পুরুষের বহুবিবাহ: রাষ্ট্রীয় বৈধতা ও নৈতিক প্রশ্ন

একটি রাষ্ট্র যখন ঘোষণা করে যে একজন পুরুষ তার স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে, তখন তা কেবল একটি আইনি ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজের নৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করে দেয়। এই অবস্থান নারীর সম্মতি, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে গৌণ করে তোলে, যা কোনোভাবেই একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০.৮ শতাংশ নারী। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও এই নারীরা আজও বহু নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়ে গেছেন। বিবিএসের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী অবিবাহিত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও অবিবাহিত পুরুষের সংখ্যা অবিবাহিত নারীর তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। এই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে সমস্যাটি নারীর অভাব নয়; বরং পুরুষের সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে চলার একটি প্রবণতা বিদ্যমান। দুঃখজনকভাবে, রাষ্ট্র সেই প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত না করে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

গণতন্ত্রের মৌলিক দর্শন হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের প্রতি সম্মান এবং সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষা। কিন্তু এখানে আমরা ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখি। সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর নিরাপত্তা ও সম্মতির প্রশ্ন উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, আর সীমিতসংখ্যক ক্ষমতাধর ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর দাবি আইনি কাঠামোর ভেতরে স্থান পাচ্ছে। এ ধরনের অবস্থান আইন ও নীতির নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলে।

এই রায়ের সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের জায়গা হলো, এটি নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ধারণাকে দুর্বল করে দেয়। “স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন নেই”— এই বক্তব্য নারীর মতামত ও অংশগ্রহণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে নারী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের অংশীদার না হয়ে কেবল তার প্রভাবের মুখোমুখি একজন ভুক্তভোগীতে পরিণত হন।

আইন কাগজে যেভাবে লেখা থাকে, বাস্তব জীবনে তার প্রভাব সব সময় সেভাবে ধরা পড়ে না। একজন নারীকে এখন এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বসবাস করতে হবে যে, যেকোনো সময় তার পারিবারিক কাঠামো তার সম্মতি ছাড়াই বদলে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তা নিছক সামাজিক বিষয় নয়; এটি মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার একটি স্থায়ী উৎস হয়ে ওঠে, যা নারীর আত্মসম্মান ও পারিবারিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আইনের সমতার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতায় এই ধরনের বিধান মূলত আর্থিকভাবে সচ্ছল ও প্রভাবশালী পুরুষদের পক্ষেই কার্যকর হবে। একাধিক পরিবার পরিচালনার আর্থিক ও সামাজিক সক্ষমতা সবার নেই। ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বেন। অথচ তখনও রাষ্ট্রের দায় কেবল ‘আইন মানা হয়েছে’— এই যুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে।

আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির কথা বলা হলেও, এই কাঠামো নারীর মানসিক নিরাপত্তা বা সামাজিক মর্যাদার কোনো বাস্তব নিশ্চয়তা দেয় না। এটি একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, মানবিক ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়— এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

যদি সমতার নীতিকে সত্যিকার অর্থে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে এই আইন নৈতিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না। একপক্ষকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে অন্য পক্ষকে সেই একই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা সমতার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে এই আইনকে বৈষম্যমূলক বলেই বিবেচনা করতে হয়।

বিশ্বের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার-সম্মত রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালেও এই সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একাধিক জীবনসঙ্গীর ধারণা ক্রমেই পরিত্যক্ত হয়েছে, কারণ তা ব্যক্তি মর্যাদা ও সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, যারা নিজেদের আধুনিক, শিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রশিক্ষিত বলে দাবি করেন, তাদের দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার সময়েই এই ধরনের নীতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছে। শিক্ষা ও প্রগতির প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তা মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে।

এই রায় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাখ্যার নির্বাচিত প্রয়োগের মাধ্যমে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা দেখা যায়। যে রাষ্ট্র নারীর সম্মতিকে গুরুত্ব দেয় না, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত মানবিক মর্যাদাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

এই সিদ্ধান্ত কেবল আপিল আদালতেই নয়, ইতিহাসের বিচারে টিকবে কি না— সেই প্রশ্নও আজ উঠছে। কারণ একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা ও অগ্রগতি পরিমাপ হয় তার নাগরিকদের, বিশেষত নারীদের মর্যাদা রক্ষার মধ্য দিয়েই।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!