পরিমলের ফোনটা পেয়ে মনটা চনমন করে উঠল। ভাবলাম, যাই তবে একবার ঘুরেই আসি। ব্যাগ গোছাতে শুরু করে দিলাম। পরদিন শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ভোর পাঁচটা পঁয়ত্রিশের জঙ্গিপুর প্যাসেঞ্জারে চেপে বসলাম।
বেশ কয়েক বছর মুর্শিদাবাদের কুতুবপুর গ্রামের একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতা করছে আমার ছোটবেলার বন্ধু পরিমল। তার স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শতকরা নব্বই জনই মুসলিম সম্প্রদায়ের। কিন্তু এই কুতুবপুরে পরিমল বেশ জনপ্রিয় একজন শিক্ষক। প্রায় প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর পরিবারের সঙ্গে তার এক গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক।
গ্রামের এক সচ্ছল কৃষক পরিবার এবং গ্রামের সবার কাছে মান্য গোলাম মোওলার বাড়ির বাইরের দিকে একটা ঘরে ভাড়া নিয়ে থাকে। নিজেই রান্নাবান্না করে খায়। গোলাম মোওলার পরিবার ভীষণভাবে সংস্কারমুক্ত একটা পরিবার। কখনো কখনো তার কোনো নিরামিষ রান্নার তরকারির বাটি গোলাম মোওলার ছোট মেয়ে বিন্নির হাত হয়ে পৌঁছে যেত গোলাম মোওলাদের রান্নাঘরে। ওঁরা পরিমলের নিরামিষ রান্না করা পদ খুব ভালোবাসত খেতে। বিশেষ করে গোলাম মোওলার স্ত্রীর ভীষণ পছন্দ ছিল সেই রান্না। আবার বিপরীতে ধুকি পিঠে এবং কষা মুরগির ঝোল তার ঘরেও এসে পৌঁছত। এছাড়া ঈদের সিমুই থেকে নানান সুগন্ধি খাদ্য তো ছিলই।
সমস্ত কুতুবপুরের একজন আপনজন ও অভিভাবক হয়ে উঠেছিল পরিমল। এখন এই গ্রামের সবাই পরিমলের নামটাই ভুলে গেছে। সে এখন সবার কাছে মাস্টার নামেই পরিচিত।
প্রতিটি ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের নাম তার মুখস্থ। প্রত্যেকের পড়াশোনার অগ্রগতি বা অবনমন তার নখদর্পণে। তাই সবার প্রতিই তার সমান নজর এবং প্রয়োজনমতো পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের দিকে বিশেষ নজর দিতে তার কখনোই ভুল হতো না। প্রকৃতপক্ষে কুতুবপুর পরিমলকে গ্রহণ করেছে আপনজন হিসেবে, পরিমলও কুতুবপুরকে নিজের করে নিয়েছে।
এই যে আপন করে নেওয়া আর নিজের করে নেওয়া, এর মধ্যে আছে এক গভীর মানসিক নৈকট্য। এই নৈকট্য তৈরি হয় প্রকৃত ভালোবাসায়। এই ভালোবাসাই তো মানুষকে বেঁধে রাখে! বেঁধে থাকার তো এই একটাই মন্ত্র পৃথিবীর সভ্যতার আদি লগ্ন থেকে বয়ে চলেছে ফল্গুধারার মতো।
অনেকদিন ধরে পরিমলের সঙ্গে দেখা হয় না। ফোনে কথাবার্তা হয় ঠিকই। কিন্তু গত সপ্তাহে ফোন করে বলল,
— আয় না একবার শহর ছেড়ে। দুদিনের জন্য ঘুরে যা।
সত্যি কথা বলতে কি, পরিমলের কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম একটা মানুষ কীভাবে একটা অঞ্চলের সবার আপনজন হয়ে উঠতে পারে! না, এর জন্য আহামরি কিছুই করতে হয় না। শুধু নিজের কাজকে শ্রদ্ধা আর অন্তর থেকে ভালোবাসতে পারলে এবং নিজের কাছে নিজেকে সৎ রাখতে পারলেই পৃথিবীর সব বাধাকে অতিক্রম করা যায়।
তখন শীত উঠোন পেরিয়ে বার দুয়ারে পা রেখেছে। তার চলে যাওয়ার সব আয়োজন প্রায় শেষ। তবুও ভোরবেলায় শরীরে একটু হাত বুলিয়ে দেয়। অনেকদিনের জন্য বাইরে যাওয়ার জন্য যখন সংসারের কর্তাটি তার স্নেহের সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, এ যেন তেমনি। শহর কলকাতায় এখন রীতিমতো সারাদিন ফ্যান চালাতে হয়। এখানে তেমন নয়। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা মাঠঘাট জুড়ে তপ্ত বাতাসের আনাগোনা। বেশিক্ষণ বাইরে রোদের মধ্যে হাঁটা যায় না।
একদিন পরিমলের স্কুল দেখতে বেরিয়েছিলাম। এই এলাকায় আমি অপরিচিতজন। কিন্তু ততক্ষণে সারা গ্রামের মানুষ জেনে গেছে তাদের মাস্টারের বন্ধু কলকাতা থেকে এসেছে। ফলে আমাকে রাস্তায় দেখে বোরখা পরা মেয়েরা একটু দূরত্বকে আশ্রয় করে নেয়। বিকেলে পরিমল স্কুল থেকে ফেরার পর যখন বসে একসঙ্গে গল্প করছি তখন বেমক্কা প্রশ্ন করেই ফেললাম,
— এখানকার সব মেয়েরাই কি বোরখা পরে?
আমার প্রশ্ন শুনে পরিমল কিছুক্ষণ থম মেরে রইল। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, প্রশ্নটা কতটা অসঙ্গত!
খুব নিচু স্বরে পরিমল বলল,
— না রে। আমি যখন প্রথম এখানে আসি তখন এতটা ছিল না। শুধু বিবাহিত মহিলারা বাইরে বেরোলে বোরখা পরত। তাও আবার সামাজিক মর্যাদায় যারা একটু উঁচুতে অবস্থান করত। খেটে খাওয়া পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা মাঠে-ঘাটে কাজ করে তাদের মধ্যে তখনও ছিল না, এখনো নেই। কিন্তু…
— কিন্তু কী?
— দ্যাখ, আমরা এখন এআই-এর যুগে বাস করছি। মোবাইল, ল্যাপটপ ছাড়া ছেলেমেয়েদের চলে না। ওদের এখন পড়াশোনার জন্য এটা একটা অপরিহার্য বস্তু।
— হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে? এর সঙ্গে আমি যেটা বললাম তার কী সম্পর্ক?
— সম্পর্ক তো আছেই। এখন দিন বাচ্চা থেকে বয়স্কা মহিলাদের মধ্যে বোরখা পরার চল প্রায় দশ-বারো গুণ বেড়ে গেছে। এটা আমাকেও ভাবায়।
সেদিনের সন্ধ্যায় চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে অনেক কথাই হলো পরিমলের সঙ্গে।
পরের দিন রবিবার। পরিমলের প্রস্তাবে ওর সঙ্গে গ্রাম ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। পথে অনেকের সঙ্গেই পরিমলের দেখা। প্রত্যেকের সঙ্গেই পরিমল আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল। কী অসম্ভব সহজ এবং সরলরেখায় জীবনের ধারা বয়ে চলেছে। একটা অপূর্ব নির্মল সৌহার্দ্যের জীবনধারা। বড়ো ভালো লাগে।
একটা বিশাল পুকুর। তার চারদিকে আমগাছ। কয়েকটি গাছের ডাল মুকুলের ভারে একেবারে জলের কাছে নত হয়ে যেন কতকালের গোপন কথার কানাকানি করছে। কখনো কখনো মনে হচ্ছে আমের মুকুল আর জল বোধহয় প্রথম প্রণয়ের প্রথম চুম্বনের জন্য ইতস্তত করছে, যদি কেউ দেখে ফেলে!
আমি মুগ্ধ হয়ে এই দৃশ্যে বিভোর হয়ে ছিলাম। একটু দূরে দেখি একটি বোরখা পরা, হয়তো তরুণী হবে, পরিমলের সঙ্গে কথা বলছে এক কোমর জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে। পরিমল ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। আমি চট করে একটা গাছের আড়ালে চলে গেলাম। সেখান থেকে ওদের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। আর আমি সেই কথা শোনার জন্য কান পেতে রইলাম।
— ও মাস্টার, তোমার নাকি বন্ধু আসিছে হেই কলকাতা থেকে।
— হ্যাঁ, এসেছে। তা তোর এবার কোন ইয়ার হলো নিলোফা?
— থার্ড ইয়ার ফিফথ্ সেমেস্টার।
বলেই নিলোফা তার মুখের সামনের বোরখার অংশটা তুলে জলে ডুব দিল।
আমার বুকের ভিতরের হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক শুরু করে দিল। কারণ অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটা সেই যে ডুব দিয়েছে, আর উঠছে না। নির্ঘাত কোনো অঘটন ঘটে গেছে। আমার হাত-পা যেন পেটের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। অথচ পরিমলের কোনো হেলদোল কিছুই দেখছি না। হঠাৎ ভুস করে সে জলের তলা থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে তার ছোটবেলার মাস্টারের দিকে তাকিয়ে হ্যা-হ্যা করে হাসছে।
পরিমল বলল,
— নীলু, জলের নিচে এতক্ষণ কী করিস তুই?
— মাস্টার, পানির নিচে একটা সুন্দর জগৎ আছে গো।
— সে তো আছেই, তাতে তোর কী?
— পানির নিচে ইচ্ছামতো, মনের সুখে চোখ মেলে সেই জগৎটারে দেখি।
— কেন, উপরের এই জগৎটারে দেখিস না?
— হ, দেখি।
— তবে?
— মাস্টার, তুমি বুঝবে না।
— কেন বুঝব না?
— একদিন আমার মতো বোরখা পরে ঘুরে বেড়াও দিনি। দ্যাখবা সব ঝাপসা। পানির নিচে কোনো বাঁধন নাই যে! সব তরল। গরল নাই।




