বেদের উপরে নারীর অধিকারের পরিবর্তন

প্রাচীন ভারতের শাস্ত্রশাসিত সমাজে বেদপাঠে নারীর আদৌ কোন অধিকার ছিল কিনা, এবিষয়ে প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থগুলিতে, এবং এমনকি বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের প্রদত্ত তথ্যে প্রধানতঃ দুটি পরস্পরবিরোধী মত দেখতে পাওয়া যায়। এরমধ্যে একটি মতানুসারে প্রাচীন ভারতের নারীরা বেদের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা বা বৈদিক যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠান, সাবিত্রী মন্ত্র, প্রণব, যজুর্মন্ত্র প্রভৃতি উচ্চারণ করবার অনধিকারী ছিলেন।
“সাবিত্রীং প্রণবং যজুলক্ষ্মীঃ স্ত্রীশূদ্রায় নেচ্ছন্তি”
(নৃসিংহ-তাপন্যুপনিষৎ)
আবার অন্য মতানুসারে, সেযুগের পুরুষদের মতোই নারীরাও বেদ ইত্যাদির অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা এবং বৈদিক যাগযজ্ঞের অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণরূপে ও সমানভাবে অধিকারী ছিলেন।

প্রসঙ্গতঃ এটাও লক্ষ্যণীয় যে, প্রাচীন ভারতে রচিত হওয়া শাস্ত্রগুলিতে নারীদের নিয়ে এধরণের পরস্পর বিরুদ্ধ দুটি মতের অস্তিত্বের কথা ‘পূর্বমীমাংসা’ নামক গ্রন্থের রচয়িতা আচার্য জৈমিনি তাঁর গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রথম পাদের তৃতীয় অধিকরণে, এবং এই গ্রন্থের প্রাচীন ভাষ্যকার শবরস্বামীও তাঁর লেখায় স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এথেকে স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, তাঁদের সময়েও নারীরা আদৌ বেদ ইত্যাদি শাস্ত্র এবং বৈদিক কর্মানুষ্ঠানে পুরুষদের মতোই সমানভাবে অধিকারী কিনা—এই প্রশ্ন উঠেছিল। আর সেসময়ে তো বটেই, এমনকি পরবর্তীকালের অনেক পণ্ডিতও জানিয়েছিলেন যে, যেহেতু ‘স্বর্গকামো যজেত’ ‘অষ্টবর্ষং ব্রাহ্মণম্ উপনয়ীত, তম্ অধ্যাপয়ীত’ প্রভৃতি বিধিবাক্যে পুংলিঙ্গের নির্দেশ রয়েছে, সেহেতু উপনয়ন, বেদাধ্যয়ন ও বৈদিক যজ্ঞের অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র পুরুষেরই অধিকার রয়েছে, নারীর নয়।

কিন্তু সেযুগে, এবং পরবর্তীসময়ে যাঁরা আবার এসব বিষয়ে নারীর সমান অধিকারের পক্ষে ছিলেন, তাঁরা জানিয়েছিলেন যে, যেহেতু প্রাচীন শাস্ত্রের এসব বিধিবাক্যে লিঙ্গ অবিবক্ষিত, অর্থাৎ—যেই লিঙ্গেরই নির্দেশ থাকুক না কেন বিধিগুলি সামান্যভাবেই করা হয়েছে, সেহেতু এতে লিঙ্গের বিশেষ কোনও গুরুত্ব নেই; বরং উপনয়নাদি বিধিই এসব বিধিবাক্যে প্রধান স্থান অধিকার করেছে। সুতরাং এথেকে তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে—উপনয়ন, বেদাধ্যয়ন এবং বৈদিক কর্মানুষ্ঠানে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েরই সমান অধিকার রয়েছে। এছাড়া তাঁরা একথাও জানিয়েছিলেন যে, প্রাচীন কোন শাস্ত্রে দম্পতির সহাধিকারের কথা তো নেই-ই, বরং এগুলিতে আলাদাভাবে নারীর বৈদিক কর্মানুষ্ঠানে অধিকারের কথাই বলা হয়েছে। (পূর্বমীমাংসা, ষষ্ঠ অধ্যায়, প্রথমপাদ, চতুর্থ অধিকরণ; অষ্টাধ্যায়ী, পনিনি, পত্যুর্নোযজ্ঞসংযোগে, ৪।১।৩৩) আর একারণেই প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে গার্গী, মৈত্রেয়ী, আত্রেয়ী প্রমুখের বেদাদি শাস্ত্রের অধ্যয়নের কথা পাওয়া পাওয়া যায়; এবং এমনকি একারণেই ঋগ্বেদের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিদের মধ্যেও মহর্ষি অম্ভৃণ ঋষির কন্যা বাক দেবীকেও দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া ঋগ্বেদের মন্ত্রদ্রষ্ট্রীদের মধ্যে নারী ঋষির নামেরও কোন অভাব তো দেখতে পাওয়া যায়ই না, বরং ‘কঠি’, ‘কলাপী’ প্রভৃতি বেদের শাখাধ্যেতৃবাচক পদগুলিও প্রাচীন ভারতে নারীজাতির বেদাধ্যয়নে অধিকারেরই পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।

আর এসব ছাড়া প্রাচীন ভারতের স্মৃতিকার গোভিলাচার্য তাঁর গৃহ্যসূত্রে বিবাহের জায়গায় নিয়ে আসা কন্যাকে বিবাহের আগে যজ্ঞোপবীতিনী রূপেই বর্ণনা করেছিলেন বলে—
“প্রাবৃতাং যজ্ঞোপবীতিনীম্ অভ্যুদানয়ঞ্জপেৎ”
(গোভিল গৃহ্যসূত্র, ২।১।১৯)
—এথেকে স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, তাঁর মতানুসারে বিবাহের আগে কন্যাকে তখন অবশ্যই উপনয়ন সংস্কারের দ্বারা সংস্কৃতা যজ্ঞোপবীতধারিণী হতে হত। এমনকি গোভিলাচার্য আবার এধরণের কন্যাকে দিয়ে বেদমন্ত্রও পাঠ করিয়েছিলেন—
“পশ্চাদয়েগ্নে সংবেষ্টিতংকটম, এবং জাতীয়ং বা হন্যৎ, পদা প্রবর্তয়ন্তীং বাচয়েৎ—প্র যে পতিয়ানঃ পন্থাঃ কল্পতাম্”
(গোভিল গৃহ্যসূত্র, ২।১।২০)

অন্যদিকে বশিষ্ঠ ঋষিও কিন্তু তাঁর স্মৃতিগ্রন্থে নারীর জন্য সাবিত্রীমন্ত্র পাঠ করে হোম করবার বিধান দিয়েছিলেন—
“মনসা ভর্তুরতিচারে ত্রিরাত্রং যাবকং ক্ষীরোদনং বা ভুঞ্জানাহধঃ শয়ীত ঊর্ধ্বং ত্রিরাত্রাদপ্সু নিমগ্নায়াঃ সাবিত্র্যাহষ্টশতেন শিরোভিৰ্জুহুয়াৎ পূতাভবতি”
(বশিষ্ঠস্মৃতি, ২।৫)

তাছাড়া প্রাচীন ভারতে যজমানের স্ত্রী যদি বেদাদি শাস্ত্রে নিতান্ত অজ্ঞই থাকতেন, তাহলে যজ্ঞের সময়ে ঋত্বিক প্রমুখের নির্দেশমত যথাযথ অনুষ্ঠান করা তাঁর পক্ষে কখনও সম্ভব হত না।

আর এসব বিষয় লক্ষ্য করেই, জৈমিনি এবং তাঁর অনুবর্তি শাস্ত্রকাররা তখন মতপ্রকাশ করেছিলেন যে, পুরুষের মতোই নারীর জন্যও উপনয়ন, বেদাধ্যয়ন এবং বৈদিক কর্মানুষ্ঠান প্রভৃতি আসলে শাস্ত্রবিহিত। তবে জৈমিনির পরবর্তীকালের স্মৃতিকারেরা আবার নতুনভাবে এই প্রশ্নের মীমাংসা করবার একটা চেষ্টা করেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তাঁদের মধ্যেও আবার এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে গিয়ে পরাশরস্মৃতির ভাষ্যকার মাধবাচার্য তাঁর গ্রন্থে দুটি মত উদ্ধৃত করেছিলেন বলে দেখা যায়। তিনি প্রথমে তাঁর গ্রন্থে এবিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে নারীদের দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন; যথা—(১) ব্রহ্মবাদিনী, এবং (২) সদ্যোবধূ। এঁদের মধ্যে ব্রহ্মবাদিনীগণের জন্যই তিনি উপনয়ন, অগ্নীন্ধন, বেদাধ্যয়ন, স্বগৃহে ভিক্ষাচর্যা প্রভৃতি বৈদিক অনুষ্ঠানের বিধান দিয়েছিলেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় ধরণের নারীর জন্য তিনি জানিয়েছিলেন যে, যাঁরা বধূ হবেন তাঁদের বিবাহের সময় উপস্থিত হলে কোনভাবে উপনয়ন সংস্কারমাত্র করেই তাঁদের বিবাহকার্য নিষ্পন্ন করতে হবে। এবং এই সদ্যোবধূদের জন্যই মনু বলেছিলেন—
‘পতিসেবাই নারীর গুরুকুলে বাস, গৃহকার্যই তাঁর অগ্ন্যাহুতি।’

মনু ছাড়া প্রাচীন ভারতের স্মৃতিকারদের মধ্যে হারীতও এই একই মতের পরিপোষক ছিলেন। কিন্তু এঁদের পরে স্মৃতিকার যম আবার এবিষয়ে অন্য মতের সমর্থন করেছিলেন। তাঁর মত ছিল যে, বেদে নারীর অধিকার এযুগের জন্য তো নয়ই, বরং এটা ‘কল্পান্তর বিষয়ক’। তবে পুরাকালে কুমারীদের অবশ্য মৌঞ্জীবন্ধন, বেদাধ্যয়ন ও বেদের অধ্যাপনা, গায়ত্রীমন্ত্র উচ্চারণ প্রভৃতি সবধরণের বৈদিক অনুষ্ঠানই পুরুষদের মতোই তুল্যভাবে বিহিত ছিল। কিন্তু শুধু নিজের পিতা, পিতৃব্য বা ভাই ছাড়া অন্য কারো কাছে কুমারীরা তখন বেদাধ্যয়ন করতে পারতেন না। এছাড়া তাঁদের নিজের গৃহেই ভৈক্ষচর্যা করতে হত; এবং এমনকি অজিন, চীর ও জটাধারণও তাঁদের পক্ষে নিষিদ্ধ ছিল।

আর তাই স্মৃতিকার মাধবাচার্যও তাঁর পূর্বোক্ত গ্রন্থে প্রথমে নারীদের বেদের অধিকার দিলেও পরে কিন্তু যমের এই মতকেই সমর্থন করেছিলেন।
“দ্বিবিধাঃ স্ত্রীয়ো ব্রহ্মবাদিন্যঃ সদ্যোবধ্বশ্চ। তত্র ব্রহ্মবাদিনীনাম্ উপনয়নম্ অগ্নীন্ধনম্ বেদাধ্যয়নং স্বগৃহে ভিক্ষাচর্য্য ইতি। বধূনাংতু পস্থিতে বিবাহে কথঞ্চিদুপনয়নমাত্রং কৃত্বা বিবাহঃ কার্যঃ ইতি। মৈবম্। তস্য কল্পান্তরবিষয়ত্ত্বাৎ। তথাচ যমঃ—পুরাকল্পে কুমারীণাং মৌঞ্জি-বন্ধনমিষ্যতে। অধ্যাপনং চ বেদানাং সাবিত্রীবচনং তথা॥ পিতা পিতৃব্যোভ্রাতা বা নৈনামধ্যাপয়েৎ পরঃ। স্বগৃহে চৈব কন্যায়াঃ ভৈক্ষচয়া বিধীয়তে॥ বর্জয়েদজিনংচীরংজটাধারণমেবচ॥”
(পরাশরভাষ্য, মাধবাচার্য)

অন্যদিকে ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেও এবিষয়ে স্মৃতিকার যমের মতই কিন্তু সমর্থনীয় বলে প্রতীয়মান হয়। তবে ইতিহাস আবার একইসাথে একথাও বলে যে, ঋগ্বেদের যুগের ভারতে বিশ্ববারা (ঋগ্বেদ, ৫।২৮) প্রমুখ নারীরা যজ্ঞাদিতে ঋত্বিকের কাজ করেছিলেন, এবং তাঁরা সকলেই মন্ত্রদ্রষ্ট্রী ঋষিও ছিলেন। এমনকি ঘোষা (ঋগ্বেদ, ১০।৩৯), লোপামুদ্রা (ঋগ্বেদ, ১।১।৭৯), অপলা (ঋগ্বেদ, ৮।৮০) প্রমুখরাও তখন মন্ত্রদ্রষ্ট্রী ঋষি হয়েছিলেন। আর এঁদের মধ্যে অপলা আবার তাঁর চর্মরোগের জন্য স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্তা হওয়ার পরে ইন্দ্রদেবতাকে সন্তুষ্ট করবার জন্য সোমাহুতি প্রদান করে এই ব্যাধি থেকে মুক্তিলাভ করেছিলেন।

এরপরে ব্রাহ্মণযুগে নারীরা যদিও আর আলাদাভাবে ঋত্বিকের কাজ করবার অধিকারী ছিলেন না, কিন্তু তবুও স্ত্রী হিসেবে স্বামীর সঙ্গে প্রধান প্রধান যজ্ঞে তাঁরা যে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতেন,—শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লিখিত বাজপেয় যাগ প্রসঙ্গে একথার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। (শতপথ ব্রাহ্মণ, ৫।২।১।১০) এমনকি এসময়ে নারীর জন্য সাবিত্রীদীক্ষা নিষিদ্ধ হলেও বেদাধ্যয়ন কিন্তু তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল না। আর এযুগে বেদের কর্মকাণ্ডে তাঁদের পৃথক অধিকার কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ণ হলেও বিবাহিত দম্পতির সহাধিকারে এবং বেদের জ্ঞানকাণ্ডের আলোচনার ক্ষেত্রে তাঁরা উভয়েই ঋগ্বেদের যুগের মতোই সমান অধিকারী ছিলেন। একারণেই দেখা যায় যে, বৃহদারণ্যকোপনিষদে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর স্ত্রী মৈত্রেয়ীকে ব্রহ্মজ্ঞান বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অতি গভীর জ্ঞানের উপদেশ দিয়েছিলেন, এবং সেযুগের আরেক ঋষিকন্যা গার্গী এই পরমতত্ত্বদর্শী ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যকে তাঁর সঙ্গে বিচার করবার জন্য তাঁকে আহ্বান করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু এরপরেই সূত্রযুগে নারীরা নিজেদের সবধরণের বৈদিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে শূদ্রতুল্য হয়ে গিয়েছিলেন।

এসময়ে আপস্তম্ব নারীর জন্য সাবিত্রীদীক্ষা, যজ্ঞোপবীত ধারণ, পক্কান্ন বলি প্রভৃতি নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। (আপস্তম্ব ধর্মসূত্র, ১।১।১।৮ ও ২।৭।১৫।১৮)

অন্যদিকে বিষ্ণু ও আশ্বলায়ন জানিয়েছিলেন যে—নারীদের জাতকর্ম, নামধেয়, আদিত্যদর্শন, অন্নপ্রাশন ও চূড়াকরণ অমন্ত্রক হবে। (বিষ্ণু ধর্মসূত্র, ২৭।১৩-১৪; আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র, ১।১৬।১৬), এবং শুধুমাত্র বিবাহের সময়েই নারীর সমন্ত্রক সংস্কার করলে চলবে।

এরপরে বৌধায়ন আরেকধাপ এগিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, নারীর বেদমন্ত্রে কোন অধিকারই নেই। (বৌধায়ন ধর্মসূত্র, ১।৫।১১।৭)
আর গৌতম বলেছিলেন যে, বৈদিক অনুষ্ঠানে নারীর কোন স্বাতন্ত্র্য থাকবে না। (গৌতম ধর্মসূত্র, ১৮।১)

অন্যদিকে আবার বশিষ্ঠের মত ছিল যে, অচমনেও নারীর কোন অধিকার নেই, তাঁরা শুধুমাত্র নিজেদের ওষ্ঠদ্বয় দিয়ে জলস্পর্শন করলেই আচমনের কাজ হয়ে যাবে। (বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র, ৩।৩৪)

আর এঁদের অনুসরণ করে মনু জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, বিবাহই হচ্ছে নারীর একমাত্র বৈদিক সংস্কার, পতিসেবাই হচ্ছে তাঁর গুরুকুলে বাস এবং গৃহকার্যই হচ্ছে তাঁর অগ্নিক্রিয়া। যজ্ঞ, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি কোন ধর্মকার্যেই তাঁর স্বতন্ত্র কোন অধিকার নেই। বরং পতিসেবা করাই তাঁর একমাত্র ধর্মানুষ্ঠান। (মনুস্মৃতি, ২।৬৭)

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে, এর আগে ঋগ্বেদের যুগে ঋষিকন্যা বাক ঘোষণা করেছিলেন—
“আমি রুদ্রগণের ও বসুগণের সহিত বিচরণ করি, আদিত্যগণের ও বিশ্বদেবগণের সহিত বিচরণ করি। মিত্র ও বরুণ উভয়কেই আমি ধরিয়া রাখিয়াছি। ইন্দ্রকে, অশ্বিদ্বয়কেও আমি ধরিয়া রাখিয়াছি। আমি ব্রহ্মদ্বেষীর নাশের জন্য রুদ্রের ধনু বিস্তার করিয়াছি। আমি জনহিতার্থে সংগ্রাম করি। আমি দ্যবা পৃথিবীতে অনুপ্রবিষ্ট আছি। ঊর্ধ্বভাগে দ্যোকে প্রসব করিয়াছি, সমুদ্রের জলরাশির মধ্যে আমার গর্ভ রহিয়াছে; বিশ্ব-ভুবনে আমি অনুপ্রবেশ করিয়াছি, দ্যুলোককে আমি স্বদেহ দ্বারা স্পর্শ করিয়াছি। বিশ্বভুবন নির্মাণে প্রবৃত্ত হইয়া আমি বায়ুর মত সর্বত্র প্রবাহিত হই। পৃথিবীর পরে দ্যুলোকের পরে যাহা কিছু বিদ্যমান, সর্বত্র আমি আমার মহিমার দ্বারা সম্ভূত হই। আমি জগন্ময়ী, জগন্মাতা, জগদ্ধাত্রী। এই বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতি ধূলিকণায় আমিই বিদ্যমান রহিয়াছি।” (ঋগ্বেদ, দশমমণ্ডল, ১২৫নং সূক্ত বা দেবীসূক্ত)

আর পণ্ডিতেরা বলেন যে, ঋগ্বেদের ঋষিকন্যা বাকের এই আমিত্বের প্রসারের ছায়াকে অবলম্বন করেই পরবর্তীসময়ে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণের বিশ্বরূপের এবং দেবী মাহাত্ম্যে দেবীর সর্বব্যাপিনী রূপের কল্পনা করা হয়েছিল।

অন্যদিকে বৃহদারণ্যক উপনিষদের ঋষিপত্নী মৈত্রেয়ী অমরত্ব লাভ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যকে বলেছিলেন—
“যেনাহঃ নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুর্যাম”
(বৃহদারণ্যকোপনিষদ, দ্বিতীয় অধ্যায়, চতুর্থ ব্রাহ্মণ)
অর্থাৎ—সেই বিদ্যা, সেই জ্ঞানের দ্বারা আমি কি করব, যার সাহায্যে আমি অমৃতত্ব লাভ করতে সমর্থ হব না?

তাই বৈদিক ভারতে যে নারী মৃত্যু উত্তীর্ণ হয়ে অমরত্ব লাভ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, যে নারী তখন মরণশীল হয়েও মনুষ্যসুলভ মৃত্যুকে জয় করে মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল, যে নারী তখন সামান্য নারী হয়েও নিজেকে বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে দিয়ে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে পেরেছিল—‘অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরামি’, অর্থাৎ—আমি রুদ্রগণ এবং বজ্রগণের সাথে বিচরণ করি, এ জগতে আমিই অদ্বিতীয়; এবং এ জগতে আমি ভিন্ন আর কে আছে—‘একৈবাহং জগত্যত্র, দ্বিতীয়া কা মমাপরা’—সেই নারীই কিনা পরবর্তীসময়ে নিতান্তই পুরুষের অঙ্গুলিহেলনে বেদের অধিকার থেকে শেষপর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়ে গিয়েছিল।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!