বাংলার আকাশে ইতিহাস কখনো কখনো এমন এক নক্ষত্রকে জন্ম দেয়, যার আলো যুগের পর যুগ ধরে একটি জাতির পথ আলোকিত করে। বাঙালির ইতিহাসে সেই দ্যুতিময় নক্ষত্রের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর জন্মদিন ১৭ মার্চ বাঙালির হৃদয়ে জাগ্রত করে সাহস, নেতৃত্ব এবং আত্মমর্যাদার চেতনা।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়েরা খাতুনের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছোটবেলা থেকেই তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় নেতৃত্ব ও অকুতোভয় সংগ্রাম। সেই উপলব্ধিই তাঁকে ধীরে ধীরে একটি জাতির নেতা হিসেবে গড়ে তোলে।
ত্রিশের দশকে টুঙ্গিপাড়া ও গোপালগঞ্জের গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা তরুণ মুজিব খুব কাছ থেকে মানুষের দুঃখ কষ্ট, দারিদ্র্য ও বৈষম্য দেখেছেন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়াশোনা করার সময় থেকেই তিনি সহপাঠীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি প্রদর্শন করেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে তিনি কখনো দ্বিধা করেননি। এই সময়েই তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত হন এবং ধীরে ধীরে জনজীবনের প্রশ্নে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
চল্লিশের দশকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রকৃত সূচনা ঘটে। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সেই সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও এ কে ফজলুল হকের মতো নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। এই সময়েই তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংগঠনের কাজ করেন। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেন। মানুষের দুঃখ কষ্ট তাঁর রাজনৈতিক চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। খুব দ্রুতই তিনি ছাত্ররাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়, তরুণ শেখ মুজিব সেই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ফলে তাঁকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করা হয়। ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নে এই আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। সংগঠক হিসেবে তাঁর দক্ষতা খুব দ্রুতই তাঁকে জনমানুষের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে পূর্ব বাংলার কৃষক শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কারাগারে থাকলেও আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি গোপালগঞ্জ আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সময় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হলেও অল্পদিনের মধ্যেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তা ভেঙে দেয় এবং অনেক নেতার সঙ্গে তাকেও আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হলে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে থেকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথকে আরও শক্তিশালী করেন।
পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতেই শেখ মুজিব ধীরে ধীরে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। ষাটের দশকে তিনি বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ দেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি। এই ছয় দফা ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক স্বাধিকারের সনদ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এটিকে বিচ্ছিন্নতার ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়। কিন্তু জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে সেই মামলা ভেঙে পড়ে এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি মুক্তি পান। সেই সময় ছাত্রসমাজ তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকদের টালবাহানা দেশকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। সেই উত্তাল সময়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তা বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামের দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় মুক্তির অমোঘ আহ্বান। সেই আহ্বানেই সমগ্র জাতি প্রস্তুত হয়ে ওঠে স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য।
এই উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই আসে ১৭ মার্চ। সাধারণত নেতার জন্মদিনের অনুষ্ঠান বা উদযাপন হয়, কিন্তু ১৯৭১ সালে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশ তখন কার্যত আন্দোলনের মধ্যে। তবুও হাজার হাজার ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। তারা ফুল ও মালা গলায় পরিয়ে দিয়ে এবং স্লোগান দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। অনেকেই বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ জীবন ও জাতির মুক্তির জন্য দোয়া করেন।
পাকশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাংলার জনগণ তাকে ফুল ও ফুলের মালা গলায় পরিয়ে দিয়ে এবং স্লোগান দিয়ে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান
এরপরে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্বর গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক এবং শোষণমুক্ত রাষ্ট্রের। তাঁর রাজনীতি ছিল মানুষের কল্যাণের রাজনীতি। কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষের উন্নয়নই ছিল তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। দেশ পুনর্গঠনের সময় তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে একক দলীয় শক্তিশালী প্রশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সমন্বয় সহজ হবে এবং তা জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে সাহায্য করবে। এজন্য ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে জাতীয়করণের ধারায় একটি একক দলীয় ব্যবস্থা, বাকশাল, প্রতিষ্ঠা করেন। বাকশাল বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনায় দেশের প্রশাসনকে কেন্দ্রীভূত করে উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণমূলক কাজ ত্বরান্বিত করেছিল। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে সে কর্মসূচি জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হত। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, একবিন্দুমাত্র সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যদি নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দেশের দুরবস্থা দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে এবং জনগণ সরাসরি উপকৃত হবে
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, রাতের অন্ধকারে এক নির্মম অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এই বর্বর হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গভীর শোকের অধ্যায়। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে, স্বপ্নে এবং দেশের জন্য সকল সংগ্রাম করার অনুপ্রেরণায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্যবার কারাগারে ছিলেন। মোট ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। তার মধ্যে স্কুলজীবনে ব্রিটিশ শাসনের সময় সাত দিন, বাকিটা পাকিস্তান সরকারের আমলে। ১৯৩৮ সালে প্রথমবার কারাগারে গিয়ে রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করেন। এরপর ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দফায় পাঁচ দিন, ১৩২ দিন, ৮০ দিন, ২৭ দিন, ৬৩ দিন এবং ৭৮৭ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পরও ২০৬ দিন কারাগারে থাকেন। ১৯৫৮ সালের সামরিক আইন জারি হলে ১ হাজার ১৫৩ দিন কারাগারে কাটান। ছয় দফা আন্দোলন ও বিভিন্ন সমাবেশের সময় গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৬৬–৬৯ সালের মধ্যে ১ হাজার ২১ দিন কারাভোগের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুক্তি পান। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান সরকারের হাতে ২৮৮ দিন কারাভোগের মধ্যেও তিনি বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে অটল ছিলেন। কারাগারের অন্ধকারেও তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পরিকল্পনা করেছিলেন, যা তাঁর চিন্তাভাবনা ও আদর্শের অমূল্য দলিল হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অটলতা। সংগ্রামে, চিন্তায় এবং কর্মে তিনি ছিলেন অবিচল। বহুবার কারাবরণ, অসংখ্য ষড়যন্ত্র এবং কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর পথকে কখনো বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি জানতেন তাঁর লক্ষ্য কী এবং সেই লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শ্রদ্ধার সাথে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করি, তাঁর সংগ্রামী জীবনের মহাকাব্যকে স্মরণ করি। এবং তাঁর জীবন আমাদের শেখায় সাহস কী, নেতৃত্ব কী, এবং মানুষের জন্য রাজনীতি করার প্রকৃত অর্থ কী। আজও তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর সংগ্রামের পথ বাঙালি জাতিকে আজও আলোকিত করে চলেছে।#




