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ফুটবলের মতন। আগত বৈশাখের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ এসব উপলব্ধি করে জঙ্গলের বুকে গাছেরা নতুন পাতা বোনার সুর তোলে। সময়ের বাঁকে গোত্তা খেয়ে সে সুর হয়তো জঙ্গলেই হারিয়ে যায়! সাধারণ মানুষের কান অবধি এসে পৌঁছয় না। তবু তো এ পৃথিবীতে সবই তৈরী হয়, দুঃখ-আনন্দ-হাসি-জন্ম-মৃত্যু-উৎসব! সব কিছু! নদীর বুকে কোন শ্রমজীবী জল ছেঁচে পাথর তুলছে এখন! এতে করে হয়তো মূর্তির বুক পরিষ্কার হবে! স্রোত আসবে! কমলা সুমিত্রা এখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মাঝে হয়তো সাদা দেওয়াল! বেপরোয়া প্রেমিকার মতন দুহাত দিয়ে সে আচ্ছাদন সরিয়ে নদী-মাঠ-পাহাড়ের আহবান নিয়ে সুমিত্রায় মিশে যেতে ইচ্ছে করে কমলার! যেন ওর আমি মিশে যাবে ওর নিজের আমিতেই! যেমন নদী গিয়ে শেষ হয় বড় নদীতে কিংবা শেষমেশ বাউল আঁকড়ে ধরে নিজের দোতারাকেই!
“কালা তোর দোতরার ডাং
কালা তোর ভাওইয়া গান
উরাং বাইরাং মোর মন থাকিবার না পারে
ও কালা রে..”
আজ এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওদের ঝুপড়িটা ঘিরে আবার একটা জটলা জুটে গেছে। প্রতি দুপুরের মতো এই দুপুরেও ঝুপড়িতে ওদের ঘরে একাই ছিল কমলা। মাটিতে কোলেরটাকে শোয়ানো ছিল। আজ সকাল থেকে সেটা চিল চিৎকার করে কান্না জুড়েছে। বারবার চেষ্টা করেও তাকে থামাতে পারেনি কমলা। এখন ওর বুকে আর এক ফোঁটাও দুধ নেই! ভয়ংকর বেসুরো ওটা! ভয়ংকর বেতালা! লয়ের সাথে লয় মেলে না মোটে! সোম এ পড়ে যায় ফাঁকি! বড় ছেলেটা বাকিগুলোকে নিয়ে ইস্কুলে গেছে। ওদের মধ্যে তিনটে তিন ‘কেলাসে’ পড়ে আর বাকিগুলো ইস্কুলের বাইরে বসে থাকে, মিড ডে মিলের জন্য। হীরেন গেছে বিট অফিসে। এই সুডৌল বসন্তে নিজের কঙ্কালসার শরীরে নিদারুণ স্তন্যহীনতা আর অন্যদিকে খিদের জ্বালায় দুগ্ধপোষ্যের বিষম চিৎকার এই দুয়ের মাঝে পড়ে দিশেহারা হয়ে গেছিল কমলা। ওটাকে চুপ করাতে দুহাতে সজোরে ওর গলাটা চেপে ধরেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একেবারে চুপ! যেন রক্তচক্ষু দিয়ে শ্বাস রোধ করা হল ক্ষোভের! যে কোনো মৃত্যুই চাপাকান্নার শব্দ বয়ে নিয়ে আসে। কোথাও মৃত্যু হয় একটা গোটা জন্মেরই! কমলা এখন নির্বাক! ওর চোখে জল কিন্তু চেতনায় কোথাও শোক নেই হয়তো! ওর গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে মুক্তিহীন, অবসরহীন, অগোছালো দৃশ্যেরা। কাউনিয়ার সবুজ ধানক্ষেত, আলের উপর দিয়ে ছুটে চলে দুইটি মেয়ে, দেখতে হুবহু এক! ইন্ডিয়া থেকে বয়ে আসা সরু নদীগুলোয় ঝাঁপায় তারা অহরহ! সাঁতরে চলে যায় ওপারে। সর্ষে ক্ষেতের ভেতর দুজনে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে সারা বেলা। দূরে মুখ তুলে দেখে ইন্ডিয়ার বর্ডার, বিএসএফ এর চেকপোস্ট। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে আসে তারা ছায়াঘেরা সবুজ বাঁশবনের ভেতর দিয়ে। তুচ্ছ বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়ার মাঝে, গৃহহীন, রাষ্ট্রহীন ওই দুইজন কান পেতে থাকে রাতের তারার দিকে। সুরেলা মিঠে বাতাসে কোমল নিষাদের মতন তখন ভেসে আসে অনাম্নী কোন সাধকের গাঁথা বিনিসুতোর ভাওয়াইয়া,
“উড়িয়া যায় চখুয়ার পঙ্খী বগীক বলে ঠারে
ওরে তোমার বগা বন্দী হইছে ধল্লা নদীর পারে রে।
ফান্দে পরিয়ে বগা কান্দে রে..”
জঙ্গলে এখন বৃষ্টি নেমেছে হঠাৎ করেই। অবিরাম বৃষ্টি! মূর্তির শীর্ণ শরীরে যেন হঠাৎ করে বান ডেকেছে! অনুভূতির দুর্বলতম জায়গায় গভীর আঘাত পেয়ে এক মাঝি নদী পাড়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে বসেছে! বৃষ্টির তোরে তার নৌকাখানা ভেসে গেছে। জঙ্গলের পাখিদের ডানার পালক ভিজে ভারী হচ্ছে ক্রমশঃ। অসুখের দুঃখ, অন্যায়ের দুঃখ, বঞ্চনার দুঃখকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রেখে একটা নতুন জন্মকে আর নিজের পরিচয়ের দলিল বানাতে এখন নারাজ কমলা। সে চাইছে পাখি হয়ে বাঁচতে শুধু বাঁচার আনন্দে।#




