ছবি আর কবিতাকে একসঙ্গে আমি বলি ‘ছবিতা’। ইংরেজিতে এর নাম হতে পারে Paintry, অর্থাৎ Painting + Poetry। অন্যভাবে চাইলে এটাকে Pain + Poetry বলেও ভাবা যায়। বাংলায় আপাতত একে ‘বেদনার্থী’ বলা যেতে পারে, মনমতো না হলেও কাজ চালানোর মতো।
কনসেপশান, ফর্ম এবং টেক্সচারের দিক থেকে আমার কবিতা সবচেয়ে বেশি নৈকট্য অনুভব করে চিত্রকলার সঙ্গে। কেন? হতে পারে, আমি একসময় পেইন্টার হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। একেবারেই কি পারিনি? এই প্রশ্ন আমি নিজেকেই করি।
এই প্রশ্ন করেছি আরও কয়েকজন শিল্পীকেও, জ্যঁ কঁকতো, পিকাসো, পল ক্লি, গুন্টার গ্রাস। কবি, চিত্রকর, লেখক, মাধ্যম ভিন্ন হলেও তাঁদের কাজের মধ্যে এক ধরনের আন্তঃসম্পর্ক ছিল। এই প্রশ্নের এক ধরনের উত্তর যেন পাওয়া যায় বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনেও। পরিণত বয়সে আঁকতে শুরু করে তিনি যেন কবিতার কিছু অপূর্ণতা তাঁর তুলি আর রঙের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।
এই কাজটা অন্য শিল্পীরাও করেছেন। কুসামা বিন্দুর পর বিন্দু বসিয়ে যেন কবিতা লিখেছেন। আমি যেমন শব্দের পর শব্দ বসিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করি। আবার হুয়ান মিরো অল্প কয়েকটি রেখায় ক্যানভাসে এমনভাবে ছবি নির্মাণ করেন, যেখানে অনেকটা জায়গা ফাঁকা থাকে, যেন সেই ফাঁকা জায়গায় দর্শক নিজেকে বসাতে পারে, নিজেকে দেখতে পারে। সফিউদ্দিনের দুমকা পর্বের প্রিন্টগুলোর মধ্যেও আমরা এমন এক ধরনের রীতি ও প্রকৃতি অনুভব করি।
কিন্তু যদি আমি মিডিয়াম না বদলাই? যদি আমি শুধু কবিতার মধ্যেই ছবি আঁকতে চাই? আমি চাই, আমার কবিতায়ই পাঠক ছবি দেখুক, অনুভব করুক। আমার দিক থেকে বললে, যেহেতু আমি লিখি, আঁকতে পারি না, তাই আমার শব্দই যেন আমার হয়ে আঁকে। কেননা আমি আঁকতে চাই।
আমার ‘ছুরি আর আপেলের জড়জীবন’ কবিতাটা পড়া যাক।
টেবিলে ছুরি আর আপেল
দুজন দুজনকে দেখছে।
ব্যাপারটা ভয়াবহ,
কিন্তু সামন্তবাদীদের জন্য উপভোগ্য।
ছুরিটা কে তৈরি করেছে
কামার।
এখন টেবিলে কীভাবে এলো ছুরিটা
এটাই প্রশ্ন।
আর আপেলের কথাটা
আপেলকেই ভাবতে হবে।
কে ওকে টেবিলে এনে রেখেছে?
কে ওকে ধারালো ছুরির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে?
কেন?
এটাকে কবিতা না বলে কেউ চাইলে সেজানের স্টিল লাইফ কিংবা মাতিসের কোলাজও বলতে পারে। অর্থাৎ এটি এক ধরনের ছবি, শব্দে শব্দে আঁকা।
হয়তো আর্ট কোনো না কোনো সময় তার নিজস্ব গণ্ডির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। আবার ফিরে যায়ও। ভাবো তো, এই কবিতাটা পড়তে পড়তে কি ভ্যান গঘের সূর্যমুখী ফুলের স্টিল লাইফ, অথবা তাঁর মলিন কয়েক জোড়া বুটজুতোর ছবি চোখে ভেসে ওঠে না?
এবার ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকর রেনোয়ার Portrait of Madame Monet (1874) ছবিটা মনে করি। তারপর পড়ি এই কবিতাটি।

রেনোয়া
ক্লদ মনের বউ
শুয়ে শুয়ে সুখী সুখী নিমগ্নতায়
বই পড়ছে।
এরকম একটা ব্রাইট এ্যান্ড কালারফুল অয়েল পেইনটিং
তুমি এঁকেছো।
কেন আঁকলে?
ওর প্রাইভেসি আর সোশাল এ্যাপিলের বিষয়টা মাথায় নিলে না
না কি কামিই
তোমার বন্ধুর বউ
এটা চেয়েছে?
তুমি কি ভালোবাসো ওকে
তুমি কি দেখেছো ওর সান,
ওর ইম্প্রেশান?
এখন
শুয়ে শুয়ে
ও বই পড়ছে
বই পড়ছে
আমি ওকে পড়ছি।
হ্যাঁ
আমি ওকে পড়ছি।
আর আমার টেবিল
আর আমার বইয়ের তাক
চাইছে আমাকে পিষে ফেলতে।
এটা কি ইমপ্রেশনিস্ট কবিতা?
এই কবিতাটা হয়তো শিল্পগুরু রেনোয়াই লিখতে পারতেন। কিন্তু সেই কাজটা শেষ পর্যন্ত করেছেন তাঁর ছেলে জ্যঁ রেনোয়া, ক্যামেরা হাতে। তিনি কলকাতায় এসে ‘The River’ চলচ্চিত্রটি বানিয়েছিলেন। হয়তো তাঁর পিতা পিয়্যের অগুস্ত রেনোয়ার কোনো অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা সেখানে অন্য মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল।
আর্টের নিয়তি হয়তো এটাই। একই কাজ তুলি, কলম, ক্যামেরা দিয়ে কত মানুষ যে কত জায়গায় বসে করে চলেছে।#




