টাঙ্গন নদীর পাশে

পয়লা-আষাঢ়। সকাল এগারোটা। দোতলা বাড়ির একটি ফাঁকা ঘর। জলপূর্ণ টাঙ্গন নদী। বিনীতা একা-একা ব্রিফকেস থেকে তার পরার জন্য নাইটি বের করছিল। বিনীতার বয়স তিরিশ বছর। বিবাহিতা। নবনীতা আস্তে-আস্তে ঘরের মধ্যে ঢুকল। বিনীতা তাকাল নবনীতার দিকে। নবনীতার পরণে হলুদ শাড়ি। কানে ঝুমকা নামক সোনার দুল। খুবই সুন্দর লাগছিল নবনীতাকে। বিনীতা জিজ্ঞেস করল,”নবনীতা, কিছু বলবি।” নবনীতার বয়স পঁচিশ বছর। মাথায় সিঁদুর দেওয়া। ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেল বিনীতার দিকে। কোনও কিছু না বলে বিনীতাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল। নবনীতা বিনীতার বুকে মাথা দিয়ে কাঁদতে লাগল। বিনীতা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, নবনীতা,কাঁদছিস কেন?
নবনীতা কাঁদতেই থাকল।
বিনীতা প্রশ্ন করল, নবনীতা,বল কি হয়েছে? তুই এমন কাঁদছিস কেন? নবনীতা বিনীতার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে বলল, দিদি, আমি ছোট হতে চাই।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বংশীহারী। বংশীহারীর মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে টাঙ্গন নদী। টাঙ্গন নদী থেকে কিছুটা দূরে উদয়ন সরকারের দোতলা পাকা বাড়ি। উদয়ন সরকারের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে বিনীতা আর ছোট মেয়ে নবনীতা। নবনীতা বিনীতার থেকে পাঁচ বছরের ছোট। ছোট-মেয়ে নবনীতার খুবই ইচ্ছে ছিল সে ‘বড়’ হবে। আর বড় বোন বিনীতার ভীষণ ইচ্ছে ছিল,সে ‘ছোট’ হবে। বিনীতার বিয়ের সম্বন্ধ যখন চাঁচোলের শিশির সরকারের ছোট ছেলে আদৃত সরকারের সাথে চলছিল, তখন বিনীতা বিয়েতে সম্মতি জানিয়েছিল। ধুমধাম সহকারে বিনীতার বিয়ে হয়েছিল। বিনীতা, মালদা জেলার চাঁচোলের শিশির সরকার বাড়ির ছোট বউ হয়েছিল। বিনীতা বড় থেকে ‘ছোট’ হয়ে গিয়েছিল। নবনীতার বিয়ের কথা যখন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হিলির তপোবন মজুমদারের বড় ছেলে উপায়ন মজুমদারের সাথে চলছিল, তখন নবনীতা বিয়েতে ‘হ্যাঁ’ জানিয়েছিল। মহাসমারোহে নবনীতার বিয়ে হয়েছিল। নবনীতা তপোবন মজুমদার বাড়ির বড় বউ হয়েছিল। নবনীতা ছোট থেকে ‘বড়’ হয়েছিল। বাবা-মায়ের টানে বিয়ের পরে বেশ কিছুদিন বাবার বাড়িতে নবনীতা ও বিনীতার মধ্যে প্রায়ই দেখা হতো। কিন্তু তারপর বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রায় চার বছর হতে চলল তাদের মধ্যে কোনও দেখা সাক্ষাৎ ছিল না। যদিও ফোনে মাঝে-মাঝে কথা হতো, স্মার্টফোনে ভিডিও কলের মাধ্যমে তাদের মধ্যে দেখাদেখি চলত। যখন নবনীতা বাবার বাড়িতে আসত,তখন কোনও না কোনও কারণে বিনীতা বাবার বাড়িতে আসতে পারত না। আবার বিনীতা যখন বাবার বাড়িতে আসত, তখন নবনীতাও কোনও কাজে আটকে পড়ায় বাবার বাড়িতে আসা সম্ভব হতো না। ফলে নবনীতা আর বিনীতার মধ্যে সরাসরি দেখা হতো না। এবার নবনীতা ও বিনীতা ঠিক করেছিল,যতই জরুরি কাজ থাকুক না কেন,যতই‌ অসুবিধে আসুক না কেন,এবার তারা দু’জনে পয়লা আষাঢ় বাবার বাড়িতে দেখা করবেই। সে কারণেই আজ পয়লা আষাঢ় একা একা নবনীতা ও বিনীতা সকালবেলা বংশীহারী বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল।

বিনীতা নবনীতার থুতনিটা ধরে নবনীতার মুখটা ওপরে তুলে ধরল। নবনীতার অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিল। বিনীতার পরণে ছিল খয়েরি রঙের শাড়ি। দু’হাতে দুটো মানতাসা নামক সোনার বালা। অপুর্ব লাগছিল বিনীতাকে। বিনীতা দু’হাত দিয়ে নবনীতাকে জড়িয়ে ধরল। নবনীতার গায়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগল। তারপর নবনীতাকে দু’হাত দিয়ে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিনীতা কাঁদতে লাগল আর বলতে লাগল, নবনীতা,আমি বড় হতে চাই। বড় হতে চাই।

অল্প দূর দিয়ে ভরা টাঙ্গন নদী কলকল শব্দে বয়ে চলছিল আর দোতলা ঘরের মধ্যে বিনীতা ও নবনীতা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে যাচ্ছিল। খুব কাঁদছিল।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!