সাইকো

সুন্দর, পরিপাটি করে সাজানো-গোছানো অন্নপ্রাশন বাড়ি। নরম মিঠে আলোর মালা দিয়ে মোড়া। সাউন্ড সিস্টেমে হালকা করে হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া আর শিব কুমার শর্মার বিখ্যাত বাঁশি ও সন্তুরের যুগলবন্দী চলছে। সাজুগুজু করা বহু লোকজনের ভিড়। নিমন্ত্রিতদের সংখ্যা অনেক। সবার মুখেই তরল হাসি। খাওয়া-দাওয়ারও বিপুল আয়োজন। পুরো তিনতলাটা জুড়ে বুফে সিস্টেমে খাওয়া দাওয়া। অর্থাৎ কিনা যেমন খুশি তেমন খাওয়া। অবশ্য একদিকে বসে খাওয়ারও আয়োজন আছে। তবে সবই সেলফ সার্ভিস। নিজেরটা নিজেকেই নিয়ে নিতে হচ্ছে।
খাওয়া-দাওয়ার আগে ও পরে খুশি খুশি মুডে সবাই ছবি তুলছে। নিজেদের ছবি যে তুলছে না, তা নয়। তবে আজকে বিশেষ দিন বলে সবাই ছবি তুলতে চাইছে যার জন্মদিন সেই ছোট্ট সোনা আর তার গর্বিত বাবা-মার সঙ্গেই। আর ওরা তিনজনেই অক্লান্তভাবে অজস্র রঙিন বেলুন দিয়ে সাজানো দারুন সুন্দর কল্কার কাজ করা রাজ সিংহাসনে বসে বা পাশে দাঁড়িয়ে অতিথি অভ্যাগতদের সঙ্গে ছবি তুলে চলেছেন। এমন আনন্দময় পরিবেশে ছবি তুলতে কার না ভালো লাগে?
এরই মধ্যে হঠাৎ করে সদ্য কিশোর ছেলেটা উৎকট ভাবে আওয়াজ করে উঠল। কানেতে তীব্রভাবে বাঁধে, তাল কেটে যায়– এমন কর্কশ পিলে চমকানো আওয়াজ। সবাই তো অবাক। তার চেয়েও বেশি আতঙ্কিত। কী ব্যাপার, কোনও দুর্ঘটনা ঘটে গেল নাকি? না, তেমন তো কিছু ঘটেনি। তাহলে..?
সে যাই হোক, কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাপারটাকে এড়িয়ে গিয়ে আবার খুশি আনন্দ, খাওয়া দাওয়া আর ছবি তোলায় মত্ত হয়ে পড়ল সবাই। ঠিক তখনই আবার। আবার সেই পিলে চমকানো শব্দ। এরপর খানিকক্ষণ বাদে বাদেই বারবার সেই পিলে চমকানো আওয়াজ করতে লাগল ছেলেটা ‌। আর যতবার সে আওয়াজ করল ততবারই তার বাবা-মার মুখ থেকে আলো হারিয়ে যেতে থাকল। অনেক চেষ্টা করল ওরা ছেলেকে সামলাতে। কিন্তু কে কার কথা শোনে? আজ ছেলেটা তার বাবা-মা’র কথার কোনও পাত্তাই দিল না। একরোখা, একগুঁয়ের মতো সে হঠাৎ হঠাৎ করে বিশ্রী, উৎকট শব্দটা করেই চলল।
ওর বাবা মায়ের কাছে এর চেয়ে অপ্রস্তুত হওয়ার আর কী থাকতে পারে?
ওদের খুব কাছের বন্ধুরা অবশ্য চক্ষু লজ্জার খাতিরে আওয়াজটা শুনেও না শোনার ভান করতে থাকল। কেউবা একটু এগিয়ে গিয়ে নরম করে ওদের ব্যাপারটা ইগনোর করার পরামর্শও দিল। আসলে ওরাও তো বুঝতে পারছে পরিস্থিতিটা, কিন্তু কী-ইবা করবে? কিছুই তো করতে পারছে না।
এদিকে অদ্ভুত বিরক্তিকর ও বিসদৃশভাবে ছেলেটা থেকে থেকে বিকট আওয়াজ করেই চলল। বিশেষ করে ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে বেলুনে সাজানো সিংহাসনটায় বসে ভিডিও রেকর্ডিং এর সময় আওয়াজটা অসহ্যরকম বেড়ে গেল। রেকর্ডিং-এর মধ্যেও রয়ে গেল আওয়াজটা। ভিডিওগ্রাফার অনেক কায়দা করেও সেটাকে ম্যানেজ করতে পারল না।
ছেলেটার মা কার্যত হতাশ হয়ে টানতে টানতে অনেকটা দূরের জানালাটার পাশের চেয়ারে নিয়ে গিয়ে বসাল তাকে। তারপর গলার স্বর নামিয়ে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল তাকে, কিন্তু ভবি কিছুতেই ভুলবার নয়। আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত সংযোজন হিসেবে উদ্দাম উন্মত্তভাবে হাত পাত ছোঁড়াও শুরু হল এবার।
সত্যি, কীসব ভাবছে সবাই! মুখে কিছু বলতে পারছে না হয়তো সৌজন্যবশত, কিন্তু মনে মনে নিশ্চয় ভাবছে, ছেলেটার সাইকোলজিকাল সমস্যা আছে, মাথার দোষ–পাগল!
আর ভাবতে পারে না ছেলের মা–” আমার আর মুখ দেখাবার জায়গা রইল না! ছি ছি! সবাই কী ভাবছে! কেন আমার সঙ্গেই এরকম হয় বারবার? কী অপরাধ করেছিলাম আমি? কোন পাপের এই শাস্তি পাচ্ছি?কেন আমাকেই এসব সহ্য করতে হবে? কেন….”
চোখে জল এসে যায় তার। মনে হয় প্রাণ খুলে একটু কাঁদে। কিন্তু এত লোকের সামনে সেটা আরও অপ্রীতিকর হবে ভেবে কোন রকমের সামলে নেয় নিজেকে।
ছেলের বাবাও সমান অপ্রস্তুত। কিন্তু সবার সামনে সুটেড-বুটেড স্মার্টনেস কিছুতেই ভাঙতে চায় না সে। হাজার হলেও পুরুষ মানুষ বলে কথা না!
কিন্তু ছেলের কান্ডকারখানায় পরিস্থিতি যে যথেষ্ট জটিল এবং অসহনীয় হয়ে উঠেছে–সে বিষয়ে দুজনেই সহমত না হয়ে উপায় নেই। এখনই একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। তা না হলে বাকি মান সম্মানেরও টানাটানি হওয়ার সম্ভাবনা।দুজনে মিলে তাই সিদ্ধান্ত নেয়– আর নয়, বাড়ি ফেরাটাই ছেলেকে সামলানো আর মান বাঁচানোর একমাত্র রাস্তা।
সেইমতো তারা সবাইকে কোনও রকমে বিদায় জানিয়ে ছেলেকে নিয়ে অন্নপ্রাশন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসে ছেলেটা কিছুটা শান্ত হয়। হাত পা ছোড়া অনেক কমে আসে। আওয়াজ করাও থেমে যায়। তবুও অস্থিরতার লক্ষণ রয়ে যায় পুরো মাত্রায়। বোঝা যায় ভেতরের ঝড় এখনো চলছে।
এবার মোবাইল খুলে তড়িঘড়ি একটা উবের ভাড়া করে ছেলেটার বাবা। বেশ কিছুক্ষণের অপেক্ষা। তারপর উবের চলে এলে তাড়াতাড়ি চড়ে বসে তিনজন।
গাড়ির মধ্যে বসেও ছেলেটা গোঁজ হয়েই থাকে। তেমন হাত পা ছোঁড়া, আওয়াজ না করলেও বোঝা যায়, ভেতর ভেতর যথেষ্ট অশান্ত হয়েই আছে।
ছেলেটার মায়ের অবস্থাও অনেকটা তেমন। লজ্জায়, রাগে মুখটা এখনও লাল হয়ে আছে।
বেশ কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পর একটু থিতু হয়ে মা প্রশ্ন করল ছেলেকে,” কেন তুই অমন করছিলি তখন সবার সামনে? আমাদের কষ্ট দিবি বলে?”
ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানের স্বরে উত্তর করল ছেলে–” কষ্ট তো আমিই পাচ্ছিলাম। এত ভালো একটা টকটকে লাল পাঞ্জাবি পরেছি, কই আমাকে তো কেউ ভালো বলল না! কেউ আদর করল না! সবাই তো ওই ছেলেটাকে নিয়েই যত কিছু আদর সোহাগ করল, প্রশংসা করল। আমার কষ্ট হয় না বুঝি……”
এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সে। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে ছেলেটা। দুচোখ দিয়ে অঝরে বৃষ্টি নামে। চোখের জল মুখে লালার সঙ্গে মিশে টপটপ করে পড়তে থাকে নীচেতে।
বাবা মা এবার সহজ ভাবেই বুঝতে পারে কার্যকারণটা। এতদিন ছেলেটাকে নিয়ে আছে এটা তাদের অনেক আগেই বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু কি আর করা যাবে। এর তো কোনও উত্তর হয় না। এর কী ব্যাখ্যা দেবে এখন ছেলেকে? তবে উত্তর যে একেবারে হয় না তাও নয়। এমন একটা পরিস্থিতিতে এই প্রশ্নের একটাই উত্তর হয় এখন। যাকে বলে আদি ও অকৃত্রিম উত্তর। সেই উত্তরাবলীর শর্ত মেনেই ব্যথিত অনুশোচনায় বাবা আর মা আদর করে বুকে টেনে নেয় অভিমানী ছেলেকে।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!