ভাগীরথী: একটি মানচিত্রের রক্তস্নাত শরীর এবং বিস্মৃত মহাকাব্য

স্বাধীনতা কোনো বিমূর্ত রোমান্টিক ধারণা কিংবা কোনো অলৌকিক দান নয়; এটি মূলত এক যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘস্থায়ী জন্মপ্রক্রিয়া। এই সার্বভৌমত্বের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মিত হয়েছে লক্ষ কোটি মানুষের চূর্ণ হাড় ও জমাটবদ্ধ মজ্জার ভস্মস্তূপে, কোটি মায়ের হৃদপিণ্ড নিংড়ানো হাহাকারে, দীর্ঘশ্বাস ও অবিনাশী সংগ্রামের রক্তিম প্রবাহে। একটি মানচিত্রের সার্বভৌমত্ব আসলে কেবল ভূখণ্ডের সীমানা নয়, বরং তা হাজার হাজার নামহীন আত্মার লোনা জল আর বীরত্বের এক জীবন্ত জ্যামিতি। সেই জ্যামিতির একেবারে কেন্দ্রস্থলে মিশে আছে পিরোজপুরের বাগমারা কদমতলীর নিভৃত পল্লীর সেই বিধবা গৃহবধূ ভাগীরথী সাহার মহাকাব্যিক আত্মত্যাগ। তিনি কেবল একজন বীরাঙ্গনা নন, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অকুতোভয় রণকৌশলী। ইতিহাসের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘প্রান্তিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ’, ভাগীরথী ছিলেন সেই সংগ্রামেরই এক মূর্ত প্রতীক, যিনি নিজের শরীরকে যুদ্ধের ময়দানে একটি ‘কৌশলগত হাতিয়ারে’ রূপান্তর করার চূড়ান্ত ও একক সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

​১৯৪০ সালে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার দেবীপুর গ্রামে এক দরিদ্র মুড়ি বিক্রেতার ঘরে জন্ম নেয়া ভাগীরথীর যাপিত জীবন ছিল চরম দারিদ্র্যের। ১৯৭১ সালের ৪ মে পিরোজপুরে হানা দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট। পিরোজপুরের তৎকালীন সাব-জোনাল মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ক্যাপ্টেন এজাজ আহমদের নেতৃত্বে যখন জনপদে লাশের স্তূপ তৈরি হচ্ছিল এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে বলেশ্বর নদের মোহনায় ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, ভাগীরথী তখন হয়ে উঠেছিলেন এক অদৃশ্য যোদ্ধা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ না থাকলেও শত্রুর মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা বা যৌন লালসাকে ব্যবহার করেই তাদের সামরিক গোয়েন্দা জালে আঘাত হানা সম্ভব। এটি ছিল এক চরম নৈতিক ও শারীরিক পণ, যা যুদ্ধের প্রথাগত সংজ্ঞা ও লৈঙ্গিক ভূমিকা— উভয়কেই আমূল চ্যালেঞ্জ করে।

তিনি ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে পিরোজপুর শহরের পাক সামরিক ক্যাম্পে প্রবেশ করতে শুরু করেন। তৎকালীন সামরিক ডামাডোলে তিনি নিজের সম্ভ্রমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে শত্রুর অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার পান। ১৯৭২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে এ এস এম শামসুল আরেফিন সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র’ (অষ্টম খণ্ড)-এ সংরক্ষিত সেই অমোঘ ও যন্ত্রণাদায়ক স্বীকৃতি—”বাংলার অষ্টাদশী মেয়ে ভাগীরথী স্বেচ্ছায় নিজের দেহ দিয়ে পাকিস্তানিদের খুশি করতেন”— এটি স্রেফ কোনো খবর ছিল না; এটি ছিল এক বীরের মহাকাব্যিক আত্মবলিদানের দালিলিক সাক্ষ্য। তিনি যৌন সহিংসতাকে স্রেফ নারীত্বের অবমাননা হিসেবে মেনে না নিয়ে তাকে একটি ‘কৌশলী পাল্টা প্রতিরোধ’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। শত্রুরা যখন তাঁকে কেবল ভোগের সামগ্রী ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভুগছিল, ভাগীরথী তখন তাদের অসতর্ক মদ্যপ আলাপ থেকে সংগ্রহ করছিলেন পাক বাহিনীর সামরিক অবস্থান, রসদ এবং গোপন আক্রমণের তথ্য। এই অমূল্য তথ্যগুলোই তিনি প্রাণ হাতে নিয়ে নিয়মিত পৌঁছে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।

ভাগীরথীর দেওয়া নিখুঁত তথ্যের ভিত্তিতেই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সরোয়ার হোসেন ও মতিউর রহমান সরদারের দল ২৯ আগস্ট ১৯৭১-এ বাগমারায় এক অতর্কিত হামলা চালায়, যাতে পাক বাহিনীর প্রায় ৪৫ জন সদস্য নিহত হয়। ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বরের সফল অভিযানেও তিনি ছিলেন নেপথ্যের মূল কারিগর। কিন্তু এই বীরত্বের নেপথ্যে ছিল এক বিষাক্ত বিশ্বাসঘাতকতা। স্থানীয় কুখ্যাত রাজাকার আবদুল আলী ও তার দোসরদের সহায়তায় ভাগীরথীর এই ‘গুপ্তচর’ ভূমিকা ক্যাপ্টেন এজাজের কাছে প্রকাশ পায়। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১— ইতিহাসের এক কলঙ্কিত দিন। ক্যাপ্টেন এজাজের নির্দেশে জনসমক্ষে ভাগীরথীর বসন ছিন্ন করে তাঁকে চরম লাঞ্ছিত করা হয়। এরপর তাঁর দুই পা জলপাই রঙের দু’টি সামরিক জিপের পেছনে মজবুত দড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। জিপ দু’টি যখন বিপরীত দিকে প্রচণ্ড গতিতে চলতে শুরু করে, তখন পিরোজপুরের পিচঢালা পথে আছড়ে পড়ে ভাগীরথীর আকাশফাঁটা আর্তনাদ। জিপের টানে তাঁর শরীর থেকে জীবন্ত মাংসের পিণ্ড খুলে আসছিল, হাড় মড়মড় করে ভাঙছিল। এক সময় তাঁর শরীর বীভৎসভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ কেবল একজন নারীকে হত্যা করা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীর মনোবল ভেঙে দেয়ার এক পরিকল্পিত ‘প্রদর্শনীমূলক সহিংসতা’। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্মৃতিহত্যা’ (Memorycide)— যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর প্রতিরোধের সাহস না পায়।

​ভাগীরথী সাহার এই মৃত্যু ছিল দখলদার শক্তির নৈতিক পরাজ্যের চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি। তাঁর ত্যাগের তুলনা চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়া পোলিশ রেজিস্ট্যান্স বা ফরাসি বীর নারী যোদ্ধাদের সাথে। তাঁর রক্তে ভেজা সেই পথ আজও সাক্ষ্য দেয় যে, এই মানচিত্রের লাল বৃত্তটি আসলে কোনো কৃত্রিম রঙ নয়, এটি ভাগীরথীর মতো বীরদের হৃদপিণ্ড নিংড়ানো তাজা রক্ত। তবে ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়। ইতিহাসের এই মহানায়িকার দুই পুত্র— গণেশ সাহা ও কার্তিক সাহা— আজও পিরোজপুরের এক জীর্ণ কুটিরে অবহেলা আর নিদারুণ অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। জাতীয় গণমাধ্যমের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, যে বীর জননী নিজের দেহকে দ্বিখণ্ডিত হতে দিয়েছিলেন এই মাটির জন্য, তাঁর উত্তরসূরিরা আজও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন। এই বৈপরীত্য সামষ্টিক স্মৃতির দৈন্য এবং রাষ্ট্রের ‘ন্যায়বিচার’ প্রদানের দীর্ঘসূত্রতাকেই উন্মোচিত করে। ভাগীরথী সাহা আজ এক জ্বলন্ত মশাল। তিনি প্রমাণ করে গিয়েছেন যে, প্রতিরোধ কেবল আধুনিক অস্ত্র দিয়ে হয় না, প্রতিরোধ হয় আত্মার অদম্য শক্তি দিয়ে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আজ সময় এসেছে ভাগীরথী সাহাকে কেবল একজন ‘বীরাঙ্গনা’ বা ‘শিকার’ হিসেবে নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে একজন ‘রণকৌশলী’ এবং ‘অকুতোভয় বীর’ হিসেবে পাঠ করার। তাঁর রক্তে রঞ্জিত পিরোজপুরের সেই ধুলিকণা আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয় যে— এই স্বাধীনতা কোনো দান নয়, এটি ভাগীরথীদের মতো লক্ষ প্রাণের মহাকাব্যিক মূল্যে কেনা এক সার্বভৌম সম্পদ।

ভাগীরথী সাহা তাই কোনো নিভৃত পল্লীর সাধারণ নাম নয়; তিনি বাংলাদেশের অস্তিত্বের এক অম্লান ও জীবন্ত মহাকাব্য। যে পিচঢালা পথে তাঁর শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, সেই পথ দিয়েই আজ হেঁটে চলেছে এক স্বাধীন জাতি। তাঁর এই অসামান্য ত্যাগ নিরন্তর স্মরণ করিয়ে দেয়— বাংলার এই মানচিত্র কোনো করুণার দান নয়, বরং তা ভাগীরথীদের মতো লক্ষ প্রাণের রক্ত আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এক অবিনাশী ও সার্বভৌম অধিকার।

তথ্যসূত্র:
১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (৮ম খণ্ড),
তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার (পৃষ্ঠা: ৫২৮-৫৩০)।
​২) প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক খালিদ আবু রচিত গ্রন্থ: পিরোজপুরের মুক্তিযুদ্ধ।
৩) ১৯৭১: গণহত্যা ও নির্যাতন, সম্পাদক: মুনতাসীর মামুন।
৪) দৈনিক আজাদ, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২’এর প্রতিবেদন: বাংলার বীর নারী ভাগীরথী।
​৫) ​দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৯ ডিসেম্বর ২০২১: স্বাধীনতার ৫০ বছর: কেমন আছেন ভাগীরথীর সন্তানেরা?
৬) ​বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ মার্চ ২০২৪: স্মৃতিতে ভাগীরথী, বাস্তবে চরম অবহেলা।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!