জীবনানন্দ দাশ মূলতঃ একজন কবি, এবং একান্তভাবে কাব্যচিন্তায় নিমজ্জিত থাকলেও, একইসাথে কিছু মননমূলক প্রবন্ধও রচনা করেছিলেন। আর তাঁর অধিকাংশ প্রবন্ধই যে কবিতা বিষয়ক ছিল, একথা সহজেই অনুধাবনযোগ্য। তাঁর রচনাবলী পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি তাঁর আত্মচারিত্রিক কাব্য—‘ধূসর পান্ডুলিপি’র প্রায় সমসময় থেকেই কবিতা লেখার ফাঁকে ফাঁকে কবিতার বিষয়ে নিজের কিছু ভাবনা ধারণাও লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এবং তাঁর মৃত্যুর পরে ‘কবিতার কথা’ নামে তাঁর লিখিত কাব্যালোচনা নামের পনেরোটি প্রবন্ধ একত্রিত করে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত করা হয়েছিল। তবে এছাড়াও তাঁর লেখা সাহিত্য, সমাজ বা আত্মস্মৃতিমূলক আরো কিছু প্রবন্ধের সন্ধান পাওয়া যায়। আর সবমিলিয়ে এগুলিতেই মোটামুটিভাবে তাঁর কবিতা বিষয়ক ভাবনাবলি লিপিবদ্ধ রয়েছে বলেও লক্ষ্য করা যায়। জীবনানন্দ গবেষকদের মতে, তিনি এই প্রবন্ধগুলি ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৬০ বঙ্গাব্দ—এই ষোলো বছরের মধ্যে লিখেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, এই সময়টিই তাঁর কবিতা সৃষ্টিরও মুখ্যকাল ছিল। এসময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’ ও ‘সাতটি তারার তিমির’–এর অধিকাংশ কবিতা রচনা করেছিলেন। অর্থাৎ—এসময়ের মধ্যে তিনি যে কাব্যচিন্তা করেছিলেন, এই প্রবন্ধগুলিকে সেটারই সমাহত প্রকাশ বলা যেতে পারে।
এরমধ্যে অন্ততঃ পাঁচটি প্রবন্ধে তিনি মূলতঃ বাংলা কবিতা নিয়েই আলোচনা করেছিলেন; এগুলোর শিরোনাম হল—‘রবীন্দ্রনাথ ও অধুনিক বাংলা কবিতা’, ‘উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য’, ‘কবিতার আত্মা ও শরীর’, ‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’, এবং ‘অসমাপ্ত আলোচনা’। এছাড়া তাঁর অন্য প্রবন্ধসমূহেও স্বাভাবিকভাবেই বাংলা কবিতা তথা সাহিত্য-প্রসঙ্গ প্রায়শঃই আলোচিত হয়েছিল।
তবে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই তাঁর আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। এসময়ে জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথের উপরে কমপক্ষে দুটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা; এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতা’ গ্রন্থের তথ্যানুসারে অন্ততঃ তিনটি কবিতা লিখেছিলেন। এরমধ্যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর লেখা ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের একক প্রবন্ধটি ‘দৈনিক স্বরাজ’ নামক একটি সাময়িকীর ১৩৫৪ বঙ্গাব্দের ২৪শে শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানা যায়। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথও জীবনানন্দের ‘মৃত্যুর আগে’ কবিতাটি পড়ে মন্তব্য করেছিলেন—
“জীবনানন্দ দাশের চিত্ররূপময় কবিতাটি আমাকে আনন্দ দিয়েছে।”
এবং তাঁকে দুটি পত্র লিখেছিলেন, যা নিম্নরূপ ছিল—
(১) “তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহ মাত্র নেই—কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারিনে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদীকে পরিহসিত করে। বড়ো জাতের রচনার মধ্যে একটা শান্তি আছে যেখানে তার ব্যাঘাত দেখি সেখানে স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে। জোর দেখানো যে জোরের প্রমাণ তা নয় বরঞ্চ উল্টো।”
(২) “তোমার কবিতাগুলি পড়ে সুখী হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।”
জীবনানন্দের সাথে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সংস্পর্শ শুধু এটুকুই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ একজন ‘লোকোত্তর পুরুষ’ ছিলেন; এবং সেযুগে রবীন্দ্রনাথকে যাঁরা ‘আধ্যাত্মিক সত্যে বিশ্বাসী ও বুর্জোয়া সভ্যতার প্রতীক’ হিসেবে দেখেছিলেন, তাঁদের তিনি অসাহিত্যিক বলেছিলেন। এছাড়া তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্রকেন্দ্র থেকে কখনোই চ্যুত হবে না। তবে রবীন্দ্রনাথকে অবশ্য তিনি সবসময়েই পরবর্তী কাব্যপ্রচেষ্টার পটভূমিকায় বিচার করেছিলেন; এবং এরফলে রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু সীমা সম্বন্ধে তিনি সচেতন হয়েছিলেন ও অন্যদের মধ্যেও এবিষয়ে চেতনা জাগিয়ে তোলবার চেষ্টা করেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ এখানে তাঁর লেখা থেকেই এবিষয়ের দুটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে যা নিম্নরূপ—
(১) “তাঁর প্রকৃত কাব্যলোকে সমাজ-ও-ইতিহাসচেতনা একটা নির্ধারিত সীমায় এসে তারপর মন্থর হয়ে গেছে। আধুনিকের কবিতা সেই কিনারার থেকে সূত্র তুলে নিয়ে যে ধরনের সমাজ ও ঐতিহ্য বোধের আশ্রয় গ্রহণ করেছে তার পরিচয় রবীন্দ্রকাব্যে পাওয়া যায় না বললে উক্তি অসঙ্গত হবে, কারণ রবীন্দ্রকাব্য বিরাট সমুদ্রের মতো—কিন্তু তাঁর শেষ জীবনের কবিতায়ও—‘পুনশ্চ’, ‘রোগ-শয্যায়’, ‘আরোগ্য’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থেও—এই জিনিষ রবীন্দ্রকাব্যের প্রধান স্মরণীয় বিষয় নয় বলে কবি এর দিকে সম্পূর্ণ মনঃক্ষেপ করতে উদাসীন এবং এর প্রকাশ তাঁর কাব্যে রবীন্দ্র প্রতিভার স্বাক্ষর থেকে বঞ্চিত।” (রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা, কবিতার কথা, পৃ- ২১)
(২) “… ‘কল্লোলে’র লেখকেরা মনে করেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ অনেক সার্থক কবিতা লিখেছেন—কিন্তু তিনি যাবতীয় উল্লেখ্য বিষয় নিয়ে কবিতা লেখবার প্রয়োজন বোধ করেন না—যদিও তাঁর কোনো কোনো কবিতায় ইতিহাসের বিরাট জটিলতা প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে হয়; তিনি ভারত ও ইউরোপের অনেক জ্ঞাত ও অনেকের মতে শাশ্বত বিষয় নিয়ে শিল্পে সিদ্ধিলাভ করেছেন, কিন্তু জ্ঞান ও অন্তর্জ্ঞানের নানারকম সঙ্কেত রয়েছে যা তিনি ধারণা করতে পারেননি বা করতে চাননি।” (অসমাপ্ত আলোচনা, কবিতার কথা, পৃ- ১১২)
জীবনানন্দ গবেষকদের মতে, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৬০ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত মোট বারো বছরের ব্যবধানে তাঁর লেখা এই প্রবন্ধদ্বয় থেকে মোটামুটিভাবে একথা বুঝতে পারা যায় যে, এটাই ছিল রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর ধারণা। আর জীবনানন্দের কবিতার পাঠক-পাঠিকামাত্রেই অবগত রয়েছেন যে, তাঁর নিজের কবিতাতেও ‘সমাজ-ও-ইতিহাসচেতনা’ একটা পর্যায়ে এসে কাজ করেছিল, এবং তাঁর কবিতায় ‘জ্ঞান ও অন্তর্জ্ঞানের নানারকম সঙ্কেত’ তিনি ধারণ করতে চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া অন্যান্য যেসব বাঙালি কবি ও সাহিত্যিকদের সম্বন্ধে জীবনানন্দ কিছু টুকরো ও খুচরো মন্তব্য করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ সেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, আলাওল, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, লালন ফকির, রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বর গুপ্ত, প্রমথ চৌধুরী, বিদ্যাপতি, ভারতচন্দ্র প্রমুখ প্রধান ছিলেন। এঁদের মধ্যে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সম্পর্কে তাঁর অগ্রন্থিত পূর্ণাঙ্গ একটি প্রবন্ধ ‘অনুক্ত’ পত্রিকায়; এবং নজরুল সম্পর্কে তাঁর অগ্রন্থিত পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধটি ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
এছাড়া তিনি নিজের কয়েকটি প্রবন্ধে কিছু গ্রন্থ সম্পর্কেও ছিন্ন উল্লেখ করেছিলেন; যথা—রবীন্দ্রনাথের ‘পুনশ্চ’, ‘রোগ-শয্যায়’, ‘আরোগ্য’ ও ‘বলাকা’; মহর্ষি ব্যাসের ‘মহাভারত’; শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’; এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উত্তর-ফাল্গুনী’।
এসব ছাড়া দুটি কবিতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা এবং তা থেকে তাঁর কাব্য চিন্তার নির্দেশ সুধীন্দ্রনাথের ‘উটপাখী’ (কবির ভাষায় এতে প্রাপ্তব্য ‘স্মরণীয়তর বাণী’) ও সমর সেনের ‘নাগরিক’ (কবির ভাষায় ‘স্মরণযোগ্য বাক্যসমষ্টি’)–কে নিয়ে লেখা দুটি প্রবন্ধ থেকে পাওয়া যায়।
এগুলির মধ্যে জীবনানন্দ যখন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধে—এই কবি তাঁর কবিতায় একজন মহৎ কবির নয়, বরং একজন সুকবির শব্দ ও ছন্দপ্রেমই দেখিয়েছেন—বলেছিলেন, তখন তাঁর এই উক্তির যথার্থতা নিয়ে কেউ কোনো সন্দেহ না করলেও, কিন্তু এরপরে কবি যখন বলেছিলেন—
“বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কবিতার উদয়ের আগে রবীন্দ্রকাব্যের আওতার থেকে বেরিয়ে পড়বার দু-একটা প্রয়াস দেখা গিয়েছিল। সে ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি হচ্ছেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।” (কবিতার কথা, পৃ- ২০)
—তখন অনেকেই বিস্ময় বোধ করেছিলেন। কারণ, বাংলায় রবীন্দ্র-মুক্তির কাব্যেতিহাসে শুধু সত্যেন্দ্রনাথই যদি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হন, তাহলে নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার, ও যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের কোন মহিমা থাকে না। কারণ, বাংলা সাহিত্যের গবেষকদের মতে, মূলতঃ এই তিনজনই রবীন্দ্রকাব্যলোক থেকে বেরিয়ে আসবার উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, যে প্রচেষ্টা সত্যেন্দ্রনাথের চেয়ে সন্দেহাতীতভাবেই অনেক বেশি তীব্র ও আত্মচেতন ছিল। তবে এঁদের সম্বন্ধে জীবনানন্দও যে ওয়াকিবহাল ছিলেন না, এমনটা কিন্তু নয়; বরং তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’–এ সত্যেন্দ্রনাথের প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে নজরুল, মোহিতলাল ও যতীন্দ্রনাথের প্রভাবও পুরোমাত্রায় সক্রিয় ছিল বলেই সমালোচকরা মনে করে থাকেন। আর একারণেই সত্যেন্দ্রনাথ সম্পর্কে জীবনানন্দের উপরোক্ত উক্তিকে অন্যান্যরা অযথার্থ বলেই মনে করে থাকেন।
তবে এঁদের তুলনায় নিজের সমসাময়িক অন্যান্য আধুনিক কবিদের সম্পর্কে জীবনানন্দের মতামত অনেক বেশি লক্ষ্যভেদী হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। সমালোচকদের মতে, তিনি তাঁর অসামান্য অন্তর্দষ্টিবলে ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে, আধুনিক কাব্যান্দোলন—
“রবিকাব্যলোকের বিপক্ষে ঠিক নয়, রবীন্দ্রসৃষ্ট সাহিত্যস্বভাব ও সময়স্বভাবের বিরুদ্ধে।”
আর একারণেই কবি অমিয় চক্রবর্তীর প্রকরণ-বিচিত্রতা, বুদ্ধদেব বসুর ‘মানুষ ও প্রকৃতির নিরন্তর উৎকর্ষ-পরিবর্তনের পথে’ পরিক্রমা, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ভূগোল ও মানুষের ইতিহাসে’ লিপ্ত থাকা, আর সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনা’—এ সব কিছুকেই তিনি খুব যথার্থভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হল যে, নিজের ‘উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য’ নামক প্রবন্ধের কোথাও তিনি কবি বিষ্ণু দে’র নামোল্লেখ পর্যন্ত করেননি। অন্যদিকে এঁদের মধ্যে সুধীন্দ্রনাথের কবিতাকেই তিনি বোধহয় সবথেকে বেশি মূল্য দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে, কবি সুধীন্দ্রনাথ হলেন—
“আধুনিক বাংলা কাব্যের সবচেয়ে বেশি নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনা।”
শুধু তাই নয়, এরপরে তিনি আরো লিখেছিলেন—
“আধুনিক সাহিত্যের প্রায় বারো আনা তথাকথিত প্রাগ্রসর কবিতার চেয়ে সুধীন্দ্রনাথের কবিতা বেশি প্রবীণ; তার নিজের এষণার কবিতালোকে তিনি আধুনিক প্রায় সকল কবির চেয়েই বেশী আন্তরিক নন কি?”
তবে জীবনানন্দ কিন্তু প্রচারধর্মীমর্মী কবিতায় বিশ্বাসী ছিলেন না; শুধু তাই নয়, ‘অর্থহীন অসন্তোষে বা দুর্বল বিদ্রোহের অভিমানে’ নিজের পূর্ববর্তী বড় কোন কবিকে ডিঙিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তাঁর কোন আস্থা ছিল না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর প্রতিটি কবিতার মুক্তি বিশুদ্ধ কবিতার পথ ধরেই আসবে। এছাড়া তিনি কবির কল্পনাপ্রতিভাকে সর্বাধিক মর্যাদা দিয়েছিলেন; আর এর অভাবে যে নিঃসার বুদ্ধিজীব কবিতা জন্ম নেয়, সেটাকে কখনোই আমল দেননি। আসলে কবিতায় বিশুদ্ধ রসের অবতারণাই তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল। এবং এজন্যই ‘গদ্যপ্রায় পদ্যছন্দ বা গদ্যছন্দ’ অবলম্বন করে বিংশ শতকের চতুর্থ ও পঞ্চম দশকে যে সংখ্যাহীন পদ্যের বান এসেছিল, সে সম্বন্ধে তিনি স্পষ্টভাবেই নিজের বিরূপতা প্রকাশ করেছিলেন।
এসব ছাড়া আধুনিক তথা তাঁর সমকালীন বাংলা কবিতা সম্বন্ধেই তিনি নিজের মতামত সবথেকে পরিষ্কারভাবে জ্ঞাপন করেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, তাঁর সময়কার আধুনিক বাঙালি কবিরা বোদলেআর, ইয়েটস, ইলিয়ট, পাউণ্ড, মালার্মে, পল ভেরলেন, রসার প্রমুখের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। তবে জীবনানন্দ অবশ্য আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে তাঁর শেষ সিদ্ধান্ত জানাননি; কিন্তু তাঁর দৃষ্টি নিশ্চিতভাবেই নিরাসক্ত ছিল। আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে তিনি শুধু এটুকুই বলেছিলেন যে, এতে প্রতীকী, সুররিয়ালিস্ত ও অন্তজ্ঞানী—এই কয়েকটি দিক রয়েছে। এছাড়া তাঁর মত ছিল যে, একজন কবির প্রকৃত সিদ্ধি শুধুমাত্র বৈষ্ণব কবিতা ও রবীন্দ্রনাথেই দ্রষ্টব্যঃ। এসবের বাইরে নিজের একটি লেখায় তিনি পরবর্তী বাংলা কাব্যেতিহাসে দীর্ঘকবিতা, মহাকবিতা ও কবিতানাট্য সৃষ্ট হতে পারে বলেও আশাপ্রকাশ করেছিলেন; এবং এর কারণস্বরূপ জানিয়েছিলেন যে, তাঁর সমকালে এসবের বিশেষ কোন চর্চা হয়নি বলেই, ভবিষ্যতে এধরণের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কবিতায় লোকশিক্ষা বা সমাজশিক্ষাকে তিনি আবার আমল দেননি।
অন্যদিকে নিজের ‘কবিতার আত্মা ও শরীর’ নামক প্রবন্ধেই তিনি শুধুমাত্র কাব্যপ্রকরণ নিয়ে নিজের কিছু চিন্তা লিপিবদ্ধ করেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। যেমন—ছন্দ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল—
“কবি-প্রেরণার তারতম্য অনুসারে ছন্দের জাতি নির্ণয় হয়।”
আর ভাবাক্রান্ত কবির—
“চোখও অনুভব করে যেন ছন্দবিদ্যুৎ।”
আর পয়ার (জীবনানন্দ অক্ষরবৃত্তকে বুঝিয়েছিলেন) সম্বন্ধে তাঁর মত ছিল যে, এটি আধুনিক বাংলা কবিতায় সর্বব্যাপী। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, কবিরা আধুনিক বাংলা কবিতায় ‘২২ ও ২৬ এবং ক্বচিৎ তার চেয়েও দীর্ঘতর মাত্রার’ অক্ষরবৃত্ত ব্যবহার করেছেন। এমনকি জীবনানন্দ নিজেই অনুরূপ ব্যবহার সর্বাধিক করেছিলেন; যথা—
(১) “আমরা হেটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষসন্ধ্যায়”
(২) “যত নীল আকাশেরা রয়ে গেছে খুঁজে ফেরে
আরো নীল আকাশের তল”
(মৃত্যুর আগে, ধূসর পাণ্ডুলিপি)
এরপরে তিনি আরো জানিয়েছিলেন যে, যতিপ্রান্তিক ছন্দ লুপ্ত হয়ে গিয়েই বাংলা কবিতায় প্রবহমানতা একচ্ছত্র হয়ে উঠেছে। তাঁর মত ছিল যে, এখনকার কবিরা মুক্তক অক্ষরবৃত্ত, মুক্তক স্বরবৃত্ত ও মুক্তক মাত্রাবৃত্তেই সাধারণতঃ লেখেন। আর একারণেই তিনি বলেছিলেন—
“কবিতার ছন্দ যদি যুগের নাড়ীমূলের নির্দেশ দান করে তাহ’লে মাত্রাবৃত্ত মুক্তকে প্রচুর কবিতা আশা করা যায়।”
এছাড়া স্বরবৃত্ত বা প্রাকৃত বাংলার ছন্দ যে অব্যবহৃত থেকে গিয়েছে, তিনি একথারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একসময়ে স্বরবৃত্ত ছন্দ প্রসঙ্গে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। কিন্তু তবুও, রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্বরবৃত্ত ছন্দকে প্রধানতঃ লঘুচাপল্যেই ব্যবহার করেছিলেন। আর সমালোচকদের মতে, জীবনানন্দ তাঁর জীবনের শেষদিকে মানবপ্রকৃতির সিরিয়াস দিক নিজের কবিতায় ফোটাতে চাইলেও, এই ছন্দ তাঁর স্বভাবের ঠিক অনুকূল ছিল না।
এসব ছাড়া জীবনানন্দ তাঁর প্রবন্ধে কোনো বিদেশি কবি বা কাব্যধারা সম্পর্কে আলাদা ও একক কোনো সন্দর্ভ রচনা না করলেও, কবিতা নিয়ে আলোচনার বিভিন্ন প্রসঙ্গে অনেক ভিনদেশি কবিশিল্পীর নাম করেছিলেন। যথা—ইএটস, এলিঅট, শেক্সপীয়র, মালার্মে, ভেরলেন, রসার, বোদলেআর, পাউণ্ড, অডেন, কামিংস, হার্ডি, হাউসম্যান, সিটওএল, ডে লুইস, স্পেন্ডার, ম্যাকনীস, আলেকজান্ডার পোপ, দান্তে, সোফোক্লেস, ইসকাইলাস, হোমর, হক্সলি, হেমিংওএ, কোএসলার, ইশারউড, ব্লেক, রিলকে, ভিলো, ডান, কর্টিংস, ওঅর্ডসওঅর্থ, ড্রাইডেন, জনসন, পেটার, ল্যাম, গ্যয়টে, আর্নল্ড, শেলি, কোলরিজ, টলস্টয় প্রমুখ। এর বাইরে তিনি কবির নাম করেছিলেন, যাঁদের কাছ থেকে গ্রহণ করে আধুনিক বাংলা কবিতা ঋদ্ধ হয়েছে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, জীবনানন্দের সময়ে রবীন্দ্রনাথকে ছেড়ে বাঙালি কবিরা যাঁদের শরণ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বোদলেআর, ইয়োটস, ইলিয়ট, পাউণ্ড, মালার্মে, ভেরলেন, রসার প্রমুখ ছিলেন। এঁদের মধ্যে এলিঅট–এর ‘ওএস্টল্যান্ড’ সম্পর্কে’ তাঁর মত ছিল—
“বিশেষ সময়-চিহ্নের ছাপ তার উপর এমন জাজ্জ্বল্যমান যে তা আজ না হোক কাল অন্তত ফিকে হয়ে যাবে।”
আর কামিংস (অবান্তর চাতুরী), অডেন–এর ‘মেমোরেবল স্পীচ’কে তিনি স্বীকার করেননি।
সমালোচকদের মতে, জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধের গদ্যভাষা তাঁর কাব্যভাষার মতোই একান্ত নিজস্ব ছিল; এবং তাঁর গদ্যভাষা ও কাব্যভাষা অসমান্তরাল ছিল। বস্তুতঃ দীর্ঘ বাক্য গড়নে তাঁর বিশিষ্টতা, দীর্ঘ ও জটিল, নানারকম সংশয়ে ও জিজ্ঞাসায়, আবর্তে ও ঘূর্ণিতে ঠেকে ঠেকে এগিয়ে গিয়েছিল বলে লক্ষ্য করা যায়। তবে এরমধ্যে চলতি রীতিই প্রশ্রয়িত হয়েছিল, কিন্তু সেটাও আবার জীবনানন্দের নিজস্ব বাকভঙ্গির অনুসারী ছিল। একটি উদাহরণ নিম্নরূপ—
“এখন আমি আর একটা কথা বলতে চাই খানিকটা অত্যুক্তি করেই যেন, অথবা যা অত্যুক্তি নয়—আমার কাছে অন্তত সত্য বলে মনে হয়; কাব্যের ভিতর লোকশিক্ষা ইত্যাদি অর্ধনারীশ্বরের মতো একাত্ম হয়ে থাকে না; ঘাস, ফুল, বা মানবীর প্রকট সৌন্দর্যের মতো নয়; তাদের সৌন্দর্যকে সার্থক করে কিন্তু তবুও সেই সৌন্দর্যের ভিতর গোপনভাবে বিধৃত রেখা উপরেখার মতো যে জিনিষগুলো মানবী বা ঘাসের সৌন্দর্যের আভার মতো রসগ্রাহীকে প্রথমে ও প্রধানভাবে মুগ্ধ করে না—কিন্তু পরে বিবেচিত হয়—অবসরে তার বিচারকে তৃপ্ত করে।” (কবিতার কথা, কবিতার কথা)
সমালোচকদের মতে, মোহিতলাল মজুমদারের বাংলা গদ্যে এরকম দীর্ঘ বাক্য এত বেশি দেখা না গেলেও, জীবনানন্দের গদ্য পড়ে নিশ্চিতভাবেই তাঁর জটিল গদ্যরীতি কথাই মনে পড়ে যায়। প্রসঙ্গতঃ এখানে মোহিতলালের একটি প্রবন্ধের কিছু অংশ তুলে ধরা যেতে পারে, যা নিম্নরূপ—
“সকল প্রতিবেশ প্রভাব জয় করিয়া, দেশ ও কালের সকল অনিত্য প্ররোচনা অস্বীকার করিয়া, তিনি এক নিরুদ্দেশ সাধনাতীর্থের অভিমুখে চলিয়াছিলেন বটে—পথের পথ-সঙ্কট অপেক্ষা দৃঢ় দিগন্ত-বলয়ের রহস্য-সীমা তাঁহাকে অধিকতর আকুল করিত বটে, কিন্তু তিনি যে-দেশে যে-সমাজে জন্মিয়াছিলেন তাহার অশুচি অবস্থা তাঁহার আত্মমর্যাদাবোধ আঘাত করিত, তাঁহার সেই অতিশয় দৃপ্ত ও স্বতন্ত্র আত্মিক সাধনায় বিঘা ঘটাইত; বাংলার সেই নবজাগরণের যেক্ষণে এবং যে-পরিবারে তাঁহার জন্ম হইয়াছিল তাহাতে তাঁহার ভাব-জীবনের স্বাতন্ত্র্যবোধ যতই প্রখর হোক, এ অস্বস্তি হইতে তাঁহার অব্যাহতি ছিল না।” (রবীন্দ্রকাব্যের কবি-পুরুষ, সাহিত্য-বিতান, মোহিতলাল মজুমদার)
লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, রবীন্দ্রনাথের গদ্যের মত এখানে উপমা-উৎপ্রেক্ষার ছড়াছড়ি নেই; আর যেখানে আছে, সেখানে তা জীবনানন্দের মুদ্রা-চিহ্নিত, তাঁর কবিতার মতোই নির্বস্তুক উপমা, নির্বস্তুক উৎপ্রেক্ষা। কয়েকটি উদাহরণ নিম্নরূপ—
(১) “জীবনের সমস্যা ঘোলা জলের মুষিকাঞ্জলির ভিতর শালিকের মত স্নান না করে বরং যেন করে আসন্ন নদীর ভিতর বিকেলের শাদা রৌদ্রের মতো;”
(২) “আমার জীবনের ভিতর তা আরো খানিকটা জ্ঞান বীজের মতো ছড়াতে পারে, আমার অনুভূতির পরিধি বাড়িয়ে দিতে পারে, আমার দৃষ্টি-স্থূলতাকে উঁচু মঠের মতো যেন একটা মৌন সূক্ষ্মশীর্ষ আমোদের আস্বাদ দিতে পারে;”
(৩) “… তথাকথিত সভ্যতা কোনো এক দারুণ হস্তীজননীর মতো যেন বৃদ্ধিস্থলিত দাঁতাল সন্তানদের প্রসবে-প্রসবে পৃথিবীর ফুটপাত ও ময়দান ভরে ফেলেছে …”
তবে একইসাথে একথাও উল্লেখ্য যে, জীবনানন্দের ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের এই লেখায় কিছু উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার থাকলেও, উত্তরকালে তাঁর গদ্যে অবশ্য এসব উপমা-উৎপ্রেক্ষা কমে গিয়েছিল। তবে বাক্যগড়নের জটিলতা ও গ্রন্থিময়তা কিন্তু কোনো সময়েই কমেনি। বরং জীবনানন্দের কাব্যভাষাতেও এই জটিল গ্রন্থিলতা লক্ষ্য করা যায়—
“মৃত্তিকার ওই দিক আকাশের মুখোমুখি যেন শাদা মেঘের প্রতিভা;
এই দিকে ঋণ, রক্ত, লোকসান, ইতর, খাতক;
কিছু নেই—তবুও অপেক্ষাতুর;
হৃদয়স্পন্দন আছে—তাই অহরহ
বিপদের দিকে অগ্রসর;
পাতালের মতো দেশ পিছে ফেলে রেখে
নরকের মতন শহরে
কিছু চায়;
কী যে চায়।”
(নাবিকী, সাতটি তারার তিমির)
পরিশেষে বলা চলে যে, জীবনানন্দের পনেরোটি প্রবন্ধের এই একটিমাত্র সংগ্রহ থেকে এ তথ্য পরিষ্কারভাবে ধরা দেয় যে, তিনি শুধু রবীন্দ্রোত্তর কবিতার ক্ষেত্রে নন, বরং প্রবন্ধ-ধারারও একজন বিশিষ্ট মননবিদ ও অন্যতম প্রধান কারুশিল্পী ছিলেন। তাঁর কাব্য-বিবেচনা তাঁর একান্ত নিজস্ব, সৎ, জটিল ও সাহসী ছিল। যা তাঁর নিজস্ব কবিতার বিচারে অতিমূল্যবান তো বটেই; কেননা, এর দ্বারা সবাই যেমন কবি জীবনানন্দকে তাঁর আপন আয়তনে শনাক্ত করে নিতে পারেন, তেমনি তাঁর কবিতার অনেকরকম কুটকুশলতা মিলিয়ে নিতেও পারেন; যার মাধ্যমে ভিতরকার অনেক গেরো খুলে যেতে পারে, আর অনেক জট রূপোন্তরিত হতে পারে। একইসঙ্গে জীবনানন্দের এসব লেখা সাধারণ কাব্যভাবনাশীল প্রবন্ধ হিসেবেও দামি; কারণ, এরমধ্যে অনেক বীজবন্ত বিশ্বাস ডানা মেলেছিল, এবং অনেক তরু ডালপালা, আর অনেক বিবেচনা কুঁড়ি ফুল ও মঞ্জরী হিসেবে উজ্জ্বলন্ত হয়ে উঠেছিল। তাই জীবনানন্দের এই প্রবন্ধগুচ্ছকে আধুনিক বাংলা কবিতার এক অক্ষর চিন্তাংশ—এক অমর ভূমি ও ভিত্তির স্থপনা বলা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে যে, তিনি কোন একাডেমিক বা অধ্যাপকি ধরনের প্রবন্ধ লেখেননি বলে এই প্রবন্ধগুচ্ছে তাঁর চিন্তার আভা ও তেজ—তাঁর ভাবনার বিশিষ্ট প্রণালী ফুটে উঠেছিল। আর বিংশ শতকের তিরিশের দশকের প্রধান বাঙালি কবিবৃন্দ যে মনীষার ও উপলব্ধির দিক থেকেও সেকালের প্রধান পুরুষ ছিলেন, জীবনানন্দ দাশের ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধগ্রন্থটি এর এক চিরোজ্জ্বল প্রমাণপত্র।#




