সাধারণভাবে সাহিত্য সমালোচকরা বলেন যে, কিছু বিশেষ বিশেষ সৃষ্টিব মধ্যে কোন লেখকের সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়, আর সেগুলোর সার্বিক বিচারেই লেখকের কৃতির সার্থকতা বিচার করা সম্ভব। তবে এরমধ্যে লেখক বিশেষের অনুভব, কল্পনা, রূপকল্পের ব্যবহার, দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতির পরিচয় পাওয়া গেলেও এর বাইরেও লেখকের যে একটি সত্তা রয়েছে, সেখানে তিনি একান্তভাবে তাঁর নিজের হয়ে থাকেন। এরমধ্যে তাঁর ব্যক্তি ভাবনা, বিশেষ বিশেষ প্রবণতা ইত্যাদি,—সংক্ষেপে তাঁর নিজস্ব পরিমণ্ডলের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু নিজের লেখা ও সাহিত্যকৃতির মধ্যে লেখক সর্বজনীন হন বলে, এখানে তিনি নিজেকে সকলের অনুভবের মধ্যে বিকশিত করে তোলেন বলে, এজায়গায় তাঁর নিজস্ব ঘরোয়া পরিচয় পাওয়া যায় না। বরং এ পরিচয় তাঁর ব্যক্তি মনের খবরে, বন্ধু-বান্ধব ও আপন পরিজনদের সঙ্গে একান্ত আলাপে পাওয়া যায়। আর এর সার্থক প্রকাশ বিশেষভাবে তাঁর ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে চিঠিপত্রকে যদিও ব্যক্তিগত সংবাদ আদান প্রদানের প্রকৃষ্ট মাধ্যম বলে মনে করা হয়ে থাকে, কিন্তু তবুও এর মধ্যে দিয়েই সাধারণতঃ লেখকের ব্যক্তিমনের নানা বিচিত্র খবর, তাঁর বিচিত্র অনুভব ও বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া যায়। এখানে তিনি সাময়িকের জন্য হলেও নিজের গণ্ডীবদ্ধতাকে অতিক্রম করে ব্যাপকতা লাভ করেন। আর এ অনুভবই আবার বিচিত্ররূপে তাঁর সাহিত্য-সৃজনে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এক কারণেই কোন কবির কবিতা পড়ে পাঠক-পাঠিকারা যেমন বিস্ময়-মোহিত হন, তেমনি একইসঙ্গে কবির সম্পর্কেও আরো বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েন; তাঁর পুষ্পিত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বরূপটাকে জেনে নিতে তাঁরা কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। অতএব, কোন কবির পত্রগুচ্ছ সাধারণতঃ দু’-ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করতে পারে।
প্রথমতঃ এরমধ্যে পথিক-পাঠিকারা তাঁর লেখক-লেখিকাকে ঘরোয়াভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারেন; এবং
দ্বিতীয়তঃ, বিশেষ বিশেষ ঘটনা তাঁর মনের প্রতিফলনে যে বিশেষত্ব লাভ করে, সেসব অন্যদের মনেও রঙ ধরিয়ে দেয়।
আর বিশেষতঃ এই দ্বিতীয় কারণেই ব্যক্তিগত পত্রও সাহিত্য বলে খ্যাতিলাভ করতে পারে। আসলে, ব্যক্তি ভাবনা যখন নৈর্ব্যক্তিকতা লাভ করে সার্বিক হয়ে পড়ে, এবং বিশেষ যখন নির্বিশেষ রূপ গ্রহণ করে মানবিক বোধের আবেদন সৃষ্টি করে, ঠিক তখনই সেটা সাহিত্যের রূপ পরিগ্রহণ করে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ গ্রন্থকে একথার প্রকৃষ্ট নিদর্শন বলা চলে। কারণ, রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী, চিত্রা, গল্পগুচ্ছ ইত্যাদি সৃজনধর্মিতায়, কাব্য ও গল্প রূপের সার্থকতায় পাঠক-পাঠিকাকে আনন্দ দান করলেও ছিন্নপত্রের মধ্যে যখন রবীন্দ্রমানসে এর প্রাথমিক রূপ, প্রাথমিক অভিজ্ঞতা, প্রাথমিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে জানতে পারা যায়, তখন রবীন্দ্রনাথের এক বিশেষ রূপের, এক বিশেষ মানুষের, এক বিশেষ কবিসত্তার, এক দরদী বাঙালি মনের পরিচয় লাভ করে পাতক-পাঠিকারা অভিভূত হন। আর একারণেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছিন্নপত্রের একটা বিশিষ্ট ভূমিকা ও বিশেষ আবেদন বরাবরই সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু এখানে এবিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করবার অবকাশ নেই; এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের পত্রগুচ্ছকে ছিন্নপত্রের সঙ্গে তুলনা করাও সম্ভব নয়। তবে ‘সুকান্ত সমগ্র’ গ্রন্থে এখনো পর্যন্ত সুকান্ত ভট্টাচার্যের যে ঊনপঞ্চাশটি পত্র সঙ্কলিত হয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে যেমন ব্যক্তি মানুষ সুকান্ত সম্পর্কে অনেক কথা জানতে পৰ যায়, অন্যদিকে তেমনি কবি সুকান্তের নানা বিশেষ অনুভবকেও প্রত্যক্ষ করতে পারা যায়। আর এগুলোই আজও পাঠক-পাঠিকাদের ব্যক্তি সুকান্তকে এবং কবি সুকান্তকে উপলব্ধি করতে অনেকটাই সাহায্য করে।
যাই হোক, এসইব পত্রের মধ্যে পূর্বোক্ত গ্রন্থে সুকান্তের প্রথম যে পত্রটি সঙ্কলিত হয়েছে, তাতে দেখা যায় যে, এসময়ে সুকান্তের বয়স পনেরো বছর অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই এসময়ে তাঁর মধ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই কিশোর মনের আবেগময়তার প্রকাশ ও নতুন রোম্যান্সের উত্তেজনা ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে এতে তাঁর কিশোর মনের নানা পরিচয় ও নানা প্রবণতার কথা প্রকাশিত হওয়াও অত্যন্ত স্বাভাবিক বলেই বোধ হয়। এছাড়া এই পত্রের মধ্যে দিয়েই সুকান্ত ভট্টাচার্যের কলকাতা শহরের প্রতি আত্যন্তিক অনুরাগ, পরিবেশের গুরুত্ব, সমাজসচেতনতা, সাহিত্যানুরাগ, ভাষায় দক্ষতা এবং প্রকাশের ঋজুতার পরিচয়ও পাওয়া যায়। সুতরাং এই পত্রগুচ্ছকে সুকান্তের দ্রুত বিকশমান মনেরই সুন্দর অভিব্যক্তি বলা চলে।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনেতিহাসের সাথে পরিচিত প্রায় সকলেই অবগত রয়েছেন যে, কলকাতার সঙ্গে সুকান্তর আজন্ম নিবিড় পরিচয় ছিল। এখানকার জলহাওয়ায়, বিচিত্র ঘটনা ও পরিবেশের মধ্যে দিয়ে তাঁর মন বিকশিত হয়েছিল বলেই বিংশ শতকের চল্লিশের দশকের কলকাতার উপরে জাপানি আক্রমণে আতঙ্কিত মানুষ যখন প্রাণভয়ে তৎপর ছিলেন, তখন তিনি এই দুর্যোগের মুখে কলকাতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশেষভাবে চিন্তিত ছিলেন। আসলে ছিন্নপত্রে রবীন্দ্রনাথ যেমন জমিদারি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তাঁর সময়কার পল্লী বাংলার রূপ দেখে বিচলিত বোধ করেছিলেন, ঠিক তেমনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সুকান্তও কলকাতার জন্য বিচলিত হয়ে উঠেছিলেন। আর তাই নিজের এই পত্রে তিনি লিখেছিলেন—
“… আজ রুদ্ধশ্বাসে প্রতীক্ষা করছে পৃথিবী কলকাতার দিকে চেয়ে, কখন কলকাতার অদূরে জাপানী বিমান দেখে আর্তনাদ কবে উঠবে সাইরেন—সম্মুখে মৃত্যুকে দেখে, ধ্বংসকে দেখে। প্রতিটি মুহূর্ত এগিয়ে চলেছে বিপুল সম্ভাবনার দিকে। এক-একটি দিন যেন মহাকালের এক একটি পদক্ষেপ, আমার দিনগুলি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছে বাসরঘরের নববধূর মতো এক নতুন পরিচয়ের সামীপ্যে। ১৯৪২ সাল কলকাতার নতুন সজ্জাগ্রহণের এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত। বাস্তবিক ভাবতে অবাক লাগে, আমার জন্ম-পরিচিত কলকাতা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাবে অপরিচয়ের গর্ভে, ধ্বংসের সমুদ্রে, তুমিও কি তা বিশ্বাস কর …?
কলকাতাকে আমি ভালবেসেছিলাম, একটা রহস্যময়ী নারীর মতো, ভালবেসেছিলাম প্রিয়ার মতো, মায়ের মতো। তার গর্ভে জন্মানোর পর আমার জীবনের এতগুলি বছর কেটে গেছে তারই উষ্ণ-নিবিড় বুকের সান্নিধ্যে; তার স্পর্শে আমি জেগেছি, তার স্পর্শে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। বাইরের পৃথিবীকে আমি জানি না, চিনি না, আমার পৃথিবী আমার কলকাতার মধ্যেই সম্পূর্ণ। একদিন হয়তো এ পৃথিবীতে থাকব না, কিন্তু এই মুহূর্ত পর্যন্ত আমি যে কলকাতায় বসে কলকাতাকে উপভোগ করছি। সত্যি … বড় ভাল লেগেছিল পৃথিবীর স্নেহ, আমার ছোট্ট পৃথিবীর করুণা। বাঁচতে ইচ্ছা করে, কিন্তু নিশ্চিত জানি কলকাতার মৃত্যুর সঙ্গেই আমিও নিশ্চিহ্ন হব।”
এমনকি এর তিনমাস পরে লেখা তাঁর আরেকটি চিঠিতেও কলকাতার প্রসঙ্গ পাওয়া যায়, যেটার পটভূমি ঠিক আগের মতোই। আর এর মধ্যেও কলকাতার বিষণ্ণতা ও একটা নতুন ভিন্ন পরিচয় ফুটে উঠেছে বলে লক্ষ্য করা যায়—
“… কলকাতা এখন আত্মহত্যার জন্যে প্রস্তুত, নাগরিকরা পলায়ন তৎপর। … এ থেকে অনুমান করা যায় যে, কত দ্রুত সবাই করছে প্রস্থান আর শহরটি হচ্ছে নির্জন। তবে এই নির্জনতা হবে উপভোগ্য—কারণ এর জনাকীর্ণতায় আমরা অভ্যস্ত, সুতরাং এর নব্য পরিচয়ে আমরা একটা অচেনা কিছু দেখার সৌভাগ্যে সার্থক হব। আর কলকাতার ভীষণতার প্রয়োজন এই জন্যে যে, এত আগন্তুকের স্থান হয়েছিল এই কলকাতায়, তার ফলে কলকাতা কাদের তা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন বিদেশী এলে সে বুঝতেই পারবে না, যতক্ষণ না তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে দেশটা কাদের। কারণ, যা ভীড়-তাতে মনে হয় দেশটা সকলের না হোক, শহরটা সর্বজনীন।
আজকাল রাত একটায় যদি কলকাতা ভ্রমণ কর তাহলে তোমার ভয়ঙ্কর সাহস আছে বলতে হবে। শুধু চোর গুণ্ডার নয়, কলকাতার পথে এখন রীতিমত ভূতের ভয়ও করা যেতে পারে। সন্ধ্যার পর কলকাতায় দেখা যায় গ্রাম্য বিষণ্ণতা। সেই আলোকময়ী নগরীকে আজকাল স্মরণ করা কঠিন; যেমন একজন বৃদ্ধা বিধবাকে দেখলে মনে করা কঠিন তার দাম্পত্য-জীবন। আর বিবাহের পূর্বে বিবাহোম্মুখ বধূর মতো কলকাতার দেখা দিয়েছে প্রতীক্ষা—অন্য দেশের বিবাহিতা সখীর মতো দেখবে ঘটিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
আজ আমার ভাইয়েরা চলে গেল মুর্শিদাবাদ—আমারও যাবার কথা ছিল, কিন্তু আমি গেলাম না মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াবার এক দঃসাহসিক আগ্রহাতিশয্যে, এক ভীতি-সংকুল, রোমাঞ্চকর, পরম মুহূর্তের সন্ধানে। তবু আমার ক্লান্তি আসছে, ক্লান্তি আসছে এই অহেতুক বিলম্বে।”
আসলে সুকান্তর কিশোর মনে তখন এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি ও এ্যাডভেঞ্চারের প্রবল আগ্রহ ছিল বলে সকলেই যখন প্রাণভয়ে কলকাতা ত্যাগ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন, তখন কিশোর সুকান্তর মনের কথা ছিল—
“আমার ভয় হয় পাছে কলকাতার ভয়ঙ্কর দিনগুলো হারিয়ে ফেলি।”
তবে এরপরে অবশেষে সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলো এসেছিল, আর পাঁচদিন ধরে কলকাতার বুকে জাপানি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল। এসময়ে কলকাতার খিদিরপুরে, হাতিবাগানে, ডালহৌসি অঞ্চলে আকাশপথে আক্রমণ হয়েছিল; যারফলে কলকাতা তখন আরও জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সুকান্ত তখন রাজনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে এই পর পর আক্রমণে তাঁর মনে ভীরুতার পরিবর্তে দৃঢ়তা এসেছিল যে—‘জাপানকে রুখতে হবে’। এসময়ে লেখা তাঁর একটি পত্রে একদিনের জাপানী আক্রণের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, সেটা এরকম—
“… রঙ্গমঞ্চে জাপানী বিমানের প্রবেশ। সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু স্তব্ধ। আর শুরু হয়ে গেল দাদার ‘হায়’, ‘হায়’, বৌদির থেকে থেকে সভয় আর্তনাদ, আর আমার অবিরাম কাঁপুনি। ক্রমাগত মন্থর মুহূর্তগুলো বিহ্বল মুহ্যমানতায়, নৈরাশ্যে বিঁধে-বিঁধে যেতে থাকল, আর অবিশ্রান্ত এরোপ্লেনের ভয়াবহ গুঞ্জন, মেসিনগানের গুলি, আর সামনে পিছনে বোমা ফাটার শব্দ। সমস্ত কলকাতা একযোগে কান পেতে ছিল সভয় প্রতীক্ষায়, সকলেই নিজের নিজের প্রাণ সম্পর্কে ভীষণ রকম সন্দিগ্ধ। দ্রুতবেগে বোমারু এগিয়ে আসে, অত্যন্ত কাছে বোমা পড়ে আর দেহ মনে চমকে উঠি, এমনি করে প্রাণপণে প্রাণকে সামলে তিন ঘণ্টা কাটাই। তখন মনে হচ্ছিল, এই বিপদময়তার যেন আর শেষ দেখা যাবে না। অথচ বিমান আক্রমণ তেমন কিছু হয়নি, যার জন্য এতটা ভয় পাওয়া উচিত।”
খুব সম্ভবতঃ এই ভয় না পাওয়ার মধ্যে তখন সুকান্তর বিশেষ একটি রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল। আসলে যে বিশ্বাস প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামের প্রেরণা দেয়, তা কোন ঘটনার সার্বিক পরিচয় জানিয়ে এর কার্যকারণকেও স্পষ্ট করে তোলে। আর এই বিশ্বাসের জোরেই বয়সের অল্পতা সত্ত্বেও মানসিক অভূতপূর্ব দৃঢ়তা লক্ষ্য করা যায়।
যাই হোক, জাপানি বোমার ভয়ঙ্কর দিনগুলোর পরে বহুদিন অতিক্রান্ত হলেও যুদ্ধ ও মন্বন্তরে কলকাতা শহর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবুও এরমধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন আশা আর বিশ্বাস ছিল বলে, এই দুর্যোগের দিনগুলো বিশ্বাসী মনে কখনোই ভয়ঙ্কররূপে ফুটে উঠতে পারেনি। অতঃপর কলকাতার বুকে অনেক গৌরবজনক ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল। আর অবশেষে এই কলকাতাতেই পৈশাচিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল। এসময়ে সুকান্ত রাউডন স্ট্রিটের রেড-এড কিওর হোমে অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। কিন্তু এসময়ে কলকাতা সম্পর্কে তাঁর মনে বিরূপতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। আর একারণেই ১৯৪৬ সালের ৩রা অক্টোবর তারিখের একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—
“… শহরের রক্তাক্ত কোলাহলের বাইরে এই নির্জন, শ্যামল ছোট্ট একটু দ্বীপের মতো জায়গায় বেশ আছি। কিন্তু তবুও আমার শিকড় গজিয়ে উঠতে পারেনি, বাইরের জগতের রূপ-রস-গন্ধ-সমৃদ্ধ হাতছানি সকাল সন্ধ্যায় ঝল্ক দিয়ে ওঠে তলোয়ারের মতো। এখন আছি বদ্ধ-দীঘির জগতে; সেখান থেকে লাফ দিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে মাছের মতো, কর্মচাঞ্চল্যময় পৃথিবীর স্রোতে। সকালের আশ্চর্য অদ্ভুত রোদ্দুর কোনো কোনো দিন সারাদিন ধরে কেবলই মন্ত্রণা দেয় বেরিয়ে পড়তে; শহর-বন্দর ছাড়িয়ে অনেক দূরের গ্রামাঞ্চলের সবুজে মুখ লুকোতে দেয় অযাচিত পরামর্শ। সত্যিই অসহ্য লাগে কলকাতাকে মনের এইসব মুহূর্তে।”
এসব ছাড়া পত্রগুচ্ছের মধ্যে সুকান্তের আরেকটি প্রধান লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য হল, ধর্মীয় সংস্কারের প্রতি তাঁর বিরোধিতা। ইতিহাস বলে যে, মানব সভ্যতার শৈশবকালে অসহায়তাবোধের ফলে যে অলৌকিক বিশ্বাস স্বাভাবিকভাবে মানুষের মনে গড়ে উঠেছিল, পরবর্তীকালে শ্রেণীবিভক্ত সমাজে মানুষকে বিভ্রান্ত করবার জন্য আফিম হিসেবে এটাকেই ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। আর এরপরে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার মানুষের জ্ঞান ও যুক্তিবোধকে কার্যকারণের একটা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত করলেও বহুদিনের সংস্কারের ফলে বহু শিক্ষিত মানুষের মনেও এই ধর্মীয় সংস্কার ততদিনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। সুকান্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু অরুণাচল বসুর মধ্যে এই ধর্মীয় প্রবণতা লক্ষ্য করেই তাঁকে বারে বারে আঘাত ও বিদ্রুপ করেছিলেন। আর এজন্যই দেখা যায় যে, তিনি তাঁর প্রথম চিঠিতেই ‘শ্রীরুদ্রশরণম’ শিরোদেশে ব্যবহার করেছিলেন। অবশ্য এটা ব্যবহারের পিছনে তাঁর আরো একটা উদ্দেশ্য ছিল। সেটা হল যে, কলকাতা তখন জাপানি আক্রমণের ভয়ে আতঙ্কিত, সুকান্তের ভাষায়—
“আসন্ন শোকের ভয়ে ব্যথিত জননীর মতো সাইরেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।”
আর এই ভয়াবহতার অভিব্যক্তির জন্যই চিরাচরিত ধারণা অনুযায়ী তিনি তখন রুদ্রদেবতার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। তবে এটা নিঃসন্দেহে তাঁর ব্যাজস্তুতি ছিল। কিন্তু এরপরে সুকান্ত যখন জানতে পেরেছিলেন যে, তাঁর বন্ধু সন্ন্যাস অবলম্বন করেছেন, তখন তিনি তাঁকে কৌতুক ব্যঙ্গের সঙ্গে লিখেছিলেন— “সৎসঙ্গশরণম।
শ্রী শ্রী শ্রী ১০৮ অর্ণব-স্বামী গুরুজীমহারাজ সমীপেষু।
শত শত সেলামপূর্বক নিবেদন,
পরমারাধ্য বাবাজী, আপনার আকস্মিক অধঃপতনে আমি বড়ই মর্মাহত হইলাম। ইতিমধ্যে শ্রবণ করিয়াছিলাম আপনি সন্ন্যাস অবলম্বন করিয়াছেন, তখন মানসপটে এই চিন্তাই সমুপস্থিত হইয়াছিল যে ইহা সাময়িক মত্ততা মাত্র; কিন্তু অধুনা উপলব্ধি করিতেছি আমার ভ্রম হইয়াছিল। এমতাবস্থায় ইহাই অনুমিত হইতেছে যে কাহারও সুমন্ত্রণায় আপনি এই পথবর্তী হইয়াছেন। অতএব আমার জিজ্ঞাসা এই যে, বৃদ্ধ পিতা এবং অসুস্থা মাতার প্রতি ঐহিক কর্তব্যসকল পদাঘাতে দূরীভূত করিয়া কোন নীতিশাস্ত্রানুযায়ী পারলৌকিক চবমোন্নতি সাধনের নিমিত্ত আপনি এক মোহমার্গ সাধনা করিতেছেন?”
লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, সুকান্তের এই পত্রের মধ্যে একদিকে যেমন সূক্ষ্ম কৌতুক, ব্যঙ্গ এবং নিজের বন্ধুর প্রতি গভীর সহানুভূতির পরিচয় পাওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি পারলৌকিক চরমোন্নতির প্রতি একটি অবিশ্বাসও দেখা যায়।
তারপরে তাঁর বন্ধু অরুণাচল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে যখন গ্রামে ছিলেন, তখন সেখানকার উৎসাহীদের নিয়ে ‘ত্রিদিব’ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন, এবং সুকান্তকেও বন্ধু হিসেবে তিনি এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু পত্রিকার এই নামটি যে সুকান্তর মোটেই যে পছন্দ হয়নি, একথা তাঁর পত্রগুচ্ছ থেকে জানতে পারা যায়। কারণ, সুকান্ত ১৯৪৩ সালের ৩রা মার্চ তারিখের একটি পত্রে নিজের বন্ধুকে এবিষয়ে লিখেছিলেন—
“তোদের (থুড়ি) আমার ‘ত্রিদিব’ সম্বন্ধে একটা বড় সত্য অনুমান করছি যে, আমরা এই পাপ-দুঃখ-কষ্ট আকীর্ণ ধরণীর নগণ্য লোক কর্মদোষে ‘ত্রিদিবে’র দর্শন পাচ্ছি না। আশা করি তোর সঙ্গ লাভের পুণ্যে হয়তো পাপস্খলন হবে এবং তখন এক সংখ্যার দর্শনলাভও হবে।”
আসলে পাপ দুঃখ কষ্ট আকীর্ণ মর্ত্য পৃথিবীর সঙ্গে যেহেতু স্বর্গের প্রত্যক্ষ কোন সম্পর্ক নেই, আর ত্রিদিব নামের মধ্যেই যেহেতু পারলৌকিকতার ভাব বিদ্যমান রয়েছে, সেহেতু সুকান্ত এটাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, এটি ছাড়া আরও দু’-একটি পত্র রয়েছে, যেখানে ‘ত্রিদিব’ সম্পর্কে উল্লেখ হওয়ামাত্রই সুকান্ত নিজের বন্ধুকে একটু খোঁচা দেওয়ার প্রবণতা পরিত্যাগ করতে পারেননি।
বে ধর্ম সম্পর্কে স্পষ্টভাবে তাঁর মত কাশী গিয়ে ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৪৪ সালে কাশী দর্শনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে নিজের বন্ধুকে একটি পত্রে তিনি লিখেছিলেন—
“কাশীর আমি প্রায় সব দ্রষ্টব্যই দেখেছি। ভাল লেগেছে কেবল ইতিহাসখ্যাত চৈত সিংহের যুদ্ধঘটনাজড়িত প্রাসাদের প্রত্যক্ষ বাস্তবতা, আর রাজা মানসিংহ স্থাপিত observatory মানমন্দির। অবিশ্যি বিখ্যাত বেণীমাধবের ধ্বজা থেকে কাশী শহর খুব সুন্দর দেখায় কিন্তু সেটা বেণীমাধব বা কাশীর গুণ নয়, দূরত্বের গুণ। …
কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় দেখলাম, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘ছাত্র নিবাস মূলক’ বিশ্ববিদ্যালয়। আর দেখলাম গান্ধীজি পরিকল্পিত ভারতমাতার মন্দির। দুটোতেই ভাল লাগার অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও ধর্মের লেবেল আঁটা বলে বিশেষ ভাল লাগল না।”
আসলে কোন জায়গায় ধর্মের লেবেল আঁটার মধ্যে যে একটা পশ্চাদমুখী চিন্তা ও একটা প্রতিক্রিয়ার মতলব থাকে, একথা সুকান্ত তখন সচেতনভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
এছাড়া আগেই বলা হয়েছে যে, সুকান্তের পত্রগুচ্ছ যেহেতু তাঁর ব্যক্তিগত সংবাদ এবং আবেগ ও চিন্তার বিনিময় মাধ্যম, সেজন্য এই পত্রগুলোর মধ্যে তাঁর ব্যক্তি প্রবণতার একটি সুন্দর আলেখ্যও পাওয়া যায়। এছাড়া তাঁর এই পত্রগুলোর মধ্যে তারুণ্যের স্বভাবসুলভ রোম্যান্টিক ভালোবাসার কথা, তাঁর দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং তাঁর কাব্য প্রবণতার পরিচয়ও রীতিমত লক্ষ্যণীয়। প্রেম সুকান্তের জীবনেও এসেছিল, এবং এর উপক্রমণিকা, তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু—সুকান্তের আবাল্য সঙ্গিনী এবং পরে বান্ধবী সম্পর্কে বয়ঃসন্ধির অনুরাগ বর্ণনায় তাঁর আবেগ, উচ্ছ্বাস ও সংযমও এসব পত্রে খুব সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে বলেই দেখা যায়। যেমন—পত্রগুচ্ছের চার নম্বর চিঠিতে সুকান্ত লিখেছিলেন—
“একত্রে আহার করতাম, পাশাপাশি শুয়ে বই পড়ে শোনাতাম ওকে, রাত্রে পাশাপাশি শুয়ে ঘুমোতাম। ঘুমের মধ্যে ওর হাতখানি আমার গায়ে এসে পড়ত, কিন্তু শিউরে উঠতাম না, ওর নিঃশ্বাস অনুভব করতাম বুকের কাছে। তখনো ভালবাসা কি জানতাম না আর ওকে যে ভালবাসা যায় অন্যভাবে, এতো কল্পনাতীত। কোনো আবেগ ছিল না, ছিল না অনুভূতির লেশমাত্র।
শেষে একদিন, যখন সবে এসে দাঁড়িয়েছি যৌবনের সিংহদ্বারে, এমনি একদিন, দিনটার তারিখ জানি না, পাশাপাশি শুয়েছিলাম, ঘুমিয়ে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতেই দেখি ভোর হচ্ছে আর সেই ভোরের আলোয় দেখলাম পার্শ্ববর্তিনীর মুখ। সেই নব প্রভাতের পাণ্ডুর আলোয় মুখখানি অনির্বচনীয়, অপূর্ব সুন্দর মনে হল। কেঁপে উঠল বুক, যৌবনের পদধ্বনিতে। হঠাৎ দেখি ও চাইল আমার দিকে চোখ মেলে, তারপর পাশ ফিরে শুল। আর আমি যেন চোরের মতো অপরাধী হয়ে পড়লাম ওর কাছে।”
এখানে জানিয়ে রাখা যাক যে, এই প্রথম সান্নিধ্য যখন হয়েছিল তখন সুকান্তর বয়স ছিল ১০ বছর, আর তাঁর সঙ্গিনীর ৯ বছর; এবং এরপরে যখন ভালোবাসার সলজ্জ অরুণিমার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল—তখন সুকান্তর বয়স ছিল ১৪ আর তাঁর বান্ধবীর বয়স ছিল ১৩। তারপরে এই আবেগ উচ্ছ্বাসের মধ্যে দিয়ে ঘনিষ্ঠতা অর্জনের পথে স্বাভাবিকভাবেই অগ্রসর হয়েছিল। অন্যদিকে এই দুর্বলতার কারণ হিসেবে সুকান্ত পরবর্তীসময়ে নয় সংখ্যক চিঠিতে বলেছিলেন—
“ওটা কাব্য রোগের লক্ষণ। মানুষের যখন কোনো কাজ থাকে না, তখন কোনো একটা চিন্তাকে আশ্রয় করে বাঁচতে সে উৎসুক হয়, তাই এই রকম দুর্বলতা দেখা দেয়। তোমার চিঠি না পেয়ে আমার উপকারই হয়েছিল, আমি অন্য কাজ পেয়েছিলাম। ধর, তোমার চিঠিতে যদি সন্তোষজনক কিছু থাকত, তাহলে হয়তো আমার কাব্যের ধারা তোমাকে আশ্রয় করত। ও তাড়াতাড়ি শুধরে নিল, চিঠিটা কিন্তু সন্তোষজনক ছিল না। আমি বললুম; আমার কাব্যের ধারাও সঠিক পথে চলেছে।”
এখানে অন্য কাজ বলতে সুকান্ত নিশ্চিতভাবেই তাঁর রাজনীতিক কাজের কথা বলেছিলেন। এসময়ে তাঁর সামনে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটা বড় সমস্যা, বড় পরিমণ্ডল, বিরাট দায়িত্ব এবং মহত্তর আবেগের পথ উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল; আর তাঁর কাব্যের ধারা সেই বড় এবং মহতের দিকেই চালিত হয়েছিল। ফলে সুকান্ত একটা নতুন পথ, নতুন আদর্শ লাভ করে তাঁর সৃজনী শক্তিকে সার্থকপথে নিয়োজিত করতে পেরেছিলেন।
প্রসঙ্গতঃ জানিয়ে রাখা যাক যে, সুকান্তের দৈনন্দিন কাজকর্ম বলতে প্রধানতঃ তাঁর পরিবর্তনহীনভাবে রাজনীতিকে বোঝানো হয়ে থাকে। তাঁর স্কুলে যাওয়া, রাজনীতির চর্চা করা আর কবিতা গল্প লেখা—এসবও রাজনীতি চর্চারই অন্তর্গত ছিল। কারণ, এ বয়সে কর্ম ও চিন্তার মধ্যে যেমন কোন ব্যবধান থাকে না, তেমনি এর প্রকাশ ভঙ্গির মধ্যেও থাকে না। তাই এসময়ে মাঝে মধ্যে রাঁচি কিংবা কাশী ঘুরে আসা, ‘জনযুদ্ধ’ নামক একটি পত্রিকার জন্য লেখা, ‘জনযুদ্ধ’ বিলি করা, ছাত্র সংগঠন এবং সম্মেলনের কাজ করা, এবং পরবর্তীসময়ে কিশোর-বাহিনীর যাবতীয় দায়িত্বও তাঁকেই পালন করতে হয়েছিল। আর এজন্যই সতেরো সংখ্যক চিঠিতে নিজের বন্ধুকে তাঁর কাজের একটা ফিরিস্তি দিয়ে তাঁর কাছে না যাওয়ার কারণ হিসেবে ১৯৪৪ সালের ১৩ই জুন তারিখে তিনি লিখেছিলেন—
“(১) কিশোর বাহিনীর দুধের আন্দোলন শুরু হল।
(২) ১৫ই জুন A.I.S.F. Conf
(৩) কিশোর বাহিনীর কার্ড এখনো ছাপা হয়নি। ছাপাব।
(৪) ১৩ই জুন I.P.T.A–এর অভিনয় শ্রীরঙ্গমে।
(৫) ১১ই জুন কিশোর বাহিনীর জরুরী মিটিং।
(৬) কিশোর বাহিনীর ৪নং চিঠি এ সপ্তাহে লিখতে হবে।
(৭) ১৬ই জুন আমাদের বাড়িতে বৌভাত।
(৮) এখন আমার শরীর অত্যন্ত খারাপ।”
পরবর্তী দু’বছর ধরে একদিকে শরীর খারাপ অন্যদিকে কাজের চাপ—এই দুটোই ধীরে ধীরে সুকান্তের মনের ওপরে ভীষণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। আর তাই নিজের ছাব্বিশ সংখ্যক চিঠিতে তিনি বলেছিলেন—
“অবিশ্রান্ত প্রবঞ্চনার আঘাতে আঘাতে মানুষ যে সময় পৃথিবীর ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে, ঠিক সেই সময় এসেছে আমার জীবনে। … আজকাল চারিদিকে কেবল হতাশার শকুনি উড়তে দেখছি। হাজার হাজার শকুনি ছেয়ে ফেলেছে ভবিষ্যৎ আকাশ। গত বছরের আগের বছর থেকে শরীর বিশেষভাবে স্বাস্থ্যহীন হবার পর আর বিশ্রাম পাইনি ভালমতো। একান্ত প্রয়োজনীয় বায়ু ‘পরিবর্তনও’ ঘটেনি আমার সময় ও অর্থের অভাবে। পার্টি আর পরীক্ষার জন্যে উঠে দাঁড়ানোর পর থেকেই খাটতে আরম্ভ করেছি; তাই ভেতরে অনেক ফাঁক থেকে গিয়েছিল। পরীক্ষা দিয়ে উঠেই গত তিন মাস ধরে খাটছি। বুঝতে পারিনি স্বাস্থ্যের অযোগ্যতা। হঠাৎ গত সপ্তাহে হৃদযন্ত্রের দুর্বলতায় শয্যা নিলুম।”
এই শয্যাগ্রহণই শেষপর্যন্ত তাঁকে একটি মারাত্মক পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তবে রক্তপায়ী কীটগুলো ভেতরে ভেতরে তাঁকে দুর্বল করে তুললেও মনের দিক থেকে সুকান্ত কিন্তু কখনোই নিজেকে দুর্বল বা অসমর্থ বলে মনে করেননি। অনুমান করা যেতে পারে যে, এই কঠিন রোগ থেকে সেরে উঠতে তখন নিশ্চই প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হত। অন্ততঃ সুকান্তর এসময়ে একথাই মনে হয়েছিল যে, প্রচুর অর্থ থাকলেই শরীর ভাল করা সম্ভব। আর তাই অর্থের অভাবেই তখন সুকান্তর জীবনকে নিরর্থক বলে মনে হয়েছিল। অন্যদিকে এসময়ে তাঁর পার্টিরও অবস্থা ভালো ছিল না বলে তাঁদের পক্ষে তাঁকে যথেচ্ছ অর্থের যোগান দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাছাড়া নিছক প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্যও এসময়ে সুকান্তর ছিল না। আর একারণেই তাঁর স্পর্শাতুর কবি মন তখন অভিমানে অভিযোগে মুখর হয়ে উঠেছিল; এবং নিজের এই চিঠিতেই আরেক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন—
“আমার লেখকসত্তা অভিমান করতে চায়, কর্মীসত্তা চায় আবার উঠে দাঁড়াতে! এই সত্তার দ্বন্দ্বে কর্মীসত্তাই জয়ী হতে চলেছে; কিন্তু কি করে ভুলি, দেহ আর মনে আমি দুর্বল একান্ত অসহায় আমি?”
লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, এই চিঠির মধ্যে তাঁর দ্বন্দ্ব-সংক্ষুব্ধ কবি মনের একটি সুন্দর পরিচয় ফুটে উঠেছে বলে লক্ষ্য করা যায়। তবে এসময়ে আর্থিক-প্রতিকূলতায় ও শারীরিক অসুস্থতায় পার্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেখা দিলেও একজন কর্মী হিসেবে শেষপর্যন্ত বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করে তিনি তাঁর রাজনীতিক সত্তাকেই জয়ী করে তুলেছিলেন। আর একারণেই এর কয়েক মাস পরেই নিজের আত্মীয়-বন্ধুকে লেখা একচল্লিশ সংখ্যক চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন—
“বাস্তবিক এইসব বীরদের (চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বীর) প্রায় প্রত্যেকেই শিশুর মতো হাসি-খুশি, সরল, আমোদপ্রিয়। এ ছাড়াও বিখ্যাত শ্রমিক এবং কৃষক নেতারা এখানে অসুস্থ অবস্থায় জড়ো হয়েছেন। তাঁদের সঙ্গেও তোর আলাপ করিয়ে দেবার লোভ আমার ছিল।
বেশ কাটছে এখানে। সবাই এখানে আপন হয়ে উঠছে, ভালবাসতে আরম্ভ করেছে আমাকে। ডাক্তার রোগী সবারই আনন্দ আমার সঙ্গে রসিকতায়! এক এক সময় মনে হয় বেশ আছি- শহরের রক্তাক্ত কোলাহলের বাইরে এই নির্জন, শ্যামল ছোট্ট একটু দ্বীপের মতো জায়গায় বেশ আছি।”
কিন্তু একইসাথে এই নির্জনতা তাঁর পছন্দ ছিল বা বলেই এই চিঠিতেই অন্যত্র তিনি লিখেছিলেন—
“এখন আছি বদ্ধ-দীঘির জগতে, সেখান থেকে লাফ দিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে মাছের মতো, কর্মচাঞ্চল্যময় পৃথিবীর স্রোতে।”
এ থেকে বুঝতে পারা যায় যে, কর্মচঞ্চল পৃথিবীর মধ্যেই সুকান্ত জনতার মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলেন। আর তিনি যে জনতার কবি, এ কথা জানিয়ে ১৯৪৪ সালে নিজের মেজ বৌদিকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—
“… আমি কবি বলে নির্জনতাপ্রিয় হব, আমি কি সেই ধরনের কবি? আমি যে জনতার কবি হতে চাই, জনতা বাদ দিলে আমার চলবে কি করে? তাছাড়া কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট, কমিউনিস্টদের কাজ-কারবার সব জনতা নিয়েই।”
এখানে বলাই বাহুল্য যে, কমিউনিজমেরআদর্শের জন্যই সুকান্তকে শহীদ হতে হয়েছিল। অন্যদিকে সুকান্তের পত্রগুচ্ছের মধ্যে অন্য যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয়, সেটা হল তাঁর সাহিত্যপ্রীতি এবং ভাষায় উপরে দখল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, সুকান্তের পত্রগুচ্ছের সবথেকে পুরোনো যে চিঠিটি এখনও পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, সেটার তারিখ হল ১৬ই এপ্রিল (১৯৩৯)? সুকান্তর বয়স তখন তেরো-চৌদ্দ ছিল। সুতরাং যদিও এটা তাঁর বয়ঃসন্ধিকালের রচনা ছিল, কিন্তু তবুও অলঙ্কারের ব্যবহারে, শব্দের চয়নে ও ভাব উপযোগী ভাষা ব্যবহারে এর পরিপক্কতা আজও পাঠক-পাঠিকাকে তীব্রভাবেই আকর্ষণ করে—
“তোমাকে চিঠি লিখতে ইচ্ছা করে তাকে দমন করতে পারি না। তবুও লিখে তৃপ্তি পায় না মন আর লোভও বেড়ে যায় এইতো চিঠি লিখলাম। আবার একটু পরে হয়তো তোমায় দেখতে ইচ্ছা করবে। আগুনের মধ্যে পতঙ্গ হয়তো ঝাঁপ দিতে চাইবে; চঞ্চল মনের অঞ্চল হয়তো বসন্তের বাতাসে একটু দুলতে চাইবে; মনের মাদকতা হয়তো একটু বাড়বে কিন্তু শীর্ণ শাখায় সে দোলা সুখের দিনগুলিকে ঝরিয়ে দেবে। আজকাল মাঝে মাঝে অব্যক্ত স্পৃহা সরীসৃপের মতো সমস্ত গা বেয়ে সুস্থ মনকে আক্রান্ত করতে চায়। আমি এ সমস্ত সহ্য করতে পারি না। আমার চারিদিকের বিষাক্ত নিঃশ্বাসগুলো আমাকেই দগ্ধ করতে ছুটে আসে আর তার সে রোমাঞ্চকর নিঃশ্বাস আমাকে লুব্ধ করে। আশার চিতায় আমার মৃত্যুর দিন সন্নিকট। তাই চাই আজ আমার নির্বাসন। তোমাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই, তোমাদের ভুলতে চাই; দীন হয়ে বাঁচতে চাই। তাই সুখের দিনগুলোকে ভুলে, তোমাদের কাছে শেখা মারণ-মন্ত্রকে ভুলে, ধ্বংসের প্রতীক স্বপ্নকে ভুলে মৃত্যুমুখী আমি বাঁচতে চাই। কিন্তু পারব না, তা আমি পারব না;—আমার ধ্বংস—অনিবার্য। আজ বুঝেছি কেন এত লোক দুঃখ পায়, সঠিক পথে চলতে পারে না। আলেয়া-যৌবন তার দিক-ভ্রান্তি ঘটায়। হঠাৎ স্বপ্নাকাশে বাস্তবের মেঘগুলো জড়ো হয়ে দাঁড়ায় ভিড় করে, হাতে থাকে বুভুক্ষার শাণিত-খড়্গ আর অক্ষমতার হাঁড়ি-কাঠে তাদের মাথা কাটা পড়ে। এই তো জীবন। প্রথম যৌবনের অলস অসতর্ক মুহূর্তে আমরাই আমাদের শ্মশানের চিতা সাজাই হাস্যমুখর দিনের পরিবেশনে। অশিক্ষিত আমাদের দেশে যৌবনে দুর্ভিক্ষ আসবেই। আর তারই বহ্নিময় ক্ষুধা আমাদের মনকে তিক্ত, অতৃপ্ত, বিকৃত করে তোলে। জীবনে আসে অনিত্যতা, জীবনী-শক্তি যায় ফুরিয়ে, কাজে আসে অবহেলা, ফাঁকি আমরা তখনই দিতে শিখি আর তখনই আসে জীবনকে ছেড়ে চুপি চুপি সরে পড়বার দুরস্ত অভিসন্ধি।” (৩৯নং পত্র)
এই চিঠিতে ‘বুভুক্ষার শাণিত-খড়্গ’, ‘অক্ষমতার হাঁড়িকাঠ’, ‘সরীসৃপের মতো অব্যক্ত স্পৃহা’ প্রভৃতি সমাসোক্তি ও রূপক অলঙ্কারের ব্যবহারে অভিনবত্ব সুকান্তের সাহিত্য ক্ষমতারই উজ্জ্বল ঐতিহাসিক নির্দশন।
কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধে আতঙ্কিত কলকাতার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন—
“ম্লানায়মান কলকাতার ক্রমস্তস্বমান স্পন্দন ধ্বনি শুধু বারম্বার আগমনী ঘোষণা করছে আর মাঝে-মাঝে আসন্ন শোকের ভয়ে ব্যথিত জননীর মতো সাইরেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। নগরীর বুঝি অকল্যাণ হবে। আর ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে কলকাতা, তবে নাটকটি হবে বিয়োগান্তক। এই হল কলকাতার বর্তমান অবস্থা।”
এরমধ্যে একদিকে যেমন কলকাতার সাইরেনের দীর্ঘশ্বাস লক্ষ্য করা যায়, অন্যদিকে তেমনি একটি সাহিত্যিক প্রকাশও দেখা যায়। তাছাড়া তিনি এতে খুব চমৎকারভাবে তৎকালীন কলকাতার নাটকীয় অবস্থাও বর্ণনা করেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়।
আবার বন্ধু অরুণাচলদের পরিত্যক্ত বেলেঘাটার বাড়ির বর্ণনার ক্ষেত্রেও সুকান্তের কাব্যিক আবেগ প্রসঙ্গতঃ উল্লেখনীয়—
“তোদের আগের সেই লতাচ্ছাদিত, তৃণশ্যামল, সুন্দর বাড়িটি ত্যাগ করা হয়েছে। যেখানে তোরা ছিলি গত চার বছর নিরবচ্ছিন্ন নীরবতায়, যেখানে কেটেছে তোদের কত বর্ষণ-মুখর সন্ধ্যা, কত বিরস দুপুর, কত উজ্জ্বল প্রভাত, কত চৈতালি হাওয়ায়-হাওয়ায় রোমাঞ্চিত রাত্রি, তোর কত উষ্ণ কল্পনায়, নিবিড় পদক্ষেপে বিজড়িত সেই বাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হল আপাত নিষ্প্রয়োজনতায়।”
কিংবা—
“শত শত জন-কোলাহল-মথিত ইস্কুল বাড়িটি আজ নিস্তব্ধ নিঝুম। সদ্য বিধবা নারীর মতো তার অবস্থা। তোদের অজস্র-স্মৃতি-চিহ্নিত তার প্রতিটি প্রত্যঙ্গ যেন তোদেরই স্পর্শের জন্য উন্মুখ; সেখানে এখনও বাতাসে বাতাসে পাওয়া য়ায় তোদের স্মৃতির সৌরভ।”
তাছাড়া রাঁচী ভ্রমণের সময়ে জোনহা প্রপাতের সৌন্দর্য বর্ণনাও তাঁর পত্রে অত্যন্ত রমণীয়ভাবে ফুটে উঠেছে বলেও দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষতঃ সে জায়গায়, যেখানে রাতের জোনহার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন—
“জোনহা সারাহাত বিপুল বেগে তার গৈরিক জলধারা নিষ্ঠুরভাবে আছড়ে আছড়ে ফেলতে লাগল কঠিন পাথরের ওপর, আঘাত-জর্জর জলধারার বুকে জেগে রইল রক্তের লাল আর রুদ্ধ ঘরে শোনা যেতে লাগল আমাদের ক্লান্ত নিঃশ্বাস। প্রহরীর মতো জেগে রইল ধ্যানমগ্ন পাহাড় তার অকৃপণ বাৎসল্য নিয়ে, আর আমাদের সমস্ত ভাবনা ঢেলে দিলাম সেই বিরাটের পায়ে।”
এসব ছাড়াও সুকান্তের পত্রগুচ্ছের মধ্যে আরও অনেক টুকিটাকি সংবাদ পাওয়া যায়। যেমন—১৯৪৫ এবং ১৯৪৬ সালেও সুকান্ত সম্ভবতঃ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কারণ, ১৯৪৫ সালের ২০শে এপ্রিল তারিখের একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—
“বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার জন্য আমার দুশ্চিন্তা ও অবহেলার সীমা নেই, যদিচ তোড়জোড় করছি খুব।”
আবার ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের ২৮শে জ্যৈষ্ঠ তারিখের আরেকটি চিঠিতে লিখেছিলেন—
“পরীক্ষা দিয়ে উঠেই গত তিন মাস ধরে খাটছি।”
প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, এসব পরীক্ষার খবর যাই হোক না কেন, একজন কবি হিসেবে সুকান্ত যে তাঁর জীবদ্দশাতেই যথেষ্ট খ্যাতি এবং সম্মান পেয়েছিলেন, এ সংবাদও কিন্তু তাঁর পত্রগুচ্ছ থেকে পাওয়া যায়। যেমন—১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২৭শে চৈত্র তারিখের একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—
“একদিকে বাইরের খ্যাতি, সম্মান, প্রতিপত্তি লাভ করছি, অন্যদিকে… আমার সমস্ত আশা-আকাঙ্খা এবং ভবিষ্যৎকে চূর্ণ করে দিচ্ছে।”
তবে এই চিঠির তারিখ সঠিক কিনা—একথা বলা কঠিন। কারণ, ১৯৪১ সালে তাঁর বাইরের খ্যাতি, সম্মান, প্রতিপত্তি লাভ করবার কোন কারণ তাঁর জীবনেতিহাসে পাওয়া যায় না। অনুরূপভাবে, ১৯৪৬ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর তারিখের চিঠিতেও তাঁর খ্যাতি আর স্মরণীয় দিনের উল্লেখ এভাবে পাওয়া যায়—
“… কাল আমার জীবনে সব থেকে স্মরণীয় দিন গেছে। মুক্ত বিপ্লবীরা সদলবলে (অনন্ত সিং বাদে) সবাই আমাদের এখানে এসেছিলেন। অনুষ্ঠানের পর তাঁরা আমাদের কাছে এলেন আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে। বিপ্লবী সুনীল চ্যাটার্জী আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আর একজন বিপ্লবী তাঁর গলার মালা খুলে পরিয়ে দিলেন আমায়। গণেশ ঘোষ বললেন—‘আমি আপনাকে ভীষণভাবে চিনি।’ … অম্বিকা চক্রবর্তী ও অন্যান্য বন্দীরা সবাই আমাকে অভিনন্দন জানালেন—আমি তো আনন্দে মুহ্যমান প্রায়। সত্যি কথা বলতে কি এতখানি গর্বিত কোনো দিনই নিজেকে মনে করিনি। ফ্রান্সে আর আমেরিকায় আমার জীবনী বেরুবে যেদিন শুনলাম সেদিনও এত সার্থক মনে হয়নি আমার এই রোগজীর্ণ অশিক্ষিত জীবনকে।”
পরিশেষে একথাও জানিয়ে রাখা যাক যে, সুকান্ত নিজের জীবদ্দশাতেই তাঁর ছড়ার বইয়টি প্রকাশ করবার জন্য একটি পান্ডুলিপি তৈরি করে শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের কাছে সম্ভবতঃ ছবি আঁকাবার জন্য জমা দিয়েছিলেন। তাছাড়া বাংলার কিশোর বাহিনীর কর্মসচিব হিসেবে কিশোর বন্ধুদেরও তিনি সবসময় পরামর্শ দিয়ে গিয়েছিলেন। এভাবেই পত্রগুচ্ছের মাধ্যমে সুকান্তের জীবন, কর্মময়তা এবং তাঁর বিশেষ বিশেষ চিন্তাভাবনার প্রামাণ্য পরিচয় পাওয়া যায়। আর এসব ঐতিহাসিক কারণেই জন্যই তাঁর পত্রগুচ্ছ আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।#




