২০ মে ১৯৭১: বিভীষিকময় চুকনগর গণহত্যা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চুকনগর গণহত্যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বিভীষিকাময় ও বৃহৎ হত্যাযজ্ঞগুলোর একটি। ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি বৃহত্তম গণহত্যাগুলোর অন্যতম অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ এবং হত্যাযজ্ঞের মুখে খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ফরিদপুর, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা এবং চালনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষ ভারতে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরিবার। সীমান্তে পৌঁছানোর জন্য ডুমুরিয়া হয়ে সাতক্ষীরা অভিমুখী পথ তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হতো। নদীপথে ভদ্রা নদী ব্যবহার করে মানুষ সহজে চুকনগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত।

চুকনগর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। বাজারটি তিন দিক থেকে নদীঘেরা হওয়ায় এবং খানিকটা উঁচু স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এটি শরণার্থীদের বিশ্রাম, রান্নাবান্না এবং সাময়িক আশ্রয়ের প্রধান স্থান হয়ে ওঠে। মানুষ এখানে এসে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে পরবর্তী সময়ে সীমান্তের দিকে যাত্রা করত। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সেখানে মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৮ ও ১৯ মে চুকনগর বাজার ও আশপাশের এলাকায় জনসমাগম চরমে পৌঁছে। পাতখোলা বিল, মাছবাজার, কাঁচাবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, গরুহাটা, বটতলা এবং কালীমন্দির এলাকা হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে ভরে ওঠে।

তৎকালীন আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন এবং ভদ্রা নদীর খেয়াঘাটের ইজারাদার বিহারি শামসুদ্দিন খাঁ পাকিস্তানি বাহিনীকে চুকনগরে অবস্থানরত বিপুল শরণার্থীর খবর দেয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সেনারা সাতক্ষীরা ক্যাম্প থেকে চুকনগরে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

সেদিন (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে চুকনগরে মানুষের স্বাভাবিকভাবে কাজকর্মে ব্যস্ত ছিল। কেউ রান্না করছিল, কেউ মালপত্র গোছাচ্ছিল, কেউ সীমান্তে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অনেকেই সকালের খাবার খেতে বসেছিল। ঠিক এমন সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা থেকে একটি ট্রাক ও একটি জিপে করে পাকিস্তানি সেনারা চুকনগর সাতক্ষীরা সড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ে এসে পৌঁছায়।

রাস্তার পাশে পাটখেতে কাজ করছিলেন মালতিয়া গ্রামের চিকন আলী মোড়ল। সেনাদের গাড়ি দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এরপর শুরু হয় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি সেনারা বাজারে প্রবেশ করে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে। একদল পাতখোলা বিল, চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া এবং ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে অবস্থানরত মানুষের ওপর গুলি চালায়।

মুহূর্তেই চারদিকে আর্তচিৎকার, আতঙ্ক এবং মৃত্যুর বিভীষিকা নেমে আসে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে থাকে। অনেকে নদীতে ঝাঁপ দেয়, অনেকে মাঠে ও ঝোপে লুকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের অবিরাম গুলিবর্ষণে অসংখ্য মানুষ ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। ভদ্রা নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। বহু লাশ নদীতে ভেসে যায় এবং কোথাও কোথাও লাশের স্তূপে পথ বন্ধ হয়ে যায়।

সেদিন চুকনগরের প্রবাহমান ভদ্রা নদী রক্তগঙ্গায় পরিণত হয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত।

সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই হত্যাযজ্ঞ চলে প্রায় দুপুর ৩টা পর্যন্ত। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, প্রায় চার মাইল এলাকা জুড়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা থাকলেও অধিকাংশ গবেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীর মতে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ এই গণহত্যায় প্রাণ হারায়।

চুকনগর গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীরা এই ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে হৃদয়বিদারক বিবরণ দিয়েছেন। বলাই গোলদার স্মৃতিচারণে বলেন, কয়েক ঘণ্টা আগেই তাদের পরিবারের একটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। কিন্তু গুলিবর্ষণ শুরু হলে চারদিকে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় যে পরিবারের সদস্যদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী আনসার আলী সরদার জানান, তারা কয়েকজন মিলে ২১টি বাঁশ ব্যবহার করে অসংখ্য লাশ নদীতে ঠেলে ফেলেছিলেন। কৃষক আফসার আলী সরকারও জানান, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তারা হাজার হাজার লাশ নদীতে ফেলতে বাধ্য হন।

চুকনগরের পাশের গ্রাম রুস্তমপুরের শিক্ষক সরদার মুহাম্মদ নূর আলী গণহত্যার পরবর্তী পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, পুরো এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। দুর্গন্ধের কারণে অনেক লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিন মানুষ ওই এলাকার নদীর মাছ খেত না।

এই গণহত্যায় বহু শিশু বাবা মা হারায়। গণহত্যার পরদিন পাতখোলা বিলের লাশের স্তূপের মধ্যে এক মৃত মায়ের বুকের দুধ পানরত ছয় মাস বয়সী এক শিশুকন্যাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে তার নাম রাখা হয় সুন্দরী। তিনি বড় হয়ে সাক্ষাৎকারে জানান, চুকনগর বধ্যভূমিতে গেলে আজও তার বুক হাহাকার করে ওঠে, কারণ তিনি জানেন না তার প্রকৃত পরিবার কোথায় ছিল।

চুকনগর গণহত্যা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি ছিল নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভয়াবহ উদাহরণ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের সহযোগিতায় সংঘটিত এই হত্যাযজ্ঞ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ট্র্যাজেডি।

বর্তমানে চুকনগরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি বছর ২০ মে শহিদদের স্মরণে স্থানীয় মানুষ, গবেষক, মুক্তিযোদ্ধা এবং শহিদ পরিবার সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে চুকনগর গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চুকনগরের মাটি আজও ১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত দিনের সাক্ষ্য বহন করে। এই গণহত্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের এক নির্মম স্মারক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

তথ্যসূত্র:
১। মুনতাসীর মামুন (সম্পাদিত), ১৯৭১ চুকনগরে গণহত্যা।
২। মুনতাসীর মামুন, চুকনগর গণহত্যা।
৩। রাশেদুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধে খুলনা।
৪। ১৯৭১ গণহত্যা ও নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট।
৫। চুকনগর গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার ও মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!