অনসূয়াকে রুট ডিরেকশনটা দিয়ে দিয়েছিল তারই সহপাঠিনী বন্ধু মৈত্রেয়ী। মৈত্রেয়ীদের দেশের বাড়ি জলপাইগুড়ি শহরেই।
জয়েন্টে অত্যন্ত ভালো রেজাল্ট করে সে কলকাতার মেডিকেল কলেজেই চান্স পেয়েছিল। তার রুমমেট হওয়ার জন্য মৈত্রেয়ীর সঙ্গে সম্পর্কটা হয়ে উঠেছিল ভীষণ ঘনিষ্ঠ।
তাদের ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে যাবার পর দুজনের ইন্টার্নশিপ শেষের মুখে। ঠিক এই সময়েই ঘটনাটা ঘটে গেল। সারাটা ছাত্রজীবনে শুধুই ইউনিয়নবাজি আর ক্যাম্পাসে দাদাগিরি করেও সবার থেকে ভালো রেজাল্ট করে পাশ করে গেল সায়ন্তন শর্মা । ক্যান্টিন থেকে শুরু করে হস্টেলে, ক্লাসে বিভিন্ন মেয়েদের উত্যক্ত করে তুলত সব সময়।
জুনিয়র মেয়েদের ইউনিয়ন রুমে ডেকে নিয়ে গিয়ে ভাষিক রেগিং তো ছিল ছোট ঘটনা। কখনো কখনো তাদের দিয়ে গা, হাত, পা, মাথা টেপাতে বাধ্য করত।
জুনিয়র বলে তারা কিছু বলতে পারত না। কেউ কিছু বলার চেষ্টা করলেই তাকে ফেল করিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রেশন আটকে দেবার ভয় দেখাত। এরফলে এটা একসময় এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছল যে মেয়েরা দল বেঁধে প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে অভিযোগ করতে বাধ্য হলো। কিন্তু প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে তারা আরো আশ্চর্য হয়ে গেল। তিনি বললেন,
— সায়ন্তন তো খুব ভালো ছেলে। আর তাছাড়া কোএডুকেশন কলেজে পড়াশুনো করতে গেলে এসব একটু আধটু তো মানিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়।
— কিন্তু স্যার…
কিছু বলতে যাচ্ছিল অনসূয়া। প্রিন্সিপাল হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
— দেখ তোমরা এযুগের মেয়ে, বী ওপেন মাইন্ডেড।
প্রিন্সিপালের কথায় অনসূয়ারা একটা অশুভ আঁতাতের পরিষ্কার ছবি যেন দেখতে পেল। কারণ হাসপাতালের চারিদিকেই কর্তৃপক্ষ আর এই ধরণের ছাত্র নামধারী পেশীশক্তির একটা নেক্সাসের কথা উথলে উঠেও আবার কেন জানি সবকিছু এক অদ্ভূত অনুভূতি হীন মৌনতার মধ্যে স্থবির হয়ে যায়! বিভিন্ন ধরনের কানাঘুষোর রং পাল্টে পাল্টে যায়। সব বুঝতে পেরেও চিরকালীন প্রতবাদী অনসূয়া সাহসে ভর করে বলেই ফেলল,
— স্যার, ইফ্ ডোন্ট মাইন্ড প্লীজ ক্ল্যারিফাই দ্যা ওপেন মাইন্ডনেস।
অনসূয়ার এই কথায় প্রিন্সিপালপাল স্যারের মাথায় যেন রক্ত চড়ে যায়। প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন,
— হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু সে?
— ইজ নট ক্লিয়ার টু ইউ স্যার?
— গেট আউট, আই সে গেট আউট।
মৈত্রেয়ী এবং অন্যান্যরা অনসূয়ার সাহস দেখে তারাও যেন সাহসী হয়ে উঠলো। মৈত্রেয়ী বলল,
— ঠিক আছে স্যার, আমরা বেরিয়ে যাচ্ছি। আজকে আপনাকে মৌখিকভাবে জানাতে এসেছিলাম কিন্তু এরপর..
— এরপর কি?
— যথা সময়ে এবং যথাস্থানে তা জানতে পারবেন।
(২)
পিজিবিটির সপ্তর্ষির সঙ্গে অনসূয়ার ঘনিষ্ঠতা বছর দুয়েক ধরে। সেই ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক এখন বেশ গাঢ়। দুই বাড়িতেই তাদের ঘনিষ্ঠতা মেনে নিয়েছে।
এক রবিবারের উত্তর কলকাতার এক ক্যাফেটেরিয়াতে তারা দুজনেই গিয়েছিল সময় কাটানোর জন্য। মাঝে মাঝেই ঐ ক্যাফেটেরিয়াতে তারা যায় বলে মালিক থেকে ওয়েটার সবাই ওদের পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে বেশ একটা ভালো সম্পর্কও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ওদের অজান্তে ক্যাফেটেরিয়ার সবাই তাদের নাম দিয়েছিল ডাক্তার কাপল্ বলে। অবশ্য ওদের এই পরিচয়টা অনসূয়া বা সপ্তর্ষি কেউই জানতে পারে নি কোনদিন।
প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে সায়ন্তনের বিরুদ্ধে নালিশ করার ব্যপারটা অনসূয়া সপ্তর্ষিকে বলতেই সপ্তর্ষি বলল,
— সবটাই আমি জানি।
— তুমি জানো! কৈ আমাকে তো পরশুদিন কিছু বললে না তুমি! এমনকি কালকে রাতে যখন ফোনে কথা হলো তখনও তো তুমি কিছু বলো নি!
— বলি নি কারণ আজকে বলব বলে। ফোনে ঐসব কথা না বলে সামনাসামনিই বলা ভালো। বা বলতে পারো আলোচনা করা ভালো।
— তুমি যখন সবটাই জানো তাহলে এখন বলো আমি কি ঠিক করিনি?
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সপ্তর্ষি বলল,
— না। কাজটা মোটেই তুমি ঠিক করো নি।
— কি বলছ তুমি!
— ঠিকই বলছি। কি হবে এসব ফালতু ঝামেলায় জড়িয়ে!
সপ্তর্ষির কথায় অনসূয়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে শান্ত গলায় বলে,
— সপ্তর্ষি তুমি কি সায়ন্তনের দলের এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের এইসব কাজকর্মকে সমর্থন করো?
এই প্রশ্নে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় সপ্তর্ষি । কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— না, ওদের কাজ তো সমর্থন যোগ্য নয়।
— তাহলে?
— দ্যাখ, আমরা দিনরাত খেটেখুটে পড়াশুনো করে নিজেদের ক্যারিয়ার তৈরি করতে এখানে এসেছি। সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
— কিন্তু ক্যারিয়ারের কথা ভেবে যেকোনো অন্যায়কে মেনে নেওয়া মানে তো এক ধরনের স্বার্থপরতা!
অনসূয়ার কথায় একটু মুচকি হাসি যেন তরল পানীয়ের মতো তার ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সেই হাসিতে এক ধরনের অপরিচিত ব্যঙ্গ ঝিলিক মেরে উঠল।
এইসময় ওয়েটার দুটো প্লেটে বড়ো সাইজের দুটো ফিস কাটলেট আর ব্ল্যাক কফির দুটো কাপ প্লেট নামিয়ে দিল। সপ্তর্ষি দেখল অনসূয়া তার মাথাটা নিচু করে দিকে এক শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন এক গভীর চিন্তায় সে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। কখন যে ওয়েটার তাদের টেবিলে খাবারটা সার্ভ করে দিয়ে গেছে তা অনসূয়ার খেয়ালই নেই।
অনসূয়ার এই অবস্থা দেখে সপ্তর্ষি বুঝতে পারে অনসূয়া তার কথাটা মেনে নিতে পারে নি। তাই সে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
— কি হলো অনু? তুমি কি আমার কথায় কিছু মনে করেছ? আমি কিন্তু তোমার ভালোর জন্যই বলেছি।
অনসূয়া কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু সপ্তর্ষির দিকে এক অদ্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার দৃষ্টি যেন সপ্তর্ষির বুকের ভিতর গিয়ে বিদ্ধ হচ্ছে। যেন তার বুকের ভিতরের সব অনুচ্চারিত শব্দ সমূহ উন্মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সামনের টেবিল জুড়ে আর সেই সব শব্দ সমূহ অনসূয়ার দৃষ্টিতে ঝলসে গিয়ে কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে উঠছে।
(৩)
ইন্টার্নশিপ শেষ হয়ে যাবার পর রেজিস্ট্রেশন নাম্বারও পাওয়া হয়ে গেছে। খুব ইচ্ছা ছিল মৈত্রেয়ীর মতো সেও মেডিসিনে মাস্টার্সটা করবে। ওদিকে সপ্তর্ষির সব কিছু কমপ্লিট হয়ে যাবে কয়েক মাসের মধ্যেই।
কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে গেল তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো দুর্ঘটনাটা। হঠাৎ করে সোস্যাল মিডিয়াতে দেখল কলেজর বয়েজ হোস্টেলে তার সঙ্গে একটা অপরিচিত ছেলের ন্যূড ছবি ভাইরাল হয়ে গেছে চারিদিকে। কি করে এটা সম্ভব! সে আকাশ থেকে পড়ল নাকি তার মাথার উপরের আকাশটা ভেঙে পড়ল তা সে বুঝতে পারল না।
ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিল সে। কয়েকদিন পরেই হস্টেল ছেড়ে বাড়ি যাওয়ার কথা। অথচ এই ঘটনা নিয়ে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রিন্ট মিডিয়ার দৌলতে এখন এটা একটা ভীষণ চর্চার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি মাঠে নেমে পড়ল ফয়দা তুলতে। এই অবস্থায় মৈত্রেয়ী তাকে যথেষ্ট সাপোর্ট করে পাশে থেকে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে করেছিল। মৈত্রেয়ীর কথাতেই অনসূয়া রাজি হয়েছিল সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে যেতে। ওর পরামর্শ মতো সপ্তর্ষিকে নিয়ে তারা তিনজনে মিলে গিয়ে এফ.আই. আর. করবে ভেবেছিল। কিন্তু সপ্তর্ষিকে রাজি করাতে পারেনি।
বাধ্য হয়ে অনসূয়া আর মৈত্রেয়ী আর তাদের আরেকজন সহপাঠী সৌরভকে নিয়ে তারা গিয়েছিল এবং এবং. আই. আর. করেছিল।
সত্যি বলতে কি সাইবার ক্রাইম দপ্তরের আধিকারিক ও অন্যান্য কর্মকর্তারা খুবই দ্রুততার সঙ্গে বিষয়টির তদন্ত করে আসল দোষী সায়ন্তনকে চিহ্নিত করে অ্যারেস্ট করে তার কাছ থেকে বয়ান আদায় করতে পেরেছিল যে সে এ. আই. এর মাধ্যমে এই ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দিয়েছে উপরের নির্দেশে। এই খবরটা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচার হয়ে যাবার পর বিষয়টি নিয়ে মিডিয়া যেমন চুপ করে গিয়েছিল তেমনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গুলোও বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। অদ্ভুতভাবে দোষী বেইল পেয়ে গিয়ে কলার তুলে আগের মতোই সারা কলেজ জুড়ে তার দাদাগিরি চালাতে লাগল বরং এখন যেন সেই দাদাগিরি আরো অবাধ এবং তার সাগরেদের সংখ্যা ও দ্বিগুণ।
এদিকে অনসূয়ার যে সম্ভ্রমহানি হওয়ার তা হয়ে গেছে। হস্টেল ছেড়ে দিতে হবে। অথচ কি করে সে বাড়িতে গিয়ে তার বাবা মাকে মুখ দেখাবে?
মৈত্রেয়ীর কাছে তার মনের অবস্থা বলাতে মৈত্রেয়ী বলেছিল,
— এতে তো তোর কোনো দোষ নেই। আর কোনো অন্যায়ও তুই করিস নি। এখন তো সবাই জেনে গেছে যে পুরো ব্যাপারটা একেবারে ফেক।
— না, তাহলেও…
— কোনো কিছু না। একেবারে বুক ফুলিয়ে চলবি। লজ্জা তো তোর নয়, লজ্জা এই সমাজের।
— সব বুঝি। কিন্তু…
— আবার কিন্তু ? শোন তুই সপ্তর্ষিদার সঙ্গে কথা বল।
মৈত্রেয়ীর কথা শুনে অনসূয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
মৈত্রেয়ী ভাবল, কাঁদুক। কেঁদে একটু হালকা হোক। বেশ কিছুক্ষণ পর অনসূয়া একটু শান্ত হলে মৈত্রেয়ী বলল,
— কি রে, কথা বলেছিস সপ্তর্ষিদার সঙ্গে?
— বলেছি।
— কি বলল সপ্তর্ষিদা?
— ও আমাদের সম্পর্কটাকে আর টিকিয়ে রাখতে চায় না। এই ঘটনার পর নাকি ওর বাড়ির সবাই বলে দিয়েছে আমাকে ওরা কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না।
— সে তো বাড়ির লোকজনের কথা ! সপ্তর্ষি দা কি বলছে?
— ওরও একই মত।
অনসূয়ার মুখে এই কথা শুনে মৈত্রেয়ী থমকে যায়। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোতে চায় না। শুধু মনে মনে বলল, এইসব ছেলেদের মুখে ইয়ে করে দিতে ইচ্ছে করে। যত্তসব মেরুদন্ডহীন প্রাণী।
(৪)
অনসূয়া হস্টেল ছেড়ে আসার আগেই চাকরির দরখাস্ত করে এসেছিল। সে নিজেই দরখাস্তে উল্লেখ করে দিয়েছিল যেকোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলেই সে তার নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেবে।
অবশ্য তার আগে মৈত্রেয়ীর কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কথা। সেইমতো অনসূয়া তার প্রেফারেন্স সাজিয়ে দিয়েছিল। ফলে কাউন্সিলিংয়ের সময় কোনো অসুবিধাই হয় নি।
হস্টেল ছেড়ে বাড়ি ফিরে সে খুব একা হয়ে যায়। বাবা- মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও সে বুঝতে পারে তার জন্য তার বাবা-মায়ের সামাজিক ও পারিবারিক সম্মানহানি হয়ে গেছে অনেকটাই। এটা অবশ্যই তার বাবা – মায়ের ধারণা। একদিন পাশের ঘর থেকে সে শুনেই ফেলল বাবাকে মা বলছে,
— আমাদের মেয়েটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেল!
এই কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বাবা অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সে তাদের একটা অসস্তির যে কারণ হয়ে উঠেছে এটা তার বাবা মা তার সামনে মুখ ফুটে না বললেও সে বুঝতে পারে। তার বাবা তো প্রায় তার সঙ্গে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে। সকাল হলেই কোনোরকমে বাজারটা সেরে রেখে অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে দু একটা কথা না বললেই নয় সেই রকম দু একটা কথা শুধু মা বলে।
সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার তাদের কাজের মালতী মাসি যে ছোটবেলা থেকেই তাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে, এই বর্ধমান শহর ছেড়ে যেদিন ডাক্তারী পড়ার জন্য সে কলকাতায় গেল সেদিন সবথেকে বেশি কেঁদে ভাসিয়েছিল এই মালতী মাসিই। তার ডাক্তারী পড়ার সময় ছুটি ছাটায় বাড়িতে এলে তাকে বিভিন্ন রকমের পদ রান্না করে খাওয়ানোর জন্য যে ব্যাকুল হয়ে পড়ত, যে পাড়ায় বুক ফুলিয়ে সবার কাছে তার সম্পর্কে গর্ব করে বেড়াত সেই মালতী মাসিও যেন কেমন বাঁকা চোখে তার দিকে তাকায়। কথা প্রায় বলেই না।
এক দম বন্ধ করা পরিস্থিতি। অনসূয়া হাঁপিয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে সে এই মানুষ গুলির আচার আচরণ লক্ষ্য করে আর ভাবে মানুষ যতই নিজেকে আধুনিক ডিগ্রি ও পোষাকের আড়ালে মুড়ে ফেলুক না কেন তার ভিতরে আসলে রয়ে গেছে এখনো সেই মান্ধাতার আমলের মানসিক কুসংস্কার আর অন্ধত্ব।
অনসূয়া যখন আর এই অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। সে যখন মানসিকভাবে খুবই ক্লান্ত ঠিক সেই সময়ে তার চাকরির নিয়োগ পত্রটা এলো।
খুব ভয়ে ভয়ে সে নিয়োগপত্রটা খুলে দেখল যে সে যা চেয়েছিল তাই হয়েছে। তাকে জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ির গয়েরকাটার খুট্টিমারির ফরেস্টের রাভা বস্তির প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা পেয়েই অনসূয়া মৈত্রেয়ীকে ফোন করে। তখন মৈত্রেয়ী জলপাইগুড়িতেই ছিল। খবরটা শুনেই মৈত্রেয়ী বলল,
— তুই একদম চিন্তা করিস না। ঐখানে অর্থাৎ নাথুয়াতে আমার এক পিসির বাড়ি। আমি আমার পিসতুতো সোমদেবকে বলে সব ব্যবস্থা করে দেব।
— হ্যাঁ রে, নতুন জায়গা তো, খুব ভালো হয়।
— বললাম না, একদম চিন্তা করবি না। কবে আসবি?
— দেখি কালকেই তৎকালে টিকিট কাটব। তুই শুধু বল কোন কোন ট্রেন যায় এবং কোন স্টেশনে নামব?
— তুই ধুপগুড়ি স্টেশনে নামবি। কামরূপ এক্সপ্রেস, তিস্তা – তোর্ষা বা কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস ধরে। কবে আসছিস আমাকে জানাবি। আমার ভাই সোমদেব তোকে স্টেশনে রিসিভ করে ঠিক নিয়ে যাবে।
মৈত্রেয়ীর কথায় আশ্বস্ত হলো অনসূয়া।
তিনটে ট্রেনে টিকিট খুঁজে শেষ পর্যন্ত কামরূপ এক্সপ্রেসে তৎকালীন টিকিট পেয়েছিল অনসূয়া। সেই মতো সবকিছু জানিয়ে দিয়েছিল মৈত্রেয়ীকে। মৈত্রেয়ী সোমদেবের ফোন নম্বরটা তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
(৫)
ভোরবেলাতে ধূপগুড়ি স্টেশনে নেমে অনসূয়া ফোনে সোমদেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিল। তারা একটা ছোট উল্টো গাড়ি ভাড়া করে নিল। ধূপগুড়ি স্টেশন চত্বর ছেড়ে তাদের গাড়ি এগোতে থাকল খুট্টিমারির ফরেস্টের দিকে।
গয়েরকাটা ছেড়ে যাবার পরই ধীরে ধীরে তাদের গাড়ি জঙ্গলের বুক চিরে কালো পিচের রাস্তা ধরে এগোতেই একটা অদ্ভূত বুনো গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মেরে বুঝিয়ে দিল জনারণ্য থেকে সে তার কাঙ্খিত রাজ্যে ঢুকে যাচ্ছে।
রাস্তায় একটা ছোট ব্রীজের উপর দিয়ে তাদের গাড়িটা যখন অতিক্রম করছে তখন নিচে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে একটা সরু নদী। সোমদেব বলল,
— দিদি এটাই হচ্ছে রাঙাটি নদী।
— নদী এতো সরু ! জলও তো খুব কম।
— হ্যাঁ, পাহাড়ী নদী এরকমই হয়। তবে বর্ষাকালে জল বেড়ে যায় পাহাড়ের উপরের জল নেমে এলে।
অনসূয়া লক্ষ্য করল জল অল্প হলেও সে বেশ স্রোতেই বয়ে চলেছে। দেড় থেকে আড়াইফুট স্বচ্ছ জলের নিচে অসংখ্য পাথরের বিস্তার। কবে কোন কাল থেকে এই পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে নদীর স্রোত তার কোনো হিসেব নেই। অনসূয়ার মনটা সকালের শীতল হাওয়া আর অরণ্যের কলুষহীন শুদ্ধ গন্ধে বেশ চনমনে হয়ে উঠল।
কিছুটা যেতেই তারা খুট্টিমারির জঙ্গলের ঠিক প্রবেশ পথে এসে গেল। পিচ রাস্তার ডানদিকে ঠিক রাস্তার উপরেই রয়েছে বনবিভাগের একটা বিশাল দোতলা বাংলো। সেই বাংলোকে পিছনে ফেলে তাদের গাড়ি বাঁ দিকের জঙ্গলের গেটে দাঁড়িয়ে পড়ল। বনকর্মীরা এসে তাদের পরিচয় জেনে গেট খুলে দিল। গেট পেরিয়ে তাদের গাড়ি ঢুকে গেল জঙ্গলের ভিতরের রাস্তা দিয়ে। ডানদিকে জঙ্গলের সমান্তরালে এগিয়ে চলেছে একটি নদী। সোমদেব জানাল এই নদীটির নাম হাতিনালা নদী। এই জঙ্গলে হাতি, বুনো মোষ, অসংখ্য ময়ূর থাকে। এছাড়াও অনেক ধরনের জন্তু জানোয়ারের বাস। ঐ নদীতে হাতিরা জল খেতে আসে বলে এর নাম হাতি নালা।
মুগ্ধ বিস্ময়ে অনসূয়া চারিদিকে দেখছিল। সে যেন প্রথম দর্শনেই এই অরণ্যের প্রেমে পড়ে গেল। নদীর ওপারে তখন প্রথম সূর্যের আলোয় নদীটি যেন ছোট মেয়ের মতো অবর্ণনীয় উজ্জ্বল আনন্দে হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছে। কয়েকটি ময়ূর পাখা মেলে ছোট নদীটি পেরিয়ে ওপারে সবুজ ধান ক্ষেতের দিকে উড়ে গিয়ে বসছে। ওপারে বেশ দূরত্ব রেখে ঐ ক্ষেতের উপর তিনটি কাঠের তৈরি ওয়াচ টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে। সোমদেবের কাছেঅই সে জানতে পারল হাতিরা হাতিনালা নদীতে জল খেতে এসে প্রায়ই ওপারের জমিতে ধান খাওয়ার জন্য চলে যায়। সেই হাতিদের লক্ষ্য রাখার জন্যই ওখানে উপরে বসে মানুষ পাহারা দেয়।
কিছুক্ষণ পরই অরণ্যের গর্ভে দেখা গেল কিছু ঘরবাড়ি। ঐটাই রাভা বস্তি।
তাদের গাড়িটা রাভা বস্তিতে ঢুকে ডানদিকের একটা সরু রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে একটা কাঠের তৈরি বাড়ির সামনে এসে থামল। বড়ো বড়ো ও মোটা শাল কাঠের বেশ কিছু খুঁটির উপর মাটি থেকে অন্তত পনের ফুট উঁচুতে পাটাতন পাতা মেঝে তার উপর কাঠের দেওয়াল এবং লাল রঙের টিনের চালা দেওয়া তিনটি ঘর। কাঠের মই , যাকে ওখানকার লোক সিঁড়ি বলেই মনে করে, সেই সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উপরে উঠতে হয়। সিঁড়ির নিচে মাটিতে একটা রঙ চটে যাওয়া সাইন বোর্ডে লেখা আছে ” রাভা বস্তি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র” খুট্টিমারি ফরেস্ট, জলপাইগুড়ি।
তাদের গাড়িটা থামতেই চারিদিক থেকে বেশ কয়েক জন মহিলা পুরুষ এবং ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বেরিয়ে এলো। অনসূয়া বুঝতে পারল নিশ্চয়ই ওরা আগে থেকেই খবর পেয়েছিল যে তাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য নতুন ডাক্তার আসছে। তাও আবার মেয়ে ডাক্তার। ওদের চোখে মুখে প্রবল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের ছটা।
প্রত্যেকেরই গায়ের রঙ ফর্সা। নেপালী,ভূটানীদের যেমন হয়। কিন্তু এদের চোখ মুখে একটা আলগা সৌন্দর্য যেন ঠিকরে পড়ছে। কয়েকটি বাচ্চা ছেলে মেয়ে সদ্য হয়তো ঘুম থেকে উঠে খবরটা শুনেই দৌড়ে এসেছে। তাদের কারুর নাক থেকে ঠোঁট পর্যন্ত শিকনির ধারা শুকিয়ে সাদা দাগের একটা রেখা তৈরি করেছে। কারুর চোখের কোনায় দলা পাকিয়ে রয়েছে পিচুটি। ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বয়স্ক লোক, তার বয়স পঞ্চাশও হতে পারে আবার সত্তরও হতে পারে। এদের বয়স ঠিক বোঝা যায় না, বেরিয়ে এসে তার সামনে দুহাত তুলে প্রণাম জানিয়ে বলে,
— নমস্তে ডাগদার মাদাম। আমি রমেশ মারাক, এই হাসপাতালের কেয়ারটিকর। আমাদের কি সৌভাগ্য আপনি তবে এলেন।
প্রতি নমস্কার জানিয়ে অনসূয়া বলল,
— কেন আসব না? সরকার পাঠিয়েছে, আমাকে তো আসতেই হবে।
— আপনি থাকবেন তো?
এই প্রশ্নে চমকে ওঠে অনসূয়া। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— কেন থাকব না? আমি তো থাকার জন্যই এখানে এসেছি।
— না, আসলে গত দশ বছর ধরে এখানে কোনো ডাগদারবাবু আসে নি।
এর আগে দু চারজন যারা এসেছিল তারা এক সপ্তাহ, পনেরো দিন খুব বেশি হলে একমাস থেকেই চলে গেছে। আর আমি এই হাসপাতালের কেয়ারটিকর হয়ে শুধু শুধু সরকারের টাকায় মায়নে গুনছি।
এই কথার মধ্যেই একজন মহিলা বলল,
— আরে বাইরে আর কতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখবে ডাগদারণীকে? ডাগদারণীর ঘরে নিয়ে যাও।
মহিলার কথা শুনে উপস্থিত সবাই সমস্বরে বলল,
— হা, হা রমেশদা ডাগদারণীকে ঘরে নিয়ে যাও। আমরা ডাগদারণীর খাবার ব্যবস্থা করছি।
সোমদেব উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে বলল,
— শোনো আমার বাড়ি নাথুয়া বাজারে। তোমাদের ডাক্তার কিন্তু আমার দিদি। কোনো রকম যেন অসুবিধা না হয় সেটা দেখবে কিন্তু। আমি অবশ্য মাঝে মাঝেই আসব।
উপস্থিত লোকজনের মধ্যে একজন যুবক বলল,
— হা,হা তোমাকে চিনি। নাথুয়া বাজারে তোমাকে দেখেছি।
যুবকের কথায় সবাই সোমদেবের দিকে তাকালো। একজন বলল,
— তাহলে ডাগদারণী তো আমাদের ঘরের লোক।
অনসূয়া লক্ষ্য করল এরা বাংলাতেই কথা বলে এবং বেশ ভালোভাবেই ভাষাটা জানে।
ওরা সবাই সোমদেবকে সকালের জলখাবারের জন্য অনুরোধ করল কিন্তু তার একটা জরুরি কাজ থাকার জন্য সে সেখান থেকে বিদায় নিল ঐ গাড়িতেই।
(৬)
অনসূয়াকে সঙ্গে নিয়ে রমেশ হাসপাতালের উপরে উঠে গেল। তার শরীর জুড়ে রোমাঞ্চকর অনুভূতি।




