প্রথম ইঙ্গভারতীয় কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষ

বর্তমানে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা তেমন কোনো ব্যতিক্রমী বিষয় নয়। বলা যায় বিশ্বসাহিত্যের অনিবার্য লেখকে পরিণত হয়ে তাঁরা ভারতীয় দিগন্তের বহুতর সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। কিন্তু কোম্পানি আমলে কিংবা এমনকি ব্রিটিশ-শাসনকালে ভারতীয়দের ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা ছিল নানাবিধ আকর্ষণ ও কৌতূহলের বিষয়। ভারতীয়দের মধ্যে আবার যাঁরা ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করেন তাঁদের মধ্যে বাঙালি সাহিত্যিকদের অবস্থান যথেষ্ট মর্যাদাপূর্ণ। ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের রচিত ইংরেজি ভাষার সাহিত্যও যে কোনো অংশে অবহেলার বিষয়বস্তু নয় বরং গুরুত্বপূর্ণ সেটা প্রমাণিত হয়ে গেছে অনেককাল আগেই। কেননা তাঁদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে গ্রন্থ রচিত হয়েছে ভারতীয় এবং অভারতীয় তথা ইংরেজিভাষী সমালোচকদের দ্বারা। সেইসব গ্রন্থে ইঙ্গভারতীয় লেখকদের সাহিত্য নির্ণীত-বিশ্লেষিত হয়েছে সমগ্র ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে। বর্তমানে উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন পরিস্থিতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের যে-জয়জয়কার সেটির পূর্ব বা আদি প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজেই ঔপনিবেশিক কালের সাহিত্যিক পটভূমিটির গুরুত্ব বিবেচনাযোগ্য।

১৯০৮ সালে লন্ডন থেকে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় যেটির রচয়িতা ই. এফ. ওটেন এবং গ্রন্থটির শিরোনাম আ স্কেচ অব এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান লিটারেচর। এটি হচ্ছে কোনো অভারতীয় কর্তৃক ইঙ্গভারতীয় সাহিত্যের মূল্যায়নমূলক প্রথম গ্রন্থ। ওটেন সাহেব তাঁর এই গ্রন্থে ইঙ্গভারতীয় সাহিত্যের জন্মক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন ১৭৮৩ সালকে। কিন্তু আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ওটেন-এর এ মূল্যায়ন অভ্রান্ত নয় কেননা তিনি যাঁকে প্রথম ইঙ্গভারতীয় কবি হিসেবে সনাক্ত করেন তিনি মূলত ইংরেজ, ভারতীয় বংশোদ্ভূতই নয়। অর্থাৎ তিনি তখন কর্মসূত্রে ভারতবর্ষে বসবাসরত ছিলেন কিন্তু কেবল কর্মের মানদণ্ডে তাঁকে ইঙ্গভারতীয়রূপে চিহ্নিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত সে-প্রশ্ন উত্থাপন করাই যায়। ১৭৮৩ সালে বিখ্যাত প্রাচ্যতত্ত্ববিদ স্যার উইলিয়ম জোন্স (১৭৪৬-১৭৯৪) ভারতবর্ষের মাটিতে প্রথমবারের মত পা রাখেন। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়মে বিচারক নিযুক্ত হ’ন মার্চের ৪ তারিখে। একই বছরের ২০ মার্চ তিনি নাইট উপাধি লাভ করেন এবং এপ্রিল মাসে আনা মারিয়া শিপলে’র সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হ’ন। আরবি-ফারসি ভাষায় পারদর্শী জোন্স অবশ্য ইয়োন্স উক্সফার্দি (যেটির অর্থ অক্সফোর্ডের জোন্স) ছদ্মনামে লেখালেখি করেন। বিশেষ করে ১৭৭১ সালে প্রকাশিত পারসিয়ান গ্রামার গ্রন্থে মুদ্রিত হয় তাঁর এ ছদ্মনাম। ওটেনের মূল্যায়নটি জোন্সের ভারতে অবস্থানের নিরিখেই নির্ণীত হয়। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় ১৭৬৩ সালে অর্থাৎ ভারতে আগমনের আরও বহুকাল আগে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইংরেজিতে কবিতা রচনা করেন। ১৫২৭ সালে রচিত মার্কো গিরোলামো ভিডা’র ৬৫৮ পংক্তির কবিতা ‘স্কাশিয়া লুডুস’ অবলম্বনে তিনি রচনা করেন ‘ক্যায়সা’ নামক কবিতাটি। পৌরাণিক চরিত্র ক্যায়সা-কে দাবা খেলার দেবী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তীকালে ভারতে থাকাকালে তিনি রচনা করেন ‘দ্য এনচ্যান্টেড ফ্রুট’ ‘হিন্দু ওয়াইফ’ সহ আরও কিছু কবিতা।

ই. এফ. ওটেন রচিত গ্রন্থে আলোচিত প্রধান ইঙ্গভারতীয় লেখকরা হলেন জন লেডেন, হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, বিশপ হেবের, ডেভিড লেস্টার রিচার্ডসন (ডি. এল. রিচার্ডসন), জর্জ পাওয়েল থমাস, জে. বি. নর্টন, আলফ্রেড লায়াল, রুডইয়ার্ড কিপলিং, হেনরি মেরিডিথ পার্কার, এডউইন আর্নল্ড, ডব্ল্যু টি. পিয়ারসি, এলিফ চিম, টি. এফ. বিগনোল্ড, ই. এইচ. এ্যাটকেন, ইলটুড্স্ প্রিচার্ড, মিডোজ টেলর, এইচ. এস. কানিংহ্যাম, জন লং, জি. বি. ফ্রেজার এবং আর ডব্ল্যু ফ্রেজার। ওটেনের গ্রন্থে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে কয়েকজনের নামোল্লেখ রয়েছে যদিও তাঁদের সাহিত্যিক মূল্যায়ন নেই। এঁরা হলেন এইচ. বিজয়চাঁদ দত্ত, জি. সি. দত্ত, শশীচন্দ্র দত্ত, তরু দত্ত, পি. সি. মিত্র, লাল মনোকর, ভেসুভালা সি নওরোজি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং রামস্বামী রাজু। ই. এফ. ওটেন বাঙালি কবি, কেবল বাঙালি কবিই নন, প্রথম ইঙ্গভারতীয় কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেন নি, এমনকি তাঁর নামেরও উল্লেখ করেন নি। যাহোক, বিবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর গ্রন্থটি প্রশংসার যোগ্য। পরবর্তীকালে ওটেন সাহেবের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যান টি. ও. ডি. ডান (থিওডোর ও’ডগলাস ডান)। ১৯১৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর গ্রন্থ বেঙ্গলি রাইটার্স অব ইংলিশ ভার্স: আ রেকর্ড এ্যান্ড এ্যান এ্যাপ্রিসিয়েশন। এটি ইঙ্গভারতীয় সাহিত্যের মূল্যায়ন হলেও অবাঙালি ভারতীয় লেখকদের সাহিত্য এতে আলোচিত হয় নি। ডান-ই প্রথম বাঙালি কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষ এবং তাঁর সাহিত্যকর্মের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করেন।

১৯০৬ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত সি. ই.বাকল্যান্ডের ডিকশনারি অব ইন্ডিয়ান বায়োগ্রাফি গ্রন্থের ১৬৩ পৃষ্ঠায় কাশীপ্রসাদ ঘোষের যে-পরিচিতি দেওয়া হয়েছে সেটি লক্ষ করা যেতে পারে। তাঁর জন্ম ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে। ১৮২১ সালে তিনি ‘ফ্রি স্কলার’ হিসেবে হিন্দু কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। ১৮২৮ সালে প্রফেসর এইচ. এইচ. উইলসনের অনুরোধে ‘গভর্নমেন্ট গেজেট’ ও ‘এশিয়াটিক জার্নালে’ প্রকাশের জন্য জন স্টুয়ার্ট মিল-এর ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস গ্রন্থের সমালোচনা রচনা করেন। ১৮৩১ সালে প্রকাশিত হয় ইংরেজিতে রচিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ শায়ের এ্যান্ড আদার পোয়েমস্। ১৮৩৪ সালে প্রকাশিত হয় ভারতবর্ষের স্থানীয় রাজাদের সম্পর্কে লেখা ইতিহাস যা পূর্বে ছদ্মনামে প্রকাশ পায় ডেভিড লেস্টার রিচার্ডসনের ‘লিটারেরি গেজেট’ পত্রিকায়। ১৮৪০ সালে রিচার্ডসন নির্বাচিত ব্রিটিশ কবিদের কবিতার সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয় তাঁর কবিতা। ১৮৪৬ সালের নভেম্বরে কাশীপ্রসাদ সাপ্তাহিক ‘হিন্দু ইন্টেলিজেন্স’ প্রকাশ শুরু করেন এবং সেটি ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহতভাবে প্রকাশিত হয়। ১৮৩৮ সালে লর্ড কানিংহ্যামের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ধর্মসভা’। কাশীপ্রসাদ ঘোষ তখন সব ধরনের ধর্মীয় সংস্কারের বিরোধিতা করেন। তাঁকে কলকাতা শহরের ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ এবং অবৈতনিক প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট মনোনীত করা হয়েছিল। ১৮৭৩ সালের ১১ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ইংল্যন্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের বোডেন-অধ্যাপক বিখ্যাত প্রাচ্যতত্ত্ববিদ হোরেস হ্যাম্যান উইলসন (১৭৮৬-১৮৬০) রচিত (১৮৪৫-৪৮ সালের কালপরিধিতে) তিন খণ্ডের গ্রন্থ দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ফ্রম  ১৮০৫-১৮৩৫-এর ৫০৬-৫১০ পৃষ্ঠায় মদ্রিত কাশীপ্রসাদ ঘোষের যে-আত্মজীবনী মুদ্রিত হয়েছিল সেটি যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। তাঁর মন-মানসিকতা এবং তাঁর অভিরুচি সম্পর্কে বেশ খানিকটা ধারণা এ থেকে পাওয়া যাবে। অবশ্য তাঁর কবিতার চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, অনেককাল আগেই এই বাঙালি কবি তাঁর রচনায় এমন ভাব-বিষয়ের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন যা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর। ১২১৬ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে তথা ১৮০৯ সালের আগস্ট মাসে তাঁর জন্ম। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি সামান্য ইংরেজি ও বাংলা পড়তে পারতেন। ১৮২১ সালে তাঁকে হিন্দু কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় ‘ফ্রি স্কলার’ হিসেবে। ১৮২৭ সালে হিন্দু কলেজ পরিদর্শনে আসেন এইচ. এইচ. উইলসন। স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রদের কাব্যরচনার দক্ষতা যাচাই করবার জন্য তাদেরকে কবিতা রচনা করতে দেওয়া হয়। একমাত্র কাশীপ্রসাদই কাব্যরচনায় সক্ষমতা দেখাতে পারেন। সেটি ছিল ‘তরুণ কবির সর্বপ্রথম কাব্যপ্রচেষ্টা’। সময়টা ছিল আগস্ট মাস। কিন্তু সে-কবিতা এবং সেইসঙ্গে আরও কিছু কবিতা কাশীপ্রসাদ ঘোষ বাতিল করে দেন কাঁচা হাতের রচনা এমন বিবেচনায়। স্কুলে থাকাকালীন রচিত কবিতার মধ্যে অনুমোদন পায় তাঁর রচিত একমাত্র কবিতা যেটির শিরোনাম ‘দ্য শায়ের’, যেটির অর্থ ‘আশা’। ডক্টর উইলসনের অনুরোধে কাশীপ্রসাদ ঘোষ মিল-এর ‘দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’-র প্রথম কয়েকটি অধ্যায়ের সমালোচনা রচনা করেন এবং যেটি প্রথমে ছাপা হয় ১৮২৯ সালের ১৪ ফ্রেব্রুয়ারির ‘গর্ভনমেন্ট গেজেট’-এ। পরে আবার সেটি ছাপা হয় ‘এশিয়ািটক জার্নাল’-এ। মূলত কবি হিসেবে পরিচিতি পেলেও তিনি বেশকিছু সমালোচনামূলক গদ্যও রচনা করেছিলেন। ‘লিটারেরি গেজেট’ পত্রিকায় বেরোয় তাঁর লেখা ‘দ্য ভিশন, আ টেল’, ‘অন বেঙ্গলি পোয়েট্রি’ এবং ‘অন বেঙ্গল ওয়ার্ক্স এ্যান্ড রাইটার্স’ প্রভৃতি সমালোচনামূলক গদ্য। জেমস লং প্রকাশিত ‘ক্যালকাটা মান্থলি ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত হয় তাঁর রচনা ‘স্কেচেস্ অব রণজিৎ সিং’ এবং ‘দ্য কিং অব ওউধ’। এছাড়া লং-এর ‘লিটারেরি গেজেট’-এ বেরোয় তাঁর ‘মেমোয়ার্স অব নেটিভ ইন্ডিয়ান ডাইন্যাস্টি’।

হোরেস উইলসনের আহ্বানে লেখা আত্মজীবনীতে কাশীপ্রসাদ ঘোষ আরও জানান, ছোট থেকেই তিনি কবিতা বিষয়ে উৎসাহী ছিলেন এবং কবিতা লিখতেন। হিন্দু কলেজে বিদ্যালয়ে পড়তে এলে সেখানকার শিক্ষক আর. হ্যালিফ্যাক্স তাঁকে বেশ অনুপ্রেরণা যোগান এবং তিনি ইংরেজিতে কবিতা লিখে সেসব দেখান তাঁকে। হ্যালিফ্যাক্স সাহেব কাশীপ্রসাদের কবিতাগুলো সোৎসাহে পাঠ করেন এবং তিনি তাঁকে বেশকিছু প্রয়োজনীয় বই পড়বার পরামর্শ দেন। শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত বাংলা বাইবেলের অনুবাদের সীমাবদ্ধতা ও অযথার্থতা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন কাশীপ্রসাদ ঘোষ। পত্রিকাটি কাশীপ্রসাদের সমালোচনা মেনে নেয় এবং বাইবেলের প্রথম অনুবাদটি মিশন থেকে তাঁকেই পাঠানো হয় ১৮৩১ সালে। মিশনের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর জন্য অনুরোধও জানানো হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় যথেষ্ট পরিশ্রম করে কাশীপ্রসাদ বাইবেল-অনুবাদের সংশোধনী ও পরিমার্জনা করে দেন। যদিও পরে জানা যায়, শ্রীরামপুর মিশন সবৈবভাবে কাশীপ্রসাদের পরামর্শানুযায়ী কাজ করে নি। দ্রুত মুদ্রণের জন্য অনেকটা দায়সারাভাবে তাঁরা ছাপিয়ে ফেলেন উইলিয়ম কেরী অনূদিত সেই বাইবেল। এটা হতে পারে সত্তর বছর বয়েসী কেরী সেসময়টাতে মাঝে-মাঝে অসুস্থ হয়ে যেতেন। তাঁর পক্ষে বাইবেলের কাশীপ্রসাদকৃত পরামর্শে পুরোপুরি সাড়া দেওয়াটা সম্ভবপর হয়ে ওঠে নি। তবে এ থেকে একটা বিষয় বোঝা যায়, কথোপকথন ও লিপিমালা’র রচয়িতা উইলিয়ম কেরী’র অনুবাদও যে ইংরেজিজানা বাঙালির দক্ষ হাতে পড়ে বেশ একটা কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীনই হয়েছিল। কাশীপ্রসাদ ঘোষ ইংরেজি ছাড়াও ফারসি, নাগরী এবং সংস্কৃতেও পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন।

আত্মজীবনীতে নিজের পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে যে-তথ্য দেন তা থেকে জানা যায় ১৮২৫ সালে সতেরো বছর বয়সে বিয়ে করেন তিনি। ১৮২৮ সালে তাঁর একটি পুত্রসন্তান হয় এবং সে বছরেই তাঁর স্ত্রীবিয়োগ ঘটে। পুনরায় বিয়ে করেন তিনি। মাত্র এক বছর বয়সী তাঁর পুত্রসন্তানটি মারা যায়। ১৮৩১ সালে মৃত্যুবরণ করেন তাঁর পিতা। ১৮৩২ সালে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী একটি কন্যসন্তানের জন্ম দিয়ে একই দিনে মৃত্যুবরণ করে। কাশীপ্রসাদ ঘোষ তৃতীয়বার দ্বার পরিগ্রহ করেন। কাশীপ্রসাদরা ছিলেন চার বোন ছয় ভাই। পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে বেশ জটিলতা ও সমস্যার সৃষ্টি হয় তাঁদের পরিবারে। এমনকি তাঁকে মামলায় পড়ে শরাণাপন্ন হতে হয় কোর্টকাছারির। তিনি জানান, সৎ ভাইয়ের সঙ্গে যৌথ মালিকানার সম্পত্তিঘটিত মামলায় তাঁকে কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দৌড়াতে হয়। তাঁর সৎ ভাইয়েরা তখন সকলেই ছিল নাবালক। পরিবারের সদস্যরা যৌথ মালিকানাধীন তাঁদের সম্পত্তির সুষম বিভাজনে ব্যর্থ হলে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হ’ন। কোর্ট বেশ সুচারুরূপেই সম্পত্তির মালিকানার সমাধান করে দেয় কিন্তু সে-মামলার খরচ হিসেবে কাশীপ্রসাদ ঘোষকে দিতে হয় ২৫ হাজার রুপি। কাশীপ্রসাদ ঘোষ তাঁর রচনায় সেই সময়কার ব্রিটিশ আদালতের সমালোচনা করেন। তিনি জানান, মামলার জন্য স্থানীয় নাগরিকদের নিকট থেকে ব্রিটিশরা যে-খরচ আদায় করে তা অত্যন্ত অন্যায্য এবং প্রায় অত্যাচারের সামিল।

কলকাতা হিন্দু কলেজের শিক্ষক মিস রবার্টস্ হ্যালিফ্যাক্সের অনুপ্রেরণার কথা ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কাশীপ্রসাদের বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে কাশীপ্রসাদের সাহিত্যরুচি এবং ইংরেজি ভাষায় লেখার ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। কলকাতা থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী মিসেস হ্যালিফ্যাক্স কাশীপ্রসাদকে জানান যে ইংল্যন্ডে গিয়ে তিনি কাশীপ্রসাদ ঘোষের জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে লিখবেন। এটিও খুব কৌতূহলোদ্দীপক একটি ঘটনা ছিল নিঃসন্দেহে। কোম্পানি আমলে উপনিবেশিক ভারতবর্ষের একজন বাঙালির জীবন ও সাহিত্যকর্মকে ইংরেজিভাষী একজন শিক্ষাবিদের এতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করাটা অবশ্যই সহজ ব্যাপার ছিল না। কাশীপ্রসাদের ব্যক্তিত্বের প্রভা এবং তাঁর রচনার শক্তি ও শৈলী দ্বারাই মুগ্ধ হয়েছিলেন বিদেশিনী, একথা নিশ্চিতভাবে বলা চলে। ১৮৩৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কাশীপ্রসাদ ঘোষ জানান, তিনি বাংলায় অনেকগুলি গান রচনা করেছেন কিন্তু তাঁর অধিকাংশ রচনা ইংরেজিতেই। তিনি লেখেন, বাংলার চাইতে ইংরেজিতে লিখতেই তিনি অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ভাব-ভাবনা-আবেগ এসব বাংলা না ইংরেজি কোন্ ভাষায় লেখা কবিতায় যথাযথভাবে ফুটে ওঠে সে-বিষয়ে চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে না পারলেও কাশীপ্রসাদ জানান, বাংলার চাইতেও ইংরেজি ভাষায় পঠনপাঠন এবং রচনায় অধিক সময় ব্যয় করে গেছেন তিনি। প্রসঙ্গত টি. ও. ডি. ডান-এর মন্তব্য (৫ সংখ্যক পৃষ্ঠায়) থেকেও কাশীপ্রসাদ ঘোষের আত্মবিশ্বাসী মূল্যায়নের যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। ডান তাঁর পূর্বোক্ত গ্রন্থে লিখেছেন, ১৮৩০ থেকে ১৮৩৬ সালের মধ্যে ডেভিড লেস্টার রিচার্ডসন তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘দ্য বেঙ্গল এ্যানুয়েল’-এর যে-সাতটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় এবং যেখানে নির্বাচিত গদ্য-পদ্যেরই স্থান হতো, সেখানে কাশীপ্রসাদের একাধিক কবিতা প্রকাশ পায়। এ থেকেই তাঁর কবিত্বশক্তি এবং কবিতার যোগ্যতার প্রমাণ মেলে বলে মন্তব্য করেন ডান।

১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত লতিকা বসু রচিত ইন্ডিয়ান রাইটার্স অব ইংলিশ ভার্স গ্রন্থে ‘গভর্নমেন্ট গেজেট’ এবং জেমস লং-এর ‘লিটারেরি গেজেট’ দু’টোরই উদ্ধৃতিসূত্র রয়েছে। সেখানে কাশীপ্রসাদ ঘোষের বেড়ে ওঠা তাঁর আশৈশব কাব্যাবেগ এবং তাঁর কাব্যবিকাশ প্রভৃতি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। শৈশবে মুগ্ধতা নিয়ে কান পেতে শুনতেন ‘বৃষ্টিপাতের সংগীত’। বনের পাতার ‘মর্মর’ কেড়ে নিতো তাঁর মনোযোগ। প্রকৃতির সেইসব মুগ্ধতার আশ্রয়ে কবিতা লিখলেন তিনি এবং হিন্দু কলেজের ‘হেড-লেকচারার’ আর. হ্যালিফ্যাক্সকে সেটা দেখালেন। বাঙালি কবির কাব্য-প্রতিভার বিদেশি ভাষায় প্রতিফলন পাঠ করে মুগ্ধ হলেন হ্যালিফ্যাক্স সাহেব। কিন্তু তিনি দেখলেন কাশীপ্রসাদের কবিতা কাব্যগুণে গুণান্বিত ঠিকই কিন্তু কবিতার পংক্তিবিন্যাস স্বতঃস্ফূর্ত হলেও ইংরেজি কাব্যের ছন্দরীতি বা বিন্যাস সেখানে অনুসৃত হয় নি। হ্যালিফ্যাক্স তাঁকে পরামর্শ দিলেন কেরী রচিত ‘প্রোসোডি’ গ্রন্থটি পাঠ করবার জন্য। কিন্তু বইয়ের দোকানে গিয়ে কাশীপ্রসাদ সে-বই পেলেন না। তখন তিনি নিয়ে এলেন মারে রচিত ‘প্রোসোডি’ এবং লর্ড কেইনের লেখা ইলেমেন্টস্ অব ক্রিটিসিজম’। এই দুটি গ্রন্থ কাশীপ্রসাদের জন্য ছিল বিশেষ সহায়ক। কবিতার কলাপ্রকৌশল তিনি শিখলেন বইগুলো থেকে। এছাড়া শ্রেষ্ঠ ইংরেজি কবিতার পঠনপাঠন তিনি সমান্তরালে চালিয়ে যান। এতে করে তাঁর শ্রুতি ইংরেজি কবিতার ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কাশীপ্রসাদ পূর্বে লেখা কবিতাটি আবার লিখলেন। এবারে ভাববস্তু ঠিক রেখে সেটিকে ছন্দের ছাঁচে ফেললেন। তারপর সেটি নিয়ে গেলেন হ্যালিফ্যাক্স সাহেবের কাছে। তিনি অনুমোদন করলে কাশীপ্রসাদ প্রকাশ করেন সে-কবিতা। ১৮৩০ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর কাব্যগ্রন্থ শায়ের এ্যান্ড আদার পোয়েমস্ প্রকাশ পেলেও কাশীপ্রসাদ নিজের সে কাব্যপ্রচেষ্টা সম্পর্কে বেশ খোলাখুলিভাবেই বলেন যে আসলে অতটা দ্রুত নিজের কাব্যগ্রন্থ তিনি প্রকাশ না করলেও পারতেন। কেননা, সেসব কবিতায় বেশকিছু পুনরাবৃত্তি এবং ব্যাকরণগত অযথার্থতা রয়ে যায়। ১৮৩৪ সালের ১ নভেম্বর প্রকাশিত ‘লিটারেরি গেজেট’-এ কাশীপ্রসাদ জানান যে পুনর্মুদ্রণের জন্য প্রথম গ্রন্থের কবিতাগুলো তিনি পরিমার্জনায় নিয়োজিত আছেন।

কাশীপ্রসাদ ঘোষের সেই কাব্যগ্রন্থের পুনর্মুদ্রণের কোনো সংবাদ বা তথ্য পরবর্তীতে আর পাওয়া যায় না। এ থেকে সমালোচকগণের অনুমান, সে-কাব্যগ্রন্থ হয়তো আর পুনর্মুদ্রিত হয় নি। কিন্তু তা না হলেও প্রথম বইয়ের কবিতার সূত্রেই কাশীপ্রসাদের কাব্যপ্রতিভার স্ফূরণশক্তি টের পেয়েছিলেন সমকালীন সমালোচকমহল। বাঙালি নয় বরং ইংরেজ সমালোচকের মূল্যায়নেরই দ্বারস্থ হতে পারি আমরা। ডি. এল. রিচার্ডসন (ডেভিড লেস্টার রিচার্ডসন) নামেই যিনি সমধিক পরিচিত তিনি কাশীপ্রসাদ ঘোষের প্রথম কাব্য সম্পর্কে ‘লিটারেরি গেজেট’-এ যে-মূল্যায়ন করেন (১৮৩৪ সালের ১ নভেম্বর) সেটি প্রণিধানযোগ্য: “যেসব সংকীর্ণমনা লোক আক্রমণাত্মক-বিশ্রী অভ্যাসের বশে ভারতবাসীদের অবজ্ঞার চোখে দেখে থাকেন আমি তাদেরকে এই ছোট্ট কবিতাটি পড়তে বলি এবং তাদের জিজ্ঞ্যেস করি- তারা কী এর চাইতে ভালো কবিতা বিদেশি ভাষায় নয়, তাদের মাতৃভাষাতেই লিখতে পারবেন।” সমালোচক লতিকা বসু তাঁর গ্রন্থটিতে কাশীপ্রসাদের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েছেন এবং তাঁর কাব্যের সমালোচনাও তিনি করেন যেটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দৃষ্টিতে রিচার্ডসন হয়তো কাশীপ্রসাদের কবিতাপ্রচেষ্টাকে খানিকটা সহানুভূতির দৃষ্টিতেই দেখেছিলেন। হতে পারে তিনি একজন ইংরেজের লেখা কবিতার পরিবর্তে একজন ইঙ্গভারতীয় কবির কাব্যপ্রচেষ্টাকে অধিক গুরুত্ব দেন। কাব্যগ্রন্থটি মূলত একটি দীর্ঘ কবিতার বিভিন্ন ভাগে বিন্যস্ত শাখার সমাহার। মূল কবিতাটির শিরোনাম ‘শায়ের’। তবে বিভিন্ন বিষয়াশ্রিত গীতিকবিতা এতে রয়েছে।

‘শায়ের’ নামক কবিতাটি বর্ণিত হয় একজন চারণ কবির জবানীতে যাঁর হৃদয়েশ্বরীর মৃত্যু ঘটেছে এবং যাঁর হৃদয়ে সেই প্রেমিকার জন্যে যন্ত্রণা আর হাহাকার জমাটবদ্ধ। অনেক সমালোচক কবিতাটিতে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজি কবিতায় প্রতিফলিত প্রকৃতিচেতনা ও নীতিবাদের প্রভাবসম্পাত লক্ষ্য করেন। প্রচলিত বিশেষণাতিশায়ন উপমা উৎপ্রেক্ষা সবই সেই সময়কার কাব্যধারার ঐতিহ্যলালিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ কাশীপ্রসাদ ঘোষের কাব্যের খানিকটা উদ্ধৃতি এবং সেটির মৎকৃত বঙ্গানুবাদ লক্ষ করা যেতে পারে-

You may have seen the tender stem
That bear the rose’s blooming gem-
How when the flow’ret falls way,
Snatched by a storm it doth decay! … …
You may have seen the lily flower
That liveth in the watery bower-
How smilingly and purely white
It blooms when shines the moon at night.
হয়ত দেখেছো তুমি গাছের নরম শাখা
যে-শাখা বহন করে ফুটন্ত গোলাপ-রত্ন-
কীভাবে সে ফুল ঝরে পড়ে যায়
ক্ষয়ে যায় তীব্র এক ঝড়ের প্রকোপে! … …
হয়তো দেখেছো তুমি শাপলার ফুল
বসতি যায় জলময় সরোবরে-
কী যে স্মিত ও নিখুঁত সফেদ দেখায়
যখন ঝকঝকে ফোটে রাত্রি চন্দ্র কিরণে।

‘দ্য হিন্দু ফেস্টিভ্যালস্’ কবিপ্রসঙ্গতাটিতে ভারতীয় সভ্যতার বিশেষ করে দেশীয় উৎসবাদির প্রতি কবির মুগ্ধতা এবং জনজীবনের সঙ্গে উৎসব-পার্বণ প্রভৃতির সম্পৃক্ততা বর্ণিত। ভারতীয় তথা সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীর প্রসঙ্গ এবং তাঁদের নামে যেসব পূজো-ব্রত রয়েছে সেগুলোর কথা এসেছে কবিতায়। অষ্টাদশ শতকের কবিদের কবিতায় যেমন গ্রিসদেশীয় দেবদেবীর প্রাধান্য তেমনি কাশীপ্রসাদের কবিতায় গ্রিসের স্থানে এসেছে ভারতীয় সভ্যতার দেবদেবী-মাহাত্ম্য। তবে তাঁর নৈসর্গিক কবিতাগুলোকে সমালোচকেরা ততটা উচ্চাঙ্গের বলে মনে করেন নি। বলতে পারি প্রকৃতিচিত্রণের ক্ষেত্রে তিনি ইঙ্গভারতীয় কবিতার ঈশ্বর গুপ্ত। সূর্যাস্ত, মেঘমালা, মৃদুমন্দ সমীরণ সবই এসেছে কিন্তু এসেছে বস্তুগতভাবে, রোমান্টিকতার আবেশমাখানো নয় সেসব। ফুলের ক্ষেত্রে যদি বলি তাঁর কবিতায় গোলাপ কিংবা জেসমিনের প্রাধান্য। মাঝে-মাঝে এসেছে পদ্মফুলের প্রসঙ্গ। এখানে একটা বিষয় তাঁর কবিতার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। অনেকেই বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিপুলতাপূর্ণ ও জ্ঞানগভীর প্রতিষ্ঠানের মত কোনো জায়গায় লেখাপড়া না করেই সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় কাশীপ্রসাদ যে-কাব্যচর্চার ও সৃষ্টির দৃষ্টান্ত রেখে যান তা দুইশ’ বছর আগেকার বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতে খুবই তাৎপর্যময় একটি ঘটনা। তাছাড়া কাশীপ্রসাদ ঘোষের কাব্যগ্রন্থটি আকারেও ছিল উল্লেখযোগ্য- সর্বমোট দুইশ’ পৃষ্ঠার। অর্থাৎ কাব্যাভিষেকেই তিনি প্রসন্ন ভবিতব্যের ইঙ্গিত দিতে পেরেছিলেন। বইটির মুদ্রণসৌকর্যের প্রশংসা করেছিলেন তাঁর কবিতার মূল্যায়নকারীরা। এটি মুদ্রিত হয়েছিল ‘ইন্ডিয়া গেজেট’-প্রেস থেকে। কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছিল লর্ড উইলিয়ম বেন্টিংক-কে। কাশীপ্রসাদ ঘোঘের কাব্য প্রকাশকালে তিনি ছিলেন ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর। পরবর্তীতে (১৮৩৪-১৮৩৫) বেন্টিংক ভারতবর্ষের প্রথম গভর্নর-জেনারেল নিযুক্ত হ’ন। গ্রন্থস্থ অনেকগুলি কবিতা আলাদা-আলাদাভাবে সমকালীন বহু বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। এঁদের মধ্যে হোরেস হ্যাম্যান উইলসন এবং হেনরি মেরিডিথ পার্কারের নাম বলা যায়। এসব থেকে কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষের পরিম-লটিকেও অনুধাবন করা যায়। হোরেস উইলসনের মত বিদগ্ধ পণ্ডিত এবং মেরিডিথ পার্কারের মত নামকরা কবির সান্নিধ্য ও প্রীতিধন্য হতে পেরেছিলেন খিদিরপুরের হেদুয়া অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী একজন বাঙালি। বস্তুত কাশীপ্রসাদ ঘোষের এ অর্জন ও অবস্থান সমগ্র বাঙালির জন্যই গর্বের বিষয়। তোষামোদ করে বা আত্মমর্যাদাহীন ব্যক্তিত্বশূন্য হয়ে তিনি সেটি অর্জন করেন নি, করেছেন তাঁর কাব্যপ্রতিভা ও মননের শক্তি দিয়ে।

কাশীপ্রসাদ ঘোষের অনেক কবিতাই সমালোচকদের সুদৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয় নি। সেটির কারণও চিহ্নিত করা যায়। কাব্যচর্চার প্রথম দিকে তিনি নিসর্গ প্রেম দৈনন্দিন জীবনের ঘটনানির্ভর কাব্য-উপাদানের দিকে মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু কালক্রমে তাঁর মধ্যে ভিন্নধর্মী চেতনার স্ফূরণ ঘটতে থাকে। বলা যায় তাঁর উপলব্ধির জগতটি প্রসারিত হয় এবং তাঁর মননাঞ্চলও হয় গভীরতাশ্রয়ী। ‘দ্য লাভারস্ লাইফ’ কিংবা ‘সং অব দ্য বোটম্যন টু গঙ্গা’র কাশীপ্রসাদকে পরবর্তীতে ভিন্নরূপে পাওয়া যায় ‘ইন্ডিয়া’ কিংবা ‘ল্যামেন্ট অব ঔউধ্ অন দ্য এ্যানেক্সেশন, ১৮৫৬’ প্রভৃতি কবিতায়। প্রথমটি ১৮৬২ এবং দ্বিতীয়টি রচিত হয় ১৮৭২ সালে। ১৮৭৩ সালে মৃত্যুর মাত্র বছরখানেক আগেও যে-কবিতা কাশীপ্রসাদ রচনা করেন তাতে একজন সচেতন স্বাদেশিক ভারতবাসীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ‘ইন্ডিয়া’ শিরোনামাঙ্কিত কবিতাটিতে দেবদেবীর প্রাধান্য রয়েছে ঠিকই কিন্তু এতে জয়গান গাওয়া হয়েছে বীরত্বের জন্যে স্মরণীয় ঐতিহাসিক-পৌরাণিক চরিত্রদের। তাছাড়া কবিতাটিতে প্রচ্ছন্নভাবে এসেছে এক ধরনের মুক্তির প্রত্যাশা। অবরুদ্ধ উপনিবেশিত স্বদেশের অবস্থা কবির সংবেদনা দিয়ে ধরবার চেষ্টা করেছেন কাশীপ্রসাদ ঘোষ। কবির তেষট্টি বছর বয়সের রচনা তাঁর ‘ল্যামেন্ট অব ঔউধ্ অন দ্য এ্যানেক্সেশন, ১৮৫৬’ শিরোনামের কবিতাটি। সমালোচকগণ তাঁর এ-কবিতাটির ওপর ততটা দৃষ্টি নিবদ্ধ না করলেও কবিতাটি নানা কারণেই স্মরণযোগ্য। এ-কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে যুগপৎ রাজনৈতিক সচেতনতা এবং স্বাদেশিকতা। ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের ভাষার আশ্রয় নেওয়া সত্ত্বেও কাশীপ্রসাদের এমনতর সংবেদনশীলতা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্ববাহী। প্রসঙ্গত বলা যায় ১৮৫৬ সালের ৭ ফ্রেব্রুয়ারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জেনারেল লর্ড ডালহৌসি’র আদেশের বলে অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে ক্ষমতাচ্যূত করা হয় অযোগ্য শাসন ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে এবং অঞ্চলটিকে নিয়ে আসা হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রত্যক্ষ অধীনতায়। এ-ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে বলা যায় এক ধরনের আগ্রাসন। বস্তুত অযোধ্যায় বিরাজমান থাকা নবাবদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণকে কোম্পানি সহ্য করতে না পেরে ছককষা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে কোম্পানি এর ক্ষমতা প্রদর্শন করলেও ১৮৫৬ সালে এসে তারা ‘চ্যাসাস বেল্লি’ বা ‘যুদ্ধের কারণ’ সৃষ্টি করে নবাবকে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠিত করে। যেটা লক্ষ করবার বিষয় ১৮৫৬ সালে যখন এ ঘটনাটি ঘটে তখন কাশীপ্রসাদ ঘোঘের বয়স সাতচল্লিশ বছর। তখন বা তার কিছুকাল পরেও তিনি কবিতাটি রচনা করেন নি। ঘটনাটির ষোলো বছর পরে ষাটোর্ধ্ব কাশীপ্রসাদ রচনা করেন কবিতাটি। অর্থাৎ জীবনাভিজ্ঞতার পরিপক্ক একটি স্তরে পৌঁছবার পরে কবিতাটির জন্ম। ঘটনার এত বছর পরেও যখন কবিতাটি লেখা হলো তখন এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কবি তাঁর মন থেকে ঘটনাটিকে কখনই মুছে ফেলেন নি বরং বিষয়টিকে তিনি জীবনের শেষ পর্ব পর্যন্ত বয়ে নিয়ে গেছেন। ‘ল্যামেন্ট অব ঔউধ্ অন দ্য এ্যানেক্সেশন, ১৮৫৬’ কবিতাটির শিরোনামটির দিকেই যদি দৃষ্টি দেই তাহলে দেখবো এতে প্রতিফলিত হয়েছে বিলাপ বা শোকের কথা। কিন্তু এ-বিলাপ ব্রিটিশদের পক্ষে নয়, বরং বিপরীত, বিলাপ জনগণের পক্ষে এবং উপনিবেশের বিপক্ষে। কাশীপ্রসাদের এ-কবিতায় রয়েছে জনগণের জীবনের ঐতিহ্যের কথা এবং ব্রিটিশদের সমালোচনা। বলা যেতে পারে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায়ও যেখানে এতটা স্পষ্টভাবে ব্রিটিশদের সমালোচনা লক্ষ করা যায় না সেখানে কাশীপ্রসাদ ঘোষের কবিতা নিঃসন্দেহে অগ্রবর্তী ভাবনার ধারক। কবিতাটি যেহেতু বাংলা ভাষায় রচিত নয়, তা বাঙালি পাঠক ও সমালোচকের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে সহজেই। কিন্তু বাঙালি কবির এ-কবিতা স্বাদেশিকতার বোধে এবং উপনিবেশবিরোধিতার উপলব্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ।

ইঙ্গভারতীয় কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষের কবিপ্রতিভার গুরুত্ব কতখানি সেটি সংক্ষেপে পর্যালোচনা করতে পারা যায় ইংরেজ কবি লেটিসিয়া এলিজাবেথ ল্যান্ডন-এর (১৮০২-১৮৩৮) সূত্রের সহায়তায়। ক্ষণজন্মা এ কবি ও ঔপন্যাসিক অনেকগুলি কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাসের স্রষ্টা। তাঁর অনেকগুলি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্য ফেট অব এ্যাডেলেইড, দ্য শিভালরি এ্যান্ড আদার পোয়েমস্, দ্য ভেনেসিয়ান ব্রেসলেট এবং উপন্যাস এথেল চার্চিল। নানা কারণে তিনি ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। মার্কিন কবি এডগার এ্যালেন পো’ ল্যান্ডনের প্রতিভার মুগ্ধ স্বীকৃতি প্রকাশ করেছিলেন। বিখ্যাত জার্মান কবি হাইনরিশ হাইনে এবং ফরাসি প্রসপার মেরিমে ও শাতুব্রিয়ঁ-র সঙ্গে ছিল তাঁর পরিচয় ও যোগাযোগ। মাত্র ১৮ বছর বয়সে লেখা তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল বিখ্যাত পত্রিকায়। বিলাতের বিখ্যাত প্রকাশক ফিশারস্ এ্যান্ড সন্স-এর প্রকাশনা ‘ফিশারস্ ড্রয়িং রুম স্ক্র্যাপ বুকস্’ ১৮৩২ সাল থেকে শুরু করে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত (১৮৩৮-এর সংখ্যা প্রকাশিত হয় এবং ১৮৩৯ সালের সংখ্যাটি প্রস্তুত করে রেখে যান তিনি যেটি তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশ পায়।) এটিকে বলা হতো ‘এ্যানুয়েল গিফ্ট্ বুক’। মূলত কবিতাশ্রিত এ-প্রকাশনাটিতে বিচিত্র বিষয়ের কবিতা ছাপা হতো। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষই শুধু নয় আফ্রিকা মিশর লেবাননসহ পৃথিবীর নানা দেশ জাতি সংস্কৃতি প্রকৃতি ইত্যাকার নানা বিষয়ে সমৃদ্ধ প্রকাশনাটি সমকালে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিষয় ও প্রসঙ্গকে বহির্বিশ্বে পরিচিত ও উপস্থাপনের ব্যাপারে প্রকাশনাটির বিশেষ ভূমিকা ছিল লক্ষযোগ্য। ল্যান্ডন সম্পাদিত সময়টি ছিল প্রকাশনাটির স্বর্ণযুগ। ১৮৩৫ সালে কাশীপ্রসাদ ঘোষের দু’টি কবিতা প্রকাশিত হয় ল্যান্ডন সম্পাদিত ইংল্যান্ডের এ-পুস্তকে। এতে তাঁর নামের বানান ছিল Kasiprasad Ghose. কবিতাদু’টির শিরোনাম যথাক্রমে ‘Boatmen’s Song to Ganga’ এবং ‘Storm and Rain’ ২৪ লাইনের প্রথম কবিতাটিতে বিধৃত হয়েছে গঙ্গানদীবিধৌত বাংলার জনজীবনের ও প্রকৃতির কবিত্বপূর্ণ চিত্র। কবিতাটিতে চিত্রিত কবি কাশীপ্রসাদের নিসর্গ, বসতি এবং সৌন্দর্যচেতনার বিশ্লেষণ থেকে একথা বলা যায় কবির আবেগ, বাঙালির জীবন-জগতের প্রতি মুগ্ধতা ও কাব্যচেতনার চমৎকার প্রতিফলন আজ থেকে প্রায় দুইশ’ বছর আগে রচিত সাহিত্যের শৈল্পিক সাফল্যেরই প্রমাণ। কবিতাটির প্রথম দুই এবং অভ্যন্তরীণ আরও চারটি পংক্তির উদ্ধৃতি থেকে কবি কাশীপ্রসাদের কাব্যপ্রতিভার নমুনা লক্ষ করা যেতে পারে:

Gold river! Gold river! How gallantly now
Our bark on thy bright breast is lifting her prow.
Gold river! Gold river! How bright is she beam
Which brightnessand crimsons thy soft-flowing stream;
Whose waters beneath make a musical clashing;
Whose ripples like dimples in childhood are flashing.

৫০ পংক্তির দ্বিতীয় কবিতাটির শিরোনাম ‘Storm and Rain’ এ-কবিতার কয়েকটি পংক্তির উদ্ধৃতি:

The mighty demons of the storm have met
In battle fierce. Relentless anger fires
Their bosoms, proudof desolating power.
Their swords in rapid wavings flash; and oft
In lightning gleams illume the darkened earth.

বাংলার প্রকৃতিতে বৃষ্টি ও বজ্রের ক্রিয়তা, প্রভাব ও ভূমিকার চমৎকার কাব্যিক প্রকাশ কবিতাটিকে প্রথমত শিল্পসফল করেছে এবং দ্বিতীয়ত এটি হয়ে উঠেছে বাঙালির জনজীবনের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সৃজনশীল সৃষ্টিকর্ম। বৃষ্টি-বজ্রের দৃশ্য-চিত্র আঁকতে গিয়ে কবি যেসব উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ ঘটান সেগুলো নিঃসন্দেহে তাঁর মেধা ও প্রতিভার পরিচয়বাহী। বৃষ্টির তীব্র-গতিময় ফলাকে তিনি তুলনা করেন প্রখর তরবারির সঙ্গে। বহুকাল পরেকার আরেক বাঙালি কবির বৃষ্টিবিষয়ক কবিতার কথা বলা যায় যেখানে তিনি ঢাকা শহরে বৃষ্টির বর্ণনায় বৃষ্টির ফলাকে বর্শার ফলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাছাড়া বজ্রের ‘উন্মাদ চিৎকার’ ‘ক্রোধ’ এসব উপমা লক্ষ্য করবার মত। বৃষ্টিকে কবি তুলনা করেন মুক্তো হিরে’র সঙ্গে, এমনকি বৃষ্টিপাতের ফলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া সোঁদা ঘ্রাণও তাঁর নজর এড়িয়ে যায় না। কবিতার এক জায়গায় কবির ‘Cloud upon cloud’ ‘piled along’ থেকে মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বর্ষণস্নাত দিবসে ‘মেঘের পরে মেঘ’ জমবার দৃশ্য-চিত্র। কাশীপ্রসাদ ঘোষ এবং লেটিসিয়া এলিজাবেথ ল্যান্ডনের যোগাযোগ থেকে বাঙালি কবির মেধা-প্রতিভার শক্তি ও স্বীকৃতির দিকটিই প্রমাণিত হয়। কাশীপ্রসাদ কখনই ইংল্যান্ডে যাননি কিন্তু তাঁর কবিতা প্রতিনিধিত্ব করেছে তাঁর নিজের এবং ভারতবর্ষের। একজন ইংরেজ কবির সম্পাদনায় তাঁর কবিতা নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অনুমান করা যায়, ভারতবর্ষে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকায় ছাপা কাশীপ্রসাদ ঘোষের কবিতাই ল্যান্ডন তাঁর পুস্তকে প্রকাশ করবার জন্যে মনোনীত ও নির্বাচিত করেছিলেন। অথবা এমনও হতে পারে আহূত হয়ে স্বয়ং কবিই বাংলা থেকে তাঁর কবিতাগুলো ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন। যাহোক, যে-ইংরেজ কবির মেধা-প্রতিভার স্বীকৃতি দেন আরেক বিশ্বখ্যাত এডগার এ্যালেন পো’ সেই ব্যক্তিত্বের নির্বাচনে বাঙালি কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষের স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে বাঙালির সাহিত্য-ইতিহাসে সাড়াজাগানো উপলক্ষ্য।

বাঙালি কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষ তাঁর ইংরেজি ভাষায় কাব্যরচনার মধ্য দিয়ে তাঁর বাঙালির পরিচয়কে নিয়ে গেছেন সর্বভারতীয় পর্যায়ে। এমনকি বিদেশিরাও যখন ইঙ্গভারতীয় সাহিত্যের প্রসঙ্গ উত্থাপন ও পর্যালোচনা করেন তখনও অনিবার্যভাবে পথিকৃতের ভূমিকা নিয়ে গৌরবের অবস্থানে স্থিত থাকেন কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষ। ইংরেজি ভাষায় লেখা তাঁর সমগ্র রচনাবলি সংগ্রহ করে প্রকাশ করলে আমরা হয়তো এ-কবির গুরুত্ব অধিকতর উপলব্ধি করতে সক্ষম হবো। ৥

Facebook
Twitter
LinkedIn
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!