আজ নরওয়ে তার রাজাকে শেষ বিদায় জানাল। চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন রাজা হারাল্ড পঞ্চম। তাঁর জীবনের প্রায় নয় দশক জুড়ে নরওয়েও অনেকটা পথ পেরিয়েছে। তাঁর শৈশবেই যুদ্ধ এসে কেড়ে নিয়েছিল দেশ, কাটাতে হয়েছিল নির্বাসনে। তিনি ফিরে এসেছেন যুদ্ধশেষের নরওয়েতে, দেখেছেন ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশটির উঠে দাঁড়ানো, কল্যাণরাষ্ট্রের বিস্তার, উত্তর সাগরে তেল আবিষ্কারের পর অর্থনীতির বদলে যাওয়া। তাঁর চোখের সামনেই বদলেছে নরওয়ের সমাজ। নানা দেশ থেকে মানুষ এসেছে, সঙ্গে এসেছে নতুন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি। যে নরওয়েতে হারাল্ডের জন্ম, আজকের নরওয়ে আর সেই দেশ নেই। এই দীর্ঘ পরিবর্তনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি ছিলেন কখনো রাজপুত্র, কখনো যুবরাজ, তারপর রাজা। আজ তাঁর শেষযাত্রার দিনে তাই হারাল্ডের জীবন ফিরে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে দেখা যায় নরওয়েরও অনেকটা ইতিহাস।
১৯৩৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। নরওয়েতে তখন শীতকাল। অসলো থেকে খুব দূরে নয়, আসকারের স্কাউগুমে (Skaugum) যুবরাজ ওলাভ (Kronprins Olav) ও যুবরাজ্ঞী মার্থার (Kronprinsesse Märtha) ঘরে তৃতীয় সন্তানের জন্ম হলো। তার আগে জন্মেছেন দুই কন্যা, রাগনহিল্ড (Ragnhild) ও আস্ট্রিড (Astrid)। তৃতীয় সন্তান পুত্র, নাম রাখা হলো হারাল্ড। তখনকার নরওয়ের সংবিধানে মেয়েদের সিংহাসনের উত্তরাধিকার লাভের অধিকার ছিল না। ফলে দুই বোন বয়সে বড় হলেও হারাল্ডই হলেন সিংহাসনের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী। নরওয়ের রাজদরবারের হিসাবে ৫৬৭ বছরের মধ্যে নরওয়ের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রথম রাজপুত্র ছিলেন হারাল্ড।

হারাল্ড যে রাজপরিবারে জন্মেছিলেন, আধুনিক নরওয়েতে সেই রাজবংশের ইতিহাস তখন খুব বেশি দিনের নয়। ১৯০৫ সালে সুইডেনের সঙ্গে ইউনিয়নের অবসানের পর নরওয়ে স্বাধীন রাজতন্ত্র হিসেবে নতুন রাজা বেছে নেয়। ডেনমার্কের রাজপরিবারের প্রিন্স কার্ল (Prince Carl) নরওয়ের রাজা হওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করে হাকোন নাম নেন। তিনিই হারাল্ডের দাদা রাজা হাকোন সপ্তম (Kong Haakon VII)। তাঁর স্ত্রী রানি মড (Dronning Maud) ছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য এবং রানি ভিক্টোরিয়ার নাতনি। তাঁদের ছেলে প্রিন্স আলেকজান্ডারও নরওয়েতে এসে নতুন নাম পেলেন, ওলাভ। পরবর্তী সময়ে তিনিই রাজা ওলাভ পঞ্চম (Kong Olav V), হারাল্ডের বাবা। ১৯০৫ সালে যে রাজপরিবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ডেনমার্কের একজন রাজপুত্রকে দিয়ে, তিন দশকের কিছু বেশি সময় পর সেই পরিবারের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হারাল্ড জন্ম নিলেন নরওয়ের মাটিতে।
স্কাউগুমের শান্ত পরিবেশে দুই বোনের সঙ্গে হারাল্ডের শৈশবের প্রথম তিন বছর কেটেছিল। ইউরোপে তখন যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলার (Adolf Hitler) ক্ষমতায়, একের পর এক দেশ দখল করে নিচ্ছে জার্মানি। নরওয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো এবারও নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। সেই যুদ্ধের আঁচ নরওয়েতে এসে ঠেকল, তখন হারাল্ডের বয়স মাত্র তিন বছর।

১৯৪০ সালের ৯ এপ্রিল জার্মান বাহিনী নরওয়ে আক্রমণ করে। অসলোসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বন্দর দখলের অভিযান শুরু হয়। রাজা হাকোন সপ্তম, যুবরাজ ওলাভ, সরকার এবং পার্লামেন্টের (Stortinget) সদস্যদের দ্রুত অসলো ছাড়তে হয়। জার্মান বাহিনীর হাতে রাজা ও সরকার বন্দী হলে নরওয়েকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার আশঙ্কা ছিল। রাজপরিবারও তখন আলাদা হয়ে গেল। যুবরাজ্ঞী মার্থা তিন সন্তানকে নিয়ে সুইডেনে আশ্রয় নিলেন। রাজা হাকোন ও যুবরাজ ওলাভ সরকারের সঙ্গে নরওয়েতে থেকে যান। পরে তাঁরা ব্রিটেনে গিয়ে নির্বাসিত নরওয়েজীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করেন।
সুইডেনেও বেশিদিন থাকা হলো না। ১৯৪০ সালের আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের (Franklin D. Roosevelt) আমন্ত্রণে যুবরাজ্ঞী মার্থা তিন সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। যুদ্ধের পরের কয়েক বছর হারাল্ডের শৈশব কাটে ওয়াশিংটনের কাছে। সেখানে তিনি স্কুলে গেছেন, দুই বোনের সঙ্গে সাধারণ শিশুর মতোই বড় হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের দেশে তখন জার্মান দখলদারিত্ব চলছিল।

১৯৪৫ সালের ৮ মে জার্মানি আত্মসমর্পণ করলে নরওয়েতে পাঁচ বছরের দখলদারিত্বের অবসান ঘটে। এক মাস পর, ৭ জুন রাজা হাকোন সপ্তম, যুবরাজ্ঞী মার্থা এবং তিন সন্তান দেশে ফিরে আসেন। অসলো বন্দরে তাঁদের স্বাগত জানান যুবরাজ ওলাভ। দিনটিও ছিল বিশেষ। ঠিক পাঁচ বছর আগে, ১৯৪০ সালের ৭ জুন রাজা হাকোন ও যুবরাজ ওলাভ জার্মান বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে নরওয়ে ছেড়ে ব্রিটেনে গিয়েছিলেন। পাঁচ বছর পর একই দিনে রাজা দেশে ফিরলেন। হারাল্ডের বয়স তখন আট বছর।
যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে হারাল্ড আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করেন। অসলোতে স্মেস্তাদ স্কুলে (Smestad skole) তিনি অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই পড়তেন। রাজপুত্র বলে তাঁর জন্য আলাদা শ্রেণিকক্ষ কিংবা আলাদা পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিল না। নিরাপত্তারক্ষী স্কুলে যেতেন, তবে শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকতেন। পরে হারাল্ড ভর্তি হন অসলো ক্যাথেড্রাল স্কুলে (Oslo katedralskole)। এই সময়েই তাঁর জীবনে বড় একটি ঘটনা ঘটে। ১৯৫৪ সালে তাঁর মা যুবরাজ্ঞী মার্থা মারা যান। হারাল্ড তখন সতেরো বছরের কিশোর। পরের বছর, ১৯৫৫ সালে তিনি অসলো ক্যাথেড্রাল স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন।

স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে হারাল্ড সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। ক্যাভালরি অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে (Cavalry Officers’ Training School) প্রশিক্ষণের পর নরওয়েজিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে (Norwegian Military Academy) পড়েন এবং ১৯৫৯ সালে সেখানকার শিক্ষা শেষ করেন। ১৯৫৭ সালে তাঁর দাদা রাজা হাকোন সপ্তম মারা গেলে যুবরাজ ওলাভ রাজা হন। বিশ বছর বয়সী হারাল্ড তখন নরওয়ের যুবরাজ এবং সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী। পরে ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যালিওল কলেজে (Balliol College, University of Oxford) ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন।
সমুদ্রের সঙ্গে হারাল্ডের সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই। তাঁর বাবা ওলাভ ছিলেন দক্ষ নাবিক। ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে নৌযানে স্বর্ণপদকও জিতেছিলেন। সেই আগ্রহ ছেলের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। যুবরাজ হারাল্ড প্রতিযোগিতামূলক নৌযানে নরওয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ১৯৬৪ সালের টোকিও, ১৯৬৮ সালের মেক্সিকো সিটি ও ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে অংশ নেন। ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নরওয়ের পতাকা বহনের দায়িত্বও ছিল তাঁর কাঁধে। রাজপরিবারের দায়িত্ব, সামরিক শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি সমুদ্র তাঁর জীবনের স্থায়ী সঙ্গী হয়ে থাকে। বহু বছর পরও নৌযানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেখা গেছে তাঁকে।

১৯৫৯ সালের গ্রীষ্মে হারাল্ডের সঙ্গে সোনিয়া হারাল্ডসেনের (Sonja Haraldsen) পরিচয় হয়। সোনিয়ার জন্ম ১৯৩৭ সালের ৪ জুলাই অসলোতে। তিনি কোনো রাজপরিবারের মেয়ে ছিলেন না। অসলোতে ব্যবসায়ী পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। হারাল্ড আর সোনিয়ার পরিচয় ধীরে ধীরে প্রেমে গড়ায়। কিন্তু একজন ভবিষ্যৎ রাজার সঙ্গে সাধারণ পরিবারের মেয়ের বিয়ে তখন নরওয়ের রাজপরিবারে সহজভাবে মেনে নেওয়ার বিষয় ছিল না। তাই তাঁদের সম্পর্ক দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালেই রাখতে হয়েছিল। এই অপেক্ষা চলে প্রায় নয় বছর। রাজা ওলাভ পঞ্চম প্রথমদিকে এই বিয়েতে সম্মতি দিতে চাননি। ভবিষ্যৎ রাজা সাধারণ পরিবারের কাউকে বিয়ে করলে রাজতন্ত্রের ওপর তার কী প্রভাব পড়তে পারে, সেই প্রশ্নও তখন ছিল। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত হারাল্ড তাঁর বাবাকে জানিয়ে দেন, সোনিয়াকে বিয়ে করতে না পারলে তিনি অন্য কাউকে বিয়ে করবেন না। হারাল্ড ছিলেন সিংহাসনের একমাত্র পুরুষ উত্তরাধিকারী। তিনি অবিবাহিত থাকলে ভবিষ্যতে রাজপরিবারের উত্তরাধিকার নিয়েই সমস্যা তৈরি হতো। ১৯৬৮ সালের মার্চে রাজা ওলাভ তাঁদের বিয়েতে সম্মতি দেন। ওই বছরেই ২৯ আগস্ট অসলো ক্যাথেড্রালে (Oslo Cathedral) হারাল্ড ও সোনিয়ার বিয়ে হয়। তিন বছর পর, ১৯৭১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তাঁদের প্রথম সন্তান মার্থা লুইসের (Märtha Louise) জন্ম হয়। ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই জন্ম নেন ছেলে হাকোন ম্যাগনুস (Haakon Magnus)। তখনকার উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বয়সে ছোট হলেও হাকোনই সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হন।
হারাল্ডের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নরওয়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বদলে যাচ্ছিল। যুদ্ধশেষের দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার পরিধি বাড়তে থাকে, গড়ে ওঠে শক্তিশালী কল্যাণরাষ্ট্র। এরপর ১৯৬৯ সালে উত্তর সাগরের একোফিস্কে (Ekofisk) বড় তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। তেল ও গ্যাস থেকে পাওয়া আয় পরবর্তী কয়েক দশকে নরওয়ের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
অর্থনীতির পাশাপাশি নরওয়ের সমাজও দ্রুত বদলাতে থাকে। কর্মক্ষেত্র ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে, নারী পুরুষের সমঅধিকার নিয়ে আইন ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ নরওয়েতে এসে বসবাস শুরু করে। একসময় তুলনামূলকভাবে সমজাতীয় এই সমাজে নতুন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি জায়গা করে নেয়। পরিবার, বিবাহ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়েও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। রাজপরিবারও এই পরিবর্তনের বাইরে থাকেনি। হারাল্ড ও সোনিয়ার বিয়ের সময় সাধারণ পরিবারের কাউকে ভবিষ্যৎ রাজার জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে যে দ্বিধা ছিল, পরের প্রজন্মে তা অনেকটাই কমে আসে। তাঁদের ছেলে হাকোন ২০০১ সালে মেটে মারিত তিয়েসেম হইবিকে (Mette-Marit Tjessem Høiby) বিয়ে করেন। মেটে মারিতও রাজপরিবারের কেউ ছিলেন না এবং তাঁর আগের সম্পর্কের একটি সন্তান ছিল।

১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি রাজা ওলাভ পঞ্চম মারা যান। সেই দিনই হারাল্ড নরওয়ের রাজা হন। তাঁর বয়স তখন তিপ্পান্ন বছর। চার দিন পর, ২১ জানুয়ারি তিনি পার্লামেন্টের সামনে সংবিধান রক্ষার শপথ নেন। দাদা হাকোন সপ্তম ও বাবা ওলাভ পঞ্চমের মতো তিনিও রাজকীয় মূলমন্ত্র হিসেবে রাখেন ‘Alt for Norge’, বাংলায় যার অর্থ ‘সবকিছু নরওয়ের জন্য’। সোনিয়া তখন নরওয়ের রানি হন।
১৯৯১ সালের ২৩ জুন হারাল্ড ও সোনিয়া ট্রনহেইমের নিদারোস ক্যাথেড্রালে (Nidaros Cathedral) এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানে তাঁদের রাজমুকুট পরানো হয়নি। নরওয়েতে রাজ্যাভিষেকের প্রথা ততদিনে উঠে গেছে। শেষ রাজ্যাভিষেক হয়েছিল ১৯০৬ সালে, হারাল্ডের দাদা রাজা হাকোন সপ্তম ও রানি মডের। হারাল্ড ও সোনিয়ার জন্য নিদারোসে আশীর্বাদ অনুষ্ঠানের (blessing) আয়োজন করা হয়।
নরওয়ের সংবিধান অনুযায়ী রাজা রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি কাউন্সিল অব স্টেটের (Council of State) বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন, প্রতি বছর পার্লামেন্টের অধিবেশন উদ্বোধন করেন, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের গ্রহণ করেন এবং দেশে ও বিদেশে নরওয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে দেশ পরিচালনার রাজনৈতিক ক্ষমতা নির্বাচিত সরকার ও পার্লামেন্টের হাতে। হারাল্ডের দীর্ঘ রাজত্বে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান পতন ঘটেছে, নানা বিষয়ে তীব্র মতবিরোধও হয়েছে। রাজা থেকেছেন দলীয় রাজনীতির বাইরে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের সঙ্গে দেখা করা, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নরওয়ের প্রতিনিধিত্ব করা এবং জাতীয় আনন্দ ও শোকের সময়ে মানুষের সামনে উপস্থিত থাকা ছিল তাঁর দায়িত্বের বড় অংশ।

নরওয়ের আধুনিক ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় সামি (Sámi) জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ। বহু প্রজন্ম ধরে নরওয়ের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী এই আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় নরওয়েজীয়করণ নীতির (Norwegianization policy) শিকার হয়েছে। স্কুলে সামি ভাষার ব্যবহার সীমিত করা হয়েছিল, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ছেড়ে নরওয়েজীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চাপ ছিল। ১৯৯৭ সালের ৭ অক্টোবর সামি পার্লামেন্টের (Sámediggi) অধিবেশন উদ্বোধন করতে গিয়ে রাজা হারাল্ড এই ইতিহাসের কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নরওয়ে রাষ্ট্র দুটি জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত, নরওয়েজীয় ও সামি। অতীতে সামি জনগণের প্রতি নরওয়ে রাষ্ট্র যে অবিচার করেছে, বিশেষ করে কঠোর নরওয়েজীয়করণ নীতির কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।
২০১১ সালের ২২ জুলাই নরওয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার মুখোমুখি হয়। প্রথমে অসলোতে সরকারি ভবনের কাছে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর উতইয়া (Utøya) দ্বীপে লেবার পার্টির যুব সংগঠনের গ্রীষ্মকালীন শিবিরে গুলি চালানো হয়। সেদিন এই দুই স্থানে হামলার ঘটনায় মোট ৭৭ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন তরুণ। পরদিন রাজা হারাল্ড জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেছিলেন, “I denne prosessen trenger vi hverandre”, অর্থাৎ “এই সময়ে আমাদের পরস্পরকে প্রয়োজন।” একই ভাষণে তিনি আরও বলেছিলেন, “Jeg holder fast ved troen på at friheten er sterkere enn frykten”, অর্থাৎ “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভয়ের চেয়ে স্বাধীনতা শক্তিশালী।” হামলার পরের দিনগুলোতে রাজা হারাল্ড ও রাজপরিবারের সদস্যরা নিহতদের স্মরণে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং আহত ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। নিহতদের স্মরণে অসলোসহ দেশের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ ফুল হাতে রাস্তায় নেমে আসে। ২৫ জুলাই অসলোতে আয়োজিত বিশাল স্মরণসমাবেশে রাজা ও রানি উপস্থিত ছিলেন।
রাজা হারাল্ডের ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালের ভাষণটি শুনুন ও দেখুন:
Kongehuset.no — “Norge er fremfor alt mennesker
২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাজা ও রানি হিসেবে হারাল্ড ও সোনিয়ার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজপ্রাসাদের বাগানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রায় দেড় হাজার অতিথির সামনে রাজা হারাল্ড নরওয়ে ও নরওয়ের মানুষ সম্পর্কে একটি ভাষণ দেন। সেদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, “Norge er dere. Norge er oss”, অর্থাৎ “নরওয়ে আপনারা। নরওয়ে আমরা।” তাঁর ভাষণে উঠে এসেছিল নরওয়ের মানুষের নানা পরিচয়ের কথা। কেউ ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, কেউ আল্লাহতে, কেউ মহাবিশ্বে, আবার কেউ কিছুতেই বিশ্বাস করেন না। তিনি সমকামী নারী ও পুরুষের ভালোবাসার কথা বলেছেন, বলেছেন নারী ও পুরুষের পারস্পরিক ভালোবাসার কথাও। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে এসে যারা নরওয়েকে নিজের দেশ করে নিয়েছেন, তারাও ছিলেন তাঁর নরওয়ের মানুষ। ধর্ম, জন্মস্থান কিংবা ভালোবাসার ভিন্নতা কাউকে এই দেশের পরিচয়ের বাইরে রাখে না। হারাল্ডের সেই ভাষণেই যেন বদলে যাওয়া নরওয়েরই একটি চিত্র ফুটে উঠেছিল।

বয়স বাড়ার সঙ্গে রাজা হারাল্ডের শারীরিক সমস্যাও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন সময়ে অসুস্থতার কারণে তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে এবং কিছু সময়ের জন্য রাজকীয় দায়িত্ব থেকে বিরত থাকতে হয়েছে। তখন যুবরাজ হাকোন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সুস্থ হয়ে হারাল্ড আবার কাজে ফিরেছেন। বয়সের কারণে ধীরে ধীরে তাঁর কর্মসূচি কমিয়ে আনা হলেও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, পার্লামেন্টের অধিবেশন উদ্বোধন এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থেকেছেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ায় ব্যক্তিগত সফরে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানে হাসপাতালে চিকিৎসার পর তাঁকে বিশেষ বিমানে নরওয়েতে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে তাঁর শরীরে স্থায়ী পেসমেকার বসানো হয়। এরপর রাজকীয় কর্মসূচির সংখ্যা আরও কমিয়ে দেওয়া হলেও তিনি পুরোপুরি দায়িত্ব থেকে সরে যাননি।
২০২৬ সালেও রাজা হারাল্ড সীমিত পরিসরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২২ জুলাই অসলো ক্যাথেড্রালে সন্ত্রাসী হামলার পনেরো বছর পূর্তির স্মরণানুষ্ঠানে রাজা ও রানি উপস্থিত ছিলেন। ৭ আগস্ট তিনি রাজপ্রাসাদে কাউন্সিল অব স্টেটের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। মাসের শেষ দিকে যুবরাজ হাকোন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২৮ আগস্ট সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে অসলো বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের রিকসহসপিতালেতে (Rikshospitalet) ৮৯ বছর বয়সে রাজা হারাল্ড শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
রাজা হারাল্ডের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যুবরাজ হাকোন নরওয়ের রাজা হন। তিনি হাকোন অষ্টম (Kong Haakon VIII) নাম গ্রহণ করেন। ২৮ আগস্ট রাজপ্রাসাদে জরুরি কাউন্সিল অব স্টেটের বৈঠকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বাবার মৃত্যুর সংবাদ জানান এবং বাবা, দাদা ও প্রপিতামহের মতো ‘Alt for Norge’, অর্থাৎ ‘সবকিছু নরওয়ের জন্য’ রাজকীয় মূলমন্ত্র হিসেবে রাখেন। ১ সেপ্টেম্বর রাজা হাকোন পার্লামেন্টের সামনে সংবিধান রক্ষার শপথ নেন। হাকোন রাজা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা নরওয়ের যুবরাজ্ঞী (Kronprinsesse) এবং সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী হন। ১৯৯০ সালে নরওয়ের সংবিধান পরিবর্তন করে নারী পুরুষ নির্বিশেষে জ্যেষ্ঠ সন্তানকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারের অধিকার দেওয়া হয়। সেই পরিবর্তিত আইন অনুযায়ী হাকোনের জ্যেষ্ঠ সন্তান ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা তাঁর ছোট ভাই স্ভেরে ম্যাগনুসের (Sverre Magnus) আগে উত্তরাধিকারী হন।

রাজা হারাল্ডের মৃত্যুর পর নরওয়েতে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। ৩১ আগস্ট তাঁর কফিন রাজপ্রাসাদের ভেতর দিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে রাজপ্রাসাদের চ্যাপেলে (Slottskapellet) নিয়ে যাওয়া হয়। কফিন বহন করেন তাঁর সন্তান ও নাতি নাতনিরা। সেখানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি ব্যক্তিগত স্মরণানুষ্ঠানের পর সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কফিনটি রাখা হয়। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে চ্যাপেলে প্রবেশ করে কফিনের পাশ দিয়ে হেঁটে রাজাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। মানুষের ভিড় এত বেশি ছিল যে কয়েক দিন চ্যাপেল খোলা রাখার সময় রাত ১১টা পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছিল। কফিনের পাশে সামরিক একাডেমির ক্যাডেটরা সার্বক্ষণিক প্রহরায় ছিলেন। রাজা হাকোন সপ্তম, যুবরাজ্ঞী মার্থা ও রাজা ওলাভ পঞ্চমের মৃত্যুর পরও তাঁদের কফিন এই চ্যাপেলেই সাধারণ মানুষের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়েছিল।
আজ রাজা হারাল্ডকে শেষ বিদায় জানাল নরওয়ে। অসলো ক্যাথেড্রালে রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় এক মিনিট নীরব ছিল গোটা দেশ। রাজপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশ-বিদেশের অতিথিরা। বাইরে অসলোর পথে অপেক্ষা করছিলেন হাজার হাজার মানুষ। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে রাজা হারাল্ডের কফিন নিয়ে যাওয়া হয় আকেরশুস দুর্গের রাজকীয় সমাধিক্ষেত্রে। সেখানেই শেষ হলো ৮৯ বছরের একটি জীবন, যার বড় অংশ জড়িয়ে ছিল নরওয়ের ইতিহাসের সঙ্গে। যুদ্ধের কারণে দেশ ছেড়ে যাওয়া আট বছরের সেই বালক একদিন দেশে ফিরেছিলেন রাজা হাকোন সপ্তমের হাত ধরে। তারপর বদলেছে নরওয়ে, বদলেছে পৃথিবী। হারাল্ডও পেরিয়ে এসেছেন যুবক বয়স, সোনিয়াকে ভালোবেসে নয় বছরের অপেক্ষা, সংসার, সন্তান, রাজদায়িত্ব এবং পঁয়ত্রিশ বছরের রাজত্ব। জীবনের শেষ পর্যন্ত সোনিয়া ছিলেন তার পাশে। আজ সেই দীর্ঘ পথচলারও সমাপ্তি হলো। নরওয়ে এখন নতুন রাজা হাকোন অষ্টমের দেশ। কিন্তু হারাল্ড যে নরওয়েকে রেখে গেলেন, সেই দেশের পরিচয় তিনি নিজেই একদিন কয়েকটি সহজ কথায় বলেছিলেন, “Norge er dere. Norge er oss.” নরওয়ে তোমরা। নরওয়ে আমরা। মুকুটের আড়ালে থাকা মানুষটিকে মনে রাখার জন্য এর চেয়ে বড় পরিচয় হয়তো আর প্রয়োজন নেই।
রাজা হারাল্ড পঞ্চম,
চির বিশ্রামে থাকুন।
চির শান্তিতে থাকুন।




