গতকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় “বাংলাদেশ সনদ” নামে একটি ক্যাম্পেইন লক্ষ্য করছি। ইতোমধ্যে কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে স্বাক্ষর করার জন্য ইনবক্সে লিঙ্ক পাঠিয়েছেন। কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের পথে জনতার অঙ্গীকার সনদ-এ বলা হয়েছে, দলমত নির্বিশেষে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে আটটি অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং নাগরিকদের ডিজিটাল স্বাক্ষরের আহ্বান জানানো হচ্ছে। মনোযোগ দিয়ে পড়ার পরে ভাবছি, বাংলাদেশের ৭২ সালের সংবিধান কি বাঁচবে? বাংলাদেশ চার্টারের এই ক্যাম্পেইনটি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে একটি সামাজিক উদ্যোগ মনে হলেও, এর সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলো অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
“বাংলাদেশ সনদ”-এর আটটি মূল অঙ্গীকার হলো গণহত্যার স্মৃতি, জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার, ন্যায়পরায়ণতা, গণতন্ত্র, এবং শিক্ষালাভ ও প্রজন্মান্তরে শিক্ষা। এগুলোকে সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হলেও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে মূল বিষয়ে কিছু অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, সংবিধানের চারটি মৌলিক নীতির মধ্যে অন্যতম সমাজতন্ত্র বাংলাদেশ সনদে উপস্থিত নেই। সংবিধান অনুযায়ী সমাজতন্ত্র শব্দটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হিসেবে অপরিহার্য। ‘সমাজতন্ত্র’কে বাদ দেওয়ায় সনদকে স্বীকৃত সংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার বিষয়ক ব্যাখ্যা সংবিধানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংবিধানে স্বাধীনতা আন্দোলনকে মূলত স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে দেখানো হয়েছে, যেখানে মানবাধিকার একটি ফলস্বরূপ অর্জিত মূল্য। কিন্তু নতুন সনদে এটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ইতিহাস এবং সংবিধানের উদ্দেশ্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে।
তৃতীয়ত, যেখানে সংবিধান সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ শব্দ ব্যবহার করেছে, সেখানে সনদে “গণহত্যার স্মৃতি” শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এই বিষয়টিও ঐতিহাসিক স্পষ্টতাকে অস্পষ্ট করে এবং বিভ্রান্তিকরও বটে। গণহত্যার স্মৃতি বহুমাত্রিক অর্থ ধারণ করতে পারে এবং সম্ভবত ১৯৭১ সালের ঘটনা ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় নিহতদের ঘটনাকেও একত্রিত করার প্রচেষ্টা প্রকাশ করে।
অন্য সব অঙ্গীকার যেমন জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, গণতন্ত্র এবং শিক্ষালাভ সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সমাজতন্ত্র শব্দটি বাদ দেওয়ায় এবং ইতিহাসের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত অসঙ্গতি, এই নতুন সনদকে সংবিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতীয়মান হয়। সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি অপরিবর্তনীয় মৌলিক নীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই শব্দটি অর্থনৈতিক কাঠামো নির্দেশের পাশাপাশি একটি শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী এবং গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্দেশ করে। তাই সনদে সমাজতন্ত্র বাদ থাকা এক বড় বৈষম্য এবং সাংঘর্ষিক বিষয়।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাম্প্রদায়িকতা বিলোপ করতে হবে, রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে মর্যাদা দান করবে না, ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং ধর্ম পালনকারী নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোনো বৈষম্য বা নির্যাতন করা যাবে না। তবে “বাংলাদেশ সনদ”-এর ব্যাখ্যা এই বিষয়গুলোর যথাযথ প্রতিফলন ঘটাচ্ছে কিনা সন্দেহজনক।
এই ক্যাম্পেইনের পেছনে কারা রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী, এবং “বাংলাদেশ সনদ” নাম ব্যবহার করার বৈধতা কতটুকু, এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। এই কারণে উদ্যোগটি অনেকের কাছে অস্পষ্ট এবং সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।
সংবিধানই বাংলাদেশের জনগণের প্রকৃত এবং একমাত্র সনদ। এর বাইরে কোনো নতুন সনদ যদি সংবিধানের মূলনীতি এবং অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তা গ্রহণযোগ্য নয়। সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তে গণহত্যার স্মৃতি লেখা, মানবাধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার অস্পষ্ট ব্যাখ্যা সহ একাধিক কারণে এই সনদে স্বাক্ষর দেওয়া অনুচিত বলে মনে করি। নাগরিকরা অবশ্যই যেকোনো উদ্যোগকে সমর্থন বা অসমর্থন করার স্বাধীনতা রাখে, তবে সচেতনভাবে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই শ্রেয়।
জয় বাংলা।




