আমার চোখে বাবা, চিত্ত হালদার 

শৈশবের অনেক স্মৃতিই আজ সময়ের কুয়াশায় আচ্ছন্ন, কিছু মানুষের মুখগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। তবু কিছু দৃশ্য এখনও আশ্চর্য স্বচ্ছতায় ফিরে ফিরে আসে। বাবাকে (চিত্ত হালদারকে) মনে পড়লে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কখনও বাবা গভীর মনোযোগে রঙ দিয়ে ছবি আঁকছেন, কখনও কাঠের ওপর ছেনি চালাচ্ছেন, কখনও বই খুলে নিবিষ্ট মনে পড়ছেন, কখনও সন্ধ্যায় তাঁর হাতে বেহালা কিংবা বাঁশি। তখন বুঝিনি এগুলো একজন শিল্পীর দৈনন্দিন কাজ নয়, তাঁর জীবনযাপনেরই স্বাভাবিক ভাষা। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন কাজে ডুবে থাকা মানুষ। তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না। কিন্তু তাঁর কাজ যেন নীরবে কথা বলতো। কাজের সঙ্গেই তার বেশি কথা হতো।

ছোটবেলায় বাবাকে আমি শিল্পী হিসেবে চিনিনি। তিনি ছিলেন আমার বাবা। তাঁর পরিচয়ের মধ্যে শিল্প, সাহিত্য, ভাস্কর্য কিংবা মুক্তিযুদ্ধের কোনো আলাদা তাৎপর্য তখন আমার কাছে ছিল না। বড় হওয়ার পর পরিবারের লোকদের মুখে শোনা, সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণ, পুরোনো সংবাদপত্র, আলোকচিত্র, শিল্পকর্ম, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা তথ্য একসময় তাকে আমার কাছে নতুনভাবে ফিরিয়ে দিয়েছে। এই ফিরে পাওয়া কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটি ছিল দীর্ঘ অনুসন্ধানের পথ। একটি তথ্য আরেকটি তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, একটি স্মৃতি আরেকটি স্মৃতিকে ডেকে এনেছে। ধীরে ধীরে আমার সামনে গড়ে উঠেছে এমন একজন মানুষের প্রতিকৃতি, যাঁকে আমি ছোটবেলায় পুরোপুরি চিনে উঠতে পারিনি। এই যাত্রায় আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে একটি বিষয়। যাঁদের সঙ্গে বাবার কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না, তাঁরাও তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। যারা তাঁর সহকর্মী-বন্ধু ছিলেন, যারা তাঁর কাছে ছবি আঁকা শিখেছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন কিংবা দীর্ঘদিন তাঁর সান্নিধ্যে ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের স্মৃতিতে একই মানুষটি বারবার বিভিন্ন রূপে উঠে এসেছে। কোথাও তাদের ভাষা ভিন্ন, কোথাও ঘটনার বর্ণনা আলাদা–কিন্তু মানুষটি এক। তাদের লেখায় বাবার বৈচিত্র্যময় দিকগুলো উঠে এসেছে। যেমন তিনি ছিলেন একজন অনুসন্ধিৎসু শিল্পী, অন্য দিকে নিরলস পাঠক, উদার শিক্ষক ও নীরব মুক্তিযোদ্ধাও। ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতির ভেতর দিয়ে একই মানুষকে ফিরে আসতে দেখে আমার মনে হয়েছে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর রেখে যাওয়া প্রভাবেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমি তাঁকে দেখেছি পরিবারের ভেতর থেকে, আর তাঁর সমসাময়িকরা দেখেছেন কর্মক্ষেত্রে, শিল্পচর্চায়, বন্ধুত্বে ও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। দু’টি অভিজ্ঞতা যখন একে অন্যকে সমর্থন করে, তখন একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই অনুভূতিই আমাকে বারবার বাবার জীবনের দিকে তাকাতে শিখিয়েছে। এভাবে বাবাকে ঘিরে আমি একটি নতুন জগত খুঁজে পেয়েছি।

বাবার মৃত্যুর সময় আমার বয়স ছিল মাত্র কয়েক বছর। তাই তাঁকে জানার চেয়ে না-জানার অংশই ছিল বেশি। প্রথমে মনে হতো, আমি যেন একজন শিল্পীকে খুঁজছি। পরে বুঝেছি, আমি আসলে একজন মানুষকে খুঁজছি। অন্যদের স্মৃতিগুলো একসময় যেন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিকৃতিতে মিলিত হয়েছে। আজ বাবাকে মনে করলে তাঁর কোনো একটি শিল্পকর্ম নয়, একটি জীবনযাপন ভেসে ওঠে। সেই জীবনকে বুঝতে গিয়েই আমি বাবাকে নতুন করে বারবার পাচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সেই শূন্যতা পূরণ হয়েছে ধীরে ধীরে।

যতই তাঁকে জানার চেষ্টা করেছি, ততই বুঝেছি তিনি নিজেকে কখনো একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শিল্পী পরিচয় ছিল তাঁর সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিচয়, কিন্তু তার ভেতরে বাস করতো এক অদম্য কৌতূহলী মানুষ। নতুন কিছু শেখার আকাঙ্ক্ষা যেন তাঁকে সারাজীবন চালিত করেছে। আমাদের বাড়িতে শিল্প আলাদা কোনো বিষয় ছিল না, ছিল সংসারেরই একটি অংশ। শিল্প ছিল তাঁর চিন্তার জগৎ, শেখার জগৎ ও মানুষকে জানার এক অনবরত প্রক্রিয়া। তাই তাঁর কাজের পরিধি যেমন বিস্তৃত ছিল, তেমনি বিস্তৃত ছিল জানার আগ্রহও। তিনি একদিকে ছবি এঁকেছেন, অন্যদিকে কাঠখোদাই করেছেন, প্লাস্টার অব প্যারিসে ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন, সাইনবোর্ড এঁকেছেন, নকশা তৈরি করেছেন, আবার প্রয়োজন হলে সম্পূর্ণ নতুন কোনো কারুশিল্পও শিখে নিয়েছেন। একটি মাধ্যম আয়ত্ত করার পর তিনি আরেকটি মাধ্যমে নিজেকে পরীক্ষা করেছেন। তাঁর কাছে শিল্পের যাত্রা কোনো স্থির গন্তব্যে ছিল না, ছিল নিরন্তর অনুসন্ধানের পথ। সেই শৈল্পিক পরিবেশে বড় হতে হতে শিল্পকে কখনো অস্বাভাবিক কিছু বলে আমার মনে হয়নি। অনেক পরে বুঝেছি, সেই পরিবেশই ছিল আমার বড় হয়ে ওঠার এক অনন্য বিদ্যালয়।

এই অনুসন্ধিৎসারই আরেকটি প্রকাশ ছিল তাঁর পাঠাভ্যাস। আমাদের বাড়িতে দেয়ালে খাঁজকাটা বড় দু’টি বুকশেলফ ছিল। শিল্প, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের বইয়ের সংগ্রহে ভরা সেই তাকগুলো ছিল আমাদের সংসারের নীরব সদস্য। সে সময় বাংলায় শিল্পকলা, দর্শন, ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞানবিষয়ক বই তুলনামূলক কম থাকায় ইংরেজি বইয়ের সংখ্যাই ছিল বেশি। মা, মাসি-পিসি ও অন্যান্যরা পড়তেন বাংলা সাহিত্য, উপন্যাস ও রাশিয়ার বিভিন্ন সাময়িকী। ছোটবেলায় বইগুলোর বিষয়বস্তু বুঝতাম না—কিন্তু বুঝতাম বই আমাদের পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সেসব স্মৃতি এখনও অমলিন। পরে সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণ পড়ে জেনেছি, কর্মব্যস্ত দিনের মধ্যেও তিনি নিয়মিত বই পড়তেন। বাবা শুধু নিজে পড়তেন না, অন্যদেরও পড়তে উৎসাহিত করতেন। বই ধার দিতেন, পড়া শেষে আলোচনা করতেন, কোথাও বুঝতে অসুবিধা হলে ধৈর্য নিয়ে ব্যাখ্যা করতেন। ঘরের ভেতরে তিনি যেমন বন্ধুসুলভ ছিলেন, বাইরের মানুষের সঙ্গেও তেমন ছিলেন। তারাও তাকে প্রায় একইভাবে চিনেছেন। তিনি শুধু নিজে জ্ঞান অর্জন করেননি, জ্ঞান ভাগ করে নেওয়াকেও নিজের জীবনচর্চার আনন্দ করে তুলেছিলেন।

তিনি অনুকরণে সন্তুষ্ট থাকতেন না। কোনো কাজ শুরু করার আগে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করতেন, নকশা করতেন, উপকরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নতুন কিছু করার আগ্রহই তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শিল্প তাঁর কাছে শেষ পর্যন্ত কোনো দক্ষতার প্রদর্শন ছিল না, ছিল নিরন্তর শেখার একটি পথ। এই মনোভাব শিল্পচর্চাতেও সমানভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর কাছে শিখতে আসা এনায়েত হোসেন মিলন, হেলাল উদ্দিন, সৈয়দ ওয়াহিদুজ্জামান কচি, হাসি চক্রবর্তী ও নারায়ণ চন্দ্র দাম সহ অনেকেই কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই ছবি আঁকা ও কারুশিল্পের প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছেন। তিনি কৌশল দেখিয়ে দিতেন, ভুল ধরিয়ে দিতেন, উৎসাহও দিতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ শিল্পকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, কেউ করেননি। কিন্তু অনেকের স্মৃতিতেই তিনি থেকে গেছেন শিল্পের একজন ধৈর্যশীল শিক্ষক হিসেবে। শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতেও সেই উদারতার পরিচয় মেলে।

এই উদারতার আরেকটি প্রকাশ ছিল ‘চিত্রালী’। বরিশাল শহরের কালীবাড়ি রোডে আবদুল মান্নাফ খানের কাছ থেকে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে বাবা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। ধীরে ধীরে ‘চিত্রালী’ বরিশালের শিল্পচর্চার একটি পরিচিত ঠিকানায় পরিণত হয়। ব্যক্তিগত কর্মশালার গণ্ডি ছাড়িয়ে সেখানে শিল্পচর্চায় আগ্রহী মানুষের আসা-যাওয়া ছিল নিয়মিত। কেউ ছবি আঁকতে শিখতে আসতেন, কেউ মতবিনিময় করতেন, কেউ আবার শিল্প নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় মেতে উঠতেন। শিল্পকে তিনি কখনো একক সম্পদ বলে ভাবেননি।

আজ বাবার জীবনকে ফিরে দেখলে মনে হয়, তাঁর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি হয়তো কোনো একক ছবি বা ভাস্কর্য নয়; তিনি যাঁদের হাতে প্রথম ছবি আঁকার রঙতুলি তুলে দিয়েছিলেন, যাঁদের বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যাঁদের পাশে নীরবে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের জীবনেও তাঁর সৃষ্টির একটি অংশ ছড়িয়ে আছে। একজন শিল্পীর উত্তরাধিকার শুধু তাঁর শিল্পকর্মে নয়, তাঁর স্পর্শে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা মানুষদের মধ্যেও বেঁচে থাকে।

বাবার সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণ পড়তে গিয়ে একটি বিষয় আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। তাঁরা যখন তাঁর মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার কথা বলেছেন, তখন সেটিকে কখনোই তাঁর জীবনের বিচ্ছিন্ন কোনো অধ্যায় হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তাদের স্মৃতিচারণে, শিল্পী, কারুশিল্পী, পাঠক ও মুক্তিযোদ্ধা–এই পরিচয়গুলো একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। বাবা প্রায়ই বলতেন, ”দেশ হচ্ছে মা। মায়ের জন্য জীবন উৎসর্গ করা সন্তানের কর্তব্য।” তাঁর মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার কথা জানতে গিয়ে বারবার সেই কথাগুলোই মনে পড়ে।

শিল্পচর্চার কারণে তাঁর হাত ছিল দক্ষ, আর নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনার কারণে তার নতুন কিছু জানার আগ্রহ ছিল। তার এই দুই অভিজ্ঞতাই ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে এগিয়ে দিয়েছিল। প্রথমে বাড়িতে ও তার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘চিত্রালী’তে যুদ্ধসরঞ্জাম তৈরি করতে শুরু করেন। পরে ‘ধর্মরক্ষিণী’তে যুদ্রাস্ত্র তৈরি করেন। সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণে তার বোমা, হ্যান্ডগ্রেনেড ও মারণাস্ত্র তৈরির কথা এসেছে। এ কাজে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নতুন কৌশল আয়ত্ত করার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে পরবর্তীতে নিজের মুখে তিনি খুব কমই বলতেন। নিজের অবদান প্রচার করার কোনো আগ্রহ তাঁর ছিল না। সম্ভবত সে কারণেই তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অনেক অবদান বহু বছর অপ্রচারিত থেকে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধ তাঁর ব্যক্তিজীবনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে বাড়ি ও কর্মস্থলের ক্ষতি হয়। নষ্ট হয়ে যায় বহু শিল্পকর্ম, হারিয়ে যায় দীর্ঘদিনের শ্রমের ফসল। স্বাধীনতার পরে তিনি আবার নতুন করে কাজ শুরু করেন। হারিয়ে যাওয়া কাজের শোক তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।

বাবার মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারের সামনে তাঁর অনুপস্থিতির বেদনার পাশাপাশি আরেকটি কঠিন বাস্তবতা এসে দাঁড়ায়। তিনি রেখে গিয়েছিলেন অসংখ্য ছবি, ভাস্কর্য, নকশা, আলোকচিত্র, বই ও কাজের উপকরণ। কিন্তু একটি শিল্পকর্ম দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, নিয়মিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণবিষয়ক জ্ঞান। সে সময় আমাদের পরিবারের পক্ষে সেই ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না।

তখন সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের ওপর। বাবা রেখে গিয়েছিলেন শিল্পকর্ম, ছাঁচ ও একটি অসমাপ্ত শিল্পভুবন। মা নিজে শিল্পী ছিলেন না। শিল্পী হওয়ার কথাও কোনো দিন ভাবেননি। তবু স্বামীর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেই অচেনা পথই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। স্বামীর শিল্পকর্ম ও স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার সংকল্প থেকেই তিনি রংতুলি হাতে নেন এবং সেই অচেনা শিল্পভুবনকেই নিজের কর্মজীবনের পথ হিসেবে গ্রহণ করেন। বাবার তৈরি ছাঁচ ব্যবহার করে বিভিন্ন মডেল নির্মাণ করতেন। ১৯৮১ সালে বরিশালের জাহানারা হলে অনুষ্ঠিত তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনী উপলক্ষে সংবাদপত্রে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,“আমি শিল্পী নই। স্বামীর শিল্পকর্মকে বাঁচিয়ে রাখতে রংতুলি হাতে নিয়েছি।” সেই বক্তব্য আজও আমার কাছে তাঁর জীবনসংগ্রামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য।

তবু সময়ের ক্ষয় থেমে থাকেনি। অনেক শিল্পকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিছু হারিয়ে গেছে, কিছু স্থানান্তরের সময় নষ্ট হয়েছে, আবার কিছু শিল্পকর্মের বর্তমান অবস্থানও আর জানা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়িতে ও ‘চিত্রালী’তে যে লুটপাট ও ক্ষতি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই ক্ষয় আরও বেড়েছে। কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ছবি বা ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়ালে আমার মনে হয়েছে, আমি যেন বাবার জীবনেরই একটি অংশ ক্ষয়ে যেতে দেখছি। সে সময় অনেক ক্ষেত্রেই অসহায়ভাবে দেখা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার ছিল না।

বহু বছর পরে আমি বাবার জীবন ও কাজ নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করি। কোন্ শিল্পকর্ম কখন নির্মিত হয়েছিল, কী উপকরণে তৈরি, তার বিষয় কী এবং বর্তমানে কোথায় আছে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। তবু প্রতিটি আলোকচিত্র, প্রতিটি নথি ও প্রতিটি স্মৃতিচারণ আমার কাছে মূল্যবান দলিলে পরিণত হয়েছে।

বাবার আঁকা ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ ছবিটির একটি অংশ ২০১৬ সালে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। দীর্ঘদিনের অযত্ন ও প্রতিকূল পরিবেশে ছবিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবু অবশিষ্ট অংশটুকুর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, সময় সবকিছু মুছে ফেলতে পারেনি। ক্ষতচিহ্নের মধ্যেও রয়ে গেছে বাবার হাতের স্পর্শ, তাঁর রঙের ব্যবহার এবং একটি হারিয়ে যাওয়া সময়ের উপস্থিতি। সেই মুহূর্তটি আমার কাছে শুধু একটি শিল্পকর্ম উদ্ধার নয়, বাবাকে নতুন করে ফিরে পাওয়ারও এক বিরল অভিজ্ঞতাও।

তাঁর কিছু শিল্পকর্মের অবস্থান এখনও অজানা। ‘মহামায়া’র অনুলিপিগুলো দেশের বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সেগুলো এখন কোথায় আছে, তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। আরও অনেক ছবি ও ভাস্কর্যের নাম বিভিন্ন স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়, অথচ তাদের কোনো আলোকচিত্র বা বর্তমান অবস্থানের তথ্য নেই। এই অনুপস্থিতিগুলো তাঁর শিল্পীজীবনের ইতিহাসকে এখনও অসম্পূর্ণ করে রেখেছে।

বাবার অবশিষ্ট শিল্পকর্মগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ এখন আমার কাছে একটি ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। ভবিষ্যতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো কোনো উপযুক্ত সংগ্রহশালা বা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে, যাতে সেগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হয় এবং আগ্রহী মানুষ সেগুলো দেখার সুযোগ পান।

আমি জানি, বাবার সব শিল্পকর্ম আর উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। হারিয়ে যাওয়া অনেক কাজ হয়তো নাম ও স্মৃতির মধ্যেই থেকে যাবে। তবু যা এখনও অবশিষ্ট আছে, তা সংরক্ষণ করা এবং যা হারিয়েছে, তার যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তা নথিবদ্ধ করা জরুরি। এই প্রচেষ্টা একজন সন্তানের ব্যক্তিগত দায়িত্বের পাশাপাশি একজন শিল্পীর সৃষ্টিজীবনকে বিস্মৃতির হাত থেকে যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনার একটি নিরন্তর চেষ্টা। তিনি আমার বাবা, এটি আমার ব্যক্তিগত পরিচয়। কিন্তু তাঁর শিল্প, মানবিকতা, জ্ঞানপিপাসা ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ তাঁকে বৃহত্তর পরিসরের একজন মানুষে পরিণত করেছে।

সব মানুষ একদিন চলে যান। কিন্তু কেউ কেউ তাঁদের কাজ, স্মৃতি ও স্পর্শ রেখে যান পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। বাবাও তেমনই একজন মানুষ। তাঁকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার এই যাত্রা তাই শেষ হয়ে যায়নি। যতদিন তাঁর কোনো শিল্পকর্ম, কোনো স্মৃতি, কোনো নথি কিংবা কোনো মানুষের মুখে উচ্চারিত একটি স্মরণবাক্য বেঁচে থাকবে, ততদিন তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার পথও খোলা থাকবে।#

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!