ইদানিং হরহামেশা শোনা যায়, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা। যারা বক্তব্য প্রকাশ করছেন, লিখছেন, মতপ্রকাশ করছেন, তারজন্য সকলকে সাধুবাদ জানাই। যেসব ভাবনার কথাবার্তা শোনা যায়, লেখায় দেখতে পাই, তা-সব অন্তঃসারশূন্য বলে মনে হয়েছে। বিপ্লব নামক শব্দটার ভেতর থেকে অমিত তেজস্বিতা জ্বলে ওঠে। কেতাদূরস্তরা, বিশেষ কিছু অকাল কুষ্মান্ড ব্যক্তি সুশীলরা সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে উদ্ভট ভাবনায় অজ্ঞানতার পরিচয় দিচ্ছেন।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রথম প্রস্তাব ও বিশ্লেষণ করেন সমাজতান্ত্রিক নেতা ভ. ই. লেনিন। তবে চীনে ‘মহান প্রলেতারীয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ নামে কথিত রাজনৈতিক অভিযান রীতিমতো ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি করে। মাও-পন্থীরা সাংস্কৃতিক পলিসির নামে যেসব উদ্ভট প্রস্তাব ও ধারনাপত্র তৈরি করে, তারসাথে লেনিন প্রণীত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সামঞ্জস্য পাওয়া যায় না। মাওপন্থীরা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জন্য বালজাক, শেক্সপীয়ার, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, মৎসার্ট, চাইকোভস্কির প্রমুখ বিখ্যাত লেখকদের রচনাকে জমিদার ও বুর্জোয়াদের নষ্ট হয়ে যাওয়া ‘সংস্কৃতির ক্ষতিকর ফল’ বলেছেন। এমনকি, ‘জনগণের গলা থেকে সংস্কৃতির শেকল ছিঁড়ে ফেল’, ‘তথাকথিত প্রণালীবদ্ধ জ্ঞান’ ইত্যাদি ভাবধারার সরল যুক্তি তুলে ধরেছেন। যার ফলে বহুবিধ মূল্যবোধ, বৈচিত্র্যের সংস্কৃতি চর্চা থেকে জনগণ ও মেহনতিদের উপর বাধ্যতামূলক বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়। এমন রাজনৈতিক নির্দেশনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমালোচনা হতে থাকে। সমাজতন্ত্র অতীতের সংস্কৃতিকে বর্জন করে– এইরকম ভাবনার প্রতিফলন মাওবাদীরা চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও মাওবাদীরা বলে থাকেন, তারা লেনিনের ভাবধারার আলোকে সাংস্কৃতিক বিপ্লব কর্মসূচি নিয়েছেন।
আমরা কি দেখতে পাই! লেনিন বলেন, ” সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের জন্য দরকার বিজ্ঞান, টেকনিক এবং সাধারণভাবে পুঁজিবাদী রাশিয়া রেখে গেছে তা সবই পুরোপুরি ব্যবহার করা। …”প্রত্যেক জাতীয় সংস্কৃতির মধ্যেই গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির উপাদান বর্তমান, তা সে বিকশিত অবস্থায় না থাকলেও; কেননা প্রত্যেক জাতির মধ্যেই আছে মেহনতি ও শোষিত জনগণ, তাদের জীবনধারণের পরিস্থিতি থেকে অনিবার্যভাবেই সৃষ্টি হয় গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রত্যেক জাতির মধ্যে একটা বুর্জোয়া সংস্কৃতিও আছে, তাও শুধু উপাদানরূপে নয়, আছে অধিপতি সংস্কৃতি রূপে। সুতরাং সাধারণত ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ হল জমিদার, যাজক ও বুর্জোয়াদের সংস্কৃতি। … বুর্জোয়ার সমগ্র স্বার্থই হল শ্রেণী-বহির্ভূত জাতীয় সংস্কৃতিতে বিশ্বাস প্রচার করা।”
লেনিন আরো বলেন– ”গণতন্ত্রের ও বিশ্বশ্রমিক আন্দোলনের আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির ধ্বনি সামনে রাখার সময় আমরা প্রত্যেকটি জাতীয় সংস্কৃতি থেকে নিই শুধু তার গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক উপাদান, তা নিই কেবল ও নিঃসন্দেহেই প্রতিটা জাতির বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিপরীতে।” (সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব –লেনিন)
এই ভাবধারায় অতীতকে অগ্রাহ্য করা হয়নি, বরং অতীতের সুকৃতিগুলোকে সংরক্ষণ ও প্রচার করা হয়। গবেষক ন. জলোবিন তাঁর ‘ সত্যকার সাংস্কৃতিক বিপ্লব কি জিনিস?’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, সোভিয়েত থিয়েটারে শেক্সপীয়ারের নাটক ইংলন্ড ও স্পেনের থেকে বেশি মঞ্চস্থ হয়েছে। “ইউনেস্কোর তথ্য অনুসারে, অনুবাদ সাহিত্য সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশিত হয় ইংলন্ডের থেকে নয় গুণ, জাপানের চেয়ে সাড়ে চার গুণ, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে চারগুণ বেশি। কেবল ১৯৭৩ সালেই মোট ৫ কোটি ৩০ লক্ষ কপিতে প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ৯০০টি বিদেশী বই। যেমন স্বদেশের তেমনি বিদেশের অতীত শিল্পকর্মের জ্ঞান, বিশ্ব সংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় সাধারণ শিক্ষার কর্মসূচিতে নিবদ্ধ করা হয় এখানে, অর্থাৎ বিনা ব্যতিক্রমে এখন তা সমস্ত লোকের পক্ষে কার্যত বাধ্যতামূলক। অতীতের সংস্কৃতি ঠিক সমাজতান্ত্রিক সমাজেই লাভ করে একটা সত্যকার নবজীবন, কেননা শক্তি তার বহুবর্ধিত হয়ে ওঠে কোটি কোটি লোকের উপলব্ধি আবেগ, মনন ও কর্মে।”
সাংস্কৃতিক বিপ্লব অতীতের সাথে মেলবন্ধন করে মেহনতি জনগণের বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহাসিক বিশাল সৃজনশীল সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। মনে রাখতে হবে, সাংস্কৃতিক বিপ্লব সমাজতন্ত্রের আদর্শের সাথে সম্পর্কিত নতুন সমাজ নির্মাণের জন্য বিকশিত পথ। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে দরকার, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, প্রচুর গ্রন্থ প্রকাশনার ব্যবস্থা, পাঠাগার ও জাদুঘর গড়ে তোলা। যার মাধ্যমে পশ্চাৎপদতা দূর করা যায়। পুঁজিবাদী ভাবধারা কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিধায় তা অবধারিত পশ্চাৎপদতা তুলে ধরে। তবে দীর্ঘ বছর ধরে শিল্প, বিজ্ঞানের যেসব টেকনিক, কৌশল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল মালিক শ্রমজীবী মেহনতি জনগণ।’ কমিউনিস্টরা মনে করে, সর্বদা জনগণই হলো ইতিহাসের নির্ধারক শক্তি, কেননা অপরিসীম জনপুঞ্জের আকাঙ্ক্ষাও ক্রিয়াকলাপের ফলই হলো ইতিহাস। … ‘গড়ব মোরা নিজেদের নতুন জগৎ…’ বলা হয়েছে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সঙ্গীতে।” (ন. জলোবিন)
সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে বাংলাদেশের কিছু পণ্ডিত মুখরোচক ফাঁপা বুলি আওড়াতে থাকে। কিছু কমিউনিস্টপন্থীরাও ভ্রান্তির পথে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে পারি, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতাদর্শ বৃহৎ জনগোষ্ঠি মেহনতি মানুষের সৃজনী শক্তির বিকাশকে বোঝায়। মানবজাতির ঐতিহাসিক নবসমাজের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও টেকনিকের অসীম বিকাশের ‘সামাজিক রূপ’। সেজন্য পূঁজিবাদ ও প্রাক পুঁজিবাদের সব উপাদান, সংস্কৃতির উত্তরাধিকারকে কাজে লাগিয়ে প্রলেতারিয়েতরা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। এই নিরন্তর নির্মাণে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সংঘর্ষ সংগ্রাম অবধারিতভাবে হবে। দোদুল্যমানতায় মধ্যবিত্ত, পেটি বুর্জোয়ারা অসংলগ্ন তত্ত্ব তথ্যে সমাজতন্ত্রকে ভুল পথে পরিচালিত করবার প্রচেষ্টা করবে। ধনবাদী বুর্জোয়ারা মরিয়া হয়ে উঠবে সমাজতন্ত্রকে রূখতে, প্রয়োজনে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে মেহনতি জনগণকে বিভ্রান্তির দিকে ধাবিত করবে। যুদ্ধ সংঘাত সৃষ্টি করে শ্রমজীবীদের মূলশক্তিকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। সাম্রাজ্যবাদের নির্মম পাশবিকতার বিরূদ্ধে মেহনতিরা ঐক্যবদ্ধ হবে, শ্রমজীবীর সংস্কৃতি, তাদের অর্থনৈতিক সংগ্রাম অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।
সাংস্কৃতিক বিপ্লব কোনোভাবেই পশ্চাৎপদ ভাবধারা নয়। বলা হয়ে থাকে, ”কমিউনিজমের পথে সমাজ বিকাশের অন্যতম একটি সাধারণ নিয়ম।” (প্রাগুক্ত) লেনিন বলেন, “পুঁজিবাদী সমাজ, জমিদারী সমাজ, আমলাতন্ত্রী সমাজের জোয়ালের নিচে মানবজাতির যে জ্ঞানভাণ্ডার জমিয়েছে, প্রলেতারীয় সংস্কৃতি হতে হবে তারই সুনিয়মিত বিকাশ। মার্কসের হাতে ঢেলে সাজা অর্থশাস্ত্র যেমন আমাদের দেখিয়েছে, মানবসমাজকে কোথায় যেতে হবে, অঙ্গুলি নির্দেশ করেছে শ্রেণী-সংগ্রামে উত্তরণে, প্রলেতারীয় বিপ্লব শুরুর দিকে, ঠিক তেমনিভাবেই এই সমস্ত পথ ও রাস্তা পৌঁছিয়েছে, পৌঁছয় ও পৌঁছচ্ছে প্রলেতারীয় সংস্কৃতিতে।” (প্রাগুক্ত)
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল প্রতিপাদ্য বোঝার মাধ্যমে অগণিত মেহনতি, তরুণ শিক্ষার্থীদের, সাধারণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। সংগ্রামের মূল লক্ষ্য পুঁজিপতিদের উচ্ছেদ, পুঁজিপতি শ্রেণীর বিলোপ। আর শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে প্রলেতারীয় স্বার্থকে প্রধান করে গড়ে তোলা।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি অধ্যায়ের সফল সূচনা হয়েছে। আর এখন প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের নীতিমালায় ঘোষিত গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ। এই মূলকথা প্রকাশ্যে জোরেসোরে উচ্চারিত করার সময় হয়েছে। বাক্যবাগীশ, সাম্রাজ্যবাদী দোসরদের সংস্কারের ফাঁপা বুলি-তত্ত্ব শোষকদের টিকিয়ে রাখে। দেশকে পরনির্ভরশীল উপনিবেশে পরিণত করে। আর শোষকরাই ধর্মবাদীদের দিয়ে অসার আষাঢ়ে গল্প বলাতে থাকে। জনগণের ঐক্যকে ধূলিস্যাৎ করে দেয়। এমনকি বামপন্থী কথিত প্রগতিশীলরা ধনবাদী রাষ্ট্রের ক্রীড়ানকে পরিণত হয়। বেসরকারি কিছু সাহায্য সংস্থা বণিক বেনিয়াদের মতো ব্যবসা বাণিজ্য কুক্ষিগত করে, উন্নয়নের জিকির করে। এমন প্রতিষ্ঠানের কথা-তো সকলেই জানেন। তাহলে এইসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগী দোসরদের বিরূদ্ধে শ্রমজীবীরা নিরন্তর সংগ্রাম করবে। শ্রমজীবীর জাগরণ হলেই সমাজতন্ত্রের উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিপূরক ও সহায়ক হবেই।#




