গীতিকাব্য: নোনা মাটির নোলক (পর্ব- ১২)

মাটির গান গাইতে গাইতে নোনাজলে ভেসে বেড়ায় মদন, ছমির মিঞারা। প্রকৃতি কাড়ে তাদের সুখ- স্বপ্ন- আশা- ভরসা। নোনাস্রোতে ভাঙনের সাক্ষী হয় রোজ রোজ। রাত নামলে ছমিরের চোখে ভাসে মেয়ে গোলাপির মুখ। শোনে বিবির অসহায় কান্না।কালক্রমে বাঁজা হারামনি শোনে নারী জীবনের কাঙ্খিত মা ডাক। নোনা জল শোনায় নিখোঁজ হওয়া মানুষের গল্প। আখ্যান জড়িয়ে বাঁচে বিপন্ন লোকসংস্কৃতি, অলৌকিক বিশ্বাস, গ্রাম্য নরনারীর প্রেম, অকাল শোক। ‘নোনা মাটির নোলক’ বস্তুত সমাজ, লোকসংস্কার ও রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষিতে গ্রামীণ বিভাজনের দৃশ্যলিখন, ভাঙনের গান।

দ্বাদশ পর্ব

মনটা বড্ড কু গাইচেচে জেওনি দুরির বোনে
কি জানি কি বিপোদ আচে খুঁটতেচে এ মনে
কোটাল বাড়লি নদীর বুকি যুবোতী ঢেউ ওটে
মদ্দো যাচ্চে জঙ্গোলের গায় বুকি আঁদার ছোটে।

শোলির ধারে বিরেল কাঁদে অমুঙগুলে ডাক
কদিন ধোরে মাতার ওবর ডাকতেছ্যেলো কাক
ও হারা তুই আগ করিসনি দিই নি যেতিবাদা
বোনবিবি মা সোঙ্গে আচে সজংগুলি দাদা।

বিপদ আপদ বেকার কোতা মনের ঝেতো ভয়
একোন ঝেদি না খাটি তো মরবো অসোময়
যা হোক করে ছানিটারে দিতি হোবা বে
আশপাশির নোক বললি ঝাতা শুনবে তেকোন কে!

ভালোয় ভালোয় যাও মহোলে এগলা কাঁদি কাটি
নৌকো খানা চলবে দেকিস সিইসে বোনের দিকি
বদর বদর তিন বদর আর জয় মা বোনবিবি
শিঙায় দিচ্চে ফুক মেয়েরা বিপদ সেমলে নিবি।

নৌকোর পাটায় পড়ে আচে আন্নার সরোম জাম
মদন মাঝির ভালো গোলা গাইতি পারে গান
ছিটে বাড়ি হাতে ওগার বোন বাদাড়ে ঘোরে
একনাটিতে কোরবে সাবাড় পড়লি হালুম করে।

পকিতি আর কেরোম করে সোজ্য করতি পারে
নোবে পাপ আর পাপে মৃত্যু এগলা নদী মরে
গোরান, হেঁতাল কেটে নে য়ায় ভাঙে মধুর চাক
বাড়ির কোতা ভাবলি পরে আসবে মরার ডাক।

বোনবিবির নাম শ্মরোন করে নামলো বোনির মাজে
পাতায় পাতায় নোনা হাওয়া দুপুর বিকেল সাঁঝে
কালু সোদ্দারের চেয়রা খান বুনো মোষের মোতো
আঙরা চোকি দেকলি তারে ছুটতো ছাবাল যেতো।

বেড়াঘরে আচে এ্যাকোন বাঘ বেধবা বোন
পাড়ার ঝেত হোমরা চোমরা পেতি চায় তার মন
ঘরের বাইরে দেঁইড়ে ছ্যেলো করে দেবে ভাতা
দোরমা ঠ্যেলে খটর খটর গেরামের হই মাতা।

বুকিতেনে সাহস বেঁদে বাইরি বেইরে আসে
অন্দোকারে জায় না দ্যেকা কেউ নি আশপাশে
দিনোমানে ভালো সাজে আতে মাংসোর খোঁজে
চিন্তায় চিন্তায় জের্নো মারা চোকদুটো কি বোজে?

ভালোয় ভালোয় বলতিচি তোর একেন থেকে যা
ঝাড়বো নাকি বোঁটির কোপটা করে দোবো ঘা
ও হেরিনি শোন না কোতা যাবো অনেক ধুর
একেন থেকে অনেক দুরির নামটা অচিনপুর।

আঁদবি বাড়বি গয়না পরবি টানবো ধোরে কাচে
ফুল ফুটবেনে একোন তো আর নেড়া ফুলির গাচে
এট্টু পরে হাঁটার আবাজ যাচ্চে সরে সরে
বোটকা গন্দো শরীর জুড়ে নালসার ঢেউ নড়ে।

বোনের বাগের চে এরাতো হিংসো মানুষ বাগ
ভালো মন্দো বুঝবেনে তো মনে বেজায় আগ
জোরে মারে পেচোন থেকে বাগের ছিটে বাড়ি
ফেটে চৌচির সব্বো শরীর অক্তে ছোড়াছড়ি।

মেগের মদ্যি ফুটে ওটে উগ্নো চাঁদের আলো
টেনে হিঁচড়ে নাশটা তেকোন খালে ফেলে দেলো
আঁদার জলের তোড়ে একোন ভেসে যাচ্চে নাশ
দরদর করে ঘামের জলে, দেকতেচে চারপাশ।

পিতীবিতে চকির আড়ে কতো কি যে ঘটে
আগাশ মাটি ঋণির বোজায় কিস্তি মিটোয় লটে
আত্তিরিতে ঝিঁঝির ডাকে হেইরে যাচ্চে কোতা
জানবেনে কেউ গাঙধারিগার দুক্কু সুকির ব্যেতা।

জোছনা আবার ডাক পেড়েচে দাগি কালো মেগ
হাতটা নাড়লি দাঁড়ের থেকে জেবোন হারায় বেগ
আবছা হয়ে আসতেচে চোক চারদিক অন্দোকার
তারাগুনো কোতায় হারায় আগাশের হই পার।

আতিদিনি নোড়াই করে থাকতি এট্টু ভালো
আঁদার বেশি এই জেবোনে এট্টু খানি আলো
চরের মাটি সোনার খাঁটি ঘরছাড়া জেবোন
কোতায় যাবে পেইলে ওরা চৌদিকি মরোণ।

চলবে…

Facebook
Twitter
LinkedIn
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!