বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছে। সেই যুদ্ধ ছিল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার লড়াই, ছিল ন্যায় পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই। সেই যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানি বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষণে সহযোগিতা করেছিল জামায়াতে ইসলাম, তাদের প্রতি মানুষের ঘৃণা কখনো মুছে যায়নি। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে ঘিরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে।
১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে একটি ঘটনা ঘটে যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্মৃতিতে বিশেষভাবে স্থান দখল করে আছে।
২৫ অক্টোবর ২০১৪ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে সেদিন ফিলিস্তিনে নিহত দুই বাংলাদেশির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে গোলাম আযম গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় ৩৬ বছর বয়সী এক যুবক তার সামনে এগিয়ে যান। তিনি নিজের পায়ের স্যান্ডেল হাতে নিয়ে পরপর দুটি আঘাত করেন। একটি আঘাত লাগে কপালে। আরেকটি লাগে চোয়ালে।
ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। পরে জানা যায় ওই যুবকও জানাজায় অংশ নেওয়া একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন। তার ভাষায়, “গোলাম আযম আসার পরই আমাদের মধ্যে একটা গুঞ্জন তৈরি হলো। তার আসাটা আমরা মেনে নিতে পারিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা একজন মানুষ এভাবে আমাদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে জানাজা পড়বে, আমাদের সমাজে মিশে যাবে, এটা আমাদের ভাবতেও অবাক লাগছিল।” সেই ঘৃণা থেকেই তিনি জুতা হাতে তুলে নেন।
তখনকার তরুণ সাংবাদিক খন্দকার মুনীরুজ্জামান পরে এই ঘটনার কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, “জিয়াউর রহমান গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর ওইটাই ছিল তার প্রথম পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স। মানুষ তাকে কীভাবে নেয়, তার একটা টেস্ট কেইসও ছিল ওই দিন।”
ঘটনার পর গোলাম আযমের সঙ্গে থাকা লোকজন দ্রুত তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এ সময় উত্তেজনা তৈরি হয়। জুতাপেটা করা ব্যক্তির ওপর জামায়াতের কর্মীরা হামলা করার চেষ্টা করে। পরে জাসদের নেতা প্রয়াত কাজী আরেফ আহমেদ ও তার সঙ্গীরা তাকে উদ্ধার করেন।
পরদিন দেশের প্রায় সব পত্রিকায় এই খবর প্রকাশিত হয়। আলোকচিত্রী রশীদ তালুকদার ঘটনাটির দুটি ছবি তোলেন। তার একটি ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হয়, যা পরবর্তীকালে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে। এই ঘটনাকে মানুষ এখনও স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ হিসেবে মনে রেখেছে।
তিন দশকের বেশি সময় পরে বায়তুল মোকাররম আবারও ইতিহাসের সাক্ষী হয়। ২০১৪ সালের ২৫ অক্টোবর ডেইলি স্টার ও কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত অবস্থায় গোলাম আযম মারা যান।
এরপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ আগেই ঘোষণা দেয়, জাতীয় মসজিদে গোলাম আযমের জানাজা হতে দেওয়া হবে না। সেই কারণে বায়তুল মোকাররম এলাকায় ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। ওই সময় এলাকায় ছয়টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

ওইদিন তার মরদেহ জানাজার জন্য ঢাকার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে নেওয়া হয়। ভিড়ের মধ্যে কয়েকজন তার মরদেহবাহী কফিনের দিকে জুতা নিক্ষেপ করেন। গণজাগরণ মঞ্চের একজন কর্মী “জয় বাংলা” স্লোগান দিয়ে কফিনের দিকে জুতা ছুঁড়ে মারেন। পরিস্থিতি উত্তেজিত হলে পুলিশ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে।
বায়তুল মোকাররম মসজিদে জীবিত অবস্থায়ও তিনি মানুষের জুতাপেটার শিকার হন, অপদস্থ হন। মৃত্যুর পরও সেই একই জায়গায় তার কফিনের দিকে জুতা ছোঁড়া হয়। এই ঘটনাগুলো বাঙালির হৃদয়ে গাথা স্মৃতি। ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তানি বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে এই দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তাদের অপরাধ মানুষ ভোলেনি।
১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামের নেতা গোলাম আযম পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষে অবস্থান নেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। বয়সের কথা বিবেচনায় নিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাকে এই সাজা দেয় আদালত।
বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে যায়নি। তারা শহীদদের ত্যাগও ভুলে যায়নি। তাই যারা সেই সময় স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে তাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ এখনও রয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা জামায়াতে ইসলামীসহ সেই রাজনৈতিক ধারার সবারই মনে রাখা দরকার। কারণ বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদেরকে কখনো গ্রহণ করেনি। ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয় যে এই দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বাসঘাতকদের ভুলে যায় না। ইতিহাসও তাদের ক্ষমা করে না।#




