১৭ মে ১৯৭১, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় দিন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের সহায়তায় সংঘটিত হয় একাধিক গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন। দক্ষিণাঞ্চলের ঝালকাঠির রাজাপুরের কাঠিপাড়া এবং মাদারীপুরের শিবচর বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের জন্য।
কাঠিপাড়া গণহত্যা:
১৭ মে, সোমবার। সকাল গড়ানোর আগেই ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার কাঠিপাড়ার মানুষ খবর পান যে পাকিস্তানি বাহিনী এলাকায় ঢুকছে। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে গ্রামবাসী যে যেদিকে পারেন ছুটতে থাকেন। অনেকে আশ্রয় নেন কাঠিপাড়া ঠাকুরবাড়ির ঘন জঙ্গলে। পুরুষরা সামনে থেকে পাহারা দিতে থাকেন, আর নারী ও শিশুদের জঙ্গলের গভীরে লুকিয়ে রাখা হয়।
কিন্তু স্থানীয় রাজাকারদের চোখ এড়াতে পারেননি তারা। খবর পেয়ে পাকিস্তানি বাহিনী তিন দিক থেকে জঙ্গল ঘিরে ফেলে। একদল স্কুলের পাশ দিয়ে, আরেকদল দক্ষিণ দিকের খালপাড় ঘেঁষে, অন্যদল নারিকেলবাড়িয়া হয়ে জঙ্গলের চারপাশ বন্ধ করে দেয়। তারপর শুরু হয় গুলি, চিৎকার, আর মৃত্যুর মিছিল।
এদিন জঙ্গলের ভেতর থেকে টেনে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধশত মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পুরো এলাকা পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। গুলি ছাড়াও খালের কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষদেরও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাযজ্ঞে একই পরিবারের আটজন সদস্য নিহত হন। একটি বাড়ির ২২ জন নারী একদিনেই স্বামী হারিয়ে বিধবা হন। পরবর্তীতে এলাকাটি স্থানীয়ভাবে “বিধবা পল্লী” নামে পরিচিতি পায়, যা আজও সেই দিনের নীরব সাক্ষ্য বহন করে।
কাঠিপাড়ার হত্যাকাণ্ড ছিল এক সামরিক অভিযান এবং এর সাথে জড়িয়ে ছিল স্থানীয় প্রতিহিংসা, লোভ এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ। কার্তিক চন্দ্র হালদারকে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে কুপিয়ে হত্যা করে রাজাকার আইয়ুব আলী ঘরামি। হরিমোহন হাওলাদারকে ব্যবসায়িক স্বার্থে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রিয়নাথ এদবরকেও পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
পাকিস্তানি সেনারা চলে যাওয়ার পর যারা বেঁচে ছিলেন, বিকেলে ফিরে এসে দেখেন চারদিকে শুধু লাশ। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। নিহতদের স্বজনরা পরদিন জঙ্গলের ভেতরে চারটি গণকবরে ১০-১২ জন করে দাফন করেন।
কিন্তু হত্যাযজ্ঞের এখানেই শেষ হয়নি। রাজাকার ও লুটেরা বাহিনী গ্রামজুড়ে চালায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারীদের ওপর নির্যাতন। ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র, গবাদিপশু, বাসনপত্র, এমনকি খাদ্যসামগ্রীও লুট করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে এই অঞ্চলের মানুষ কাটিয়েছেন আতঙ্ক, অনাহার এবং অপমানের মধ্য দিয়ে। স্থানীয় খালেক হাওলাদার ওরফে খালেক মাস্টার, হামেদ জমাদ্দার, বেলায়েত জমাদ্দার, মিল্লাত জমাদ্দারসহ আরও কয়েকজন এই মানবতাবিরোধী অপরাধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
শিবচর গণহত্যা:
মুক্তিযুদ্ধের সময় মাদারীপুরের শিবচর ছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের নৃশংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১৯৭১ সালের ১৭ মে, সোমবার সকালে মাদারীপুরের এ আর হাওলাদার জুটমিলস এলাকায় স্থাপিত পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প থেকে তিনটি লঞ্চে করে সেনারা শিবচরের উদ্দেশে রওনা হয়। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় তারা উৎরাইল লঞ্চঘাটে নেমে শিবচর এলাকায় অভিযান শুরু করে।
সেই সময় শিবচরে ইতোমধ্যে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়েছিল। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পীর মোহসেন উদ্দিন দুদু মিয়ার নেতৃত্বে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট শিবচর থানা শান্তি কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সদস্যরা এবং স্থানীয় রাজাকাররা পাকিস্তানি বাহিনীকে তথ্য, দিকনির্দেশনা ও সরাসরি সহযোগিতা দেয়। শিবচর থানার আনসার সদস্যদের নিয়েই মূলত রাজাকার বাহিনী গড়ে ওঠে; পরে নতুন সদস্যদের মাদারীপুরের আনসার ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
১৭ মে পাকিস্তানি বাহিনী প্রথমে চরশামাইল গ্রামে প্রবেশ করে। সেখানে কয়েকটি হিন্দু বাড়িতে লুটপাট চালানো হয়, বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং কয়েকজন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয়ভাবে চরশামাইল গণহত্যা নামে পরিচিত।
চরশামাইল থেকে পাকিস্তানি সেনারা একই দিন গুয়াতলা গ্রামে যায়। সেখানে তারা আরও ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। গ্রামের ৩৮ জন নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুধু হত্যা করেই তারা থেমে থাকেনি; গুয়াতলা থেকে ১৪ জন গ্রামবাসীকে ধরে হাত-পা বেঁধে পাশের উৎরাইল নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এদের মধ্যে মাত্র একজন প্রাণে বেঁচে ফিরতে সক্ষম হন, বাকিরা নদীতে ডুবে মারা যান। এই ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে উৎরাইল গণহত্যা নামে পরিচিত।
পুরো অভিযানের সময় গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি জনপদকে বিপর্যস্ত করে ফেলে পাকিস্তানি বাহিনী। সন্ধ্যার আগেই তারা মাদারীপুরে ফিরে যায়।
পরে আগস্ট মাসের মধ্যভাগে পাকিস্তানি বাহিনী দ্বিতীয়বার শিবচরে আসে এবং ৩-৪ দিন অবস্থান করে। এসময় শিবচর বাজারে কারফিউ জারি করা হয়। তারা বাজারের কয়েকটি স্বর্ণের দোকান লুট করে কয়েক মণ স্বর্ণ নিয়ে যায়। তবে শিবচরে তারা স্থায়ী কোনো সেনা ক্যাম্প স্থাপন করেনি।
শিবচরের গুয়াতলা গ্রামে আজও একটি গণকবর রয়েছে, যেখানে ১৭ মে নিহতদের দাফন করা হয়। উৎরাইল নদীর যে স্থানে গ্রামবাসীদের ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, ২৪ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা শিবচর থানা আক্রমণ করেন। শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম তালুকদারের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে রাজাকারদের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষ হয়। যুদ্ধে ১৪ জন রাজাকার নিহত হয়। অন্যদিকে ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে শিবচরে রাজাকারদের শক্ত অবস্থান বড় ধাক্কা খায়।
শিবচরের গণহত্যাগুলো দেখায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা কতটা ভয়াবহ ছিল। চরশামাইল, গুয়াতলা ও উৎরাইলের ঘটনাগুলো শুধু কয়েকটি হত্যাকাণ্ড নয়; এগুলো শিবচরের মানুষের দীর্ঘদিনের ভয়, ক্ষতি এবং স্বজন হারানোর ইতিহাস বহন করে। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাসে শিবচর গণহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কাঠিপাড়া ও শিবচরের ঘটনাগুলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে স্থানীয় পর্যায়ে সংঘটিত সহিংসতার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এই দুই অঞ্চলে মানুষ প্রাণ হারায়, বাড়িঘর পুড়ে যায় এবং বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। পাশাপাশি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে, যা গ্রামীণ জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
শিবচরের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই দিনে একাধিক গ্রামে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। অন্যদিকে কাঠিপাড়ায় একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ঘিরে ধরে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। দুই ক্ষেত্রেই স্থানীয় সহযোগীদের উপস্থিতি ঘটনাগুলোর গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে।
এসব ঘটনার বিবরণ থেকে বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সহিংসতা শুধু বড় সামরিক সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকেও সরাসরি আঘাত করেছিল। কাঠিপাড়া ও শিবচর সেই সময়ের সেই বাস্তবতারই অংশ।
তথ্যসূত্র:
১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড)
২। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস
৩। মুনিরা জাহান সুমি, কাঠিপাড়া গণহত্যা (গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র)




