১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে একদিকে যেমন গৌরবের, অন্যদিকে তেমনি অসংখ্য নির্মম ঘটনার সাক্ষী। এই সময় সারাদেশে বহু গণহত্যা সংঘটিত হয়, যার অনেকগুলো আজও যথাযথভাবে আলোচিত হয়নি। খুলনার ডাকরা গণহত্যা এবং চট্টগ্রামের পরৈকোড়া গণহত্যা তারই দুটি ভয়াবহ উদাহরণ। দুটি ঘটনাতেই নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী, পুরুষ ও শিশুরা নির্মমভাবে প্রাণ হারান।
ডাকরা গণহত্যা:
১৯৭১ সালের মে মাস। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার খুলনা অঞ্চলের বাগেরহাট এলাকার রামপাল উপজেলার পেরিখালী ইউনিয়নে ডাকরা নামে একটি গ্রাম ছিল। গ্রামটি ছিল মূলত হিন্দু অধ্যুষিত। চারপাশে নদী, খাল আর সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা শান্ত এই জনপদে মানুষ কৃষিকাজ আর ছোটখাটো জীবিকা নিয়ে স্বাভাবিক জীবন কাটাত। গ্রামে একটি কালী মন্দিরও ছিল, যা স্থানীয় সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল ছিল।
কিন্তু ১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী। তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর নির্যাতন, লুটপাট ও ভয়ভীতি সৃষ্টি করতে শুরু করে। ফলে বহু পরিবার প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের দিকে, অর্থাৎ ভারতের উদ্দেশে পালানোর চেষ্টা করে।
এই সময়েই ডাকরা গ্রাম এক বিশাল আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। অবিভক্ত বরিশাল জেলার পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা ও বরিশাল সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে এখানে আশ্রয় নেয়। ধারণা করা হয়, তখন সেখানে প্রায় দশ হাজার মানুষ অবস্থান করছিল। সবারই একটাই আশা ছিল, কিছুদিন নিরাপদে থেকে সুযোগ বুঝে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাওয়া যাবে। তবে যে গ্রামকে মানুষ নিরাপদ আশ্রয় ভেবে বেছে নিয়েছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই সেই জায়গাই পরিণত হয় এক ভয়াবহ মৃত্যুকূপে।

সেই দিনটি ছিল ডাকরার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। তৎকালীন বাগেরহাট উপ-বিভাগীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান রাজব আলী ফকিরের নেতৃত্বে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন রাজাকার দুইটি নৌকায় করে ডাকরা গ্রামে আসে। কালীগঞ্জ বাজার অতিক্রম করে তারা মাদারতলী ও কুমারখালী খালের মধ্য দিয়ে খুব সহজেই আশ্রয় নেওয়া মানুষের ভিড়ের কাছে পৌঁছে যায়। তখন গ্রামে হাজার হাজার মানুষ ক্লান্ত, আতঙ্কিত ও অসহায় অবস্থায় ছিল।
নৌকা থেকে নেমেই রাজাকাররা আচমকা, জমায়েত হওয়া মানুষদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। মুহূর্তেই চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। কেউ কেউ প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেয়, কিন্তু সেখানেও তাদের রক্ষা হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, নদীতে ঝাঁপ দেওয়া বহু মানুষকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।
চোখের পলকেই পুরো গ্রাম মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। গুলির শব্দ, মানুষের আর্তচিৎকার, শিশুদের কান্না আর আগুনের ধোঁয়ায় চারদিক ভারী হয়ে ওঠে। বাড়িঘরে লুটপাট চালানো হয়, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয় এবং কিছু নারীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেই দিনের ঘটনায় প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায় বলে বিভিন্ন গবেষণা ও বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। ডাকরা গ্রামের শান্ত পরিবেশ আর কখনোই আগের মতো ফিরে আসেনি।
চট্টগ্রামের পরৈকোড়া গণহত্যা:
একই দিনে দেশের আরেক প্রান্তে, চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকায় ঘটছিল আরেকটি ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। ইতিহাসে যা পরৈকোড়া গণহত্যা নামে পরিচিত। এই অঞ্চলটি ছিল পরৈকোড়া, বাথুয়াপাড়া এবং পূর্ব কন্যারা গ্রাম নিয়ে গঠিত। এখানেও বহু হিন্দু পরিবার বসবাস করত এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় শহর থেকে পালিয়ে আসা অনেক মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছিল।
যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়তে থাকায় এই অঞ্চলের মানুষও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। গ্রামবাসীদের রক্ষায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা পাহারার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এই প্রতিরোধের খবর শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। স্থানীয় রাজাকার ও মুসলিম লীগ নেতা খয়রাতি মিয়া, যার প্রকৃত নাম খায়ের আহমদ চৌধুরী, পাকিস্তানি সেনাদের পথ দেখিয়ে গ্রামে প্রবেশ করতে সহায়তা করে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৭১ সালের ২১ মে সকাল থেকেই পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। চট্টগ্রাম শহর থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বড় বহর ৩৭টি ট্রাক ও সামরিক যান নিয়ে গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। সকাল নয়টা থেকে দশটার মধ্যে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে তারা।
প্রথমে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা কিছুক্ষণ প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। গ্রামবাসীদের কয়েকজনও অস্ত্র হাতে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী অস্ত্রশস্ত্রের সামনে সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি।
এরপর শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মানুষকে বাড়ি থেকে বের করে এনে হত্যা করা হয়। কেউ পালানোর চেষ্টা করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে সেখানেই লুটিয়ে পড়ে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আগুন, ধোঁয়া আর মানুষের আর্তনাদ।

সেদিন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের পরিকল্পিত হামলার সামনে গ্রামের সাধারণ মানুষ একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছিল। বহু পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা সুরজিৎ দাশের পরিবারের একাধিক সদস্যকে সেদিন হত্যা করা হয়। তাঁর বাবা রমনীমোহন দাশও নিহতদের একজন ছিলেন।
এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত বেদনার গল্প। কেউ বাবা হারিয়েছে, কেউ সন্তান, কেউ হারিয়েছে পুরো পরিবার।
ডাকরা ও পরৈকোড়া, দুই জায়গাতেই একই দিনে এমন ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হলেও দীর্ঘ সময় ধরে ঘটনাগুলো জাতীয়ভাবে খুব বেশি আলোচিত হয়নি। স্থানীয়ভাবে স্মরণসভা বা শহীদদের স্মরণ করার কিছু উদ্যোগ থাকলেও জাতীয় ইতিহাসে এই ঘটনাগুলোর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়। কারণ যারা সেদিন নিহত হয়েছিলেন, তারা কেউ যুদ্ধ করতে যাননি। তারা ছিলেন সাধারণ মানুষ, যারা শুধু বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন।
ডাকরা ও পরৈকোড়া গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেই অন্ধকার অধ্যায়গুলোর প্রতিনিধিত্ব করে, যা দীর্ঘদিন ইতিহাসের প্রান্তে পড়ে ছিল। এই ঘটনাগুলোর স্মরণ ও গবেষণা শুধু অতীতকে জানার জন্য নয়, ভবিষ্যতে যেন মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই শিক্ষা নেওয়ার জন্যও জরুরি।
স্বাধীনতার মূল্য কত ভয়াবহ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল, এই ইতিহাস আজও আমাদের তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র:
১। জামাল উদ্দীন। আনোয়ারায় একাত্তর, গণহত্যা ও মুক্তিযোদ্ধা। চট্টগ্রাম: বলাকা প্রকাশন, ৪০ মোমিন রোড, কদম মোবারক মার্কেট।
২। প্রতিবেদক, নিজস্ব। “স্বাধীনতার ঘোষণা, প্রতিরোধ ও গণহত্যা”। প্রথম আলো। ৪ নভেম্বর ২০২০ তারিখে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ: ৪ নভেম্বর ২০২০।




