গবেষক: জয়িতা রানা দাস
তত্ত্বাবধায়ক: ড.হেমন্ত ভট্টাচার্য
বিভাগ: সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
প্রতিষ্ঠান: সিকম স্কিলস্ ইউনিভার্সিটি
প্রকাশনা: সময়ের শব্দ
ISSN: 2704- 1387
প্রকাশের তারিখ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংক্ষিপ্তসার:
সংস্কৃত কথাসাহিত্য কেবল বিনোদন, নীতিশিক্ষা বা রোমাঞ্চকর কাহিনির আধার নয়; এর অন্তর্লোকে প্রাচীন ভারতীয় সমাজের ন্যায়বোধ, অপরাধচেতনা ও বিচারব্যবস্থার সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘হিতোপদেশ’, ‘পুরুষপরীক্ষা’, ‘শুকসপ্ততিকথা’, ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’, ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’, ‘কথাসরিৎসাগর’ ও ‘দশকুমারচরিত’-এর বিভিন্ন কাহিনিতে চৌর্য, হিংসা, পরস্ত্রীসংসর্গ, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, সম্পত্তি-বিবাদ, ঋণ, ক্রয়-বিক্রয় এবং অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিরোধের বিচিত্র দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
এই আখ্যানগুলিতে বিচার কেবল অপরাধীর শাস্তিবিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সত্যনির্ণয়, সামাজিক শৃঙ্খলা, পারস্পরিক অধিকার-কর্তব্য এবং নৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া হিসেবেও বিচারকে দেখা হয়েছে। স্মৃতিশাস্ত্রে বর্ণিত বিবাদপদ, বিচারপ্রক্রিয়া, প্রমাণ, শপথ ও দণ্ডবিধির সঙ্গে কথাসাহিত্যের ঘটনাগুলির তুলনামূলক পাঠ প্রাচীন ভারতীয় বিচারচেতনার ব্যবহারিক ও মানবিক রূপকে স্পষ্ট করে তোলে।
আধুনিক সমাজে অপরাধের রূপ পরিবর্তিত হলেও লোভ, হিংসা, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অন্যের অধিকারের প্রতি অশ্রদ্ধার মতো মানবিক প্রবৃত্তিগুলি এখনও সক্রিয়। সেই কারণে সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচারচেতনা বর্তমান ভারতীয় সমাজ ও বৃহত্তর ভারতীয় সাহিত্যপরম্পরার প্রেক্ষিতেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই আলোচনায় অতীতের বিচারব্যবস্থার পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি ভারতীয় সাহিত্যমানসে ন্যায়, অন্যায় ও মানবিক দায়বদ্ধতা অনুসন্ধানের দীর্ঘ ঐতিহ্যকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মূল শব্দ: সংস্কৃত কথাসাহিত্য, বিচারব্যবস্থা, ন্যায়চেতনা, অপরাধচেতনা, স্মৃতিশাস্ত্র, বিবাদপদ, বিচারপ্রক্রিয়া, প্রমাণ, শপথ, দণ্ডবিধি, সামাজিক নৈতিকতা।
সংস্কৃত কথাসাহিত্য বা আখ্যানসাহিত্য প্রাচীন ভারতীয় সমাজজীবনের বহুমাত্রিক পরিচয় বহন করে। এই সাহিত্যে মানবজীবনের প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, নৈতিকতা-অনৈতিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও সমাজব্যবস্থার পাশাপাশি অপরাধ, অপরাধী, বিচার, প্রমাণ, শাস্তি এবং ন্যায়-অন্যায়ের ধারণারও সুস্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। ফলে সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যকে কেবল বিনোদনমূলক বা নীতিশিক্ষামূলক সাহিত্য হিসেবে বিচার করলে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য অনালোচিত থেকে যায়। ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘হিতোপদেশ’, ‘পুরুষপরীক্ষা’, ‘শুকসপ্ততিকথা’, ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’, ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’, ‘কথাসরিৎসাগর’ ও ‘দশকুমারচরিত’ প্রভৃতি আখ্যানগ্রন্থের বিভিন্ন কাহিনিতে বিচারসভা, বিচারক, সভ্য, অপরাধ, অপরাধনির্ণয়, সাক্ষ্য, প্রমাণ, শপথ, দণ্ড এবং রাজধর্মের যে বিচিত্র চিত্র পাওয়া যায়, তা প্রাচীন ভারতীয় বিচারচিন্তার সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রতিফলন হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা, নারদস্মৃতি, বৃহস্পতিস্মৃতি ও কাত্যায়নস্মৃতি প্রভৃতি স্মৃতিশাস্ত্রে বিচারব্যবস্থার যে তাত্ত্বিক ও বিধিবদ্ধ রূপ পাওয়া যায়, আখ্যানসাহিত্যের সঙ্গে তার তুলনামূলক পাঠ প্রাচীন ভারতীয় বিচারব্যবস্থার একটি পূর্ণতর চিত্র নির্মাণে সহায়তা করে।
উল্লেখ্য, “সংস্কৃতসাহিত্যের অন্যতম সমৃদ্ধ শাখারূপে গল্পসাহিত্যের এক বিশিষ্ট স্থান আছে। মানুষের গল্প শোনার সহজাত প্রবৃত্তি থেকেই ভারতবর্ষে গল্পকথার উদ্ভব হয়েছে। একই কাহিনী বেদে, পুরাণে মহাভারতে, কাব্যে বা নাটকে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু উপস্থাপনার ভিন্নতাবশতঃ একই কাহিনি ভিন্ন স্বাদে ও বৈচিত্র্যে উপাদেয় হয়ে উঠেছে। গল্প বলার ও গল্প শোনার স্বাভাবিক আকর্ষণ থেকেই গল্পকথার সৃষ্টি হয়েছে। ঋগ্বেদের ভেকসূত্তে (৭/১০৩), ব্রাহ্মণের শুনঃশেপের কাহিনিতে, ছান্দোগ্য উপনিষদের (১/১২) সারমেয়ের উপাখ্যানে মানবেতর প্রাণী অবলম্বনে রচিত গল্পের সমাবেশ থাকলেও পরবর্তী কালের গল্পসাহিত্যের সঙ্গে তাদের পার্থক্য আছে। গল্পসাহিত্যের একটি উদ্দেশ্য হল-গল্পের মাধ্যমে নীতিশিক্ষা দান। বৈদিকসাহিত্যের গল্পগুলিতে সেই বৈশিষ্ট্য না থাকলেও এই গল্পগুলিই যে প্রাচীন ভারতীয় গল্পকথার পথিকৃৎ এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।…” ১
গল্পসাহিত্যের এই নীতিশিক্ষামূলক দিক বিচারভাবনার আলোচনায় বিশেষ প্রাসঙ্গিক।
প্রাচীন ভারতীয় আইনচিন্তায় ‘ব্যবহার’ শব্দটি বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। অন্যের অধিকারের বিরোধিতা করে কোনো বিষয় বা সম্পত্তির ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে যে বিবাদের সৃষ্টি হয়, তার বিচার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে ‘ব্যবহার’ বলা হয়েছে। এই ব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত বিরোধের নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে রাজধর্ম, প্রজাপালন এবং সামাজিক শৃঙ্খলার প্রশ্নও যুক্ত। শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমন রাজার অন্যতম প্রধান কর্তব্য বলে বিবেচিত হওয়ায় অপরাধীকে চিহ্নিত করা এবং অপরাধ অনুযায়ী দণ্ড প্রদানের জন্য একটি সুসংবদ্ধ বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছিল। স্মৃতিশাস্ত্রকারগণ তাই রাজাকে ব্যবহারদর্শনের অধিকারী ও বিচারকার্যের প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই তাত্ত্বিক বিচারচেতনার ব্যবহারিক ও কাহিনিনির্ভর প্রতিফলন সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যে দেখা যায়।
সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিচারসভা ও বিচারকের উপস্থিতি। রাজসভা বহু ক্ষেত্রে একই সঙ্গে প্রশাসন ও বিচারকার্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রাজা বিচারকার্যের প্রধান ব্যক্তি হলেও তার সহায়ক হিসেবে সভ্য, গণক, লেখক এবং অন্যান্য রাজকর্মচারীর উপস্থিতির ইঙ্গিত বিভিন্ন কাহিনিতে পাওয়া যায়। ফলে বিচারকার্য একক ব্যক্তির ইচ্ছানির্ভর ছিল না, বরং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও সহযোগী ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো বলে আখ্যানগুলি থেকে ধারণা পাওয়া যায়। ‘কথাসরিৎসাগর’-এর বিভিন্ন কাহিনিতে বিচারসভায় সভ্যদের উপস্থিতি ও তাদের কার্যক্ষমতার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বিচারসভা ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে বিচারকের পাশাপাশি অন্যান্য পদাধিকারীরও নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল।
বিচারকের যোগ্যতা ও বিচারবোধ সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন বিচারককে কেবল ক্ষমতাবান হলেই চলত না; তাকে বিচক্ষণ, নিরপেক্ষ, সত্যনিষ্ঠ, সংযমী ও যুক্তিবোধসম্পন্ন হতে হতো। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘শশ-কপিঞ্জলকথা’ এই প্রসঙ্গে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে বিচারকের গুণাবলি এবং বিচারকার্যের জন্য কে উপযুক্ত বা অনুপযুক্ত, সেই প্রশ্ন কাহিনির মধ্য দিয়ে উত্থাপিত হয়েছে। বিচারকের প্রধান কর্তব্য হলো উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সত্য নির্ণয় করা এবং পক্ষপাতহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আখ্যানসাহিত্যে বিচারকের চরিত্র কেবল প্রশাসনিক পদাধিকারীর পরিচয় বহন করে না; বরং তার নৈতিক চরিত্রের ওপর ন্যায়বিচারের সাফল্য নির্ভরশীল বলে ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।
”পঞ্চতন্ত্র ও হিতোপদেশ গ্রন্থদুটির অবলম্বনেই বিচারব্যবস্থার স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। অন্যান্য আখ্যানগ্রন্থে আলোকপাত করা হয়নি। এছাড়াও, ড. পুরীপ্রিয়া কুণ্ডুর চৌয়সমীক্ষা গ্রন্থটিতে কয়েকটি নির্বাচিত আখ্যানগ্রন্থ যেমন হিতোপদেশ, কথাসরিৎসাগর ও দশকুমারচরিতে চৌর্যাপরাধের দণ্ডব্যবস্থাটি আলোচিত হয়েছে। অন্যান্য অপরাধ তথা প্রাচীন ভারতের বিচারব্যবস্থার সার্বিক স্বরূপটি উল্লিখিত হয়নি। রোহিনী ধর্মপাল মহাশয়ার অপরাধ ও অপরাধীর পুরনোনতুন কাহিনি গ্রন্থটিতে বিচারব্যবস্থা সম্বন্ধিয় আলোচনা থাকলেয়ও সংস্কৃত আখ্যান গ্রন্থগুলিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে, সেখানে প্রাচীন ভারতের অপরাধ, অপরাধী, দণ্ডব্যবস্থা সম্পর্কিত আলোচনা করা হয়নি। ড. দেবদাস মণ্ডল মহাশয় গল্পে গল্পে রাজনীতির হাতেখড়ি গ্রন্থটিতে মোটামুটিভাবে সমগ্র আখ্যানসাহিত্যের ভিত্তিতে প্রাচীনভারতের রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার চালচিত্রটি তুলে ধরেছেন, কিন্তু সমগ্র আখ্যানসাহিত্যে প্রাচীন ভারতের বিচারব্যবস্থার অপরাপর বিষয় সেখানে আলোচিত হয়নি। বর্তমান সন্দর্ভে সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যের অন্তর্গত বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লিখিত আখ্যান-উপাখ্যানগুলি থেকে প্রাচীনভারতের বিচারব্যবস্থার স্বরূপটি যথাসাধ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।…” ২
তবে সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্য কেবল আদর্শ বিচারকের চিত্রই অঙ্কন করেনি; বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা ও বিচারকের দুর্নীতির দিকটিও উন্মোচিত করেছে। বিচারসভায় উপস্থিত সভ্য, গণক, লেখক কিংবা অন্যান্য কর্মচারীর মতো বিচারকরাও লোভ, স্বার্থ, পক্ষপাত বা ক্ষমতার প্রভাবে অন্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। এই বাস্তবতাও বিভিন্ন কাহিনিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে আখ্যানসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার একটি সমালোচনামূলক চিত্রও ফুটে উঠেছে। কোনো বিচারক ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিচালিত হলে প্রকৃত অপরাধী শাস্তি না পেয়ে নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি পেতে পারে। আবার ক্ষমতাবান ব্যক্তি তার সামাজিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব কাহিনি থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন সমাজে বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও তার সাফল্য অনেকাংশে বিচারকের নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে স্মৃতিশাস্ত্রে চতুষ্পাদব্যবহারের যে ধারণা পাওয়া যায়, সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যের বহু কাহিনিতে তার ব্যবহারিক প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। অভিযোগ উত্থাপন, অভিযুক্তের উত্তর, প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে বিচার এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা আখ্যানের বিভিন্ন বিচারপর্বে প্রত্যক্ষ হয়। যদিও আখ্যানকারেরা সর্বত্র স্মৃতিশাস্ত্রের পারিভাষিক কাঠামো অনুসরণ করেননি, তবু কাহিনির ঘটনাপ্রবাহে বিচারপ্রক্রিয়ার এই মৌলিক ধাপগুলি কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে স্মৃতিশাস্ত্র যেখানে বিচারপ্রক্রিয়াকে বিধিবদ্ধ রূপ দিয়েছে, আখ্যানসাহিত্য সেখানে সেই প্রক্রিয়াকে জীবন্ত ঘটনা ও চরিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে।
প্রমাণ বিচারব্যবস্থার আরেকটি অপরিহার্য উপাদান। কোনো অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, কোনো ব্যক্তি অপরাধী না নিরপরাধ, তা নির্ধারণের জন্য প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা প্রাচীন ভারতীয় বিচারচিন্তায় বিশেষভাবে স্বীকৃত। সাক্ষ্য, বস্তুগত প্রমাণ, দলিল, পূর্ববর্তী আচরণ, যুক্তি এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিগত উপাদান আখ্যানের কাহিনিগুলিতে সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য অপরাধীকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করেছে, আবার কোথাও বুদ্ধি ও যুক্তির মাধ্যমে বিচারক বা কোনো প্রাজ্ঞ ব্যক্তি প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করেছেন। ফলে আখ্যানসাহিত্যে প্রমাণের ব্যবহার একদিকে বিচারব্যবস্থার বাস্তব রূপ প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে কাহিনির রহস্য ও নাটকীয়তা নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
শপথের ব্যবহারও সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যে বিচারপ্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। যখন প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব দেখা দিয়েছে অথবা কোনো বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে, তখন ধর্মীয় বিশ্বাস ও দৈবশক্তির প্রতি আস্থাকে সত্যনির্ণয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও ধর্মের নামে শপথ গ্রহণ, কোথাও দেবতা বা পবিত্র বস্তু স্পর্শ করে সত্য উচ্চারণ, আবার কোথাও শপথভঙ্গের সম্ভাব্য দৈবদণ্ডের ভয়কে সত্য উদ্ঘাটনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, প্রাচীন বিচারব্যবস্থা কেবল আইনগত বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না; ধর্ম, নৈতিকতা ও দৈববিশ্বাসও বিচারচেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
অপরাধ ও দণ্ডের চিত্র সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। চুরি, প্রতারণা, মিথ্যা সাক্ষ্য, অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা, ষড়যন্ত্র কিংবা রাজকর্মচারীর দুর্নীতির মতো বিভিন্ন অপরাধের উল্লেখ আখ্যানগুলিতে পাওয়া যায়। অপরাধের সঙ্গে তার পরিণতিও যুক্ত হয়েছে। দণ্ডের উদ্দেশ্য কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়, সামাজিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ অপরাধ প্রতিরোধ করাও। এই দিক থেকে আখ্যানসাহিত্যের দণ্ডচেতনা স্মৃতিশাস্ত্রের দণ্ডনীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে আখ্যানকারেরা দণ্ডকে নিছক কঠোরতার বিষয় হিসেবে দেখাননি; অপরাধের প্রকৃতি, অপরাধীর উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও বিভিন্ন কাহিনিতে প্রকাশিত হয়েছে।
রাজা ও বিচারব্যবস্থার সম্পর্ক সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রাজা ছিলেন প্রজার রক্ষক ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাতা। তাই একজন আদর্শ রাজার অন্যতম প্রধান গুণ ছিল বিচারবুদ্ধি। ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’র বিভিন্ন আখ্যানে বিক্রমাদিত্যের সামনে যে জটিল নৈতিক ও বিচারগত সমস্যা উপস্থিত হয়, তার সমাধানের মধ্য দিয়ে তার বুদ্ধি, যুক্তিবোধ ও ন্যায়বোধের পরীক্ষা করা হয়েছে। ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’তেও বিক্রমাদিত্যের আদর্শকে সামনে রেখে রাজার যোগ্যতা বিচার করা হয়েছে। ফলে এই আখ্যানগুলিতে রাজা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী নন; তিনি ন্যায়, সত্য ও প্রজ্ঞার প্রতীক। একজন আদর্শ রাজা সেই ব্যক্তি, যিনি ব্যক্তিগত আবেগ ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম।
“প্রবৃত্তি ও রিপুর প্রভাব চিরকালই অমোঘ, তার প্রভাব এড়ানো কোনো কালেই সহজ ছিল না। অপরাধ আছে, অপরাধ ছিল, অপরাধ থাকবে।
তাই মানব জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত সাহিত্য কীর্তিগুলিতেও অপরাধ, অপরাধী, অপরাধের নিবৃত্তি, অপরাধের শাস্তি ইত্যাদির প্রতিফলন দেখা যায়- আখ্যান গ্রন্থগুলিও এর ব্যতিক্রম নয়। আখ্যান-উপাখ্যানগুলিতে বিভিন্ন অপরাধের দৃষ্টান্ত যেমন রয়েছে তেমনি তার শাস্তিব্যবস্থা সম্পর্কেও আলোচনা দেখা যায়। সেখানে সমাজের সাধারণ জনবাসীর পাশাপাশি উচ্চস্থানীয় ব্যক্তি, সম্মাননীয় বলে পরিচিত ব্যক্তি, এমনকি বিচারক তথা বিচারকার্যে নিযুক্ত ব্যক্তি, রাজকর্মচারী সকলের অপরাধ প্রবণতার কথাই উল্লিখিত হয়েছে। রাজসভার প্রশাসনিক পদে আসীন ব্যক্তিগণ যেমন বিচারসভায় উপস্থিত সভ্যগণ, গণক, লেখক ও অন্যান্য পদাধিকারী ব্যক্তিগণ তথা স্বয়ং বিচারকের দুর্নীতিপরায়ণতার চিত্রও বিভিন্ন কাহিনিতে প্রস্ফুটিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন কাহিনির মাধ্যমে আখ্যানগুলিতে বিচারসভার গঠন সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। কে বা কারা বিচারকার্যে অধিকারী, কারা সহকারী, তাদের কর্তব্য কী এগুলি কোথাও স্মৃতিতে উল্লিখিত ন্যায়ালয়ের সাথে হুবহু মিলে যায়। আলোচ্য অধ্যায়টিতে বিভিন্ন আখ্যানগ্রন্থগুলিতে বিচারসভার স্বরূপ, পদাধিকারী ব্যক্তিগণের যোগ্যতা-আবশ্যিক গুণাবলী, চতুষ্পাদের দ্বারা ব্যবহার নিষ্পত্তির দৃষ্টান্ত, বিভিন্ন প্রমাণগুলির স্বরূপ বিশ্লেষণ ও উদাহরণ সম্পর্কিত যে তথ্যগুলি পাওয়া যায় তা আলোচিত হয়েছে। ….” ৩
‘কথাসরিৎসাগর’ বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদান অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিশেষ মূল্যবান। এই সুবৃহৎ আখ্যানভাণ্ডারে রাজসভা, বিচারসভা, সভ্য, বিচারক, অপরাধ, প্রমাণ, শপথ ও দণ্ডের বিচিত্র দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন কাহিনিতে দেখা যায়, বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি রয়েছে এবং বিচারসভায় তাদের কার্যকর ভূমিকা রয়েছে। বিশেষত সভ্যদের গুরুত্বের যে চিত্র পাওয়া যায়, তা বিচারব্যবস্থার সমষ্টিগত চরিত্রের পরিচায়ক। বিচার কেবল রাজার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য, প্রমাণ ও যুক্তির সমন্বয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একটি প্রক্রিয়া। আখ্যানের বিভিন্ন পর্বে এই ধারণাই প্রকাশ পেয়েছে।
সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সঙ্গে নৈতিকতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সত্য, প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাস, কর্তব্য, ন্যায় ও অন্যের অধিকার স্বীকার করার মতো নৈতিক মূল্যবোধ বিচারচেতনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ‘পঞ্চতন্ত্র’ ও ‘হিতোপদেশে’ যদিও নীতিশিক্ষা প্রধান উদ্দেশ্য, তবু তাদের কাহিনিতে অন্যায়ের পরিণতি, প্রতারণার শাস্তি ও সত্যের বিজয়ের যে ধারাবাহিকতা দেখা যায়, তা এক ধরনের নৈতিক বিচারবোধের প্রকাশ। আবার ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’ ও ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’য় বিচারবোধ সরাসরি নৈতিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সংস্কৃত কথাসাহিত্যে আইন ও নৈতিকতা পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ন্যায়বিচারের ধারণা বৃহত্তর ধর্ম ও নীতিচেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই প্রসঙ্গে স্মৃতিশাস্ত্র ও সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যের তুলনামূলক পাঠ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। স্মৃতিশাস্ত্র মূলত বিচারব্যবস্থার বিধিবদ্ধ ও তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণ করেছে। সেখানে বিচারকের যোগ্যতা, বিচারসভার গঠন, বিবাদপদ, প্রমাণ, সাক্ষ্য, শপথ, সিদ্ধান্ত ও দণ্ড সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। অন্যদিকে আখ্যানসাহিত্য সেই তত্ত্বকে কাহিনির বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে দেখিয়েছে। স্মৃতিতে বিচারকের যে গুণ থাকা উচিত বলে নির্ধারিত হয়েছে, আখ্যানে সেই গুণসম্পন্ন বা গুণহীন বিচারকের কার্যকলাপের ফলাফল দেখানো হয়েছে। স্মৃতিতে প্রমাণের গুরুত্ব বিধিবদ্ধ হয়েছে, আখ্যানে প্রমাণের সাহায্যে সত্য উদ্ঘাটনের বাস্তব দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে। স্মৃতিতে দণ্ডের নীতি নির্ধারিত হয়েছে, আখ্যানে অপরাধ ও দণ্ডের সামাজিক ও নৈতিক পরিণতি প্রতিফলিত হয়েছে। এই কারণে স্মৃতিশাস্ত্র ও আখ্যানসাহিত্য পরস্পরের পরিপূরক। একটিতে বিচারব্যবস্থার তত্ত্ব, অন্যটিতে তার সাহিত্যিক ও সামাজিক বাস্তবায়ন।
সুতরাং সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার উপাদান অনুসন্ধান করলে প্রাচীন ভারতীয় সমাজের ন্যায়চেতনার একটি সুস্পষ্ট ও বহুমাত্রিক পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে বিচার কেবল অপরাধীর শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়া নয়; বরং সামাজিক ভারসাম্য, নৈতিকতা, রাজধর্ম ও প্রজাহিতের সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান। বিচারক, সভ্য, প্রমাণ, সাক্ষ্য, শপথ, অপরাধ ও দণ্ড প্রতিটি উপাদানই সেই বৃহত্তর ন্যায়চেতনার অংশ। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার দুর্নীতি, পক্ষপাত, বিচারকের অযোগ্যতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যে চিত্র আখ্যানগুলিতে পাওয়া যায়, তা প্রমাণ করে যে সংস্কৃত কথাসাহিত্য শুধু আদর্শ বিচারব্যবস্থার প্রশস্তি করেনি; তার অন্তর্নিহিত সংকট ও সীমাবদ্ধতাকেও সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছে।
অতএব, সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার উপাদানগুলি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি কাহিনিগত ঘটনা নয়; এগুলি প্রাচীন ভারতীয় সমাজের আইনচেতনা, নৈতিক মূল্যবোধ, রাষ্ট্রভাবনা ও মানবসম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান ও আখ্যানসাহিত্যের ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে পাঠ করলে বোঝা যায়, প্রাচীন ভারতীয় বিচারচিন্তা একদিকে যেমন সুসংবদ্ধ শাস্ত্রীয় তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, অন্যদিকে তার বাস্তব প্রয়োগ মানবিক দুর্বলতা, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক পরিস্থিতির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হতো। এই কারণেই ‘পঞ্চতন্ত্র’ থেকে ‘কথাসরিৎসাগর’, ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’ থেকে ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’, সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচার-সম্পর্কিত আখ্যানগুলি কেবল সাহিত্যিক রসের উপাদান নয়; প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ও বিচারচেতনার ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও এগুলির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
সংস্কৃত কথাসাহিত্য প্রাচীন ভারতীয় সমাজজীবনের বহুমাত্রিক প্রতিফলন বহন করে। মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক, নৈতিকতা, অর্থনৈতিক লেনদেন, অপরাধ, শাস্তি, রাজশক্তি ও বিচারব্যবস্থার নানা দিক বিভিন্ন আখ্যানের ঘটনাপ্রবাহে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষত ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘হিতোপদেশ’, ‘পুরুষপরীক্ষা’, ‘শুকসপ্ততিকথা’, ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’, ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’, ‘কথাসরিৎসাগর’ ও ‘দশকুমারচরিত’-এর মতো আখ্যানগ্রন্থগুলির বিচারসংক্রান্ত ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিচারব্যবস্থা সেখানে নিছক অপরাধীকে দণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়; বরং সত্যনির্ণয়, অধিকার প্রতিষ্ঠা, সম্পত্তি সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এসব আখ্যানে বিধিবদ্ধ আইনশাস্ত্রের প্রত্যক্ষ পুনরাবৃত্তির পরিবর্তে বিচারব্যবস্থার ব্যবহারিক রূপ কাহিনির সংঘাত ও তার নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সংস্কৃত কথাসাহিত্য বিচারব্যবস্থার ইতিহাস অনুধাবনের পাশাপাশি প্রাচীন সমাজের আইনচেতনা ও ন্যায়বোধ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিচারপ্রক্রিয়ায় সত্যনির্ণয়ের একটি বিশেষ পদ্ধতি হিসেবে শপথের ব্যবহার বিভিন্ন আখ্যানে লক্ষ করা যায়। প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বা অন্যান্য প্রমাণের অভাব দেখা দিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে শপথ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; আবার কোথাও অভিযুক্ত নিজেই শপথ করে নিজের নিরপরাধিতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। ‘হিতোপদেশ’-এর ‘সুহৃদ্ভেদ’-এর পঞ্চম কথায় নাপিতের স্ত্রী নিজের সতীত্বের প্রমাণ দিতে দেবতার নামে শপথ গ্রহণ করে। এই ঘটনাকে কেবল কাহিনির নাটকীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করলে এর বিচারিক তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এখানে শপথ ব্যক্তির বক্তব্যকে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। দেবতার নামে শপথ গ্রহণের অর্থ ছিল নিজের বক্তব্যের সত্যতার জন্য এক পবিত্র শক্তিকে সাক্ষী করা; ফলে শপথের মাধ্যমে ব্যক্তির ওপর এক ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতাও আরোপিত হতো।
‘দশকুমারচরিত’-এর ‘উপহারবর্মাচরিত’-এও শপথের বিচারিক প্রয়োগের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। উপহারবর্মা বিকটবর্মাকে অগ্নিকে সাক্ষী করে শপথ করতে আদেশ করেন। এখানে অগ্নি নিছক ধর্মীয় প্রতীক নয়; সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক পবিত্র সাক্ষীর মর্যাদা লাভ করেছে। এই দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, প্রাচীন বিচারচেতনার পরিসরে ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিচারিক সত্যনির্ণয় পরস্পর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল না। আধুনিক অর্থে শপথকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলা যায় না; কিন্তু তৎকালীন সমাজে এর কার্যকারিতা নিহিত ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং মিথ্যা শপথের সম্ভাব্য নৈতিক বা দৈব পরিণতির ধারণার মধ্যে। তাই শপথ বিচারিক প্রমাণের পাশাপাশি সত্য বলার জন্য একটি নৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবেও কার্যকর ছিল।
সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল ধনসম্পত্তি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিবাদ। স্মৃতিশাস্ত্রকারেরা বিবাদপদকে মূলত ধনমূলক ও হিংসামূলক, এই দুই বৃহৎ শ্রেণিতে বিবেচনা করেছেন। ধনমূলক বিবাদের মধ্যে ঋণ, ক্রয়-বিক্রয়, বিক্রিত দ্রব্যের যথাযথ হস্তান্তর, ক্রয়কৃত দ্রব্য প্রত্যর্পণ, হারানো দ্রব্যের স্বত্ব, পশুর মালিক ও পালকের সম্পর্ক এবং দানসংক্রান্ত বিরোধের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যে পাওয়া যায়। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, প্রাচীন বিচারব্যবস্থা শুধু গুরুতর অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেই কার্যকর ছিল না; মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবন ও সম্পত্তিগত অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
ঋণাদান বিবাদপদ এই অর্থনৈতিক বিচারচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ঋণ প্রদান ও গ্রহণের সম্পর্কে একদিকে যেমন ঋণদাতার অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকার রয়েছে, অন্যদিকে ঋণগ্রহীতার ওপর রয়েছে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব। স্মৃতিশাস্ত্রে ঋণ আদায়ের পদ্ধতি এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে দণ্ডের বিধান নির্ধারিত হয়েছে। সংস্কৃত আখ্যানগুলিতেও ঋণকে কেন্দ্র করে বিরোধের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ‘শুকসপ্ততিকথা’-র পঞ্চপঞ্চাশত্তম কথায় ঋণসংক্রান্ত পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, ঋণ নিছক ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেন ছিল না; এর সঙ্গে সামাজিক বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির প্রশ্নও যুক্ত ছিল। ঋণ গ্রহণের অর্থ ছিল একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বিচারযোগ্য বিরোধে পরিণত হতে পারত।
ঋণসংক্রান্ত এই আখ্যানগুলির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হল, প্রাচীন অর্থনৈতিক জীবনে পারস্পরিক আস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ঋণদাতা ভবিষ্যতে ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশায় তার সম্পদ অন্যের হাতে অর্পণ করতেন। ফলে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ ছিল না, পারস্পরিক বিশ্বাসেরও বিচ্যুতি ঘটাত। বিচারব্যবস্থা এই বিচ্যুতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনৈতিক সম্পর্কের স্থিতি বজায় রাখত। এই কারণে ঋণাদান বিবাদপদকে শুধু অর্থ ফেরতের বিধান হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক জীবনে বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতা রক্ষার একটি বিচারিক কাঠামো হিসেবেও দেখা যায়।
ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত বিবাদ সংস্কৃত কথাসাহিত্যে অর্থনৈতিক ন্যায়বোধের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত করে। বিক্রীয়াসম্প্রদান বলতে বিক্রিত দ্রব্য যথাযথভাবে ক্রেতার কাছে প্রদান না করাকে বোঝায়। ‘কথাসরিৎসাগর’-এর ‘রত্নপ্রভা লম্বক’-এর তৃতীয় তরঙ্গের ‘ভবশর্মার কাহিনি’-তে ক্রেতাকে প্রতারণা করে অভীষ্ট দ্রব্যের পরিবর্তে অন্য দ্রব্য বিক্রয়ের ঘটনা রয়েছে। ‘শুকসপ্ততিকথা’-র বত্রিশতম আখ্যানেও বিক্রেতার প্রতারণামূলক আচরণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এই ঘটনাগুলির তাৎপর্য শুধু প্রতারণার উদাহরণে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলি দেখায় যে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুতি ও ন্যায্যতার একটি নির্দিষ্ট সামাজিক মানদণ্ড ছিল।
বিক্রয়সংক্রান্ত এই ঘটনাগুলির মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়। লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা অপরিহার্য। ক্রেতা নির্দিষ্ট দ্রব্যের জন্য মূল্য প্রদান করলে বিক্রেতার ওপর সেই দ্রব্য যথাযথভাবে প্রদান করার দায়িত্ব বর্তায়। প্রতিশ্রুত দ্রব্যের পরিবর্তে অন্য দ্রব্য প্রদান তাই ব্যক্তিগত প্রতারণার পাশাপাশি সামাজিক আস্থারও লঙ্ঘন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃত আখ্যানগুলি প্রাচীন সমাজের বাণিজ্যিক নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক দলিল হয়ে ওঠে।
ক্রীতানুশয় বিবাদপদ ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্ককে আরও সূক্ষ্ম করে তোলে। কোনো দ্রব্য ক্রয়ের পর ক্রেতার মনে অনুশোচনা জন্মালে সেই দ্রব্য বিক্রেতাকে প্রত্যর্পণ করা যাবে কি না, এই প্রশ্নের সঙ্গে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের অধিকার যুক্ত। ‘কথাসরিৎসাগর’-এর ‘লাবাণক লম্বক’-এর ‘দেবদাসবৃত্তান্ত’-এ ক্রয়কৃত দ্রব্য প্রত্যর্পণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ ন্যায়ালয়ের শরণাপন্ন হয়। সেখানে বিচারকের সিদ্ধান্তে ক্রয়ের পূর্বে দ্রব্য পর্যবেক্ষণ, নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়া এবং প্রত্যর্পণের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, বিচারক কোনো পক্ষের বক্তব্যকে বিচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ না করে লেনদেনের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতেন।
এই আখ্যানটির বিশেষ তাৎপর্য হল, এখানে অধিকারকে একতরফাভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ক্রেতার অনুশোচনা থাকলেই তার দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়; আবার বিক্রেতার প্রত্যর্পণে অস্বীকৃতিও চূড়ান্ত নয়। দ্রব্যের প্রকৃতি, ক্রয়ের সময় তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ এবং প্রত্যর্পণের সময়সীমা, এসব বাস্তব পরিস্থিতি বিচারিক সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে সংস্কৃত কথাসাহিত্যে অর্থনৈতিক বিবাদ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে পরিস্থিতিনির্ভর বিচারবোধের একটি পরিণত রূপ লক্ষ করা যায়।
অন্যের হারানো দ্রব্যের ক্ষেত্রে প্রণষ্টস্বামিক বিবাদপদ সম্পত্তির স্বত্বধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কোনো ব্যক্তি অন্যের হারানো দ্রব্য লাভ করলেই তার ওপর নিজের স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না; প্রকৃত মালিকের সন্ধান করা অথবা রাজাকে বিষয়টি জানানো তার কর্তব্য। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘কাকোলূকীয়ম’-এর চতুর্দশ আখ্যানে এই ধরনের পরিস্থিতির উল্লেখ রয়েছে এবং অন্যের হারানো দ্রব্য আত্মসাৎ করার ক্ষেত্রে কঠোর দণ্ডের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। ‘দশকুমারচরিত’-এর ‘অপহারবর্মাচরিত’-এও সম্পত্তির প্রকৃত স্বত্ব সম্পর্কে অনুরূপ ধারণার পরিচয় পাওয়া যায়।
এই বিবাদপদের অন্তর্নিহিত বিচারনীতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দখল এবং স্বত্ব এক নয়। কোনো দ্রব্য সাময়িকভাবে কারও হাতে এসেছে বলেই তার ওপর সেই ব্যক্তির বৈধ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রকৃত মালিকের স্বত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। ‘মনুসংহিতা’-য় অন্যের হারানো দ্রব্য নিজের বলে মিথ্যা দাবি করার ক্ষেত্রে অর্থদণ্ডের বিধানও এই সম্পত্তিচেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে সংস্কৃত কথাসাহিত্যের এসব আখ্যান ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার এবং তার বিচারিক সুরক্ষার ধারণাকে স্পষ্ট করে।
স্বামিপালবিবাদপদে সম্পত্তির সঙ্গে শ্রম ও দায়িত্বের সম্পর্কটি প্রকাশিত হয়েছে। স্বামী পশুর মালিক এবং পাল সেই পশুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিযুক্ত ব্যক্তি।
“‘পঞ্চতন্ত্র’ মূল গ্রন্থটি পাঁচটি তন্ত্রে বিভক্ত-মিত্রভেদ, মিত্রপ্রাপ্তি, কাকোলুকীয়, লব্ধপ্রণাশ, এবং অপরীক্ষিতকারক। গ্রন্থারম্ভে লেখক নিজেই বলেছেন-
‘সকলার্থশাস্ত্রসারং জগতি সমালোক্য বিষ্ণুশর্মেদম্। তন্ত্রৈঃ পঞ্চভিরেতচ্চকার সুমনোহরং শাস্ত্রম্।।’
মিত্রলাভ নামক প্রথম তন্ত্রে আছে বাইশটি মনোজ্ঞ গল্প। দমনক ও করটক নামক দুই শৃগাল, পিঙ্গলক নামক সিংহ এবং সঞ্জীবক নামক বৃষভ এই তন্ত্রটির প্রধান চরিত্র। গল্পের ছলে এখানে পরিবেশিত হয়েছে সাম, ভেদ প্রভৃতি রাজনৈতিক তত্ত্ব। এখানে সন্নিবিষ্ট কিল উৎপাটনকারী বানরের দুর্দশা, কাকের বুদ্ধিতে কেউটের প্রাণনাশ, শশকের বৃদ্ধিতে সিংহের বিনাশ, জীর্ণধন বণিকের কথা প্রভৃতি গল্প সত্যই হৃদয়গ্রাহী। …” ৪
‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘লব্ধপ্রণাশতন্ত্র’-এর ‘ঘণ্ট্রোষ্ট্রকথা’-য় পালকের পারিশ্রমিক ও দায়িত্ব সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা থেকে বোঝা যায় যে পশুপালনের মতো অর্থনৈতিক কার্যকলাপও নির্দিষ্ট পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতো। পালক পারিশ্রমিক গ্রহণ করলে পশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যথাসময়ে পশুকে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া তার কর্তব্য। কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা তাকে বিচারিক জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারত। এই সম্পর্কের মধ্যে শ্রমের মূল্য ও দায়িত্ব, দুইয়েরই স্বীকৃতি রয়েছে। পালকের পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার যেমন স্বীকৃত, তেমনই মালিকের সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্বও তার ওপর বর্তেছে। ফলে স্বামিপালবিবাদকে শুধু পশুপালনসংক্রান্ত একটি বিবাদ হিসেবে দেখলে এর সামাজিক তাৎপর্য সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে শ্রম, পারিশ্রমিক ও দায়বদ্ধতার পারস্পরিক সম্পর্কের একটি সুস্পষ্ট সামাজিক কাঠামো প্রতিফলিত হয়েছে।
দত্তাপ্রদানিক বিবাদপদ দান ও সম্পত্তির স্বত্বের সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে। দানের মাধ্যমে দাতার স্বত্বের অবসান এবং গ্রহীতার স্বত্বের উৎপত্তি ঘটে। তাই কোনো দ্রব্য দান করার আগে সেই দ্রব্যের ওপর দাতার বৈধ মালিকানা থাকা আবশ্যক। নিজের নয় এমন দ্রব্য অন্যকে দান করা বৈধতার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। ‘দশকুমারচরিত’-এর ‘অপহারবর্মাচরিত’ থেকে এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। স্মৃতিশাস্ত্রে দেয় ও অদেয় দ্রব্যের যে বিধান রয়েছে, তার অন্তর্নিহিত যুক্তিও দাতার বৈধ স্বত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
দানসংক্রান্ত এই বিচারনীতি থেকে বোঝা যায়, ‘দান করার অধিকার’ নিজেই একটি সম্পত্তিগত অধিকার। কোনো দ্রব্য অন্যের হাতে হস্তান্তর করার আগে তার ওপর বৈধ স্বত্ব থাকা আবশ্যক। ফলে দত্তাপ্রদানিক বিবাদ কেবল দানের নৈতিকতা নয়; বরং সম্পত্তির বৈধ মালিকানা ও তার হস্তান্তরের অধিকারের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যের দানসংক্রান্ত ঘটনাগুলি প্রাচীন ভারতীয় সম্পত্তিচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে।
ঋণ, ক্রয়-বিক্রয়, ক্রীতানুশয়, হারানো দ্রব্য, স্বামিপাল সম্পর্ক এবং দান, এই সমস্ত বিবাদকে পাশাপাশি রাখলে একটি অভিন্ন বিচারনীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্ন হলো, কার বৈধ অধিকার কোথায় এবং সেই অধিকারের সঙ্গে কী দায়িত্ব যুক্ত। ঋণদাতার অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকার রয়েছে, কিন্তু ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের দায়িত্বও রয়েছে। বিক্রেতার দ্রব্য বিক্রয়ের অধিকার আছে, কিন্তু প্রতারণার অধিকার নেই। ক্রেতার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দ্রব্য প্রত্যর্পণের সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগও বিধিনির্ভর। হারানো দ্রব্যের দখল যার কাছে এসেছে, স্বত্ব তার নয়; স্বত্ব প্রকৃত মালিকের। পালক পারিশ্রমিকের অধিকারী হলেও পশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব তার। আবার দাতা কোনো দ্রব্য দান করতে পারেন, কিন্তু তার আগে সেই দ্রব্যের বৈধ মালিক হওয়া আবশ্যক। সমগ্র বিচারচিত্রের কেন্দ্রে তাই ‘স্বত্ব’ ও ‘দায়িত্ব’ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
সংস্কৃত কথাসাহিত্যের ধনমূলক বিবাদগুলির তাৎপর্য কেবল এই নয় যে সেখানে প্রাচীন বিধিবিধানের কিছু দৃষ্টান্ত সংরক্ষিত হয়েছে; বরং এগুলির মাধ্যমে দেখা যায়, কীভাবে আইননৈতিক ধারণাগুলি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে কার্যকর হয়ে উঠেছিল। স্মৃতিশাস্ত্র যেখানে বিধান নির্ধারণ করেছে, আখ্যানসাহিত্য সেখানে সেই বিধানের সামাজিক পরিস্থিতিকে কাহিনির মাধ্যমে দৃশ্যমান করেছে। এই কারণে আখ্যানগুলি প্রাচীন বিচারব্যবস্থার কেবল প্রতিফলন নয়, তার সামাজিক কার্যকারিতা অনুধাবনেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই প্রসঙ্গে সংস্কৃত কথাসাহিত্যকে কেবল আইনবিধির পরোক্ষ উৎস হিসেবে দেখাও যথেষ্ট নয়। আখ্যানের বিশেষ শক্তি হল, এটি বিধিকে মানুষের আচরণ ও সংঘাতের মধ্যে স্থাপন করে। ফলে একটি বিধান বাস্তবে কীভাবে ব্যক্তির অধিকার, স্বার্থ, প্রতারণা, দায়িত্ব এবং সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তা কাহিনির মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়। স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান যেখানে তুলনামূলকভাবে নীতিনির্ভর ও বিধিবদ্ধ, সেখানে আখ্যানসাহিত্য সেই নীতির মানবিক পরিণতি তুলে ধরে। এই দুইয়ের তুলনামূলক পাঠে প্রাচীন বিচারব্যবস্থার তাত্ত্বিক কাঠামো এবং তার সামাজিক প্রয়োগের মধ্যকার সম্পর্ক আরও স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা সম্ভব। অতএব, সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার উপস্থিতিকে কেবল অপরাধ ও শাস্তির আলোচনায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। এর বিস্তার মানুষের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, সম্পত্তির অধিকার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পারস্পরিক আস্থার ক্ষেত্র পর্যন্ত প্রসারিত। শপথের মাধ্যমে সত্যনির্ণয় থেকে শুরু করে ঋণ, ক্রয়-বিক্রয়, হারানো সম্পদ, পশুপালন ও দানের মতো দৈনন্দিন বিষয় পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার কার্যকর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সংস্কৃত আখ্যানগুলি এই বিচারচেতনাকে শাস্ত্রীয় বিধানের মতো বিমূর্তভাবে নয়, মানুষের সংঘাত, সংকট ও তার সমাধানের মধ্য দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছে। ফলে সংস্কৃত কথাসাহিত্য প্রাচীন ভারতীয় বিচারবোধ, সম্পত্তিচেতনা, অর্থনৈতিক নৈতিকতা এবং সামাজিক ন্যায়ধারণা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার উপাদান অনুসন্ধান করতে গেলে ধনমূলক বিবাদের পাশাপাশি হিংসামূলক অপরাধ ও তার দণ্ডবিধির দিকটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সংঘাত, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, সম্পত্তি হরণ, প্রাণী ও মানুষের প্রতি হিংসা, হত্যা, পরস্ত্রীসংগ্রহণ এবং চৌর্য, এই সমস্ত অপরাধের প্রতিফলন বিভিন্ন আখ্যানের ঘটনাপ্রবাহে লক্ষ করা যায়। স্মৃতিশাস্ত্রে যে অপরাধগুলিকে সামাজিক শৃঙ্খলা ও ন্যায়ব্যবস্থার পরিপন্থী বলে চিহ্নিত করে তাদের জন্য নির্দিষ্ট দণ্ডবিধান করা হয়েছে, সংস্কৃত কথাসাহিত্যেও সেই অপরাধগুলির নৈতিক নিন্দা, সামাজিক প্রতিক্রিয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাস্তির প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তবে আখ্যানের বৈশিষ্ট্য হল, বিধানকে কেবল তাত্ত্বিকভাবে উপস্থাপন না করে অপরাধ ও তার পরিণতিকে চরিত্র ও ঘটনার মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান করা। দণ্ডপারুষ্য এই হিংসামূলক অপরাধগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ। অন্যের প্রতি শারীরিক আঘাত বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে যে অপরাধ সংঘটিত হয়, তার দৃষ্টান্ত বিভিন্ন আখ্যানে পাওয়া যায়। স্মৃতিশাস্ত্রে দণ্ডপারুষ্যকে একটি দণ্ডনীয় বিবাদপদ হিসেবে চিহ্নিত করে সমাজকে হিংসাত্মক আচরণ থেকে রক্ষা করার যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, সংস্কৃত কথাসাহিত্যেও তার নৈতিক প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। ‘দশকুমারচরিত’-এর ‘বিশ্রুতচরিত’-এ দণ্ডপারুষ্যকে অন্যতম দোষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর তাৎপর্য হলো, শারীরিক শক্তির যথেচ্ছ প্রয়োগকে কেবল ব্যক্তিগত আচরণের ত্রুটি হিসেবে দেখা হয়নি; তা সামাজিকভাবে নিন্দনীয় ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য আচরণ হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।
এই হিংসার পরিসর কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মনুষ্যেতর প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকেও আখ্যানে নিন্দনীয় আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘কাকোলূকীয়ম্’-এর ‘কপোতলুব্ধককথা’-য় প্রাণীহিংসাকারী ব্যক্তিকে দুরাচারী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং তার নিষ্ঠুর আচরণের কারণে সমাজের অন্যদের দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এখানে শাস্তি কেবল রাষ্ট্রীয় দণ্ডের আকারে উপস্থিত নয়; সামাজিক বর্জনও অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ কথাসাহিত্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের নৈতিক প্রতিক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিয়েছে। অন্য একটি আখ্যানে মনুষ্যেতর প্রাণীকে ইষ্টক বা পাষাণ দ্বারা আঘাত করাও দণ্ডনীয় বলে বিবেচিত হয়েছে। স্মৃতিশাস্ত্রের ‘বিষ্ণুধর্মসূত্র’-এও পাষাণ দ্বারা প্রাণীকে আঘাতের জন্য মধ্যমসাহস দণ্ডের বিধান রয়েছে। ফলে আখ্যান ও স্মৃতির তুলনামূলক পাঠে বোঝা যায়, জীবহিংসা নিয়ন্ত্রণের একটি সুস্পষ্ট নৈতিক ও বিচারিক বোধ তৎকালীন সমাজে সক্রিয় ছিল।
বলাবাহুল্য, ‘সাহস’ শব্দটি এই প্রসঙ্গে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্কৃত অভিধানগত অর্থে সাহসের সঙ্গে হঠকারিতা, অবিবেচনা, দুঃসাহসিকতা প্রভৃতি অর্থ যুক্ত হলেও স্মৃতিশাস্ত্রের ব্যবহারিক পরিসরে এর অর্থ আরও নির্দিষ্ট। বলপূর্বক অপরের দ্রব্য হরণ, অত্যাচার, হিংসা বা আকস্মিক দুঃসাহসিক কর্মের সঙ্গে সাহসের ধারণা যুক্ত হয়েছে। যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতায় বলপূর্বক অপরের দ্রব্য হরণকে সাহস বলা হয়েছে। ফলে ‘সাহস’কে কেবল ব্যক্তিগত দুঃসাহস হিসেবে না দেখে সামাজিক অধিকারে বলপ্রয়োগমূলক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত। সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিভিন্ন কাহিনিতে এই অপরাধের যে বহুমাত্রিক প্রকাশ দেখা যায়, তাতে হত্যা, দস্যুবৃত্তি, পরস্ত্রীহরণ, অপরের দ্রব্য অপহরণ, জীবহিংসা এবং শিশুহত্যার মতো গুরুতর অপরাধও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সাহস অপরাধের ক্ষেত্রে আখ্যানগুলিতে অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী সামাজিক নিন্দা ও কঠোর দণ্ড, উভয় প্রবণতাই লক্ষ করা যায়। বিশেষত শিশুহত্যাকে অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। শিশুর প্রতি হিংসা এখানে শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; তা সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত। ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’-র তৃতীয় উপাখ্যানে স্ত্রীহত্যার ঘটনাকে তীব্রভাবে নিন্দা করা হয়েছে এবং তাকে অধর্মের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ‘মনুসংহিতা’-তেও শিশুহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের জন্য প্রাণদণ্ডের বিধান রয়েছে। এই দুই ধরনের সূত্র পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, আখ্যানসাহিত্য শাস্ত্রবিধিকে সরাসরি পুনরুক্ত না করেও অপরাধের নৈতিক গুরুত্বকে কাহিনির পরিণতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছে।
সাহস অপরাধের সঙ্গে নারীচরিত্রের সম্পর্কও সংস্কৃত কথাসাহিত্যে একমাত্রিক নয়। নারীকে কেবল অপরাধের শিকার হিসেবে দেখানো হয়নি; কোনো কোনো আখ্যানে নারী নিজেই হত্যার পরিকল্পনাকারী বা অপরাধের সহযোগী হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী-পঙ্গুকথা’ এবং ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’-র প্রথম উপাখ্যানে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’-র প্রথম উপাখ্যানে রাজকন্যা পদ্মাবতী দাসীর সহায়তায় মন্ত্রীপুত্রকে হত্যার পরিকল্পনা করে এবং বিষমিশ্রিত আহার প্রেরণ করে। এই অপরাধের পরিণতিতে তার দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়া লক্ষ করা যায়। এখানে লক্ষণীয় যে, আখ্যানের শাস্তি সর্বক্ষেত্রে প্রাণদণ্ডে পর্যবসিত হয়নি; সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো, অপরাধের পরিস্থিতি এবং কাহিনির নৈতিক বিন্যাসের সঙ্গে শাস্তির প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়েছে। এই দৃষ্টান্তটি স্মৃতিশাস্ত্রের কঠোর দণ্ডবিধির সঙ্গে তুলনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ধরা পড়ে। প্রাণহানিকর গুরুতর সাহসকে স্মৃতিশাস্ত্রে উত্তম সাহস হিসেবে বিবেচনা করে প্রাণদণ্ডের বিধান করা হয়েছে; বৃহস্পতিস্মৃতিতেও গুরুতর সাহসকারীর বধদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আখ্যানের ক্ষেত্রে একই অপরাধের পরিণতি কখনও মৃত্যুদণ্ড, কখনও নির্বাসন, কখনও সামাজিক নিন্দা বা অন্য কোনো শাস্তিতে পর্যবসিত হয়েছে। এর ফলে বোঝা যায়, কথাসাহিত্য শাস্তিবিধির যান্ত্রিক প্রয়োগ দেখায় না; বরং অপরাধ, অপরাধী, পরিস্থিতি এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। এই বৈচিত্র্যই আখ্যানকে নিছক আইনবিধির পুনরাবৃত্তি থেকে পৃথক করে।
অন্যদিকে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও সামাজিক মর্যাদা ও বর্ণগত অবস্থানের প্রভাব যে বিচারচর্চায় কার্যকর ছিল, তার দৃষ্টান্ত সংস্কৃত কথাসাহিত্যে পাওয়া যায়। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘মিত্রলাভ’-এর চতুর্থ আখ্যানে গুরুতর অপরাধ করলেও ব্রাহ্মণকে প্রাণদণ্ড না দেওয়ার ধারণা প্রকাশিত হয়েছে। ‘হত্যা করলেও ব্রাহ্মণ অবধ্য’ এই ধারণা বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্যমূলক দিকের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ অপরাধের গুরুত্বই সবসময় শাস্তির একমাত্র নির্ধারক ছিল না; অপরাধীর সামাজিক পরিচয়ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারিক ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারত। এই দৃষ্টান্তটি সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচারচিত্রকে আরও বাস্তব ও জটিল করে তোলে, কারণ এখানে ন্যায়ের আদর্শের পাশাপাশি তৎকালীন সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রভাবও প্রতিফলিত হয়েছে।
পরস্ত্রীসংগ্রহণ সংস্কৃত কথাসাহিত্যে হিংসামূলক ও নৈতিক অপরাধের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রাচীন সমাজব্যবস্থায় বিবাহিত নারীর প্রতি অনধিকার যৌন আকর্ষণ বা সংস্পর্শকে শুধু ব্যক্তিগত অনৈতিকতা হিসেবে দেখা হয়নি; তা সামাজিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খলারও লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ‘মনুসংহিতা’-য় নিঃসম্পর্কিত স্ত্রীলোকের সঙ্গে ক্রীড়া, তার বস্ত্র ও অলংকার স্পর্শ, অঙ্গস্পর্শ, একই আসনে বসা কিংবা একই শয্যায় অবস্থানের মতো আচরণকে স্ত্রীসংগ্রহণের পরিসরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বোঝা যায়, অপরাধের সংজ্ঞা শুধু শারীরিক যৌনসম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; অনধিকার ঘনিষ্ঠতার বিভিন্ন স্তরও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় ছিল।
সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিভিন্ন আখ্যানে পরস্ত্রীস্পর্শ, পরস্ত্রীকাতরতা এবং পরস্ত্রীসংসর্গের তীব্র নিন্দা পাওয়া যায়। ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’-র দশম উপাখ্যানে পরস্ত্রীস্পর্শকে শাস্ত্রসম্মতভাবে বিশেষ দোষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই গ্রন্থের সপ্তদশ উপাখ্যানে পরস্ত্রীস্পর্শ বা গ্রহণকে অধর্ম বলা হয়েছে। এখানে বিচারিক দণ্ডের চেয়ে নৈতিক ও ধর্মীয় নিন্দার মাত্রা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ কথাসাহিত্যে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল ‘অধর্ম’ ধারণা। কোনো আচরণকে অধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা মানে শুধু ব্যক্তিগত নৈতিক বিচ্যুতি ঘোষণা করা নয়; সামাজিক মূল্যবোধের বিচারে সেই আচরণকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলা। চৌর্য বা স্তেয় অপরাধ সংস্কৃত কথাসাহিত্যে সর্বাধিক বিস্তৃতভাবে প্রতিফলিত অপরাধগুলির একটি।
অন্যের সম্পত্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হরণ করাকে চৌর্য বলা হয় এবং স্মৃতিশাস্ত্রে চৌর্যের বিভিন্ন রূপ অনুযায়ী পৃথক দণ্ডবিধান নির্দিষ্ট হয়েছে। যাজ্ঞবল্ক্য দ্রব্যের মূল্য, অপরাধীর বয়স ও শক্তি এবং দেশ-কাল বিবেচনা করে চৌর্যের দণ্ড নির্ধারণের কথা বলেছেন। এই বিধানের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হল, একই অপরাধের ক্ষেত্রেও শাস্তি নির্ধারণে পরিস্থিতি ও অপরাধের মাত্রাকে বিবেচনা করা উচিত। সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিভিন্ন আখ্যানে চৌর্যের বিপুল দৃষ্টান্ত এই বিচারচেতনার সামাজিক পটভূমি অনুধাবনে বিশেষ সহায়ক।
“পৈশাচী ভাষায় রচিত বৃহৎকথার সংস্কৃত সারসংক্ষেপ হল ‘কথাসরিৎসাগর’। এর রচয়িতা সোমদের কাশ্মীরীয় ব্রাহ্মণ বামনভট্টের পুত্র। সোমদেবও ছিলেন কাশ্মীরবাজ ভানজের সভাকবি। অনন্তের রাজত্বকালের শেষদিকে রাজমহিষী সূর্যমতীর চিত্তবিনোদনের জন্য রামায়ণের মত বিপুলকায় এই গল্পগ্রন্থ রচিত হয়। আঠারো লম্বকে এবং ১২৪টি তরঙ্গে বিভক্ত এই গ্রন্থে প্রায় ২৪০০০ শ্লোক আছে। বিভিন্ন গল্পের স্রোতোধারা এসে এই গ্রন্থে যেন সমুদ্রের আকার ধারণ করেছে। সোমদেব নিজেই স্বীকার করেছেন যে, পাণ্ডিত্যের খ্যাতি লাভের জন্য নয়, বৃহৎকথার সংক্ষিপ্ত রূপকে সহজবোধ্য করার জনাই তাঁর এই প্রয়াস-
‘বৈদগ্ধ্যখ্যাতিলোভায় মম নৈবায়মুদ্যমঃ। কিন্তু নানাকথাজালস্মৃতিসৌকর্যসিদ্ধয়ে।।’
উদয়ন-বাসবদত্তা, নরবাহনদত্ত-মদনকঞ্চুকার কাহিনী এই গ্রন্থের প্রধান বর্ণনীয় বিষয়। বেতালপঞ্চবিংশতি, পঞ্চতন্ত্র এবং বৌদ্ধজাতকের অনেক কাহিনীও কথাসরিৎসাগরে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। গ্রন্থটিতে ৯০০ কাহিনীর সমাবেশ পরিলক্ষিত হয়। গ্রন্থটি থেকে খ্রীষ্টীয় একাদশ শতকের নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক তথ্য জানা যায়। এন. এম. পেঞ্জার কথাসরিৎসাগরের রচয়িতাকে কল্পকথার জনক এবং তাঁর রচনাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকৃতির অন্যতম বলে অভিহিত করেছেন।২ গ্রন্থটিতে শৈব ও বৌদ্ধধর্মের প্রভাবও লক্ষণীয়।…” ৫
‘কথাসরিৎসাগর’-এর ‘অলংকারবতী লম্বক’-এর পঞ্চম তরঙ্গে শিশুচুরির ঘটনা এবং ‘শক্তিযশ লম্বক’-এ গৃহপালিত পশু, বিশেষত গাভীচুরির দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘কাকোলূকীয়ম্’-এর ‘ব্রাহ্মণচৌরপিশাচকথা’-য় ব্রাহ্মণের গবাদিপশু চুরি করার প্রচেষ্টা এবং তাকে রক্ষার ঘটনা রয়েছে। ‘কথাসরিৎসাগর’-এর ‘মদনমঞ্জুকা লম্বক’-এর তৃতীয় তরঙ্গের ‘হরিশর্মাদ্বিজের কাহিনি’-তে পরিচারিকার দ্বারা মূল্যবান অলংকার চুরির ঘটনা এবং একই লম্বকের চতুর্থ তরঙ্গে গুপ্তধন চুরির দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ‘পুরুষপরীক্ষা’-র ‘হাসবিদ্যকথা’-য় ধনী ব্যক্তির গৃহে সিঁধ কেটে চুরি করতে গিয়ে চোরদের নগররক্ষকদের হাতে ধরা পড়ার ঘটনা রয়েছে। এই দৃষ্টান্তগুলির বৈচিত্র্য থেকে বোঝা যায়, চৌর্য ছিল বহুরূপী সামাজিক অপরাধ এবং তার সঙ্গে সম্পত্তির প্রকৃতি, চুরির পদ্ধতি ও অপরাধীর কৌশল সবই যুক্ত ছিল। চৌর্যের এই বহুবিধ রূপ সংস্কৃত কথাসাহিত্যের সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। শিশুচুরি, পশুচুরি, গৃহস্থালির মূল্যবান দ্রব্য চুরি, গুপ্তধন হরণ কিংবা সিঁধ কেটে চুরি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অপরাধের ধরন আলাদা হলেও মূল সমস্যা হল অন্যের স্বত্বে অনধিকার হস্তক্ষেপ। ফলে চৌর্যবিষয়ক আখ্যানগুলি সম্পত্তির আইনি ধারণাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে। বিশেষত পরিচারিকার দ্বারা গৃহস্থের অলংকার চুরি বা গৃহে সিঁধ কেটে চুরির মতো ঘটনা দেখায় যে, অপরাধ কেবল বহিরাগত ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হত না; বিশ্বাসের সম্পর্কের ভিতর থেকেও চৌর্য সংঘটিত হতে পারত। এই দিকটি কথাসাহিত্যের সমাজচিত্রকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
তবে চৌর্যের ক্ষেত্রে সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচারচেতনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলির একটি হল, সন্দেহ এবং অপরাধ প্রমাণকে এক করে দেখা হয়নি। কোনো ব্যক্তির ওপর সন্দেহ সৃষ্টি হলেই তাকে চোর হিসেবে দণ্ডিত করা যুক্তিযুক্ত নয়; প্রকৃত অপরাধী নির্ণয়ের জন্য যথাযথ অনুসন্ধান প্রয়োজন। স্মৃতিশাস্ত্রে চোর শনাক্তকরণ ও অপরাধ প্রমাণের জন্য যে পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে আখ্যানের ঘটনাপ্রবাহের যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। ‘দশকুমারচরিত’-এর ‘সোমদত্তচরিত’-এ প্রকৃত চোর অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এমন বিচারবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে কাহিনির উদ্দেশ্য শুধু চোর ধরার রোমাঞ্চ সৃষ্টি করা নয়; বরং প্রকৃত অপরাধী নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও প্রমাণের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সিঁধ কেটে চুরির ঘটনাও আখ্যানগুলিতে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ‘দশকুমারচরিত’-এর ‘অপহারবর্মাচরিত’-এ সিঁধ কেটে চুরির বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। এই ধরনের ঘটনা থেকে তৎকালীন নগরজীবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, চোরদের কৌশল এবং নগররক্ষকদের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। অপরদিকে ‘কথাসরিৎসাগর’-এর ‘নরবাহনদত্তজনন লম্বক’-এর দ্বিতীয় তরঙ্গের একটি আখ্যানে এবং ‘দশকুমারচরিত’-এর ‘পূর্বপীঠিকা’-য় তস্করবৃত্তিতে যুক্ত ব্যক্তিদের নৃশংসতার পরিচয় পাওয়া যায়। ফলে চৌর্য এখানে নিছক সম্পত্তি হরণের ঘটনা নয়; তা কখনও সংগঠিত অপরাধ, কখনও সহিংসতা এবং কখনও বৃহত্তর সামাজিক নিরাপত্তার সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে।
এই সমস্ত দৃষ্টান্ত একত্রে বিচার করলে সংস্কৃত কথাসাহিত্যে হিংসামূলক অপরাধের একটি সুসংবদ্ধ নৈতিক ও বিচারিক কাঠামো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দণ্ডপারুষ্য মানুষের প্রতি শারীরিক হিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করে, সাহস বলপ্রয়োগ ও সম্পত্তি হরণের মতো গুরুতর অপরাধকে চিহ্নিত করে, পরস্ত্রীসংগ্রহণ সামাজিক ও পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নকে সামনে আনে এবং চৌর্য ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে সুরক্ষিত করে। একই সঙ্গে জীবহিংসার দৃষ্টান্তগুলি দেখায় যে অপরাধের নৈতিক পরিসর মানবসমাজের বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। ফলে বিচারব্যবস্থা এখানে কেবল অপরাধীর ওপর দণ্ড আরোপের প্রতিষ্ঠান নয়; বরং সামাজিক সম্পর্ক, সম্পত্তি, পারিবারিক নীতি, প্রাণরক্ষা এবং নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার একটি বৃহত্তর ব্যবস্থা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, স্মৃতিশাস্ত্র ও সংস্কৃত কথাসাহিত্যের মধ্যে এখানে একটি দ্বিমুখী সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। স্মৃতিশাস্ত্র অপরাধের সংজ্ঞা, শ্রেণিবিভাগ ও দণ্ডের নীতিগত কাঠামো প্রদান করেছে; আর কথাসাহিত্য সেই কাঠামোর সামাজিক প্রয়োগকে মানুষের জীবন ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান করেছে। কোথাও শাস্ত্রবিধির সঙ্গে আখ্যানের পরিণতি সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, কোথাও আবার সামাজিক মর্যাদা, পরিস্থিতি বা কাহিনির নৈতিক বিন্যাসের কারণে তার ভিন্ন রূপ দেখা যায়। এই সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যই সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচারচেতনার মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করে। তাই আখ্যানগুলিকে কেবল স্মৃতিশাস্ত্রের বিধানের উদাহরণ হিসেবে পাঠ না করে স্বতন্ত্র সাহিত্যিক ও সামাজিক দলিল হিসেবে বিচার করা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, সংস্কৃত কথাসাহিত্যে হিংসামূলক অপরাধের উপস্থাপন মূলত একটি সুসংহত সামাজিক ন্যায়বোধের পরিচয় বহন করে। অপরাধকে চিহ্নিত করা, তার নৈতিক নিন্দা করা, অপরাধী নির্ণয়ে অনুসন্ধান করা এবং অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী শাস্তির কথা বলা, এই চারটি স্তর বিভিন্ন আখ্যানের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। ফলে ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘হিতোপদেশ’, ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’, ‘কথাসরিৎসাগর’, ‘পুরুষপরীক্ষা’ ও ‘দশকুমারচরিত’-এর মতো গ্রন্থগুলি প্রাচীন ভারতীয় বিচারব্যবস্থার কেবল ছায়াপ্রতিফলন নয়; এগুলি মানুষের আচরণ, অপরাধ, সামাজিক নিন্দা, রাষ্ট্রীয় দণ্ড এবং ন্যায়বোধের পারস্পরিক সম্পর্ককে সাহিত্যিক রূপে সংরক্ষণ করেছে। এই কারণেই সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচারসংক্রান্ত উপাদান বিশ্লেষণ করলে একদিকে যেমন প্রাচীন বিচারব্যবস্থার ব্যবহারিক রূপ স্পষ্ট হয়, অন্যদিকে তেমনই সেই সমাজের নৈতিক মানদণ্ড, সম্পত্তিচেতনা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ধারণাও পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়।
“হিতোপদেশের রচয়িতা নারায়ণ শর্মা রাজা ধবলচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন। গ্রন্থশেষে গ্রন্থকার তাঁর পৃষ্ঠপোষক রাজা ধবলচন্দ্রের গুণগ্রাহিতার কথা উল্লেখ করেছেন-
‘শ্রীমান্ ধবলচন্দ্রোহসৌ জীয়ান্মাগুলিকো রিপূন্। যেনায়ং সংগ্রহো যত্নাল্লেখয়িত্বা প্রচারিতঃ।।’
পাটলিপুত্রের রাজা সুদর্শনের পুত্রদের শিক্ষাদানের পরিকল্পনা নিয়েই গ্রন্থটি রচিত হয়। ধবলচন্দ্র ১৩৭৩ খ্রীষ্টাব্দের পূর্ববর্তী। সুতরাং তার পূর্বেই এর রচনাকাল। অধ্যাপক Winternitz হিতোপদেশে ‘ভট্টারকবার’ শব্দটির উল্লেখ দেখে মন্তব্য করেছেন যে, ৫০০ খ্রীষ্টাব্দের পূর্ববর্তী ভারতীয় শিলালেখে এই শব্দটির প্রয়োগ নেই। খ্রীষ্টীয় নবম শতকের পর শব্দটির ব্যাপক প্রচলন ঘটে। সুতরাং নবম শতকের পর থেকে চতুর্দশ শতকের শেষার্ধের মধ্যবর্তী কোন সময়ই নারায়ণ শর্মার আবির্ভাব কাল।..” ৬
একথা অনস্বীকার্য যে, চৌর্যবিষয়ক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারপ্রক্রিয়ার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল দ্রুততা ও প্রমাণনির্ভরতার সমন্বয়। ‘দশকুমারচরিত’-এর ‘পূর্বপীঠিকা’-র ‘কুমারোৎপত্তি’ নামক প্রথমোচ্ছ্বাসে তস্করবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত অপরাধপ্রবণতার যে চিত্র পাওয়া যায়, সেখানে চৌর্য কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর আঘাত নয়, সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিও একটি প্রত্যক্ষ হুমকি। এই কারণেই স্মৃতিশাস্ত্রে চৌর্যবিষয়ক বিচারে বিলম্ব না করার যে নির্দেশ রয়েছে, ‘পুরুষপরীক্ষা’-র ‘চৌরকথা’-তেও তার অনুরণন লক্ষ করা যায়। এর তাৎপর্য কেবল বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নির্ধারণের একটি প্রাথমিক বিচারবোধ এর মধ্যে নিহিত। অর্থাৎ প্রাচীন বিচারচিন্তায় সময়ও কখনও ন্যায়ের একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে।
এই পর্যায়ে সংস্কৃত কথাসাহিত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সামনে আসে। অপরাধের যে বহুবিধ রূপ মানুষের সামাজিক জীবনে দেখা দেয়, তার সবগুলিকে নির্দিষ্ট কয়েকটি বিবাদপদের মধ্যে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই ‘প্রকীর্ণ’ ধারণাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘প্রকীর্ণ’ অর্থ বিক্ষিপ্ত, মিশ্রিত বা বিভিন্ন প্রকৃতির। বিষ্ণুর ‘যদনুক্তং তৎপ্রকীর্ণকম্’ উক্তির আলোকে বলা যায়, বিচার ও সামাজিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে পূর্বনির্দিষ্ট শ্রেণির বাইরে যে আচরণগুলি নৈতিক বা অপরাধমূলক তাৎপর্য বহন করে, সেগুলিরও একটি বিচারযোগ্য পরিসর রয়েছে। মানুষের আচরণ যেহেতু বিধিবদ্ধ শ্রেণিবিন্যাসের তুলনায় বহুগুণ জটিল, তাই প্রকীর্ণের ধারণা আসলে আইনের সেই সীমারেখাটিকেই চিহ্নিত করে, যেখানে বিধি শেষ হয়ে বিচারবোধের সূচনা ঘটে।
সংস্কৃত কথাসাহিত্যে অতিথির অনাদরকে এই বৃহত্তর নৈতিক পরিসরের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এ অতিথির প্রতি অবহেলাকে শুধু সামাজিক অসৌজন্য হিসেবে নয়, গৃহস্থের ধর্মলঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে বোঝা যায়, প্রাচীন ভারতীয় সামাজিক চেতনার কাছে ন্যায় কেবল আদালতে সংঘটিত কোনো প্রক্রিয়া ছিল না; দৈনন্দিন আচরণের মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটত। অতিথির প্রতি কর্তব্য, আশ্রিতের প্রতি দায়িত্ব কিংবা সামাজিক সম্পর্কের প্রতি বিশ্বস্ততা, এসবই বৃহত্তর ন্যায়বোধের অংশ। কথাসাহিত্য এই অনানুষ্ঠানিক ন্যায়বোধকে কাহিনির চরিত্র ও ঘটনার মধ্যে এমনভাবে স্থাপন করেছে যে সামাজিক নীতি এবং বিচারনৈতিকতা পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।
বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ‘দশকুমারচরিত’-এর ‘অর্থপালচরিত’-এ বিশ্বাসভঙ্গকারীর জন্য কঠোর শাস্তির উল্লেখ এই অপরাধের সামাজিক গুরুত্বকে প্রকাশ করে। বিশ্বাস আসলে কোনো দৃশ্যমান সম্পত্তি নয়, কিন্তু সামাজিক সম্পর্কের অন্যতম মৌলিক সম্পদ। সেই সম্পদ নষ্ট হলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোও বিপন্ন হয়। ফলে কথাসাহিত্যে বিশ্বাসভঙ্গের শাস্তি প্রমাণ করে যে অপরাধের ধারণা কেবল বস্তুগত ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; সামাজিক আস্থার বিনাশও অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। পরিবারকেন্দ্রিক আচরণের ক্ষেত্রেও সংস্কৃত কথাসাহিত্য একই নৈতিক সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করেছে। পিতা-মাতার অবমাননা, সন্তানের প্রতি অন্যায় আচরণ, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার, সচ্চরিত্রা স্ত্রীর ভরণপোষণ না করা কিংবা পতিব্রতা স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে পরিত্যাগ, এই ধরনের ঘটনাকে বিভিন্ন আখ্যানে নিন্দনীয় ও অন্যায় আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে কর্তব্যের ধারণা একমুখী নয়। পরিবারের কনিষ্ঠ বা নির্ভরশীল সদস্যের যেমন কর্তব্য রয়েছে, পরিবারের কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিরও তেমনই দায়িত্ব রয়েছে। এই পারস্পরিকতার বোধ সংস্কৃত কথাসাহিত্যের ন্যায়চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিক।
গণিকা, কুট্টনী, গণিকালয়ের প্রহরী এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য চরিত্রের মধ্য দিয়ে আখ্যানগুলি অপরাধের আরও এক জটিল সামাজিক পরিসর উন্মোচিত করেছে। প্রতারণা, মিথ্যা অভিযোগ, অর্থ আত্মসাৎ, প্রলোভন, উপনায়কের ধন অপহরণ প্রভৃতি আচরণের মধ্য দিয়ে অপরাধের একটি ‘অদৃশ্য’ অর্থনৈতিক কাঠামোও ধরা পড়ে। এখানে বলপ্রয়োগের পরিবর্তে কৌশল, প্ররোচনা ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার ব্যবহারই অপরাধের প্রধান হাতিয়ার। এই দিকটি সংস্কৃত কথাসাহিত্যের একটি বিশেষ শক্তি। অপরাধকে কেবল বাহ্যিক কর্ম হিসেবে নয়, তার অন্তর্নিহিত মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখা হয়েছে।
একইভাবে আত্মহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে চিহ্নিত করা, সাধু বা সজ্জন ব্যক্তির কাম-লোভের বশবর্তী হয়ে অপরাধে লিপ্ত হওয়া, পিতা-মাতার অন্যায় আচরণ কিংবা স্ত্রীর প্রতি অবিচার, এসব ঘটনায় একটি মৌলিক সত্য প্রতিভাত হয়: সংস্কৃত কথাসাহিত্যে অপরাধের উৎসকে কেবল বহির্জগতের পরিস্থিতিতে খোঁজা হয়নি; মানুষের অন্তর্জগতকেও তার একটি প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাত্সর্য, মানবচরিত্রের এই প্রবৃত্তিগুলি কীভাবে ব্যক্তিগত নৈতিকতা থেকে সামাজিক অপরাধের দিকে মানুষকে নিয়ে যায়, আখ্যানকারেরা তা কাহিনির মাধ্যমে দেখিয়েছেন। ফলে এই সাহিত্য এক অর্থে অপরাধবিজ্ঞানেরও একটি প্রাথমিক মানবমনস্তাত্ত্বিক পাঠ নির্মাণ করে। এই মূল বিষয়টি স্মরণে রেখে সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচারচেতনা নিছক বিধিনির্ভর আলোচনার সীমা অতিক্রম করে যায়। স্মৃতিশাস্ত্র যেখানে অপরাধের সংজ্ঞা, বিচারপদ্ধতি ও দণ্ডের একটি বিধিবদ্ধ কাঠামো নির্মাণ করেছে, কথাসাহিত্য সেখানে সেই বিধানের মানবিক পরিণতি দেখিয়েছে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে কী করা উচিত; আখ্যানে দেখানো হয়েছে মানুষ বাস্তবে কী করে এবং তার ফল কীভাবে ব্যক্তি ও সমাজকে প্রভাবিত করে। এই দুইয়ের সম্পর্ক তাই বিরোধের নয়, বরং বিধান ও জীবনের, শাস্ত্র ও অভিজ্ঞতার, নীতি ও বাস্তবতার পারস্পরিক সংলাপের। সংস্কৃত বিচারচিন্তার পূর্ণাঙ্গ স্বরূপ অনুধাবনের জন্য এই দ্বিমুখী পাঠ বিশেষ জরুরি।
বিচারকের প্রসঙ্গেও এই সংলাপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজা বিচারব্যবস্থার প্রধান হলেও যোগ্য প্রাড়িবাকের বিচারকার্য পরিচালনার সুযোগ ছিল। ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’-র একত্রিংশ উপাখ্যান রাজা ও সভাসদদের সম্মিলিত বিচারকার্যের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এতে বোঝা যায়, বিচার কেবল শাসকের ব্যক্তিগত ইচ্ছার প্রকাশ ছিল না; সভা, পরামর্শ, প্রমাণ এবং বিচারবুদ্ধির সমন্বয়ও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘শশ-কপিঞ্জলকথা’-য় বিচারকের যোগ্যতা এবং বিচারপদ্ধতি সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায়, তা স্মৃতিশাস্ত্রীয় বিচারদর্শনের সঙ্গে একটি লক্ষণীয় সাযুজ্য নির্দেশ করে। একই সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ হল, সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারকের ক্ষমতার পাশাপাশি তার বিচক্ষণতার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পেয়েছে। সন্দেহ ও অপরাধ এক জিনিস নয়; অভিযোগ ও প্রমাণও সমার্থক নয়। প্রকৃত অপরাধী নির্ণয় না করে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া ন্যায়ের পরিপন্থী—বিভিন্ন আখ্যানের ঘটনাপ্রবাহে এই বোধ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে বিচারকের আদর্শ গুণ কেবল শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নয়, সত্যকে অসত্য থেকে পৃথক করার ক্ষমতা। এই বিচারবুদ্ধিই বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রতিহিংসা থেকে ন্যায়ে উন্নীত করে। এই প্রসঙ্গে প্রমাণের গুরুত্বও নতুন তাৎপর্য লাভ করে। সাক্ষ্য, শপথ, পরিস্থিতিগত তথ্য কিংবা অন্যান্য প্রমাণের ব্যবহার আখ্যানগুলিতে বিচারের নির্ণায়ক উপাদান হিসেবে উপস্থিত। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর বিভিন্ন কাহিনিতে কখন কোন প্রমাণ গ্রহণযোগ্য, তার যে ব্যবহারিক বোধ প্রকাশ পায়, তা বিচারব্যবস্থার একটি পরিণত চেতনার পরিচায়ক। অর্থাৎ ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল বিধান থাকলেই হয় না; বিধানকে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োগ করার মতো বিচারবুদ্ধিও আবশ্যক। এখানেই প্রাচীন ভারতীয় বিচারচিন্তার একটি মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি নিহিত।
এই সমগ্র আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কৃত কথাসাহিত্যকে কেবল নীতিকথা, রোমাঞ্চকর কাহিনি কিংবা বিনোদনমূলক আখ্যান হিসেবে মূল্যায়ন করলে তার সামাজিক তাৎপর্য অনেকটাই অনালোচিত থেকে যায়। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর পশুপাখি, ‘হিতোপদেশ’-এর নীতিকথা, ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’-র জটিল নৈতিক প্রশ্ন, ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’-র রাজবিচার, ‘কথাসরিৎসাগর’-এর বহুবর্ণ সমাজজীবন কিংবা ‘দশকুমারচরিত’-এর অপরাধ ও কৌশলের জগৎ—সবকিছুর গভীরে মানুষের আচরণকে বিচার করার একটি সুস্পষ্ট মানদণ্ড ক্রিয়াশীল। পশু চরিত্রগুলি আসলে মানুষের প্রবৃত্তির প্রতীক, রাজসভা মানুষের ক্ষমতার প্রতীক, চোর ও প্রতারক মানুষের লোভের প্রতীক এবং বিচারসভা সামাজিক ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই প্রতীকী বিন্যাসই কথাসাহিত্যকে সামাজিক চিন্তার একটি শক্তিশালী মাধ্যম করেছে।
আধুনিকতার প্রেক্ষিতে এই সাহিত্যিক বিচারচেতনার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। অপরাধের বাহ্যিক রূপ বদলেছে, কিন্তু তার অন্তর্গত প্রবৃত্তি বদলায়নি। প্রাচীন কাহিনির চৌর্য আজ সাইবার-চৌর্য বা তথ্যহরণের রূপ নিতে পারে; প্রতারণা আজ ডিজিটাল প্রতারণায় পরিণত হতে পারে; সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোয় নতুন মাত্রা পেতে পারে। কিন্তু অন্যের অধিকার হরণ, বিশ্বাসের অপব্যবহার, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং ব্যক্তিস্বার্থে সামাজিক ন্যায়কে অস্বীকার করার প্রবণতা একই মানবিক সমস্যার বিভিন্ন রূপ। সেই কারণে সংস্কৃত কথাসাহিত্য আজকের আইনব্যবস্থার বিধান সরবরাহ না করলেও অপরাধের মানবিক উৎস ও সামাজিক অভিঘাত বোঝার ক্ষেত্রে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় সাহিত্যের বৃহত্তর ধারায় এই উত্তরাধিকার আরও সুদূরপ্রসারী। সংস্কৃত আখ্যানের নৈতিক দ্বন্দ্ব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ন্যায়ের অনুসন্ধান পরবর্তী ভারতীয় ভাষার কথাসাহিত্যে নানা রূপে পুনর্নির্মিত হয়েছে। বাংলা কথাসাহিত্যেও ব্যক্তি ও সমাজের সংঘাত, সম্পত্তি ও অধিকার, নারী ও পরিবারের অবস্থান, ক্ষমতা ও অবিচার, অপরাধ ও শাস্তির প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে। ফলে সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচারচেতনা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাচীন বিষয় নয়; ভারতীয় সাহিত্যমানসে ন্যায়-অন্যায়ের যে দীর্ঘ বিতর্ক, তার একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ স্তর।
সামগ্রিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই আখ্যানগুলির বিচারচেতনা ‘আইন’কে মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিমূর্ত বিধান হিসেবে গ্রহণ করে না। আইন সেখানে জীবনের সঙ্গে যুক্ত, নীতি আচরণের সঙ্গে যুক্ত, অপরাধ প্রবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত এবং বিচার সত্য অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত। তাই সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার অনুসন্ধান করতে গেলে শুধু ‘কোন অপরাধের কী শাস্তি ছিল’ এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোন আচরণকে অপরাধ বলে ভাবা হত, কেন তা অপরাধ বলে বিবেচিত হত, সমাজ তার বিরুদ্ধে কী প্রতিক্রিয়া দেখাত এবং সেই প্রতিক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তি কী ছিল। এই প্রশ্নগুলিই আখ্যানগুলির অন্তর্নিহিত সমাজদর্শনকে উন্মোচিত করে।
অতএব, সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার উপস্থিতি আসলে প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ন্যায়বোধের বহুমাত্রিক প্রকাশ। স্মৃতিশাস্ত্র তার বিধিবদ্ধ কাঠামো নির্মাণ করেছে, আর কথাসাহিত্য সেই কাঠামোর মধ্যে চলমান মানুষকে দৃশ্যমান করেছে। একদিকে রয়েছে বিবাদপদ, প্রমাণ, বিচারক, শপথ ও দণ্ড; অন্যদিকে রয়েছে লোভ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, পারিবারিক দায়িত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক দ্বন্দ্ব। এই দুই স্তরের মিলনেই সংস্কৃত কথাসাহিত্যে বিচারব্যবস্থা কেবল আইনের বিষয় থাকে না, হয়ে ওঠে মানবজীবনের নৈতিক ব্যাখ্যার একটি পদ্ধতি।
সুতরাং সংস্কৃত কথাসাহিত্যের বিচারচেতনার প্রকৃত মূল্য তার প্রাচীনত্বে নয়, তার মানবিক অন্তর্দৃষ্টিতে। সময় বদলেছে, বিচারপ্রণালী বদলেছে, অপরাধের প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু ন্যায়ের মৌলিক প্রশ্নগুলি, সত্য কী, অন্যায় কী, অপরাধের দায় কার, শাস্তির সীমা কোথায় এবং ব্যক্তির অধিকারের সঙ্গে সমাজের স্বার্থের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়, আজও অমীমাংসিত নয়। এই অনন্ত প্রশ্নগুলিরই প্রাচীন সাহিত্যিক প্রতিধ্বনি বহন করে ‘পঞ্চতন্ত্র’, ‘হিতোপদেশ’, ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’, ‘সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা’, ‘কথাসরিৎসাগর’ ও ‘দশকুমারচরিত’-এর মতো গ্রন্থ। তাই এই আখ্যানগুলিকে পুনর্পাঠ করা মানে কেবল অতীতের বিচারব্যবস্থাকে জানা নয়; বরং ভারতীয় সাহিত্য ও চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্যে মানুষ কীভাবে ন্যায়কে কল্পনা করেছে, অন্যায়কে শনাক্ত করেছে এবং সামাজিক শৃঙ্খলার অর্থ নির্ধারণ করেছে, তারই একটি গভীর অনুসন্ধান। এই দৃষ্টিতে সংস্কৃত কথাসাহিত্য একদিকে প্রাচীন ভারতীয় সমাজের নৈতিক স্মৃতি, অন্যদিকে ভারতীয় সাহিত্যমানসে ন্যায়ের অবিরাম অনুসন্ধানের এক জীবন্ত দলিল।
তথ্যসূত্র:
১. ড. দেবকুমার দাস, ‘ সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস’, সদেশ ( প্রকাশক), কলকাতা -৭৩, ত্রয়োদশ সংস্করণ, ১৪২১ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা – ১৮৫, ১৯০ ও ১৮৭-১৮৮
২. ২. রূপা বিশ্বাস, ‘সংস্কৃত আখ্যানসাহিত্যে বিচারব্যবস্থার উপাদান অনুসন্ধান’, গবেষণা-সারসংক্ষেপ (Synopsis), [মূল লেখায় প্রদত্ত PDF লিংক]।
ঋণস্বীকার গ্রন্থ:
১. কৌটিল্য, ‘অর্থশাস্ত্র’, সম্পাদনা ও ইংরেজি অনুবাদ: আর. পি. কাঙলে (R. P. Kangle)।
২. জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী, ‘প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও বাঙালীর উত্তরাধিকার’
৩. সুখেন্দু সুন্দর গঙ্গোপাধ্যায়, ‘সংস্কৃত সাহিত্যের দশরত্ন’
৪. স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ, ‘ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস’
৫. অমরেশ্বর ঠাকুর, ‘সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস’
৬. ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘ভারতীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্য’
৭. মনমোহন ঘোষ, ‘Studies in Sanskrit Literature’
৮. এ. বি. কিথ (A. B. Keith), ‘A History of Sanskrit Literature’
৯. মোরিজ উইন্টারনিৎস (Moriz Winternitz), ‘A History of Indian Literature’
১০. এ. এ. ম্যাকডোনেল (A. A. Macdonell), ‘A History of Sanskrit Literature’




