ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃতি ও সাহিত্যে গঙ্গাসাগরসঙ্গম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাতীর্থ। অতি প্রাচীনকাল থেকেই অধ্যাত্ম পথের সাধক, মুনিঋষি ও সাধুসন্তরা গঙ্গার তটভূমিতে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের পরম প্রাপ্তি লাভ করে চলেছেন। একারণে সুদূর অতীত থেকে গঙ্গার উভয় তীরে অগণিত মঠ, মন্দির, দেবালয়, তীর্থক্ষেত্র গড়ে উঠেছে। শাস্ত্র বলে যে, গঙ্গাতীরে যাগ-যজ্ঞ, শাস্ত্রপাঠ, দান, তপস্যা, জপ, শ্রাদ্ধকৃত্য, দেবতা পূজন ইত্যাদি যা কিছু অনুষ্ঠিত হয়, তা নাকি কোটিগুণ ফল প্রদান করে। তাই গঙ্গার পবিত্রতায় আকৃষ্ট হয়ে সেই অতীত থেকেই সাধুসন্তরা গঙ্গার পুণ্য তটভূমিতে আশ্রয় গ্রহণ করে চলেছেন।
অন্যদিকে মহর্ষি কপিল দেবের সাধনার পাদপীঠও হল এই গঙ্গাসাগরসঙ্গম। প্রাচীনকাল থেকেই এই সুপ্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র সাধুসন্ন্যাসী ও ধর্মপ্রাণ মানুষের এক মহান তীর্থস্থান। বাংলার ভৌগলিক সীমারেখার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত নদী ও সমুদ্র বিধৌত নিম্নভূমিই গঙ্গাসাগরসঙ্গম নামে সাধারণের কাছে পরিচিত। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এখানেই ধ্যানরত কপিলদেবের হুঙ্কারে একসময়ে নাকি সগর রাজের ৬০ হাজার সন্তান ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিলেন। এরপরে সগর সন্তানদের সন্ধানে আগত অংশুমানকে কপিলমুনি বলেছিলেন যে, যদি পুণ্যতোয়া গঙ্গাদেবী এসে তাঁদের অভিষিক্ত করেন, তাহলেই তাঁরা মুক্ত হতে পারবেন। অতঃপর সগররাজ, অংশুমান ও দিলীপ বহু তপস্যা করে উর্দ্ধলোক থেকে গঙ্গাকে ধরাধামে নামিয়ে কপিলদেবের আশ্রমের কাছে সাগর তীরে নিয়ে এলে, মুনিবর নিজে গঙ্গাদেবীকে স্বাগত জানিয়ে তাঁর কাছে সগর সন্তানদের দুর্গতির কথা ব্যক্ত করেছিলেন। এরপরে ত্রিলোকপাবনী গঙ্গাদেবী নিজের পবিত্র জল দিয়ে ভস্মীভূত সগর সন্তানদের দিব্য গতি প্রদান করলে পবিত্র গঙ্গা জলের স্পর্শে সগর সন্তানরা অভিশাপ মুক্ত হয়েছিলেন। সেই শুভ্র বালুকাযুক্ত সুবিস্তৃত বেলাভূমি, নিকটে সবুজ বনানী ও সীমাহীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য সম্ভারে সজ্জিত ভূমিই হল এখনকার গঙ্গাসাগরসঙ্গম।
তবে গঙ্গাসাগরসঙ্গম মহাতীর্থ একবার বা একদিনের জন্য নয়, বরং বলা হয় যে, গঙ্গাসাগরসঙ্গম হল নিত্য মহাতীর্থ। কেননা গঙ্গাসাগর মহাতীর্থের মাহাত্ম্য অপরিসীম, অনির্বচনীয় এবং অপরিমেয়। স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে যে, মানুষ সবতীর্থ দর্শন, দান, তপস্যা, দেবপূজা ও যজ্ঞাদিতে যেসব ফল লাভ করে থাকেন, সেসব শুধুমাত্র গঙ্গসাগর সঙ্গমে স্নান করেই লাভ করা সম্ভব—
“লভতে পুরুষঃ সর্ব্বং স্নাত্বা সাগর সঙ্গমে।”
অন্যদিকে পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে যে, কলিযুগে শুধুমাত্র গঙ্গাকে আশ্রয় করাই কর্তব্য—
“কলৌ গঙ্গা সমাশ্রেয়ৎ।”
তাই যাঁরা সশরীরে গঙ্গা স্নানে যেতে অসমর্থ, তাঁরাও যদি—
“গঙ্গা গঙ্গেতি যো ব্রুয়াৎ যোজনাং শতৈরপি।
মুচ্যন্তে সর্ব্ব পাপেভ্য বিষ্ণুলোকং স গচ্ছতি॥”
অর্থাৎ— কেউ যদি ভক্তি শ্রদ্ধা সহকারে শত যোজন (৮০০ মাইল) দূরে বসেও ‘গঙ্গা গঙ্গা’ বলে ডাকেন, তাহলেও তিনি সবধরণের পাপ থেকে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুর লোকে গমন করবেন।
আর অতীত থেকেই এই গঙ্গাসাগর মেলার প্রধান আকর্ষণ হল কপিল দেবের মন্দির। এই কপিলদেব পদ্মাসনে যোগারূঢ় অবস্থায় উপবিষ্ট রয়েছেন। তাঁর বাঁ হাতে রয়েছে কমণ্ডুল, ডান হাতে রয়েছে জপমালা, আর তাঁর শিরোদেশে পঞ্চনাগ ছত্রবৎ অবস্থিত। কপিল দেবের দক্ষিণে রয়েছে গঙ্গাদেবীর বিগ্রহ। ইনি চতুর্ভুজা এবং মকর বাহন। তাঁর শ্রীহস্ত সমূহে শঙ্খ, পদ্ম, অমৃতকুম্ভ ও বরাভয়। সম্মুখে মহাতাপস ভগীরথ। আর কপিল দেবের বিগ্রহের বাঁ দিকে সগর রাজ ভক্তি বিনম্র চিত্তে করজোড়ে অবস্থানরত।
অতীত থেকেই মকর সংক্রান্তি দিবসে পুণ্যার্থীরা এই গঙ্গাসাগরসঙ্গমে মহাস্নান করে আসছেন। এদিন এখানে গঙ্গাস্নান, গঙ্গাপুজো, গঙ্গায় তর্পন ইত্যাদি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভক্তির সাথে অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই মেলা কবে থেকে চালু হয়েছিল, অর্থাৎ—সময়ের হিসেবে এই মেলার কোনও সাল তারিখ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। অথচ ভারতের যত প্রাচীন পুঁথি, পুরাণ বা গ্রন্থ রয়েছে, সেগুলির প্রায় সবগুলিতেই এই মেলার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, গঙ্গাসাগর মেলা হল কুম্ভ মেলার পরে এদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা, এবং অন্যতম প্রাচীন মেলা।
কিন্তু, গঙ্গাসাগরে যাঁর আশ্রমকে ঘিরে সেই অতীত থেকেই এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, সেই কপিল আদতে কে ছিলেন? তাঁর মহাত্ম্য কি শুধুমাত্র সগর রাজার পুত্রদের ভস্মিভূত করবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? কেন তাঁকে এদেশ ও হিন্দুধর্মালম্বীরা আজও মনে রেখেছেন? পুরাণে নয়, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় প্রাচীন ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের ইতিহাসে।
আসলে জাহ্নবীর পুণ্যধারা গৌড়ের অভ্যন্তরভাগ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে গৌড় জনপদকে কোনদিনই আর্যবাসের অনুপযুক্ত জায়গা বলে মনে করা হয় নি। বরং গৌড়-বাংলার ত্রিবেণী ও গঙ্গাসাগর সেই স্মরণাতীত কাল থেকেই একটি পবিত্র তীর্থস্থান বলে স্বীকৃতি পেয়েছে; যুগ-যুগান্তর ধরে ভারতের অসংখ্য নরনারী এসব তীর্থক্ষেত্রে সমবেত হয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিজেদের অর্ঘ্য প্রদান করেছেন।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে বেদোত্তর যুগের কোনও একসময়ে এখানকার সরস্বতী নদীর (এই নামের তিনটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনীর মধ্যে প্রথমটির অবস্থান পাঞ্জাবে, দ্বিতীয়টির রাজস্থানে এবং তৃতীয়টির গৌড়ের হুগলি জেলায়) তীরে অবস্থিত একটি পর্ণকুটীরে মুনিবর কর্দম বাস করতেন। তাঁর স্ত্রী দেবাহুতির গর্ভে ন’টি কন্যা ও একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে তাঁদের জ্যেষ্ঠা কন্যা কলার রূপের যেমন কোন তুলনা ছিল না, তেমনি তাঁদের পুত্র কপিল আবার অসাধারণ প্রতিভাবান ছিলেন। নিজের যৌবনে পদার্পণ করবার পরে তিনি যে নতুন দর্শনের প্রবর্তন করেছিলেন, আজও তা হিন্দুদের সামাজিক জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।
কপিল একাধারে একজন বিজ্ঞানবিদ ও দার্শনিক ছিলেন। তিনিই প্রথম ঘোষণা করেছিলেন যে, বস্তুর যেমন বিনাশ নেই, তেমনি এর উৎপত্তিও নেই। সকল পদার্থই হল অবিনশ্বর। আজ তুমি দেখছো যে কোন বস্তু তোমার সম্মুখ থেকে লোপ পেল। কিন্তু ভেবো না! কারণ, কাল হোক বা পরশু হোক, অন্য রূপে তা ধরাপৃষ্ঠে আবার আবির্ভূত হবেই। পদার্থ রূপান্তরিত হয়, কখনো লোপ পায় না। মহর্ষি কপিলের এই তত্ত্বজ্ঞানই পরবর্তীসময়ে এদেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণার একেবারে গোড়ার কথা হয়ে উঠেছিল। আশ্চর্যের বিষয় হল যে, ঋষি হয়েও এই মহাবৈজ্ঞানিক ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রতি কোনভাবেই আস্থাশীল ছিলেন না। তাই তাঁর সাংখ্যদর্শনে ঈশ্বরের কোন জায়গা হয়নি বলেই লক্ষ্য করা যায়। বরং তিনি বলেছিলেন যে, সবাই বলে সর্বভূতে ঈশ্বর বিরাজমান—তিনিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা; যদি তাই হয়, তাহলে তাঁর স্রষ্টা কে? আর তিনি যদি সবার ঈশ্বর হন, তাহলে একজন সুখী ও অন্যজন অসুখী হয় কেন?
“প্রমাণাভাবাৎ ন তৎ সিদ্ধিঃ” (সাংখ্যসূত্র, ৫।১০)
প্রমাণের অভাবে তাঁকে সিদ্ধ করা যায় না। কোন প্রমাণ তোমরা দেবে? তোমরা কেউ তাঁকে স্বচক্ষে দেখেছ? আর কেউ দেখেছে? অতএব তাঁকে প্রত্যক্ষসিদ্ধ বলা চলে না। অনুমান দিয়েও তাঁর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। সকল অনুমানের ভিত্তি থাকা চাই। জ্ঞাত কোনও বস্তুর সঙ্গে সম্বন্ধ নেই, এধরণের বস্তুর অনুমান করা কখনোই সম্ভব নয়। এমন কোন বস্তু তোমাদের জানা আছে, যেটার সঙ্গে ঈশ্বর সম্বন্ধযুক্ত হয়ে রয়েছেন? তাই এক্ষেত্রে তিনি অনুমানসিদ্ধ নন। তাহলে তিনি কি আপ্তসিদ্ধ? না, সেটাও নন। শ্রেষ্ঠতম আপ্তবাক্য তো বেদ। কিন্তু বেদে ঈশ্বরের প্রসঙ্গ থাকলেও প্রকৃতিই যে শ্রেষ্ঠতর—একথা তো ভালভাবেই প্রতিপন্ন করা হয়েছে। তোমরা কল্পনা দিয়ে ঈশ্বরের সৃষ্টি করেছ, আবার কল্পনা দিয়েই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছ। তাই জিজ্ঞাসা করি যে, তোমাদের কল্পিত এই ঈশ্বর বদ্ধ না মুক্ত? যদি তিনি বদ্ধ হন, তাঁকে অনাদি অনন্ত বলা হয় কেন? যদি তিনি মুক্ত হন, তাহলে তিনি কিসের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত জীব সৃষ্টি করছেন? ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে যখন এত সংশয় রয়েছে তখন তাঁকে নিয়ে মাথা ঘামাবারই কি দরকার? তাঁকে স্বীকার না করলে ক্ষতিই বা কি? জীবের প্রয়োজন তো মুক্তি। আর সেই মুক্তি আসে সম্যকজ্ঞান লাভ করলে, বিবেক সাক্ষাৎ হলে। এক্ষেত্রে ঈশ্বরের স্বীকারে বা অস্বীকারে কি আসে যায়? হয়ত তিনি আছেন, হয়ত বা নেই। তাঁর প্রসঙ্গ ত্যাগ করে নিজেকে জানতে শেখো, হৃদয় শুদ্ধ রাখো, জীবহিংসায় বিরত থাকো, সামবেদ গাও। একদিন না একদিন তুমিও সেই অনন্তের মাঝে বিলীন হবে। তখন তোমার মুক্তি, কিন্তু তার আগে নয়।
যে যুগে অশ্বের হ্রেষায় আর হস্তীর বৃংহিতে, অসির ঝঞ্চনায় আর ধনুর টঙ্কারে, রথের ঘর্ঘর আর পথের কল্লোলে, বীণার সঙ্গীত আর নূপুর ঝঙ্কারে রাজপথ মুখরিত হত, এবং এসবেরই অদূরে নির্বাক শান্ত স্নিগ্ধ সংযত গম্ভীর উদার তপোবনের মাঝে ঋষিরা তপস্যায় রত থাকতেন, সেযুগে যে কপিলদর্শনের উদ্ভব ঘটেছিল, এমন কথা এখন কল্পনা করাও শক্ত বলে বোধ হয়। এমনকি ঈশ্বরবিশ্বাসী যেকোন মানুষের পক্ষেই কপিলের নাস্তিকবাদকে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু অন্যদিকে আবার তাঁর বিরাট প্রতিভাকেও উপেক্ষা করা চলে না। তাই প্রাচীনযুগে দার্শনিকেরা—বিশেষতঃ হিন্দু দার্শনিকেরা, কপিলকে নিয়ে যথেষ্ট অস্বস্তি বোধ করেছিলেন।
অন্যদিকে, যদিও সাংখ্যাচার্য্যরা গোড়ার দিকে তাঁর অনুজ্ঞাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁদের মনেও সংশয় দেখা দিয়েছিল। আর একারণেই পরবর্তীসময়ে কপিলদর্শনের শ্রেষ্ঠতম ভাষ্যকার বিজ্ঞানভিক্ষু ঘোষণা করেছিলেন যে, সাংখ্য শব্দের অর্থ যখন সম্যক বিবেক দ্বারা আত্মজ্ঞান লাভ, তখন সর্বভূতের উপরেও যে একজন ঈশ্বর রয়েছেন—একথা স্বীকার না করে কোন উপায় নেই। তবে একইসাথে তিনি এটাও জানিয়েছিলেন যে, এই ঈশ্বর ‘অপ্রমেয়’, অর্থাৎ—প্রমাণের উর্দ্ধে। ঈশ্বরাসিদ্ধে। তারপরে পাতঞ্জলি আরো একধাপ এগিয়ে পুরাপুরি ঈশ্বরবাদী হয়ে উঠেছিলেন; এবং তাঁর হাত ধরে সাংখ্যদর্শনে ঈশ্বর উচ্চ স্থান পেয়েছিলেন। এরপরে যদিও শঙ্করাচার্য্য তাঁকে সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু তবুও তিনিও কপিলকে উপেক্ষা করতে পারেন নি।
আসলে কপিল একজন যুগমানব ও মহর্ষি ছিলেন। তাই তিনি ঈশ্বরকে অস্বীকার করলেও উচ্ছশৃঙ্খলাকে কখনোই সমর্থন করেন নি। বরং প্রাচীন ভারতের আস্তিকদের মতোই তিনিও সবাইকে মুক্তিপথের সন্ধান দিয়েছিলেন। আর একারণেই পরবর্তীসময়ে শঙ্করাচার্য্য ঘোষণা করেছিলেন যে, কপিলের নিরীশ্বর সাংখ্য ও পাতঞ্জলির সেশ্বর সাংখ্যের লক্ষ্য যখন একই, তখন এই উভয় সাংখ্যই সমর্থনযোগ্য। এরমধ্যে কপিলের মত ছিল আত্মজ্ঞান দ্বারা মুক্তির প্রতি, আর অন্যদিকে পাতঞ্জলির মত ছিল যোগ প্রভাব দ্বারা মুক্তির প্রতি। তাই শঙ্করাচার্য্য মতপ্রকাশ করেছিলেন যে, কপিল হলেন বাসুদেব, আর পাতঞ্জলি হলেনঅনন্ত।
বস্তুতঃ শঙ্করাচার্য্যের এসব বাখ্যায় মুগ্ধ হয়েই এদেশের জনসাধারণ পরবর্তীকালে কপিলকে বাসুদেবের অবতার বলে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন, এবং তাঁর মধ্যে বহু অলৌকিক শক্তি আরোপিত করা হয়েছিল। কিন্তু নিজের জীবদ্দশায় তিনি এধরণের কোন স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন না। কারণ, সেসময়ে ঈশ্বরবাদীদের কোপদৃষ্টি এড়াবার জন্যই সম্ভবতঃ তাঁকে আসুরি প্রমুখ শিষ্যসহ লোকালয় থেকে বহু দূরে সরে যেতে হয়েছিল। তাই তখন গৌড়ের একেবারে শেষপ্রান্তে গঙ্গাসাগর সঙ্গমে তাঁর আশ্রম তৈরি হয়েছিল, আর ষড়দর্শনের অন্যতম দর্শন সাংখ্যসূত্র এখান থেকেই প্রথম প্রচারিত হয়েছিল। তবে এসব হল এখন থেকে প্রায় চারহাজার বছর আগেকার কথা। কিন্তু আজও প্রতি পৌষ সংক্রান্তিতে অসংখ্য নরনারী গঙ্গাসাগরে সমবেত হয়ে এই মহামুনির উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রণতি জানিয়ে থাকেন। আর এভাবেই প্রাচীন ভারতে ঈশ্বরের অস্তিত্বের উপরে প্রশ্ন তোলা এক মহাজ্ঞানী বর্তমানে নিজেই প্রায় ঈশ্বরে পরিণত হয়ে গিয়েছেন বলে দেখতে পাওয়া যায়।
এত গেল কপিল মুনির কথা। কিন্তু যে বিশেষ দিনটি, অর্থাৎ—মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তি বা পৌষ পার্বণ, হিন্দু বাঙালির লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে এর তাৎপর্য ও বিশেষত্ব কি?
ঐতিহাসিকদের মতে—অম্বুবাচী, ইতু, নবান্ন ও পৌষ-পার্বণ—এই চারটি পার্বণই সংশয়বিবহিতভাবে শস্য উৎসব-ভিত্তিক ধর্মধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। উর্বরতা-কেন্দ্রিক ধর্মধারার ক্ষেত্রে নারী ও ধরিত্রী সমার্থবোধক বলে গণ্য হওয়ার ফলে, সুদূর অতীতে যেসব সংস্কার সৃষ্টি হয়েছিল, অম্বুবাচী সেগুলির মধ্যে সবিশেষ উল্লেখনীয়। নতুন বর্ষার মুখপাতে পৃথিবী যখন প্রথম সিক্ত হয়ে ওঠে, তখন পৃথিবীকে প্রথম ঋতুমতী নারীরূপে গণ্য করবার আদিম সংস্কারই অম্বুবাচী পার্বণের উৎস। ঋতুর ঠিক পরবর্তী দিনগুলি যেমন নারীর পক্ষে সন্তান-ধারণের জন্য প্রশস্ততম বলে মনে করা হয়, ঠিক তেমনভাবেই অতীতে অম্বুবাচীর পরবর্তী সময়টাকে ফসল ফলানোর জন্য সবথেকে শ্রেয়কাল বলে মনে করা হয়েছিল। উড়িষ্যা রাজ্যে এই পার্বণটিকে পরিষ্কারভাবে ‘রজোৎসব’ বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। আসামের কামাখ্যা মন্দিরেও এই উপলক্ষ্যে দেবীর ঋতুকাল সমাগত বলে মনে করে প্রতিবছর উৎসব পালন করা হয়। সূর্যের দক্ষিণায়ণের দিন থেকে শুরু করে তিনদিন (আষাঢ় মাসের ৭ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে এর শুরু) পর্যন্ত এই পার্বণের পালনকাল। এই ক’টি দিন জমিতে লাঙ্গল দেওয়া বা বীজ বোনা ঠিক সেই কারণেই নিষিদ্ধ, যে কারণে ঋতুকালে নারীর পুরুষ-সংসর্গ নিষিদ্ধ। (ভাষাতাত্ত্বিকরা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, পুরুষবাচক শব্দ ‘লিঙ্গ’ এবং কৃষিযন্ত্র ‘লাঙ্গল’ একই উৎসজাত।) এই ‘সংযম’ পালন করবার সূত্র ধরেই পরে উপবাস এবং অরন্ধনের প্রথা আরোপিত হয়েছিল। বিধবার ক্ষেত্রে এই ‘সংযম’ পালনটা সেই সামাজিক-মানসিকতা থেকেই এসেছে, যেটার আরেক অভিব্যক্তি একাদশী পালনের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। তবে অতীতে অম্বুবাচীর মূল উপলক্ষ্যের সঙ্গে এসবের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক ছিল না। বরং আসাম ও উড়িষ্যায় (সেখানে জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তি থেকে তিনদিন এই পার্বণ পালিত হয়) এই ক’দিন উৎসবের আবহাওয়াই থাকে।
প্রাচীনকাল থেকে নতুন ফসল ওঠবার সময়ে যে কতগুলি কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব প্রচলিত ছিল, সেগুলির মধ্যে, অন্ততঃ পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু অঞ্চলে ইতুব্রত এখনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে। ইতু হল ‘ঋতু’–র স্খলিত উচ্চারণজাত রূপ। যদিও কেউ কেউ ইতুপুজোকে সূর্য-উপাসনা বলে থাকেন, তবুও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের ছাত্র মাত্রেই এই পার্বণের রীতি ও উপচারগুলিকে বিশ্লেষণ করে ইতুকে মাতৃকাদেবী রূপেই গণ্য করেন বলে দেখা যায়। ঘটের গায়ে পুতলি আঁকা এবং ভিতরে শস্যদানা ও তৃণগুচ্ছ রাখা—একইসঙ্গে মাতৃপ্রতীক আর প্রতীকী শস্যক্ষেত্রের (জেমস ফ্রেজার সারা পৃথিবীর শস্য-উৎসবেই এই একই ধরণের রীতি এবং উপচার দেখে এটিকে ‘গার্ডেন অব অ্যাডোনিস’ নাম দিয়েছিলেন) স্বরূপ। কার্তিক সংক্রান্তি থেকে শুরু করে অগ্রহায়ণ-সংক্রান্তি পর্যন্ত ফসলী ঋতুর ভরাভরন্ত সময়কাল অবধি প্রতি রবিবার যেহেতু ঐ ঘটপুজা করা হয়, সেহেতু রবি তথা সূর্যই ইতু এমন একটা ধারণা হয়েছে। ফার্টিলিটি কাল্টের সঙ্গে সূর্যের একটা যোগসূত্র রয়েছেই। কিন্তু সেটা বলে ইতুই যে সূর্য, এমন কিন্তু নয়। সূর্য ওরফে বৈদিক ‘মিত্র’ দেবতা উচ্চারণের অপভ্রংশে ‘ইতু’ হয়ে গিয়েছেন, এমন ভাবনাও নেহাৎই দূরান্বয়ী। অগ্রহায়ণ মাসের শেষে ফসল ঘরে উঠে গেলে ইতুর ঘট ভাসিয়ে দেওয়ার রীতি, এই পার্বণটির মাতৃকারূপকেই বেশি করে সূচিত করে।
ইতুপুজো এবং নবান্ন উৎসব একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, এমনকি এগুলির চরিত্রও যে মূলতঃ একই, একথা ‘নবান্ন’ নামটি থেকেই প্রকাশ পায়। এই উপলক্ষ্যে নতুন আমন ধান ওঠবার পরে সেটার থেকে পাওয়া চাল নিজেরা খাওয়ার আগে পিতৃপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে রন্ধনশেষে নিবেদন করবার প্রথা প্রচলিত রয়েছে। এদিক থেকে দেখলে এটি মহালয়ায়ই সমধর্মী একটি পার্বণ। মনে করা হয় যে, পিতৃপুরুষ কাকের রূপ ধরে এসে ‘নবান্’–এর অংশ গ্রহণ করে যান; এই কাক রূপধারী পূর্বপুরুষের কল্পনা নিঃসন্দেহে এক ধরনের টোটেম ভাবনা। এই উৎসবে শাঁখ বাজিয়ে পূর্বপুরুষের আত্মাকে আহ্বান করবার প্রথা চালু রয়েছে। নতুন ধান, নতুন গুড় এবং দুধ—নবান্নে নিবেদিত খাদ্যের প্রধান উপকরণ। নবান্ন উৎসব পালনের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ বা তিথি নেই; ক্ষেতের ফসল গোলাজাত করবার সময়ে যেকোনো দিনই এই উৎসব পালন করা যেতে পারে, যদিও পাঁজির বিধান অনুসারে কোন শুভদিন দেখেই মেয়েরা নবান্ন মাখেন। এইসময়ে তৈরি করা খাদ্যটিকে সাধারণভাবে মেয়েরা খুবই পবিত্র বলে মনে করে থাকেন, এবং এটির মধ্যে তাঁরা খানিকটা দৈবীগুণও কল্পনা করে থাকেন। সেই কারণে স্নান সেরে শুচিস্নিগ্ধ অবস্থায় নবান্ন স্পর্শ করবার লৌকিক বিধান রয়েছে। বিশেষ বিশেষ শারীরিক অবস্থায়, ঐ দৈবীপবিত্রতা আরোপ করবার কারণে নবান্ন স্পর্শ করবার ট্যাবুও (নিষেধাত্মক ধর্মীয় সংস্কার) প্রচলিত রয়েছে। তবে অন্য কেউ হাতে তুলে দিলে সেটাকে নিজের জন্য গ্রহণ করতে কোনো বাধা নেই। স্পষ্টতঃই নবান্নকে খাদ্য-দেবতারূপে গণ্য করা হয়ে থাকে। পূর্বপুরুষের আত্মা কাকরূপে নবান্ন গ্রহণ করে গেলে বাকি খাদ্যটা তাঁদের প্রসাদরূপেই গণ্য হয়। পিতৃপুরুষের আত্মা সেখানে দেবকল্প। এখানে যে ব্যাপারটা আকর্ষণীয় সেটা হল—নবান্ন, একইসঙ্গে দেবতার প্রসাদ এবং দেবতা-কল্প। এধরণের সংস্কারের বিমিশ্রণ কিন্তু নিতান্তই দুর্লভ।
নবান্নে পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধের অংশটুকু ছাড়া অনুষ্ঠানের বাকিটুকুর সবই প্রায় মেয়েদের করণীয়। এই শ্রাদ্ধও সচরাচর পুরোহিত ছাড়াই করা হয়ে থাকে; মহালয়ার তর্পণের সঙ্গে এদিক থেকেও নবান্নের ভাবসাযুজ্য রয়েছে। সারা বছর ধরে শস্যকে কেন্দ্র করে যত রকমের উপলক্ষ্য বাঙালি হিন্দুর সংসারে আবির্ভূত হয়, সেগুলোর মধ্যে নবান্নের একটা বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, যেটার অনুষঙ্গ ধরে এর কিছু পরেই আরেকটি পার্বণ উপস্থিত হয়, সেটা হল পৌষপার্বণ।
ক্ষেত থেকে নতুন শস্য ঘরে উঠবার পরে আনন্দোৎসব করবার রেওয়াজ বিশ্বজনীন এবং সেটার বয়সও প্রায় কয়েক হাজার বছর। কৃষির উদ্ভবের পর থেকেই এই শস্য-উৎসবের ধারা পৃথিবীর সমস্ত দেশে এবং সমাজে প্রচলিত হয়েছে। বাঙালির পৌষ-সংক্রান্তি উৎসব সেই বিশ্বজনীন ঐতিহ্যেরই ধারাবাহী। এই একই তিথিতে দক্ষিণভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সেখানকার অন্নোৎসব ‘পোঙ্গল’ পালিত হয়। এই দিনই আসামের মাঘ-বিহু উৎসবেরও মুখবন্ধ ঘটে। গুজরাটে একইদিনে শস্যোৎসব পালনের অনুষঙ্গ হিসেবে সূর্য পূজার দ্যোতকস্বরূপ ঘুড়ি উড়িয়ে আনন্দ করবার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এই বিশেষ দিনটিতেই কেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে মূলতঃ যে যে জায়গার প্রধান খাদ্যই হল ভাত—আনন্দ উৎসবের প্রথার প্রচলন হয়েছে?
খুব সম্ভবতঃ গুজরাটি রীতির মধ্যেই উৎসবটির ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বর্তমান সময়ে সূর্যের উত্তরায়ণ মাঘের শেষ সপ্তাহে ঘটলেও হাজার দু’য়েক বছর আগে সেই তারিখটি কিন্তু পৌষের শেষেই ছিল। সেই প্রাচীন আমল থেকেই কালচক্রের পরিবর্তনের পটভূমিতে এই উৎসব সম্ভবতঃ সেইসব অঞ্চলে পালিত হতে শুরু হয়েছিল, যেখানে আমন ধান ফলে এবং ততদিনে গোলায় উঠে যায়। সূর্যের ঐ কক্ষ-পরিবর্তনের উপলক্ষ্যে তার উদ্দেশ্যে প্রণতি নিবেদনের প্রতীক ছিল ঘুড়ি ওড়ানো; প্রাচীন বিশ্বাস-অনুযায়ী যা মানুষের ভক্তির অর্ঘ্যকে সূর্যের কাছে পৌঁছে দেয়। সূর্যের সঙ্গে শস্যের সম্পর্কের কথা সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ভেবে এসেছে। এই উত্তরায়ণ ওরফে মকরসংক্রান্তির উপলক্ষ্যেই গঙ্গাসাগরের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানকার কপিলমুনির পৌরাণিক গল্পের ভিত্তি যেটাই হোক না কেন—মকরবাহিনী গঙ্গাকে শিবের জটা থেকে মুক্ত করে ঐ তিথিতে ভগীরথ পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলেন—প্রাচীন হিন্দুরা এমন কল্পনা করেই পুরাণ-বৃত্তান্ত তৈরি করেছিলেন। ‘মকর’ নামটির ভাবানুষঙ্গেই যে এই ভাবনার উদ্ভব হয়েছে, এবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই তারিখে পূর্ববঙ্গে বাস্তপূজার যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে, সেখানে (মকরের বিকল্প হিসেবে) মাটির কুমিব বলি দেওয়ার রীতিও সম্ভবতঃ এই আদিম ভাবনার সূত্রবাহী।
তবে শুধু কুমিরই বা কেন? বরিশাল অঞ্চলে এই পৌষপার্বণের দিন গৃহদেবতা তথা বাস্তুদেবের পূজা উপলক্ষ্যে ব্যাঘ্রবাহিনী কুলাই দেবীর আরাধনার সময়ে দুটি করে মাটির কুমিরের সঙ্গে একটি বাঘের মূর্তিও দেখতে পাওয়া যায়। অতীতের কোন একসময়ে ছেলেরা সেখানে দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাঘের এবং ধান তোলার বিষয়ে বিভিন্ন ছড়া কেটে খাবার জোগাড় করতেন। পশ্চিম বাংলাতেও কিছু-কিছু এলাকায় একইভাবে পোষলা উৎসবের শেষদিনে কুলুই ঠাকুরের পুজোয় ঐ একই রকমের বাঘ ও ধান-সম্পৃক্ত ছড়া আওড়ানোর প্রথা চালু রয়েছে। ময়মনসিংহ জেলায় এই ছড়ার আঞ্চলিক নাম হল ‘বাঘাইয়ের বয়াৎ’। নদীয়া জেলাতে অনুরূপ ছড়া ও গানকে ‘হোলবোল’ কিংবা ‘হলুই গান’ বলা হয়ে থাকে। এধরণের প্রথা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলেও প্রচলিত রয়েছে। রংপুরের ব্যাঘ্রবাহন জোড়া দেবতা ‘সোনা-উপো’ বা সোনা রায়-রূপা রায়েরও এই পৌষালী সংক্রান্তিতে পুজো উপলক্ষ্যে বাঘের তুষ্টিবাচক কথাবার্তা বলে ছড়া কাটা হয়ে থাকে। কিন্তু শস্য উৎসবের সঙ্গে পশুর এবং পশুর দেবতার এই যোগাযোগটা সারা বাংলা জুড়ে কেন যে হয়েছে, সেটা ইতিহাসের দিক থেকে একটা আকর্ষণীয় প্রশ্ন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফসল কাটবার সময়ে সেখানকার কৃষকদের আদিম সংস্কার অনুযায়ী শস্যগুচ্ছকে নানাধরনের পশুরূপে কল্পনা করা হয়ে থাকে। এই প্রথা না হয় কোন আদিমতর সংস্কারকে (অতীতে প্রথমে পশুই মানুষের খাদ্য ছিল, এখন ফসল খাদ্য—সুতরাং পশু ও ফসল এখানে সমার্থক) অনুসরণ করেই গড়ে উঠেছে; কিন্তু বাংলায়? বাঘ বা কুমির তো কোনকালেই মানুষের খাদ্য ছিল না, পৃথিবীর সর্বত্রই সেগুলি খাদক হিসেবে পরিচিত। তাহলে? এই হেঁয়ালির উত্তর একটি বাংলা প্রবাদে পাওয়া যায়—‘মাঘের শীতে বাঘে পালায়’। আসলে ফসলী ঋতু মানুষকে অন্ন দিলেও, নিরাপত্তা দিতে পারেনি। সুতরাং, সাপ বাদে অতীতের গ্রাম-বাংলার মানুষের অন্য যে দুটি প্রধান শত্রু ছিল—বাঘ ও কুমির—এগুলির এবং এগুলির অধিষ্ঠাতা দেবতাদের তুষ্টি সাধন করবার জন্যই এসব প্রথার অভ্যুদয় হয়েছিল। অতীতের কোন একসময়ে দল বেঁধে হইচই করে বনভোজন এবং ছড়া-গানের মাধ্যমে বাঘ তাড়ানোটাও হয়ত একটা উদ্দেশ্য ছিল। মাঘের প্রাক্কালে বাঘ পালিয়ে যাবে—এটাই হয়ত সেকালের মানুষের কামনা ছিল। দল বেঁধে ফসল কাটবার পটভূমিতে বাঘ গহীন বনে চলে যাচ্ছে—এমন ছবি মহেঞ্জোদড়োর সীলমোহরের গায়েও খোদাই অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। অতীতের সেই ঐতিহ্যের অনুসরণই ওই আদি-অস্ট্রিক-দ্রাবিড়দের (যাঁরা ধানের সঞ্জাত খাদ্য খেতেন) বংশাবতংস বাঙালিদের মধ্যে আজও প্রবহমান রয়েছে। বাস্তুপুজো উপলক্ষ্যে মাটির কুমির বলি দেওয়াটা, অর্থাৎ হিংস্র পশুকে বধ করে নিরাপদে থাকবার জন্য দেবতার কাছে আশ্রয় নেওয়া—মানুষের আদিমতর ভাবনার ধারাবাহী।
এটা গেল পৌষ সংক্রান্তির বিচিত্র ধরণের উৎসবের একটি দিকের কথা। এই উৎসবের অন্য দিকটির বৈচিত্র্যও কিন্তু কম নয়। পিঠে-পুলি-পায়েস ইত্যাদি অধুনা দুর্লভ খাবারগুলি তৈরি এবং বিতরণ করাও এই পৌষালী উৎসবেরই একটা অঙ্গ পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জায়গায় মকর সংক্রান্তির আগেরদিন ক্ষেত থেকে আমনধানের কেটে নিয়ে আসা গুছিগুলিকে মেয়েরা পূজো করেন, যেটার নাম হল—আওনি-বাঁওনি (আমনী-বাঁধনি)। গ্রাম বাংলায় প্রচলিত এধরণের আরেকটি উৎসব হল পৌষ-আগলানো। তাতে সর্বত্র আলপনা এঁকে গোবরের নাড়ু আর চালের গুঁড়ো পুজো করে সারারাত ধরে সেগুলোকে বিনিদ্রভাবে পাহারা দেওয়ার প্রথাও বিচিত্র প্রাচীন সংস্কারজাত। দুপুরবেলা কুনকের মধ্যে ধান ও ধানের ছড়া ভরে পূজো করে ধান্যলক্ষ্মীর বন্দনা করাটা পূর্ববঙ্গের একটা বিরাট অংশ জুড়ে প্রচলিত রয়েছে। এই একইদিনে তুষ-তুষলি ব্রত উদযাপনও করা হয়ে থাকে। শস্য উৎসব এবং সূর্যবন্দনা—এটির মধ্যে একত্রিত রয়েছে। রাঢ় বাংলার সুবিস্তীর্ণ এলাকায় প্রচলিত টুসু বা তুষু দেবীর পূজাও এই তিথিতেই সাঙ্গ হয়। যদিও টুসুকে পুরোপুরি শস্যদেবী বলা যাবে কিনা—তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। তবে শস্যসম্ভারকে উপলক্ষ্য করেই যে টুসু পরব, এবং পৌষ সংক্রান্তিতেই যে সেটার সমাপ্তি ঘটে, এথেকে এই সিদ্ধান্ত করা মোটেও অসঙ্গত নয় যে, গোটা বঙ্গভূমি জুড়েই এই দিন যে শস্যকেন্দ্রিত উৎসব নানাভাবে পালিত হয়, এটাও সেটারই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। টুসুর সরা, আওনি-বাঁওনির এবং ধান্য লক্ষ্মীর কুনক, পৌষ-আগলানোর চালগুঁড়ো-গোবরের নাড়ু—এগুলো সবই সমান দ্যোতনা বহন করে। ফসল ক্ষেতের এই প্রতীকগুলি সংস্কৃতিবিজ্ঞানে গ্রীক শস্য-দেবতা ‘অ্যাডোনিসের বাগান’ বলেই পরিচিত।
এখন বছর বছর পৌষ-পার্বণ আসে ও চলে যায়, কিন্তু অতীতের মত এই পার্বণ-উৎসবে বাঙালির প্রাণ আর তেমন করে নেচে ওঠে কি? সেই পিঠে-পুলি খাওয়ার আমোদ; সেই পার্বণী গানের লহর; সেই হাসি-ঠাট্টা, ফুলের সাজ, বেশের ঠাঁট আর আছে কি? এখনও আগের মতোই পৌষ-পার্বণের দিনে গঙ্গা-স্নান করবার জন্য ভিড় হয় বটে, এখনও আগের মতোই গঙ্গাসাগরে অত্যধিক যাত্রী সমাগম হয় বটে, কিন্তু আগেকার মত ফুলমালা আর লতাপাতা দিয়ে নৌকা সাজিয়ে নাচ-গান করতে করতে ত্রিবেণী-স্নানে যাওয়ার ধুম দেখতে পাওয়া যায় না। এখন বাঙালির সেই হাসি গিয়েছে, উল্লাস বিদায় নিয়েছে; টিকে রয়েছে শুধু সেকালেব কিছু জড়বৎ বিধি-পদ্ধতি। যেহেতু এই দিন গঙ্গা-স্নান করতে হয়, তাই অনেকে সেই নিয়মটুকু মেনে গঙ্গা-স্নান করেন; বিশেষতঃ অনেক বাড়ির প্রাচীনারা আজও সেই পুরোনো রীতি পরিত্যাগ করতে পারেননি; একারণে, অনেক জায়গাতেই তাঁদের আব্দারে নবীন প্রজন্ম এখনও গঙ্গা-স্নানের আয়োজন করে থাকেন। কিন্তু পৌষ-পার্বণের দিন অতীতের সেই মুখভরা হাসি আর বুকভরা উল্লাস, যেটা তখন বাঙালিদের চোখমুখ দিয়ে ফুটে বের হত—সেটা এখন আর দেখা যায় না। কিন্তু কেন এমন হল? কেন বাঙালির সেই হাসির লহর বন্ধ হয়ে গেল? কেন সেই রসের প্রবাহ শুকিয়ে গিয়েছে?
আসলে এখন বাঙালির হিন্দুয়ানী পরাধীন, সেটা কোন চাকরিজীবীর ধর্ম নয়। বাঙালি যেদিন থেকে চাকরি করতে শিখেছে, সেদিন থেকেই তাঁকে নিজের সামাজিকতা এবং ধৰ্ম-কর্ম জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে। ইতিহাস বলে যে, পৌষ-পার্বণ মূলতঃ কৃষকদের উৎসব। আগে এই সময়ে ক্ষেত-ভরা ধান ঘরে উঠত, কৃষকদের পরিশ্রম সার্থক হত; ঠিকঠাক ফসল হলে পরের বছর অন্নাভাব থাকবে না, দু’মুঠো অন্নের জন্য অন্য কারো দ্বারস্থ হতে হবে না—এই সুখের চিন্তায় বিভোর হয়ে বাঙালি কৃষকেরা তখন পৌষ-পার্বণের আনন্দে মত্ত হয়ে উঠতেন। তখন বাঙালির ঘড়ি ধরে দশটা-পাঁচটার চাকরি ছিল না, পরের মন বুঝে চলবার দায় ছিল না, পরের হুকুম মানতে হত না—পায়ের উপরে পা দিয়ে বাড়িতে বসে থাকা, আর দুধ-ভাত খাওয়া—এসবই তখন বাঙালির কাছে সুখের চূড়ান্ত ছিল। বাঙালিরা তখন শুধু তাঁদের নিজের নিজের আরাধ্য দেবতাকে চিনতেন; দেবতা ছাড়া বাঙালির তখন অন্য কোন সম্বল ছিল না, অন্য কাউকে বাঙালি ভরসাও করত না। সেই দেবতা বিরূপ হলে বাঙালির দুঃখের সীমা থাকত না। অতীতে পৌষ-পার্বণের দিন বাঙালির উপরে দেবতার দয়া বুঝতে পারা যেত, তাই বাঙালি তখন এই বিশেষ দিনে প্রাণ ভরে হাসত। কিন্তু অতীতের কৃষিজীবী বাঙালির যে সুখ ছিল, সেকথা এখনকার চাকুরে বাঙালিরা কিভাবে বুঝবেন? যাঁরা চিরপরাধীন, তাঁরা সারা বছরের স্বাতন্ত্র্যের মহিমা কিভাবে বুঝবেন? তাই অতীতের বাংলার পৌষ-পার্বণের সেই উল্লাস এখন আর দেখতে পাওয়া যায় না। তবে যেসব বাঙালি এখনও চাষ-বাস করেন, নিজের হাতে মা লক্ষ্মীর সেবা করেন, তাঁরা ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গু পীড়িত হলেও, শহরের বাবু সমাজের দ্বারা পরিত্যক্ত হলেও, এখনও নিজেদের আউনী-বাউনীর আমোদ সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাননি। আজও মুসলমান হলেও তাঁরা পিঠা-পুলি খান, দশজনকে ডেকে নিয়ে এসে খাওয়ান, এবং পান-ভোজনের পরম আনন্দে ভরপুর হয়ে থাকেন। তাই এখনও পৌষ-পার্বণের দিন অনেক বাঙালি গঙ্গা-স্নানে যান; এখনও তীর্থক্ষেত্রে ভিড় জমান; এখনও বাঙালির সমাজ-শরীরের ভিতরে যতটুকু সজীবতা রয়েছে, সেটা নড়ে চড়ে হেসে খেলে ওঠে।
চাকরিজীবী শহুরে বাবুরা কৃষিজীবী বাঙালির এই সুখ বুঝতে পারবেন না। তাঁরা কোটি অভাব বিজড়িত নাগপাশে আবদ্ধ দুর্বল জীব। তাঁদের হাল ফ্যাশনের সাজ-পোষাকের জন্য ভাবনা রয়েছে, জুতা-মোজার জন্য ভাবনা রয়েছে, অত্যাধুনিক মোটরগাড়ির জন্য ভাবনা রয়েছে—তাঁদের ভাবনার কি কোন শেষ আছে? যাঁদের এত ভাবনা, তাঁদের প্রাণে কি কখনো সুখ থাকা সম্ভব? যে বিলাসী, সে কি কখনো সুখী হতে পারে, নাকি অন্য দশজনকে সুখী করতে পারে? সামাজিক সুখ কখনোই বিলাসীর উপভোগ্য নয়। তাঁরা যেহেতু এখন শীতের লেপের উষ্ণতা উপভোগ করে সুখনিদ্রায় মগ্ন থাকেন, সেহেতু ভাবতেও পারেন না যে, অতীতে এদিনে কৃষিজীবী বাঙালি হিন্দুরা হাসতে হাসতে কাঁপতে কাঁপতে গঙ্গাস্নানে যেতেন, দশজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন, দশজনে মিলে আমোদ করতে করতে সাগরের জলে স্নান করতেন। এই দিন তাঁরা দেশ-দেশান্তরের সন্ন্যাসী ফকীর গৃহীত্যাগীকে দর্শন করতেন, কাঙ্গাল দুঃখীকে ভিক্ষা দিতেন, নিজের পরকালের জন্য চিন্তা-ভাবনা করতেন, আর যাঁর কৃপায় তাঁর সংসারে সুখ উথলে পড়ত, তাঁকে আহ্বান করে নিজের জীবন ধন্য করতেন। সমাজ-সুখের জন্য কতটা কষ্ট-স্বীকার করতে হবে, কতটা অর্থ ব্যয় করতে হবে, দশজনকে নিয়ে কিভাবে সুখী থাকা সম্ভব—তাঁরা এসবের চিন্তা করতেন। কারণ, শুধু নিজের দেহটাই তো সবকিছু নয়, আর নিজের দৈহিক সুখই সংসারের সার-সুখ নয়। তাই অতীতের বাঙালি হিন্দুরা পৌষ-পার্বণ উপলক্ষে নিজেদের দেহ-সুখকে অবহেলা করে মনের সুখ—সমাজের সুখ অর্জন করবার চেষ্টা করতেন। শুধু দেহ-সুখ দিয়ে কেউ সুখী হতে পারে কি? দেহ তো নানা ধরণের রোগের আস্তানা। রোগ জর্জরিত শরীর নিয়ে কেউ পিঠা-পুলি খাবেন কিভাবে? হিন্দু হতে গেলে যেমন উপবাস করতে জানতে ও শিখতে হয়, তেমনই নিজে খেতে এবং অন্যকে খাওয়াতেও শিখতে হয়। সেই খাওয়ার রকমই বা কত! নিজে রান্না করে স্ত্রীকে অন্নপূর্ণারূপে উনুনের পাশে বসিয়ে, খাদ্য-ভোজ্য তৈরি করে, আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়াতে হয়—তবেই তো খাওয়ার আমোদ ফুটে উঠবে। হিন্দুর মত খেতে ও খাওয়াতে হলে দেহে বল থাকা চাই, জঠরে অগ্নি থাকা চাই, আর হৃদয়ে উল্লাস থাকা চাই। যাঁরা অন্যের হাতে তৈরি করা খাওয়ার খেতে অভ্যস্ত—তাঁদের বাড়ির ভোজে শুধু আর্থিক অহঙ্কারই ফুটে ওঠে, সেখানে অন্নপূর্ণার শ্লাঘা প্রকাশ পায় না। তাঁরা যখন অন্য কাউকে ডেকে এনে খাওয়ান—তখন মনে হয়, অন্যরা বুঝি খেতে পান না! তাই তাঁদের বাড়ির ভোজে শুধু প্রহসনই হয়।
চাকরি করে, দশটা-পাঁচটার অফিসে আবদ্ধ থেকে, সাহেবিয়ানা শিখে—শহুরে বাঙালিরা এখন বাঙালিয়ানা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছেন। তাঁদের জীবনে অতীতের বাঙালির সরল আনন্দের সেই আদর্শ আর নেই। তাঁরা খরচ করতে জানেন না, করতে পারেন না। তাঁদের উপার্জিত সব ধনই নিজেদের দেহের সেবাতেই ব্যয় হয়ে যায়; তাঁরা অন্যকে খাওয়াবেন বা নিজেদের স্বজন-পরিজনদের নিয়ে আমোদ করবেন কিভাবে? আর যদিও বা তাঁরা সেই আমোদ করতেও চান, তাহলেও সেটা করতে গিয়ে তাঁদের টাকার অহঙ্কার এতটাই ফুটে ওঠে যে, তাঁরা মিতব্যয়ীর মত কোন কাজ করতে পারেন না। ফলে, প্রাণভরা আমোদ উপভোগ করা তাঁদের ভোগ্যে জোটে না। সস্তার আমোদ, বাঙালি হিন্দুর আমোদ হল—পৌষ-পার্বণ; চাল, তিল, কড়াই, গুড়, মুগ আর দুধ—এগুলো নিয়েই পিঠা-পুলি তৈরি হয়। কিন্তু এই পিঠা-পুলি গড়তে জানতে হয়, এই ব্যাপারে বাড়ির মহিলাদের উৎসাহী হতে হয়—তবেই এই আমোদ উপভোগ করা সম্ভব। শহুরে বাবুয়ানি ছাড়তে না পারলে, কৃষকের পরিশ্রম বুঝতে না পারলে, আর মোটা-ভাত মোটা-কাপড়ে তুষ্ট হতে না জানলে—ভাগ্যে এমন আমোদ ঘটে না। বাংলার কপাল দীর্ঘদিন আগেই পুড়েছে, তাই পৌষ-পার্বণের আমোদও দীর্ঘকাল আগেই বিদায় নিয়েছে। এই দিন কাউকে না খাইয়ে নিজে খেতে নেই—বাঙালি একথা আবার যেদিন শিখবে আর বুঝবে, সেদিন বাংলার বুকে আবার পৌষ-পার্বণের আমোদ সুবাসিত ফুলের মত ফুটে উঠবে।#




