কপোতাক্ষের কাব্যপুত্র মাইকেল মধুসূদন দত্ত

কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলরাশি সেদিন হয়তো জানত না যে, তার কোল ঘেঁষে জন্ম নিচ্ছে এক মহাকাব্যিক বিদ্রোহ। সাগরদাঁড়ির সেই শান্ত প্রহরটি ছিল দুই শতাব্দীর এক নিবিড় সন্ধিস্থল, যেখানে জীর্ণ মধ্যযুগ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে এবং আধুনিকতার অস্থির সূর্যোদয় ধীরে ধীরে দিগন্তে উন্মোচিত হচ্ছে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম কেবল একজন কবির আবির্ভাব ছিল না; এটি শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বের এক মহাকাব্যিক পথিকের সূচনা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক সংঘর্ষের স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেয়।

হিন্দু কলেজের করিডোরে ডিরোজিয়ান মুক্তবুদ্ধির যে হাওয়া তাঁর কিশোর মনে লেগেছিল, তা শেখায় মানুষকে পূজা করতে, দেবতাকে নয়। অনুকরণ নয়, মৌলিক সৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে। ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের এক প্রদীপ্ত তরুণের সামাজিক শৃঙ্খল ও সামন্ততান্ত্রিক বন্ধন ভাঙার চরমপন্থী পদক্ষেপ। নাম পরিবর্তন করে মাইকেল হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার সময় তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন সত্যিকারের বিশ্বনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের শিকড়ের গভীরতা উপলব্ধি করা।

মধুসূদনের বিশ্বনাগরিক হওয়ার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসাধারণ ভাষাগত পাণ্ডিত্য। হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় এক ডজনেরও বেশি ভাষায় তাঁর প্রজ্ঞা তাঁকে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের মূল নির্যাস আস্বাদনের সুযোগ দিয়েছে। এই বহুভাষিক জ্ঞানই তাঁকে সাহস যুগিয়েছে বাংলা ভাষার আটপৌরে কাঠামোর ওপর হোমার, ভার্জিল এবং দান্তের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আরোপ করতে। তিনি কেবল অমিত্রাক্ষর ছন্দেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। পেত্রার্কীয় ঢঙে বাংলায় প্রথম সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা প্রবর্তন করে নিজের ভুল ও আত্মোপলব্ধির অনন্য দর্পণ তৈরি করেছেন। মাদ্রাজের দারিদ্র্যপীষ্ট জীবন থেকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ের নির্বাসিত দিনগুলো তাঁকে সেই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে যে, বিশ্বকে জানতে হলে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োজন, নিজেকে চিনতে হলে প্রয়োজন মাতৃভাষার গভীর অন্তর্দৃষ্টি।

কবির ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর মহাকাব্যিক সৃজনের সমান্তরাল। রেবেকা ম্যাকট্যাভিস এবং এমিলিয়া হেনরিয়েটারের ত্যাগ ও সান্নিধ্য তাঁর সৃষ্টির অন্তরালে ধ্রুপদী করুণ রস সঞ্চার করেছে। এই নারীদের উপস্থিতি কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়; এটি তাঁর বীরাঙ্গনা কাব্যের আধুনিক এবং প্রতিবাদী নারী চরিত্রগুলোর অবচেতন প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটারের মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর কবির প্রয়াণ ইতিহাসের নির্মম পরিসমাপ্তি যেন তাঁর নিজের লেখা মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির জীবন্ত রূপ।

বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তাঁর প্রথাগত চিন্তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বিনির্মাণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত মেঘনাদবধ কাব্য কেবল একটি মহাকাব্য নয়; এটি আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বে প্রাচ্যের তথাকথিত অসুর বা রাবণকে আধুনিক বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বুদ্ধিজীবী লড়াই। তাঁর বিদ্রোহ কেবল ছন্দের ছিল না; এটি দেবকেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে মানবকেন্দ্রিক শিল্পের উত্তরণের প্রথম মহাকাব্যিক বিপ্লব। মিল্টন প্যারাডাইস লস্টে স্যাটানকে বিদ্রোহী করলেও শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরই বিজয়ী, হোমার বা দান্তের মহাকাব্যেও দৈব বিধানই চূড়ান্ত। মধুসূদন সচেতনভাবে প্রথাগত দেবতাকে হীনবল করে রাবণের দেশপ্রেম এবং মানবিক সত্তাকে মহিমান্বিত করেছেন, যা পাশ্চাত্যের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা ওরিয়েন্টালিজম-এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ।

প্রহসন থেকে নাটক, মহাকাব্য থেকে সনেট— সবখানেই মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে তিনি প্রবর্তন করেছেন সেক্যুলার হিউম্যানিজম বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ, যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষই শিল্প ও সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দু। আজকের বিশ্বায়নের যুগে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা অম্লান। ডায়াসপোরা চেতনা বা ঘর ও বাহিরের অন্তহীন দ্বন্দ্বের প্রতিফলন আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে ধারণ করে। পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরম মমতায় আত্মস্থ করে মনস্তাত্ত্বিক ডিকলোনাইজেশনের মাধ্যমে নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে আসার শিক্ষা আজও তিনি আমাদের দেন।

১৮৭৩ সালের ২৯ জুন নিঃস্ব অবস্থায় আলিপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহাকবি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, ‘সৃজনশীল বিদ্রোহ’ ছাড়া কোনো জাতির আধুনিকতা পূর্ণতা পায় না। পাশ্চাত্যের দর্পণ ছুঁয়ে প্রাচ্যের শিকড়ে ফেরার এক মহাকাব্যিক পথিক মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর কলম কেবল অমিত্রাক্ষরের ছন্দ বুনেনি; ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বদলে দিয়েছে একটি পরাধীন জাতির সাহিত্যিক রুচি এবং আত্মপরিচয়। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি কেবল এক ধূমকেতু নন, তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা, যা আজও আমাদের শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে পথ দেখায়। তিনি চেয়েছিলেন পাশ্চাত্যের মিল্টন হতে, অথচ নিয়তির নির্মম পরিহাস— আজ তিনি আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন বাংলার মধুসূদন হিসেবে।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!