বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের উত্তাল সময়ের প্রতিটি দিনই ছিল বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, প্রতিবাদ ও সংগঠনের নতুন মাইলফলক। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের সপ্তম দিনে সারা পূর্ববাংলায় স্বাধীনতার দাবিতে জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সেদিন সকালে ধানমন্ডিতে নিজের বাসভবনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ন্যাপ নেতা খান আবদুল ওয়ালী খানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধদ্বার আলোচনায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শেখ মুজিবুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানান, বাঙালির সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য নয়; এটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। জনগণের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সেই দিন রাতেই এক বিবৃতির মাধ্যমে তিনি অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান এবং ৩৫ দফা নতুন নির্দেশনা জারি করেন। এতে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, জনগণের ভূমিকা এবং আন্দোলনকে সংগঠিত রাখার বিভিন্ন দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে দমন করা যাবে না; কারণ এই জাতি স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।
এদিকে ইয়াহিয়া খানের জারি করা সামরিক ফরমানের প্রতিবাদে ঢাকায় প্রতিরক্ষা দপ্তরের বেসামরিক কর্মচারীরা মিছিল বের করেন। একই সঙ্গে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সম্পদ পাচার রোধের লক্ষ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন করে। এতে বোঝা যায় যে আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সাধারণ মানুষও স্বাধীনতার প্রস্তুতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছিল।
চট্টগ্রামেও সেদিন সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ব্যাপক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে শহরজুড়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ। স্বাধীনতার দাবিতে জনতার এই জাগরণ স্পষ্ট করে দেয় যে পূর্ববাংলার মানুষ আর পিছিয়ে যাওয়ার পথে নেই।
সেদিন ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায়ও ‘আর সময় নেই’ শিরোনামে একটি যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সম্পাদকীয়তে চলমান রাজনৈতিক সংকটের দ্রুত সমাধান এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে করাচির নিশতার পার্কে আয়োজিত এক জনসভায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, যদি শেখ মুজিবুর রহমানের দাবির ভিত্তিতে পার্লামেন্টের বাইরে সংবিধানসম্মত সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হয়, তবে তা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের পৃথক দুইটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছেই দেওয়া উচিত। একই সময় জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান খান শেখ মুজিবুর রহমানকে অস্থায়ী সরকার গঠনের আহ্বান জানান, যা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।
এভাবেই ১৪ মার্চ ১৯৭১ ছিল স্বাধীনতার প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ছাত্রসমাজ, শ্রমজীবী মানুষ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন একযোগে অসহযোগ আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে। মার্চের সেই দিনগুলোতে গোটা জাতি ধীরে ধীরে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিল।
অগ্নিঝরা সেই মার্চে বাঙালির একটাই লক্ষ্য ছিল নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা। ১৪ মার্চের ঘটনাপ্রবাহ ছিল স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জাতির দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি।#




