সাধারণভাবে বিজ্ঞান সাধনা ও স্বদেশী শিল্পের রূপকার হিসেবে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ভারত তথা বাংলার ইতিহাসে সর্বজনবিদিত হলেও, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে, বিশেষতঃ বাংলার সশস্ত্র বিপ্লববাদে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গভীর, তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী ছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। আর যদিও তিনি নিজে কখনও প্রত্যক্ষভাবে অস্ত্র হাতে নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের মঞ্চে অবতীর্ন হননি; কিন্তু তবুও, তিনি যে তাঁর সময়কার বিপ্লবী তরুণদের আত্মিক অভিভাবক, নিরাপদ আশ্রয় এবং পরোক্ষ শক্তিদাতা ছিলেন, একথার প্রমাণ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে রয়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়। তিনি বরাবরই বিশ্বাস করেছিলেন যে, পরাধীন দেশে খাঁটি বিজ্ঞান চর্চাও আসলে স্বরাজ অর্জনেরই একটা পথ। অন্যভাবে বললে, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, কোন পরাধীন দেশে জাতীয় প্রগতি বা খাঁটি বিজ্ঞান সাধনা স্বরাজ ছাড়া কখনোই পূর্ণতা পেতে পারে না। আর একারণেই তিনি বলেছিলেন—
“Science can wait, but Swaraj cannot.”
অর্থাৎ—বিজ্ঞান অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজ নয়।
এখানে বলাই বাহুল্য যে, এ বিশ্বাসই তাঁকে তাঁর সময়কার বিপ্লবী তরুণদের নিকটতম অভিভাবকে পরিণত করেছিল; এবং খুব সম্ভবতঃ একারণেই তিনি বেঙ্গল কেমিক্যালের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন, যেখানে তখন অনেক বিপ্লবীর কর্মসংস্থান ও আত্মগোপন করবার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এমনকি অতীতে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের বিভিন্ন জীবনীকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের গবেষকদের রচনাতেও তাঁর এ গোপন বিপ্লবী সংযোগ বিস্তারিতভাবে জায়গা করে নিয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। যেমন—মনোরঞ্জন গুপ্ত, যিনি নিজে আচার্যের সময়কার একজন বিশিষ্ট বিপ্লবী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তিনি ‘আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়’ নামক গ্রন্থে কিভাবে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র নিজের ল্যাবরেটরিকে বিপ্লবীদের রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, একথা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন—
“আচার্যদেব তরুণ বিপ্লবীদের ভালোবাসতেন পিতৃস্নেহে। বেঙ্গল কেমিক্যালের দরজা যে বিপ্লবী তরুণদের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত ছিল, তা তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ প্রশাসনও সন্দেহ করেছিল, কিন্তু প্রমাণাভাবে তাঁর গায়ে হাত দেওয়ার সাহস পায়নি।” (আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মনোরঞ্জন গুপ্ত, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, কলকাতা, প্রথম প্রকাশঃ ১৯৩২, পৃ: ৭৮–৮২ দ্রষ্টব্যঃ)
অন্যদিকে যুগান্তর দলের অন্যতম প্রধান সংগঠক ডঃ জাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র কিভাবে তাঁদের আর্থিক ও নীতিগত বল জুগিয়েছিলেন, একথা জানাতে গিয়ে স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন—
“আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন আমাদের মানস গুরু। যখনই আমরা কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছি, আচার্যদেবের দ্বারে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। তিনি কেবল অর্থ দিয়েই সাহায্য করেননি, বেঙ্গল কেমিক্যালের কেমিস্টদের মাধ্যমে বিস্ফোরক তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণের যোগান নিশ্চিত করেছিলেন।” (বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি, ডঃ জাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং কোম্পানি, কলকাতা, ১৯৫৬, পৃ: ১৪৫–১৪৮)
ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম: সশস্ত্র বিপ্লব’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন যে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের সময়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়নাগার এবং পরবর্তীতে বেঙ্গল কেমিক্যাল কিভাবে স্বদেশী আন্দোলনের সূতিকাগার হয়ে উঠেছিল; আর একইসাথে তিনি একথাও জানিয়েছিলেন যে, উল্লাসকর দত্ত যখন বিস্ফোরক তৈরি করছিলেন, তখন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের পরামর্শ ও পরোক্ষ সান্নিধ্যই তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। (ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম: সশস্ত্র বিপ্লব, ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, নবভারত পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৮৩, পৃ: ২১-২৪ দ্রষ্টব্যঃ)
আর প্রফুল্লচন্দ্র রায় নিজে তাঁর আত্মজীবনীতে সরাসরি সশস্ত্র বিপ্লবে যুক্ত থাকবার কথা তৎকালীন বৃটিশ সেন্সরশিপের কারণে প্রকাশ না করলেও, তাঁর সময়কার বাংলার যুবসমাজের স্বদেশী মানসিকতা ও বৃটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে লিখেছিলেন—
“A chemical laboratory is not merely a place for test-tubes and retorts; it should be the forge where the spirit of national self-reliance is hammered out.” (Life and Experiences of a Bengali Chemist, Vol. 1 & 2, Prafulla Chandra Ray; Chuckervertty, Chatterjee & Co. Ltd., Calcutta, 1932 & 1935, p: 215–218)
সুতরাং, ইতিহাস পর্যালোচনা করে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে শুধু পরীক্ষাগারে আবদ্ধ থাকা একজন বিজ্ঞানী বলা যেতে পারে না। বরং, ইতিহাস স্পষ্টভাবেই একথা বলে যে, তিনি বিজ্ঞান সাধনা, শিল্প স্থাপন এবং জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম—এ তিনটি ধারাকেই একই সূত্রে গেঁথে স্বহস্তে অসি ধারণ না করেও বাংলার বিপ্লবীদের অন্যতম প্রধান শক্তি ও আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিলেন। আর প্রফুল্লচন্দ্রের এ ভূমিকাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁকে এক অনন্য ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক-সামাজিক অভিভাবকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
অতীতে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবনীকারেরা জানিয়েছিলেন যে, তাঁর সাথে অনুশীলন সমিতির ঢাকা ও কলকাতা শাখা ছাড়াও যুগান্তর দল ও অন্যান্য গোপন বিপ্লবী প্রতিষ্ঠানগুলিরও যোগাযোগ ছিল। এছাড়া তাঁর সময়কার প্রধান প্রধান বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব, যাঁদের সঙ্গে প্রফুল্লচন্দ্রের নিবিড় যোগাযোগ ছিল, তাঁদের মধ্যে এখানে প্রথমেই বাঘা যতীন বা যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ্য; তিনি বাঘা যতীনকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তাঁর সাহসিকতায় মুগ্ধ ছিলেন। এছাড়া রাসবিহারী বসুর মত পলাতক ও বিপজ্জনক বিপ্লবীদের তিনি বিভিন্ন সময়ে অর্থ ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখেছিলেন। হেমচন্দ্র কানুনগো বিভিন্ন সময়ে বোমার রাসায়নিক সংমিশ্রণ প্রস্তুত করতে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে পরোক্ষ পরামর্শ নিয়েছিলেন। আর মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু নিজেদের ছাত্রাবস্থায় তাঁর কাছ থেকেই বিপ্লবীদের সাহায্য করবার উৎসাহ পেয়েছিলেন। এছাড়া এ তালিকায় পুলিনবিহারী দাস, মাস্টারদা সূর্য সেন এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মত ব্যক্তিত্বরাও ছিলেন। এঁদের মধ্যে—ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও সশস্ত্র বিপ্লবের মহানায়ক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যেকার সম্পর্ক গভীর শ্রদ্ধা, স্নেহ ও আদর্শিক একাত্মতায় পূর্ণ ছিল। বস্তুতঃ, বাঘা যতীন এবং তাঁর চালিত ‘যুগান্তর’ দলের বিপ্লবীদের কাছে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র এক নিরাপদ অভিভাবক ও পরোক্ষ শক্তির আধার হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি তৎকালীন বৃটিশ গোয়েন্দা পুলিশের রেকর্ড এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে একথাও জানা যায় যে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বিপ্লবী পত্রিকা ‘যুগান্তর’ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন; আর তিনি পত্রিকাটির সম্পাদক ও বিপ্লবীদের নিজেই একথা জানিয়েছিলেন যে, বাঘা যতীন তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন, এবং তাঁদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তাছাড়া বাঘা যতীনের নেতৃত্বে যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা যখন সারা বাংলা ও ভারতে সশস্ত্র অভ্যুথানের পরিকল্পনা করছিলেন, তখন তাঁদের বিস্ফোরক ও রাসায়নিক উপকরণের প্রয়োজন হওয়ায়, বাঘা যতীনের নির্দেশেই বিপ্লবী জাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, উল্লাসকর দত্ত প্রমুখ প্রফুল্লচন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। আর আচার্য তাঁর ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস’ ও প্রেসিডেন্সি কলেজের গবেষণাগারকে বিপ্লবীদের পরোক্ষ সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এসব ছাড়া বাঘা যতীন যখন বিপ্লবীদের সংগঠিত করছিলেন, তখনও প্রফুল্লচন্দ্র বহুবার অর্থ দিয়ে এবং গোপনে নানা বিপ্লবী তরুণকে বেঙ্গল কেমিক্যালে চাকরি বা আত্মগোপন করবার সুযোগ করে দিয়েও সাহায্য করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বাঘা যতীনের অসাধারণ দেশপ্রেম, অলৌকিক সংগঠন ক্ষমতা এবং আত্মত্যাগের প্রতি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মনে বরাবরই যে গভীর শ্রদ্ধা ও উচ্চ ধারণা ছিল, তৎকালীন প্রবীণ বিপ্লবী ও গবেষকদের লেখাতেও একথার উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যদিকে বাঘা যতীনের দূরদর্শিতা ও বীরত্ব সম্পর্কে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র নিজে জানিয়েছিলেন—
“If only there were one Jatin Mukherjee in every district of Bengal, the history of India would have been written differently.” (Bagha Jatin: Life and Times of Jatindranath Mukherjee, Dr. Prithwindra Mukherjee, National Book Trust, New Delhi, 2010, p: 85–90)
অর্থাৎ—যদি বাংলার প্রতিটি জেলায় একটি করে যতীন মুখোপাধ্যায় থাকত, তবে ভারতের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো।
এছাড়া প্রফুল্লচন্দ্র প্রায়শঃই বাঘা যতীনের আত্মত্যাগ সম্পর্কে একথাও বলেছিলেন যে, ভারতবাসীকে স্বাধীনতার যোগ্য করে তুলতে বাঘা যতীনের মত বীর সন্তানদের আত্মাহুতির এ ‘রক্তবীজ’ বা আত্মত্যাগের প্রয়োজন ছিল,—যা তাঁর সময়কার বাংলার তরুণ সমাজের মধ্যে স্বদেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
অন্যদিকে প্রফুল্লচন্দ্রের থেকে সুভাষচন্দ্র বয়সে প্রায় ৩৬ বছরের ছোট হলেও তাঁদের মধ্যেকার সম্পর্ক প্রগাঢ় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্নেহ এবং মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্যে এক অবিচল সহমর্মিতায় পুষ্ট ছিল বলেই ইতিহাস থেকে জানা যায়। সুভাষচন্দ্রের জীবনেতিহাস থেকে জানা যায় যে, তিনি যখন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং পরবর্তীতে উত্তরবঙ্গে বন্যাত্রাণ কার্য বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন থেকেই আচার্য রায়ের সাথে তাঁর আত্মিক নিবিড়তার এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বস্তুতঃ, ১৯২৩ সালে উত্তরবঙ্গের বিধ্বংসী বন্যার সময়ে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আহ্বানে যে ‘বেঙ্গল রিলিফ কমিটি’ গঠিত হয়েছিল, সেই ত্রাণকার্যে তরুণ সুভাষচন্দ্র বসু পরম নিষ্ঠার সাথে আচার্যদেবের নির্দেশনায় কাজ করেছিলেন; আর এসময়েই প্রফুল্লচন্দ্র সুভাষচন্দ্রের অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও ত্যাগের মানসিকতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। অন্যদিকে সুভাষচন্দ্রও আচার্যদেককে শুধু একজন বিজ্ঞানী হিসেবে নয়; বরং, ‘জাতীয় জীবনের অভিভাবক’ হিসেবে গণ্য করেছিলেন। তাছাড়া আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় সুভাষচন্দ্রের মধ্যে ভারতের ভবিষ্যৎ ত্রাতা এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার রূপও দেখতে পেয়েছিলেন। আর একারণেই কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গান্ধীজির অনুগামীদের সাথে যখন সুভাষচন্দ্রের নীতিগত বিরোধ দেখা দিয়েছিল, তখন তিনি নির্দ্বিধায় সুভাষচন্দ্রের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অতঃপর ১৯৩৯ সালে ত্রিপুরী কংগ্রেসে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরে সুভাষচন্দ্র বসু যখন দ্বিতীয়বারের জন্য জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, এবং পরবর্তীতে পদত্যাগ করে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেছিলেন, তখন প্রফুল্লচন্দ্র তাঁকে তৎকালীন রাজনীতির জটিলতা অতিক্রমকারী এক দূরদর্শী নেতারূপে আশীর্বাদ করে জানিয়েছিলেন—
“সুভাষ আমার প্রিয় ছাত্রের মত। দেশমাতৃকার সেবায় ওর যে ত্যাগ, নিষ্ঠা ও সাহস তা ভারতের ইতিহাসে বিরল। ও যা বিশ্বাস করে, তা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস্তবায়িত করতে পারে।”
এছাড়া এসময়েই ১৯২২-২৩ সালের বন্যাত্রাণের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি সুভাষচন্দ্র সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন—
“সুভাষকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন যে একজন তরুণ নেতার মধ্যে কতটা সাংগঠনিক ক্ষমতা, কর্মদক্ষতা ও মানুষের প্রতি সমবেদনা থাকতে পারে। ও কেবল রাজনীতিক নয়, ও আমাদের জাতীয় শক্তির প্রতীক।” (আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়: জীবন ও সাধনা, ডঃ দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৫, নতুন সংস্করণ: ২০১১, পৃ: ১১৫–১১৯ দ্রষ্টব্যঃ; Life and Experiences of a Bengali Chemist, Vol. II, Prafulla Chandra Ray; Chuckervertty, Chatterjee & Co. Ltd., Calcutta, 1935, p: 142–145)
অনুরূপভাবে সুভাষচন্দ্র বসুও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা মহাপুরুষ এবং বিজ্ঞান ও স্বদেশপ্রেমের মেলবন্ধনকারী হিসেবে বিভিন্ন সময়ে নিজের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছিলেন। বিশেষতঃ, ১৯৩১ সালে প্রফুল্লচন্দ্রের ৭০তম জন্মজয়ন্তী এবং পরবর্তীসময়েও বিভিন্ন উপলক্ষ্যে তিনি আচার্যদেবের অবদানকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ১৯৩১ সালে প্রফুল্লচন্দ্রের জন্মজয়ন্তী উৎসবে এবং অন্যান্য সভায় সুভাষচন্দ্র বসু আচার্যদেবকে ‘বিজ্ঞানের দরবেশ’ এবং ‘স্বদেশী আন্দোলনের পিতা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছিলেন—
“Acharya Ray is a scientist among scientists, a patriot among patriots, and a man among men. His whole life is a dedicated service to the cause of Indian regeneration.” (সুভাষ রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো, কলকাতা, ২০০২, পৃ: ২০৮–২১১ দ্রষ্টব্যঃ; Crossroads: Being the Works of Subhas Chandra Bose: 1938-1940, Sisir Kumar Bose, Asia Publishing House, Mumbai, 1962, p: 77–80)
অর্থাৎ—আচার্য রায় বিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, দেশপ্রেমিকদের মধ্যে সেরা দেশপ্রেমিক এবং মনুষ্যত্বের মধ্যে এক খাঁটি মানুষ। তাঁর সমগ্র জীবন ভারতের পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত এক ব্রত।
এছাড়া তিনি আরও লিখেছিলেন—
“আমরা যখন আচার্য রায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াই, তখন কেবল একজন রসায়নবিদকে দেখি না; আমরা দেখি এক ঋষিতুল্য ব্যক্তিত্বকে, যিনি একহাতে আধুনিক বিজ্ঞান চর্চা করেছেন আর অন্যহাতে দেশীয় শিল্প ও স্বদেশী বিপ্লবের বীজ বুনেছেন। তাঁর জীবনই আমাদের অনুপ্রেরণা।” (তরুণের স্বপ্ন, সুভাষচন্দ্র বসু, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃ: ৪২–৪৬)
সুতরাং, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যেকার সম্পর্ক শুধু সাধারণ শিক্ষক-ছাত্র বা প্রবীণ-নবীন যোগাযোগের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং, এ সম্পর্ক আসলে স্বদেশী বিজ্ঞান ও স্বরাজ সাধনার এক মহতী যুগলবন্দী ছিল। প্রফুল্লচন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন যে, দেশের মুক্তি শুধু কথায় আসবে না, এরজন্য শিল্প, বিজ্ঞান ও সুভাষচন্দ্রের মত আত্মত্যাগী নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে সুভাষচন্দ্র প্রফুল্লচন্দ্রের ত্যাগী সন্ন্যাসী জীবন ও বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতাকে স্বাধীন ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করেছিলেন।
প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবনেতিহাস থেকে জানা যায় যে, তিনি মূলতঃ তিনটি উপায়ে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। প্রথমতঃ, বেঙ্গল কেমিক্যালের লভ্যাংশ ও নিজের ব্যক্তিগত উপার্জনের একটি বড় অংশ তিনি গোপনে বিপ্লবীদের দান করে দিতেন। দ্বিতীয়তঃ, বোমা তৈরি করবার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান (যেমন—পটাশিয়াম ক্লোরেট, পিকরিক অ্যাসিড, নাইট্রোগ্লিসারিন) সম্পর্কে তরুণ বিজ্ঞানীদের ধারণা দিতেন, এবং এমনকি অনেক সময়ে ল্যাবরেটরির উপাদানও সকলের অলক্ষ্যে বিপ্লবীদের হাতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিতেন। তৃতীয়তঃ, আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের তিনি বিভিন্ন সময়ে বেঙ্গল কেমিক্যালের কারখানা ও প্রেসিডেন্সি কলেজের গবেষণাগারে ছদ্মবেশে কাজ করবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আর একারণেই অতীতে বাংলার বিপ্লববাদে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে মনোরঞ্জন গুপ্ত জানিয়েছিলেন—
“আচার্যদেব আমাদের বলতেন, ‘বিজ্ঞান শিক্ষা করো, কিন্তু দেশের মুক্তির কথা ভুলো না। যদি প্রয়োজন হয়, দেশের জন্য জীবন দিতে কুণ্ঠিত হয়ো না।’ তিনি আমাদের কাছে শুধু শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন বিপ্লবের প্রত্যক্ষ প্রবর্তক।” (আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়: স্মারক গ্রন্থ, জ্যোতির্ময় সেন সম্পাদিত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯১, পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ, পৃ: ৭৮–৭৯ দ্রষ্টব্যঃ)
আরো লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, যদিও প্রফুল্লচন্দ্র বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে অহিংস আন্দোলনের কথা বলেছিলেন; কিন্তু তবুও, তরুণদের সশস্ত্র বিপ্লবকে তিনি কখনোই ধিক্কার জানাননি। বরং, তিনি বিভিন্ন সময়ে স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে তরুণদের আগুন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া তিনি একথাও বলেছিলেন—
“I wash test-tubes in the laboratory, but my heart is with the revolutionary boys who are sacrificing their lives at the altar of the motherland.” (Life and Experiences of a Bengali Chemist, Vol. 1, Prafulla Chandra Ray; Chuckervertty, Chatterjee & Co. Ltd., Calcutta, 1932, p- 148)
অর্থাৎ—আমি গবেষণাগারে টেস্টটিউব ধুই একথা সত্যি, কিন্তু আমার হৃদয় সেসব বিপ্লবী ছেলেদের জন্য স্পন্দিত হয়, যাঁরা মাতৃভূমির বেদিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করছে।
বস্তুতঃ, পরাধীনতাকেই তিনি ভারতের নৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের মূল কারণ বলে মনে করেছিলেন। তাঁর নিজের ভাষায়—
“Research can wait, Science can wait, but Swaraj cannot wait. Political freedom is the first requisite for the regeneration of a fallen nation.” (আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম, ডঃ হরিহর ভট্টাচার্য, মানসী প্রকাশন, কলকাতা, ১৯৮৭, পৃ- ৫২)
অর্থাৎ—গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে, বিজ্ঞান অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজ অপেক্ষা করতে পারে না। একটি পতিত জাতির পুনরুত্থানের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতাই হল প্রথম শর্ত।
আর এ মনোভাব নিয়ে বিপ্লবীদের সাহায্য করার কারণেই প্রফুল্লচন্দ্রকেও তাঁর জীবনের বিভিন্ন সময়ে চরম প্রশাসনিক ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়েছিল; এবং তৎকালীন বৃটিশ সরকার তাঁকে কখনও সরাসরি গ্রেপ্তার না করলেও সর্বদা তাঁর ওপরে কড়া নজরদারি চালিয়ে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, তৎকালীন গোয়েন্দা রিপোর্টে তো প্রফুল্লচন্দ্রকে একজন ‘বিপজ্জনক ছদ্মবেশী বিপ্লবী’ (A dangerous disguised revolutionary) হিসেবে চিহ্নিত করে স্পষ্টভাষাতেই বলা হয়েছিল—
“Dr. P. C. Ray is a scientist of repute, but his laboratory at Presidency College and the Bengal Chemical works are known hotbeds of sedition and safe harbors for absconding revolutionaries.” (Home Political Department, File No. 43/1915, Secret Intelligence Report, West Bengal State Archives; বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, শৈলেশ দে, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৫, পৃ: ১০৫–১০৭)
অর্থাৎ—ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র রায় একজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী হলেও, প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকা তাঁর গবেষণাগার এবং বেঙ্গল কেমিক্যাল ওয়ার্কস দেশদ্রোহিতার আখড়া এবং পলাতক বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।
এমনকি সমকালীন ইউরোপীয় সমাজ ও সংবাদপত্রগুলিও কিন্তু প্রফুল্লচন্দ্রের এ ভূমিকা সম্পর্কে অবগত ছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, তৎকালীন ইউরোপের অনেক বিজ্ঞানী ও সমাজচিন্তক ভারতের স্বাধীনতার দাবিকে যেমন সমর্থন জানিয়েছিলেন, তেমনি অনেকে আবার একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী কর্তৃক বিপ্লবীদের সাহায্য করবার বিষয়টিকে বিস্ময়ের চোখে দেখেছিলেন। অতীতে এপ্রসঙ্গে আর্নল্ড ডেভিড লিখেছিলেন—
“It is a rare phenomenon in history where a distinguished chemist utilizes his intellectual power and resourcefulness not merely for scientific advances, but to foster a revolutionary movement against an imperialist power.” (British Scientists and the Indian Freedom Struggle, Arnold David, Cambridge University Press, 2000, p- 164)
অন্যদিকে তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন পত্রিকাতেও এবিষয়ে প্রফুল্লচন্দ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি কোন অভিযোগ করা না হলেও, বেঙ্গল কেমিক্যাল ও প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আচার্যের পরোক্ষ সমর্থনের বিভিন্ন খবর কিন্তু ছাপা হয়েছিল। যেমন—দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল—
“The police have laid strict surveillance over the activities of the noted chemist Dr. P. C. Ray due to suspected links with Bengal’s underground political organizations.” (The Statesman, Calcutta Edition, সংবাদপত্রে বিপ্লবী বাংলা: ১৯০১-১৯৩০, স্বপন বসু, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ২০০৩, পৃ- ২১২)
এছাড়া অতীতের ঐতিহাসিকরাও সকলেই একবাক্যে একথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর সময়কার ভারতের বিজ্ঞানী-বিপ্লবীদের সর্বশ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। অতীতে এপ্রসঙ্গে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছিলেন—
“প্রফুল্লচন্দ্র রায় কেবল রাসায়নিক উপাদানের সংযোগ ঘটাননি, তিনি ভারতের বিজ্ঞান ও স্বরাজ সাধনার মধ্যে এক ঐতিহাসিক সংযোগ ঘটিয়েছিলেন। বিপ্লবীদের আত্মত্যাগকে তিনি বিজ্ঞানের আলোয় শক্তি জুগিয়েছেন।” (ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলা, অমলেশ ত্রিপাঠী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ- ১৮৯)
সুতরাং, উপরোক্ত তথ্যাবলী বিশ্লেষণ করে পরিশেষে একথা বলা যেতে পারে যে, বাংলার বিপ্লববাদের ইতিহাসে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন, যিনি এটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, গবেষণাগার শুধু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কারের জায়গা নয়; বরং, মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচনের কেন্দ্রও হতে পারে। আর একাজ করতে গিয়ে, পরাধীন ভারতে রাজরোষ ও নিশ্চিত কারাবাসের ভয় সত্ত্বেও তিনি কখনোই বিপ্লবীদের দিক থেকে নিজের মুখ ফিরিয়ে নেননি। আসলে তিনি একথা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, আর্থিক আত্মনির্ভরতা ছাড়া কখনোই দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক বিপ্লব সম্ভব হতে পারে না। তাঁর সময়ে তিনি একাধারে ঋষিতুল্য একজন শিক্ষক ও বিজ্ঞানী, এবং অন্যদিকে বিপ্লবীদের সেই নীরব আলোকবর্তিকা ছিলেন,—সশস্ত্র বিপ্লববাদের ইতিহাসে যাঁর নিঃস্বার্থ অবদান তখন ভারতকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিল।#




