১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দিন দিন দৃঢ় হয়ে উঠছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে চলমান অসহযোগ আন্দোলন তখন সর্বাত্মক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ১৩ মার্চে এসে পূর্ব বাংলা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। দেশের সব স্তরের মানুষ কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চাকরিজীবী নিজেদের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আন্দোলনে অংশ নেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকে, এবং প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।
পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তারা বুঝতে পারেন যে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এদিন জমিয়াতুল ওলেমা ইসলামিয়া সংসদীয় দলের নেতা মাওলানা মুফতি মাহমুদের সভাপতিত্বে সংসদীয় দলের সভায় তিনটি আহ্বান জানানো হয়: পূর্ব পাকিস্তান থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহার, ২৫ মার্চের আগে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া।
সামরিক সরকার ১১৫ নম্বর আদেশ জারি করে প্রতিরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়, না মানলে চাকরিচ্যুতি ও সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুঁশিয়ারি দেয়। বঙ্গবন্ধু এই আদেশকে জনগণকে উস্কানির সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনা করেন।
রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ন্যাপের সভাপতি খান আবদুল ওয়ালী খান ও ন্যাপ নেতা গাউস বক্স বেজেঞ্জো ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল হাকিম পাকিস্তান সরকারের প্রদত্ত খেতাব ও পদক বর্জন করেন। চট্টগ্রামে বেগম উমরতুল ফজলের নেতৃত্বে নারীরা স্বাধীনতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত বিলাস দ্রব্য বর্জন ও কালো ব্যাজ ধারণের আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও প্রতিফলন দেখা যায়। ঢাকায় অবস্থানরত জাতিসংঘ ও পশ্চিম জার্মান দূতাবাসের কর্মচারীসহ ২৬৫ জন বিদেশি নাগরিক বিশেষ বিমানে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেন। ছাত্রসমাজও সমগ্র আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অর্থপাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক করে।
১৩ মার্চ ১৯৭১ বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন স্পষ্ট হয়ে যায়, আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি জাতির অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার সংগ্রাম। সর্বস্তরের মানুষের ঐক্য, সাহস ও দৃঢ় সংকল্পই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ সুগম করেছে।#




