১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ যাঁরা নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের সকলের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটিতে যখন আগুন জ্বলছিল, তখন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অস্বস্তিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। যে বাড়িটি একসময় ছিল মুক্তিযুদ্ধের আঁতুড়ঘর, বাঙালির স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার দীর্ঘ অভিযাত্রার ইতিহাস যে বাড়ির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে, সেই বাড়িটিই আবার আক্রান্ত হলো। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই বাড়িতেই তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে একই বাড়ি আবার ভাঙচুর হলো, লুট হলো, আগুনে পুড়ল। ধ্বংস সেখানেও থামেনি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর পোড়া বাড়িটির অবশিষ্টাংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একই ঘটনা নয়। দুই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, চরিত্র ও প্রেক্ষাপট আলাদা। তবু ইতিহাসের বিচারে তাদের পাশাপাশি রাখার গভীর কারণ আছে। ১৯৭৫ সালে ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছিল। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর ধ্বংসের লক্ষ্য হয়েছে তাঁর স্মৃতি ও ইতিহাসে তাঁর উপস্থিতির দৃশ্যমান চিহ্নগুলো। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে শুধু একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পরিণতি হিসেবে দেখলে সে ভয়াবহ ঘটনার নৃশংসতার পূর্ণ অর্থ ধরা পড়ে না। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব, সন্তান ও পুত্রবধূদের। দশ বছরের শিশু শেখ রাসেলও রেহাই পায়নি। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য একটি শিশুকে হত্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। একটি পরিবারের প্রায় সবাইকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে ক্ষমতা পরিবর্তনের চেয়েও গভীর এক অভিপ্রায় দেখা যায়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ দিয়ে হত্যাকারীদের বিচারের পথ বন্ধ করা হয়েছিল। তৈরি হয়েছিল বিচারহীনতার আইনি ভিত্তি। কিন্তু একজন মানুষকে হত্যা করা যায় একবার, আর ইতিহাস থেকে তাঁকে মুছে ফেলার আয়োজন চলে দীর্ঘকাল। মানুষকে হত্যা করতে অস্ত্রই যথেষ্ট। ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে প্রয়োজন ভিন্ন বয়ান, প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের সামনে অতীতের অন্য এক ছবি নির্মাণ করা। যে মানুষটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি হয়ে উঠেছিলেন, তাঁকে হত্যা করেই তাই শেষ করা যায়নি। তাঁর হত্যার বিচার রুদ্ধ করার পর শুরু হয়েছে ইতিহাসে তাঁর অবস্থান মুছে ফেলার দীর্ঘ লড়াই।
বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার সবচেয়ে বড় বাধা ১৯৭১। তাঁকে সরাতে গেলেই সামনে এসে দাঁড়ায় ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির গণরায়, ৭ মার্চের ভাষণ এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব। তবে মুক্তিযুদ্ধ শুধু বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস নয়। নয় মাস তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। সেই সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব, মুক্তিযোদ্ধা, বিদ্রোহী বাঙালি সেনাসদস্য, ইপিআর, পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের রক্ত ও আত্মত্যাগে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। এই ইতিহাসে প্রত্যেককে তাঁর প্রাপ্য জায়গায় রেখেই বঙ্গবন্ধুর অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। কাউকে বড় করতে অন্য কাউকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে মুছতে গিয়ে যদি একাত্তরের ইতিহাসকেই নতুন করে লিখতে হয়, তখন লড়াই আর একজন মানুষকে ঘিরে থাকে না। সেই লড়াই গিয়ে পৌঁছায় বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে।
আর ঠিক এই জায়গা থেকেই ২০২৪ সালের জুলাইকে নতুন করে পাঠ করতে হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল। সংঘর্ষ ও প্রাণহানির মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের শুরুতে দাবির কেন্দ্র ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার। ২৩ জুলাই সরকার ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রজ্ঞাপনও জারি করে। তত দিনে আন্দোলনের দাবি কোটা ছাড়িয়ে প্রাণহানির বিচার ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গিয়ে ঠেকেছিল। পরে আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতি সরকার পতনে থেমে থাকেনি। সরকার পতনের পর খুব দ্রুত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার এবং একাত্তর থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়ে বিতর্ক শুরু করা হয়। যদিও আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ ছিলেন না। তবে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে ভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের বাহন হয়ে ওঠে। কারণ ৫ আগস্টের পর লক্ষ্য শুধু শেখ হাসিনার সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ ছিল না—বঙ্গবন্ধুর বাড়ি, তাঁর স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা, ’৭২-এর সংবিধান ও একাত্তরের ভিত্তির ওপর নির্মিত রাষ্ট্রীয় উত্তরাধিকারও ক্রমে আক্রমণ ও প্রত্যাখ্যানের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। তাই চব্বিশকে নিছক ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান’ বলে মহিমান্বিত করার আগে তার নেপথ্যের রাজনৈতিক শক্তি, লক্ষ্য ও সরকার পতনের পরের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকানো জরুরি। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের রাজনৈতিক গন্তব্য কেন শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে দাঁড় করানো হলো?
ইতিহাসের বয়ান বদলের সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেত্রগুলোর একটি শিক্ষাব্যবস্থা। একটি প্রজন্ম ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে কাকে জানবে, কোন্ ঘটনাকে বাংলাদেশের জন্ম ও বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে গ্রহণ করবে, তার বড় অংশই তৈরি হয় পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাঠ্যপুস্তকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত কিছু বিষয় বাদ দেওয়া বা পরিবর্তনের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের গল্প, কবিতা ও গ্রাফিত্তি যুক্ত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান পরিবর্তনগুলো নিয়ে বলেছিলেন, “এবারে মনে হচ্ছে যেন চব্বিশকে দিয়ে একাত্তরকে ম্লান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।” একই রাজনৈতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ’৭২-এর সংবিধানকে ‘মুজিববাদী সংবিধান’ আখ্যা দিয়ে এর ‘কবর’ রচনার ঘোষণা দেয়। এর আগেই জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির ও যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযমের পুত্র আব্দুল্লাহিল আমান আযমী জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল। একই সঙ্গে তিনি ’৭২-এর সংবিধানের বৈধতা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুর হয়েছে দেশব্যাপী। মুজিবনগরেও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে ঘিরে নির্মিত স্মারকও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মারক বাংলাদেশের বিজয়ের স্মৃতি। বঙ্গবন্ধু কিংবা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সেই বিজয়ের স্মারক ভাঙার কারণ হতে পারে না।
এই ঘটনাগুলোর পাশে ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদীর একটি বক্তব্য রাখলে রাজনৈতিক অভিমুখটি আরও স্পষ্ট হয়। আমাদের আলোচিত ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, কোট আনকোট, এটার বিরুদ্ধেই তো জুলাই হয়েছে।” একই সময়ে যখন ’৭২-এর সংবিধানকে কবর দেওয়ার ভাষা উচ্চারিত হচ্ছে, জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি উঠছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা হচ্ছে , শেখ মুজিবের বাড়ি ধানমন্ডি ৩২ ধ্বংস করা হচ্ছে, তখন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র বিরুদ্ধে জুলাইয়ের এই বক্তব্যকে পুরো ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। চব্বিশকে বাংলাদেশের ইতিহাসে জায়গা দিতে একাত্তরকে ছোট করার প্রয়োজন ছিল না। ঊনসত্তর বায়ান্নকে মুছে দেয়নি, নব্বই একাত্তরকে প্রতিস্থাপন করেনি। অথচ চব্বিশকে প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক বয়ানে বারবার একাত্তরের স্মৃতি, প্রতীক ও রাষ্ট্রীয় উত্তরাধিকারের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়েছে। এখানেই জুলাইকে নিছক স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান হিসেবে দেখার বয়ান দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বরং দেখিয়েছে, সরকার পরিবর্তনের সীমানা ছাড়িয়ে এই সংঘাত পৌঁছেছে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং একাত্তর থেকে নির্মিত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভিত্তি পর্যন্ত।
চব্বিশের ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যগুলোতে বিশেষভাবে চোখে পড়ে তরুণদের উপস্থিতি। ধানমন্ডি ৩২-এ বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পোড়ানো, তাঁর ভাস্কর্য ভাঙা কিংবা ১৫ আগস্ট সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া মানুষকে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তরুণদের একটি অংশের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে। সব তরুণকে একই রাজনৈতিক পরিচয়ে দাঁড় করানো যাবে না। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ধানমন্ডি ৩২-এর বই ও নথি রক্ষা করার চেষ্টা করেছে, লুট ঠেকানোরও চেষ্টা করেছে। তবু যে তরুণদের হাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি, ভাস্কর্য কিংবা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙতে হাতুড়ি উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি থেকেই যায়। তারা কেন ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল? রাজনৈতিক বিরোধিতা কীভাবে এমন জায়গায় পৌঁছাল যেখানে একটি সরকারের প্রতি ক্ষোভ আর বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের মধ্যে সীমারেখা থাকল না?
বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্মের ইতিহাসও একাত্তরের সঙ্গে যুক্ত। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকদের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। অথচ স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করে। ঘাতকেরা ছিল সেনাবাহিনীর একটি অংশ, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্রক্ষমতার সম্পর্কের এক ভয়াবহ অধ্যায় সেদিন রচিত হয়। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আরেক রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ পর্বে সামনে আসে সেনাবাহিনী। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা জানান। এর আগে তিনি বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে আওয়ামী লীগের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। পরে সেনাবাহিনী অন্তর্বর্তী সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতার কথাও জানায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগাম ঘোষণা দিয়ে বাড়িটির অবশিষ্টাংশ গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময়ও সেনাবাহিনী সেখানে উপস্থিত ছিল, কিন্তু বাড়িটি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ছাত্র-জনতার একাংশ সেনাবাহিনীকে ‘পোষা কুকুর’ বলে অপমান করলেও সেনারা নীরব থেকেছে। এর বিপরীতে ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিকে ঘিরে সহিংসতার সময় দলটির নেতাদের সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেদিন পাঁচজন নিহত হন, যাঁদের সবাই গুলিবিদ্ধ ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে। কার গুলিতে তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল, তা দ্রুত পরিষ্কার হয়নি। প্রথম চারজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন বা সৎকার করা হয়; পরে আদালতের নির্দেশে তিনজনের মরদেহ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করা হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল শুরুতেই মৃত্যুর কারণ ও ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস নির্ণয়ে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা। এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান ব্যবহার করা গেল, অথচ পাঁচজন গুলিবিদ্ধ নাগরিকের মৃত্যুর সত্য দ্রুত সামনে আনা গেল না কেন?
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া জুলাই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু সরকার পতনের পর আন্দোলনের নেতৃত্বের একাংশের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আর সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জুলাইয়ের শুরুতে যাঁদের পরিচয় ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের সমন্বয়ক, ৮ আগস্ট তাঁদের মধ্য থেকে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। আন্দোলনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক মাহফুজ আলম প্রথমে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও পরে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। সরকার পতনের মাত্র এগারো দিনের মাথায়, ১৬ আগস্ট, মাহফুজ আলম রয়টার্সকে জানান, ছাত্রনেতারা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কথা ভাবছেন। এর পরের ঘটনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি প্রকাশ্যে আসে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে ’৭২-এর সংবিধানকে ‘কবর’ দেওয়ার ঘোষণা আসে এবং পরের বছর আন্দোলনের নেতৃত্বের একটি অংশ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করে দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী জোটের অংশ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। ফলে জুলাইয়ের ছাত্রনেতৃত্ব থেকে জন্ম নেওয়া একটি রাজনৈতিক দলের শেষ পর্যন্ত জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হওয়াকে নিছক নির্বাচনী সমীকরণ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কঠিন। অবশ্য পরবর্তীতে এই জোট প্রমাণ করে না যে জুলাই পূর্বপরিকল্পিত ছিল। কিন্তু পুরো ঘটনাপ্রবাহ একসঙ্গে পড়লে একটি ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়। কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতন, সরকার পতনের কয়েক দিনের মধ্যে আন্দোলনের নেতাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রবেশ ও নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা, এরপর নিজস্ব রাজনৈতিক দলের জন্ম এবং শেষ পর্যন্ত একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে অংশগ্রহণ
চব্বিশের রাজনৈতিক বয়ান বুঝতে গেলে ভারত ও পাকিস্তান প্রসঙ্গও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত সমস্যা আছে। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা ভারত সরকারের নীতির সমালোচনা করা বাংলাদেশের মানুষের অধিকার। কিন্তু ভারতের নীতির বিরোধিতা ও ভারতবিদ্বেষ এক কথা নয়। চব্বিশকে ঘিরে ভারতবিরোধী আবেগ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ভারতকে শত্রু এবং পাকিস্তানকে বন্ধু হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতাও সামনে এসেছে। এই বয়ানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস তার বিপরীত সাক্ষ্য দেয়।
একাত্তর ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে শুরু হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। শুরু হয় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়; শেষ পর্যন্ত শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় এক কোটিতে পৌঁছায়। ভারত বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেয় এবং যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে সরাসরি সামরিকভাবে অংশ নেয়। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে শুধু ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করলে বাঙালির নয় মাসের প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম আড়ালে পড়ে যায়। ভারত সরকারের অতীত কিংবা বর্তমান নীতির সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধিতা দিয়ে একাত্তরের ইতিহাসে পাকিস্তানকে আক্রমণকারী থেকে বন্ধু আর ভারতকে সহযোগী থেকে শত্রু বানানো যায় না। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে কে আক্রমণকারী ছিল এবং কে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক সত্য বর্তমান রাজনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে দেওয়া যায় না।
যাই হোক, ইতিহাস কাউকে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসতে বাধ্য করে না। তাঁর রাজনীতির সমালোচনা হবে, তাঁর শাসন ও সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক থাকবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমালোচনা করতে গিয়ে একজন মানুষকে তাঁর সময় থেকে তুলে ফেলা যায় না। শেখ মুজিবকে সরিয়ে রেখে ছয় দফার ইতিহাস লেখা যাবে না, সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির গণরায় ব্যাখ্যা করা যাবে না, ৭ মার্চ কিংবা অসহযোগ আন্দোলনের ইতিহাসও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াতে হবে একাত্তরের সামনেই। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অবস্থান এখানেই। তাঁকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই, নিষ্পাপ প্রমাণ করারও প্রয়োজন নেই। তিনি তাঁর সমস্ত সাফল্য, ব্যর্থতা, সিদ্ধান্ত ও ভুল নিয়েই ইতিহাসের মানুষ। কিন্তু সেই ইতিহাসে তাঁর যে জায়গা, সেটুকু কেড়ে নিলে ইতিহাসটাই আর অক্ষত থাকে না।
১৯৭৫ সালে ঘাতকেরা সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছিল। বহু বছর তাঁর হত্যার বিচার হতে দেওয়া হয়নি। সময় গড়িয়েছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর আবার ধানমন্ডি ৩২-এ আগুন জ্বলেছে। যে বাড়িটি একসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, সেটি ধ্বংস করা হয়েছে? কিন্তু তারপর? আর পেছনে কতদূর যাওয়া যাবে? ছয় দফা কোথায় রাখা হবে? ৭ মার্চ কোথায় যাবে? ৭০ সালের নির্বাচন, অসহযোগ আন্দোলন, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, এসবের ভেতর থেকে শেখ মুজিবকে কীভাবে তুলে উপড়ে ফেলা যাবে? ১৯৭৫ সালে তাঁকে একবার হত্যা করা হয়েছিল। ইতিহাস থেকে তাঁকে মুছে ফেলতে বাংলাদেশীদের একটি অংশ তাঁকে আর কতবার হত্যা করবে?#




