অতীতে প্রিয়নাথ শাস্ত্রী মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কতগুলি চিঠির সঙ্গে মহর্ষিকে লেখা কেশবচন্দ্র সেনের দশটি চিঠি, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের লেখা একটি ইংরেজি চিঠি, এবং ম্যাক্সমুলারের ইংরেজিতে লেখা একটি চিঠি ‘পত্রাবলী’ নাম দিয়ে সঙ্কলিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত করেছিলেন। এই বইটি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এগুলির মধ্যে থাকা অধিকাংশ চিঠিই ১৮৫০-১৮৮৭ সালের মধ্যে লেখা হয়েছিল। আর প্রায় ১৪৬টি চিঠির এই সঙ্কলন-গ্রন্থে স্বয়ং মহর্ষি কর্তৃক লিখিত চিঠির সংখ্যা হল ১৩৪টি—যেগুলির অধিকাংশই তিনি রাজনারায়ণ বসুকে লিখেছিলেন। এছাড়া এতে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, সৌদামিনী দেবী, নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখকে লেখা তাঁর আরও কিছু চিঠির সন্ধানও পাওয়া যায়। তবে এই গ্রন্থটি সঙ্কলন ও প্রকাশের কোন তারিখ পাওয়া যায় না।
যাই হোক, অতীতে ফ্রান্সিস বেকন (Francis Bacon) খ্যাতনামা ব্যক্তিদের চিঠি সম্পর্কে বলেছিলেন—
“Letters, such as those written by wise men, are, of all the words of men, in my judgment, the best.”
আর তাই বিশ্বের বহু প্রখ্যাত ব্যক্তির চিঠিপত্র নানা কারণে যত্নসহকারে রক্ষিত এবং পঠিত হওয়ার রেওয়াজ আজও লক্ষ্য করা যায়। (A Treasury of the World’s Great Letters, arranged by M. Lincoln Schuster, New York, 1960) এমনকি একারণেই বহুযুগ পেরিয়ে এসে আজও ডঃ জনসনের চিঠি, মুর ও বায়রনের চিঠি, রোঁলার চিঠি, মমের চিঠি, রবার্ট ফ্রস্টের চিঠি, রোজেনবার্গের পত্রগুচ্ছ প্রভৃতি বহু পত্র ও পত্রলেখক বিশ্বের দরবারে আদৃত। কিন্তু এসবের সাথে একথাও অবশ্যই স্বীকার্য যে, এসব পত্রকে কোনভাবেই পত্রসাহিত্য বলা চলে না। এর কারণ হিসেবে সাহিত্য সমালোচকরা বলেন যে, পত্রকে ‘সাহিত্য’ শব্দের অভিধাভুক্ত করতে হলে পত্রধর্মের অতিরিক্ত সাহিত্যধর্মে পত্রকে সম্পৃক্ত করে দেখবার দরকার রয়েছে; নাহলে পত্র কখনোই পত্রসাহিত্য হতে পারে না। অর্থাৎ—এক্ষেত্রে প্রথম শর্তই হল যে, একে পত্র হতে হবে। কিন্তু একইসাথে পত্রধর্মের অতিরিক্ত সাহিত্যধর্মেও একে স্বভাবিত হতে হবে। আর সেটা হলেই পত্র পত্রসাহিত্য হতে পারে, নইলে নয়।
অন্যদিকে, পত্রকে সাধারণতঃ ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা হয়ে থাকে, এবং এর আবেদন মূলতঃ পত্রলেখক ও পত্র-প্রাপকের কাছে থাকে। কিন্তু সাহিত্য ব্যক্তিমনের সৃষ্টি হলেও এর আবেদন সর্বজনীন, আর এটাই হল সাহিত্যের সার্থকতা। তবে পত্রও যখন ব্যক্তিমনের আনন্দ সর্বলোকচিত্তে সঞ্চারিত করে, তখনি পত্র আর ব্যক্তি-বিষয় থাকে না; বরং, সর্বজনের মর্মলোকের আনন্দবোধের কারণ হয়ে সাহিত্য-পদবাচ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা যেহেতু পত্র, সেহেতু একে পত্রের স্বভাবধর্মও মেনে চলতে হয়। আর এ স্বভাব-ধর্ম শুধু পত্রের আঙ্গিকে নয়, পত্রধর্মেও থাকা বাঞ্চনীয়। আর একারণেই অতীতে ডঃ জনসন (Dr. Johnson) বলেছিলেন যে, সাহিত্য রচনার মত পত্রও—
“a loose sally of the mind, an irregular, undigested piece, not a regular and orderly composition.” (An Introduction to the Study of Literature, William Henry Hudson, London, 1910, p- 443)
অন্যদিকে মিডলটন মারি (Middleton Murry) জানিয়েছিলেন—
“a composition of moderate length on any particular subject or branch of a subject, originally implying want of finish, but now said of a composition more or less elaborate in style, though limited in range.” (The Problem of Style London, Middleton Murry, 1922)
কিন্তু এখানে বলাই বাহুল্য যে, চিঠিতেও এই এলোমেলো চিন্তার অবিন্যস্ত প্রকাশভঙ্গিমায় কোন বিশেষ মুহূর্তের, বা কোন বিশেষ বিষয়ের, বা কোন বিশেষ বিষয়ের কোন একটি বিশেষ দিক প্রকাশিত হয়ে থাকে। এবং এই প্রকাশিত অভিব্যক্তিতে একটি অপরিণত ও একটি অপূর্ণতার ভাল লাগবার আবেদন থাকে,—যদিও একইসাথে এই অবিন্যস্ত, অনিয়মিত, এলোমেলো চিন্তার প্রকাশভঙ্গিতে একটি পূর্ণ ও পরিণত রচনাশৈলী থাকে। অর্থাৎ—এগুলো যত বেশি রস-সম্ভোগের, তত বেশি বস্তু গৌরবের নয়। আরো ভালো করে বললে, যেন ছোট ছোট কতগুলি রচনার টুকরো গভীর তাৎপর্যে পূর্ণ, আস্বাদনীয়, জটিল চিন্তাপূর্ণ ও মননজাত নয়। অথবা যত বেশি ভাবের, তত বেশি ভাবনার নয়; (‘brief notes set down rather significantly than anxiously’—Bacon; An Introduction to the Study of Literature, William Henry Hudson, London, 1910, p- 446) এবং রচনার এসমস্ত গুণকে রচনাসাহিত্যের জন্য সম্ভাব্য গুণ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু পত্রসাহিত্যের জন্য এগুলি মূলতঃ বিশ্লেষিত বৈশিষ্ট্য। বিশেষতঃ, রচনার স্বভাবের সঙ্গে ও রচনাকারের ব্যক্তিমন ও জীবনের যে সম্পর্ক অভিপ্রেত গুণ রূপে বর্ণনা করা হয়, সেটা পত্রসাহিত্যের বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেই সমধিক প্রযোজ্য। (‘The central fact of this true essay indeed is the direct play of this author’s mind and character upon this matter of this discourse.’ An Introduction to the Study of Literature, William Henry Hudson, London, 1910, p- 447) সুতরাং, পত্রের এসমস্ত ব্যক্তিগত ভালো লাগা, মন্দ লাগা, কোন বিষয়ে ব্যক্তিগত মতামত, ঘরোয়া কথা-প্রসঙ্গ থাকা সত্ত্বেও পত্র সর্বজনমনে রসানুভূতি সৃষ্টির সহায়ক কিনা, বিভাবিত কোন আনন্দলোকের উৎসস্থল হতে পারে কিনা, এবিষয়ে নিঃসন্দিগ্ধ হতে পারলেই পত্রকে পত্রসাহিত্যরূপে গ্রহণ করা যেতে পারে।
যাই হোক, আধুনিক বাংলা সাহিত্যে পত্রসাহিত্যের শুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে হয়েছিল বলে একটি প্রচলিত ধারণা থাকলেও এবিষয়ে ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে। কারণ, রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ ১৯১২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, এবং এতে ১৮৮৫ থেকে ১৮৯৫—প্রায় দশ বছরের সময়ের মধ্যে লিখিত তাঁর পত্রগুলিকে সঙ্কলিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ—দেবেন্দ্রনাথের পত্রলেখবার কাল যখন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল (১৮৫০-১৮৮৭), অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের পত্রলেখবার কাল তখন প্রায় শুরু হয়েছিল। সুতরাং, এ হিসাবের ভিত্তিতে বলা চলে যে, বাংলা পত্রসাহিত্যের ইতিহাসের শুরু কিন্তু দেবেন্দ্রনাথের হাতেই হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের হাতে হয়নি। আর দেবেন্দ্রনাথের লিখিত পত্রগুলিও অনেকক্ষেত্রেই পত্রসাহিত্য হয়ে উঠতে পেরেছিল। কারণ, বহু পত্রেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ঘরোয়া কথাবার্তার পরিবর্তে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত ধারণার কথা যেমন প্রকাশিত হয়েছিল, তেমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ মনের আনন্দোৎসারও এতে যথাযথভাবেই ফুটে উঠেছিল। এখানে বলাই বাহুল্য যে, তাঁর এসমস্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি আজও ব্যক্তিমনের উর্ধ্বে সর্বজনমনে অনুভূতি সৃষ্টিতে সক্ষম। যেমন—
“তুষার জটাভার সহস্র সহস্র মস্তক আকাশ-অভিমুখে উদ্যত করিয়া এখানকার এই হিমালয় পর্বত গম্ভীর স্বরে বলিতেছে—
We rear our mighty fronts towards Heaven,
Where foot of mortal never trod;
For me alone of natures works
Are chosen children of our God.
Ye verdant meads, ye flowing streams,
Ye in creation have your place,
Lo! He that made you dee made you good;
But only we have seen His face.
এই পর্ব্বতের উপরে আজকাল মেঘ বাতাস, বিদ্যুৎ বজ্র মুহুর্মুহু আনন্দে খেলা করিতেছে। সে খেলা দেখে কে? দিন দুই প্রহরেই দেখিতে দেখিতে কোমল সন্ধ্যার ছায়ার ন্যায় মেঘের ছায়া পর্ব্বতের উপরে পড়িল, আবার পরক্ষণেই সেই মেঘকে ভেদ করিয়া সূর্যের কিরণ হাসিতে হাসিতে ছড়াইয়া পড়িল। আবার কিছু পরে এমনি বাষ্প উঠিয়া সকল পর্বতকে আচ্ছন্ন করিল, যেন একেবারে সকল সৃষ্টির লোপ হইল, আবার পরক্ষণেই সম্মুখে উজ্জ্বল সবুজবর্ণ বনরাজি দীপ্তি পাইতে লাগিল। ইহা ঈশ্বরের একটি বিচিত্র কার্যক্ষেত্র। তাঁহার কার্য্যের বিরাম নাই, তাঁহার মহিমার অন্ত নাই। তাঁহার মহিমা যখন দেখিতে-থাকি তখন সকলি আর ভুলিয়া যাই। ঈশ্বর তোমাদের সকলকে কুশলে রাখুন এই আমার স্নেহপূর্ণ আশীর্ব্বাদ ইতি।” (পত্রাবলী, ১৩৪ সংখ্যক পত্র, পৃ: ২০৬-২০৭; ‘মসুরী পর্বত’ থেকে ১লা শ্রাবণ, ’৫৪ ব্রাহ্ম সম্বৎসর তারিখে সৌদামিনি দেবীকে লেখা)
আসলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সম্ভোগের সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরানুভূতির প্রকাশ দেবেন্দ্রনাথের একটা স্বভাববৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন; কারণ, সৃষ্টি—ঈশ্বরের আনন্দময় সৃষ্টি সৌন্দর্যে ভরা। তিনি বিচিত্র কার্যক্ষম পুরুষোত্তমের মহিমায় মুগ্ধ ছিলেন। তবে প্রকৃতিকে প্রকৃতির স্বতন্ত্র স্বভাবের জন্য তিনি ভালবাসলেও, একইসাথে একথাও উপলব্ধি করেছিলেন যে—
“ইহা ঈশ্বরের একটি বিচিত্র কার্যক্ষেত্র।”
অবশ্য শুধুমাত্র সৌন্দর্য-সম্ভোগের জন্যই প্রকৃতি-প্রীতিও যে তাঁর মধ্যে ছিল, একথার প্রমাণস্বরূপ এখানে ‘পত্রাবলী’র পাঁচ সংখ্যক পত্রটি ঊদ্ধৃত করা যেতে পারে, যেখানে মহর্ষির প্রাকৃতিক বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“আবার আমি ঘটনাস্রোতে এই কুমারখালি অঞ্চলে আসিয়া পড়িয়াছি। আমার আর ভ্রমণের শেষ নাই। এবার আমি যেখানে আছি তাহার সম্মুখে মাঠ, পশ্চাতে মাঠ, উত্তরে মাঠ, দক্ষিণে মাঠ, লোকালয় মাত্র নাই, নির্জনের একশেষ, গ্রাম ও বসতি তাহার বহুদূরে। এইক্ষণে প্রাতঃকাল, চতুর্দিকে পক্ষীর কলরব মাত্র শুনা যাইতেছে। পদ্মানদী হইতে স্নিগ্ধ বায়ু বহিতেছে এবং শ্যামল তৃণাচ্ছাদিত ক্ষেত্র অপূর্ব শোভা ধারণ করিয়াছে।” (পত্রাবলী, ১৩৫ সংখ্যক পত্র, পৃ- ২০৬, শিলাইদহ থেকে রাজনারায়ণ বসুকে ২৭ মাঘ ১৮৫২ খৃষ্টাব্দ তারিখে লিখিত)
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ১৮৫২ সালে নিজের চিঠিতে অবিমিশ্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সম্ভোগ অন্য কোন বাঙালি গদ্যলেখক এভাবে করেছিলেন বলে জানা যায় না। এমনকি সমকালীন অন্য কোন কবির রচনাতেও এই নিসর্গপ্রীতি দেখা যায় না। তবে বাচনভঙ্গির এই অন্তরঙ্গ রূপ এরপরে খ্রিস্টীয় বিংশ শতকে পৌঁছে পুনরায় মহর্ষির পুত্র রবীন্দ্রনাথের পত্রে পাওয়া গিয়েছিল। যেমন—
“আমার ঠিক বাক্স-Phobia হয়েছে, বাক্স দেখলে আমার দাঁতে দাঁতে লাগে। যখন চারদিকে চেয়ে দেখি বাক্স, কেবলি বাক্স, ছোট বড়ো মাঝারি হাল্কা এবং ভারী, কাঠের এবং টিনের, পশুচর্মের এবং কাপড়ের—নীচে একটা, উপরে একটা, পাশে একটা, পিছনে একটা—তখন আমার ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি এবং ছুটোছুটি করবার স্বাভাবিক শক্তি একেবারে চলে যায়।” (ছিন্নপত্রাবলী, ১৯৬০, পৃ- ২)
কিংবা—
“সন্ধ্যাবেলাকার নিস্তরঙ্গ পদ্মার উপরকার নিস্তব্ধতা এবং অন্ধকার ঠিক যেন নিতান্ত আমার অন্তঃপুরের ঘরের মতো বোধ হত।” (ছিন্নপত্রাবলী, ১৯৬০, পৃ- ৩০৫)
অতীতের সাহিত্য সমালোচকরা দেবেন্দ্রনাথের পত্রগুলিকে মোটামুটিভাবে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। যথা—(১) প্রাকৃতিক বর্ণনামূলক, (২) ধর্ম ও দর্শন-বিষয়ক, এবং (৩) হাল্কা, লঘু হাস্যরস, পরিহাস-বিষয়ক। এবারে আলোচনা প্রসঙ্গে এখানে এই তিন শ্রেণীর পত্রের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে—
(১) “সম্প্রতি এখানে বর্ষাকাল বিরাজমান, পর্ব্বত হইতে বাষ্পসকল অনবরত নির্গত হইয়া সূর্যকে আচ্ছন্ন করিয়াছে। এক একবার আমারদিগের দৃষ্টি হইতে সমুদায় জগৎ বাষ্প মধ্যে লুপ্ত হইয়া যাইতেছে, বৃষ্টি হইয়া পুনর্বার তাহা প্রকাশ পাইতেছে। এখানে মেঘের সঞ্চার হইলেই বিলক্ষণ শীতের প্রভাব হয়, প্রায় বার মাসই উষ্ণ বস্ত্র ব্যবহার করিতে হয়। … অদূরেই নিবিড় বনের মধ্যে প্রবিষ্ট হইলাম, যেহেতু সে পথ বনের মধ্যে দিয়া গিয়াছে। মধ্যে মধ্যে সেই বনকে ভেদ করিয়া রৌদ্রের কিরণ ভগ্ন হইয়া পথে পড়িয়াছে।” (পত্রাবলী, ৬৪ সংখ্যক পত্র, পৃ- ৬৫)
(২) “স্বতঃসিদ্ধ আত্মপ্রত্যয় এবং বিজ্ঞানমূলক আত্মপ্রত্যয়ের বিশেষ বোধ হয় যে, আত্মপ্রত্যয়কে প্রত্যয় করা ভ্রম কিনা এ বিষয়ের সিদ্ধান্ত না করিয়া যে ব্যক্তি আত্মপ্রত্যয়ের প্রতি নির্ভর করে সেই স্বতঃসিদ্ধ আত্মপ্রত্যয়ের উপর নির্ভর করে, আর যাহার বিচার করিয়া সিদ্ধান্ত হয় যে, স্বতঃসিদ্ধ আত্মপ্রত্যয় কদাপি ভ্রমমূলক নহে, সেই বিজ্ঞানমূলক আত্মপ্রত্যয়ের প্রতি নির্ভর করে। দুইই আত্মপ্রত্যয়। যদি স্বাভাবিক আত্মপ্রত্যয় না থাকিত, তবে বিজ্ঞান দ্বারা তাহার প্রমাণ কদাপি হইত না।
এ প্রত্যয়ের প্রতি সংশয় আনিলে তখন বিচার উপস্থিত হয়, বিচারের শেষে এই সিদ্ধান্ত হয় যে, আমি কখনো আপনি হই নাই, এ শরীর ও মনোরূপ কৌশল আমার কৃত নহে। … আমার যৌবনকে আমি ধারণ করিয়া রাখিতে পারি না, আমার জীবনকে আমি ধারণ করিয়া রাখিতে পারি না। এই সকল আলোচনা করিয়া আমার মনেতে এমন প্রত্যয় উপস্থিত হইতেছে যে আমার কারণ ও নিয়ত্ত্বা একজন পূর্ণ পুরুষ আছেন। … একজন পরিপূর্ণ স্বতন্ত্র পুরুষ আছেন।” (পত্রাবলী, ১৫-১৭)
(৩) “১৫ গ্রেণ কুইনাইন খাইয়া ১১ মাসের কার্য্য সমাধা করিয়াছ। কিন্তু সেদিনকার প্রাতঃকালের তোমার বক্তৃতাতে তো কুইনাইনের গন্ধের লেশমাত্রও নাই। শরৎকালের শিশিরসিক্ত সেফালিকা পুষ্পের ন্যায় সেদিনকার প্রাতঃকালে তোমার হৃদয়ের প্রীতিপুষ্পসকল প্রস্ফুটিত হইয়া সহজেই প্রভুর চরণে বিকীর্ণ হইয়াছিল।” (পত্রাবলী, পৃ- ১৫১)
অথবা—
“দীর্ঘকাল পর্যন্ত এবার কলিকাতায় বৃষ্টি হয় নাই, রৌদ্রের উত্তাপ দিন দিন বাড়িতেছে। হিমালয়ে যেমন আমার মস্তিষ্ক জমিয়া গিয়াছিল, এখানে সেইরূপ গলিয়া যাইতেছে।” (পত্রাবলী, পৃ- ২৭)
এখানে ১নং উদাহরণে সাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সম্ভোগের চিহ্ন বর্তমান রয়েছে; ২নং উদাহরণে জীবন ও আধ্যাত্মিক দর্শনচিন্তার মুক্তি লক্ষ্য করা যায়; এবং ৩নং উদাহরণে লঘু হাস্য-পরিহাসের আমেজ লক্ষ্যণীয়। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, সাধারণ কোন পত্রলেখকের পত্র এভাবে তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের, সুখ-দুঃখের, হাসি-কান্নার ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তি-নিরপেক্ষ সর্বজনীন চিন্তার, বা আনন্দের উৎসস্থল হয়ে উঠতে পারে না। আর যখন তা হয় তখন সেটা আর কোন সাধারণ পত্রলেখকের সাধারণ পত্ররূপে থাকে না; বরং, তা সাহিত্য-পদবাচ্য হয়ে ওঠে, এবং পত্রসাহিত্য অভিধাযুক্ত হয়। সুতরাং, দেবেন্দ্রনাথের লেখা পত্রগুলিকে এদিক থেকে নিঃসন্দেহে পত্রসাহিত্যই বলা চলে; এবং এমনকি এদিক থেকে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ পত্রসাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের আদর্শস্থল যে আদতে তাঁর পিতা, ও পিতার পত্রসাহিত্য ছিল—একথাও নিঃসন্দেহেই বলা চলে। তাছাড়া দর্শন, ধর্ম, ঈশ্বরানুভূতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা, বিভিন্ন বিষয়ক পত্রের যে সাহিত্যরস-সম্ভোগ রবীন্দ্র-সাহিত্যধারাকে উর্বর ও বিপুল করে তুলে বিশ্বপত্রসাহিত্যের ধারায় প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেটার উৎসমূলে দেবেন্দ্রনাথের এই পত্রগুলির একান্ত কোন অবদান নেই,—একথা কিন্তু নিঃসন্দিগ্ধভাবে বলা চলে না।
আর এসব কারণেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যে দেবেন্দ্রনাথের পত্রাবলীকে একটা বিশিষ্ট জায়গা দেওয়া হয়ে থেকে। তবে শুধুমাত্র ভাষার সম্পদে, অলঙ্করণের ঐশ্বর্যে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঈশ্বরানুভূতি এবং ধর্মবিষয়ক সাহিত্য-সুষমিত অভিব্যক্তিতেই দেবেন্দ্রনাথের পত্রগুলির মূল্যায়ন শেষ হয়ে যায় না। বরং, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পত্রসাহিত্যের ধারায় রবীন্দ্রনাথ যে যথার্থই দেবেন্দ্রনাথের পুত্র—এই পত্রগুলির পর্যালোচনায় এ তথ্যের ঐতিহাসিক প্রমাণও পাওয়া যায়। আর এটা শুধু ভাষাসাদৃশ্য, বাচনভঙ্গির মিল বা অলঙ্করণ-চিন্তার দিক থেকে বিচার্য নয়; বরং, ভাবের দিক থেকেও বিচার্য বলা চলে। প্রসঙ্গতঃ জানিয়ে রাখা যাক যে, দেবেন্দ্রনাথ অধ্যাত্ম-জগৎ আর জীবন-জগৎ উভয়কে সম্মিলিতরূপে গ্রহণ করে পরমব্রহ্মের প্রতি পরিণতি খুঁজেছিলেন বলেই পত্রাবলীর ৩নং পত্রে তাঁর বক্তব্যটি এত সুন্দর হয়ে উঠেছিল—
“সুন্দর শরীরের মধ্যে যদি মন সুন্দর হয় এবং সেই সুন্দর মন যদি পূর্ণ সুন্দরকে ধারণ করে, তবে সে সৌন্দর্যের নিকটে কি অন্য কোন সৌন্দর্য লক্ষ্য হয়।” (পত্রাবলী, পত্র সংখ্যা ৩, ১৮৫২, পৃ- ৫)
এই ‘পূর্ণ সুন্দর’ পুরুষোত্তম মানুষের মনেই অবস্থান করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সুন্দর মনের মানুষটির দেহটিও যদি সুন্দর হয়, তাহলে দেহটির সৌন্দর্য-আকাঙ্ক্ষা কি শুধু মহর্ষির সৌন্দর্যপ্রিয়তাকেই সমর্থন করে? না। কারণ—তিনি দেহ, মন-ময় মানুষের অন্তরেই অসীমের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। আর পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের সংখ্যাতীত শব্দে ও সুরে, কথায় ও গানেও এই একই বোধ ও বিশ্বাসের সমর্থনই লক্ষ্য করা গিয়েছিল। আসলে রুদ্রের কঠোর মুখ-দর্শন, মৃত্যুর অন্ধকার-জ্ঞান, বেদনার সৌন্দর্য-সম্ভোগ প্রভৃতিতে সজ্জিত না হলে শিবের সৌন্দর্য, জন্মের আলোর রূপ, সুখের সন্তাপ, প্রভৃতি দক্ষিণাভরণ যে পাওয়া যায় না, এই সত্যের উপলব্ধিই রবীন্দ্রচেতনার মূলতম বিশ্বাস ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল যে, নিজের এই বিশ্বাসবোধ তিনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন? শুধুই কি উপনিষদ-চিন্তায়? না। কারণ, তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথও বিশ্বাস করতেন যে—
“দুঃখরূপ তিক্ত পান না করিলে আত্মা অমৃতপানের উপযুক্ত হয় না।” (পত্রাবলী, পত্র সংখ্যা ১৭, ১৮৫৮, পৃ- ১৮)
আর যে ধর্মবিশ্বাস ও শিক্ষাচিন্তায় বর্তমানে সকলে রবীন্দ্রনাথকে চেনেন ও জানেন, তিনি মানুষের অন্তরের সঙ্গে বহিঃপ্রকৃতির—ধর্ম তথা অধ্যাত্মবোধের ক্ষেত্রে সীমা ও অসীমের মিলন, প্রাচ্যের প্রাচীন ভাবধারার সঙ্গে পাশ্চাত্যের নবীন ভাবধারার, ত্যাগ ও বৈরাগ্যের সঙ্গে ভোগ ও গ্রহণের সম্মিলনই পছন্দ করতেন। তিনি পূর্ণতার এই দ্বৈতাদ্বৈত-বোধে বিশ্বাস করতেন। সুতরাং, তাঁর এ বিশ্বাস-বোধের অন্যতম প্রেরণাস্থল যে তাঁর পিতার পত্রাবলীই ছিল, একথা মনে করলে অসঙ্গত কিছু অনুমান করা হয় না। কারণ, দেবেন্দ্রনাথও রাজনারায়ণ বসুকে একটি পত্রে লিখেছিলেন—
“তোমার ভ্রাতাদিগের কি প্রকার লেখা পড়া হইতেছে? বোধ হয় তোমারই বিদ্যালয়ে তাহারা ভুক্ত হইয়াছে। যে প্রকার তুমি দেখিয়াছ যে, আমি কতক বালককে ব্রাহ্মধর্ম অধ্যাপনা করিতেছি, সেই প্রকার তুমি তোমার ভ্রাতাদিগকে পড়াইলে অনেক উপকার হয়। অপরা-বিদ্যার সহিত তাহারদিগকে পরাবিদ্যার উপদেশ দিতে অবহেলা করিকে না। বালককালই বিদ্যা শিখিবার মুখ্যকাল।” (পত্রাবলী, পত্র সংখ্যা ২, ১৮৫১, পৃ- ৩)
এখানে যন্ত্রবিদ্যা হল অপরাবিদ্যা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান হল পরাবিদ্যা। অন্যদিকে ‘পরাবিদ্যা’, ‘অপরাবিদ্যা’র কথা রবীন্দ্রনাথও যে বলেছিলেন, এর প্রমাণ তাঁর ‘শিক্ষার মিলন’, ‘রক্তকরবী’ ও ‘অচলায়তন’–এ পাওয়া যায়।
তবে পত্রাবলীতে সঙ্কলিত হয়নি কিন্তু অন্যত্র প্রকাশিত হয়েছিল, মহর্ষির এধরণের ইতঃস্ততঃ বিক্ষিপ্ত পত্রের সংখ্যাও কম কিছু নয়। যেমন—
“কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্ম-বিবাহকে বিধিবদ্ধ করিবার প্রচেষ্টায় তিনি বিধিমতে বাধা দিয়াছিলেন। আইন বিধিবদ্ধ হইবার প্রস্তাব হইলে ভারত সরকার এ সম্বন্ধে দেবেন্দ্রনাথের মত আহ্বান করেন। দেবেন্দ্রনাথ তাঁহার মত জ্ঞাপন করিয়া সরকারকে এক পত্র লেখেন।” (সাহিত্য সাধক চরিতমালা, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৪৬, পৃ: ৭০-৭১)
কিন্তু এগুলির মধ্যে শেষ পত্রটির ভাষা হল ইংরেজি; আর এটি ১৮৭২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যার ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র ১৫-১৬নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া নিজের জীবনের প্রায় শেষভাগে কেশব সেনের সঙ্গে ধর্মবোধের বিরোধ ও অনৈক্য নিয়ে তিনি রাজনারায়ণ বসুকে যে দীর্ঘ পত্রটি লিখেছিলেন, সেটি ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র ১৮০৩ সালের একটি সংখ্যায় ১১৮-১১৯নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল।
যাই হোক, সাহিত্য সমালোচকদের মতে, দেবেন্দ্র-রচনার গদ্যসুষমা তাঁর পত্ররচনার মধ্যেও বহুল পরিমাণে লক্ষ্যণীয়। বিশেষতঃ শব্দ-সাযুজ্য (যথা—‘অন্ধ অন্ধকার’, ‘রৌদ্রের কিরণ ভঙ্গ’ ইত্যাদি) চিত্রকল্প (পত্রাবলীর ৫০, ১৭ ও ১৩৪নং পত্র), ভাষার বর্ণনামূলক সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য তাঁর সব পত্রেই লক্ষ্য করা যায়। আর একারণেই বাংলা পত্রসাহিত্য-ধারায় দেবেন্দ্র-পত্রসাহিত্য স্বতন্ত্র মূল্যায়নের যোগ্য, এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর এই অবদান চিরস্মর্তব্য।#




