এখন এই শীতকালে সারা কলকাতাই যেন উৎসবের মরশুম। নানান মেলা আর অনুষ্ঠান লেগেই আছে। বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় মঞ্চ এবং প্যান্ডেল তৈরি করতে হয়। এই সময় মালিকের কাছ থেকে ছুটি চাইলে যেমন ছুটি পাবে না, তেমনি নিজেরও অনেক আর্থিক ক্ষতি। কেননা সময়ের মধ্যে প্যান্ডেল, মঞ্চ শেষ করতে হলে তাদের ওভারটাইম খাটতে হয়। আর এই ওভারটাইম খাটলে একটা ভালো পরিমাণ অতিরিক্ত আয় হয়। ওভারটাইমের টাকায় জসিমউদ্দিন হাত দেয় না। এই টাকাটা সে আলাদা করে একটা ছোট অ্যালুমিনিয়ামের কৌটোয় ভরে রেখে দেয়। ওই অ্যালুমিনিয়ামের কৌটোর গায়ে রাতে শোবার আগে সে পরম মমতায় দু-তিনবার করে হাত বুলিয়ে তারপর ঘুমোতে যায়। ওই কৌটোতে যে তার স্বপ্ন বোনা আছে। সে স্বপ্নটা ওই দূরের আকাশকেও ছাড়িয়ে যায়। অসীম তার স্বপ্নের বিস্তার। তাই ওভারটাইমের টাকা পেলেই সেই টাকা তার স্বপ্নের বীজ হয়ে সেই কৌটোর মধ্যে ঢুকে যায়। ওই কৌটোর মধ্যেই তো তার স্বপ্নের বীজ ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়ে উঠছে। ওই টাকা সে তিল তিল করে জমিয়ে রাখছে তার মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করার জন্য। জসিমউদ্দিনের খুব ইচ্ছা ছিল, সে লেখাপড়া শিখে ভদ্রলোকের মতো একটা চাকরি করবে। কিন্তু তার যখন পাঁচ বছর বয়স, তখনই তার বাবা রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজে গিয়ে ভাড়ার থেকে পড়ে গিয়ে হঠাৎ করে মরে গেল। সেদিনই জসিমউদ্দিনের সব স্বপ্ন ভেঙে চুরে খান খান হয়ে গিয়েছিল। সেই স্বপ্নকে সে এখন বাস্তবায়িত করতে চায় তার আদরের সোনা মেয়ে রাইসার মধ্য দিয়ে। তাদের পাড়ার মৌলবি সাহেব রাইসার নাম শুনে বলেছিলেন, “আরে, এ তো দারুণ নাম। জসিম, তুমি কি জানো রাইসা মানে কী?”
সত্যি কথা বলতে, জসিম রাইসা শব্দের মানে জানে না। তাই সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল। জসিমের মুখের দিকে তাকিয়ে মৌলবি সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন যে জসিম এই নামের মানে জানে না। তখন তিনি নিজেই বলেছিলেন, “রাইসা মানে রানী। তোমার মেয়ে রানী হবে গো, জসিম!”
এই কথা শুনে জসিমের বুকে এক আনন্দের ডেলা ঠেলে মেরে উঠেছিল।
অন্যান্য লেবারদের মতো জসিমউদ্দিনও সারাদিনের কাজের ক্লান্তিতে রাতে খাওয়ার পরই ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে। মাঝে মাঝে সে ঘুম থেকে জেগে উঠে বিছানায় বসে পড়ে। সে একটা স্বপ্ন প্রায়ই দেখে। দেখে, তার সেই কৌটোটা একটা বিরাট তালগাছ হয়ে তার ঘরের টিনের চালা ফুটো করে একেবারে আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। তাদের গ্রামের সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অবাক হয়ে সেই তালগাছের মাথার দিকে তাকিয়ে দেখছে। আর বলছে, “সত্যি জসিম, তুই একটা কাজের কাজ করেছিস বটে। এই তালগাছটা আমাদের পাড়ার গর্ব।”
মাঝে মাঝে জসিমউদ্দিন যেন দেখে, সেই তালগাছটার মাথায় বসে আছে তারই আদরের মেয়ে, হৃদয়ের ধন। ওখানে সে রাইসার মুখটা যেন দেখতে পায়। রাইসার চোখেমুখে উজ্জ্বল সোনালি রোদের ঝিকিমিকি। জসিমের ভয় করে। যদি সেখান থেকে সে কোনো কারণে পড়ে যায়, তবে তো মহা সর্বনাশ! ভয়ে সে কেঁপে ওঠে। আতঙ্কে জসিমের শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে যায়। তারপরেই তার ঘুমটা ভেঙে যায়। কিছুক্ষণ বিছানার উপর বসে থেকে সে ধাতস্থ হয়ে নেয়। তারপর বিছানার পাশেই রাখা সস্তা প্লাস্টিকের বোতলের জল ঢকঢক করে খেয়ে নেয়। একটু মানসিক স্থিতি এলে সে ভাবে যে এসব স্বপ্ন, সত্যি নয়। নিশ্চয়ই পেট গরম হয়েছিল। তাই এইসব উল্টোপাল্টা স্বপ্ন সে দেখেছে। নিজেকে নিজেই আশ্বস্ত করে নিয়ে সে আবার ঘুমোবার চেষ্টা করে।
একবার ঘুম ভেঙে গেলে সহজে আর ঘুম আসতে চায় না। একটা বড় টিন ও তাবুর ঘরেই ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ জন লেবারের ঢালা বিছানা। এক কোনায় রান্নাখাওয়ার ব্যবস্থা। আর পুরো জায়গাটা জুড়ে খড় বিছিয়ে, তার উপরে যার যার কাঁথা, কম্বল বিছিয়ে তাদের বিছানা নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছে। সারাদিন খাটাখাটনির পর সবাই মিলে এক আস্তানায় এসে একসঙ্গে জড়ো হয়ে নিজেদের মধ্যে সুখ-দুঃখের বিনিময় হয়। এর মাধ্যমেই তাদের মধ্যে যেন এক যৌথ যাপনের অলীক সুখ ছড়িয়ে পড়ে। সারাদিন বাইরে বাইরে। রাত এখানেই কাটে।
তাই রাতের বেলায় তাদের মধ্যে আলাপচারিতা জমে ওঠে। সারাদিন তো কাজেই ব্যস্ত থাকতে হয়। এইটুকু সময়ের জন্যই তারা অপেক্ষা করে সারাদিন। তারপর যৌথভাবে রান্না হলে খাওয়াদাওয়া করেই বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়।
সমস্যাটা হয় ভোরবেলা। মাত্র দুখানা টেম্পোরারি পায়খানা। সকালে লাইন পড়ে যায়। কে কার আগে পায়খানায় লাইন দেবে, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে একটা অনুচ্চারিত প্রতিযোগিতা তো আছেই। তাই মাঝে মাঝে এরকম স্বপ্ন দেখলে, যখন আর কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না, তখন সে চেষ্টা করে সবার আগে প্রাতঃকৃত্যটা সেরে ফেলতে। জসিমের ভয় হয়, যদি গণেশ দাস বা সুকুর আলি একবার পায়খানায় ঢোকে, তবেই হয়ে গেল। আধঘন্টার আগে বেরোনোর নাম করে না ওরা। এদিকে বাইরে লাইন। পায়খানার টিনের দরজায় পেটাপেটি।
(দুই)
এবছর জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা, মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে তার মেয়ে রাইসা। মেয়েটা বড় মুখ করে বলেছিল, “আব্বু, তুমি কিন্তু আমাকে পরীক্ষার সেন্টারে নিয়া যাবা।”
জসিম ভেবেছিল, সে ছুটি নেবে মেয়ের পরীক্ষার সময়। কিন্তু ওই যে, এ সময়টাতেই কলকাতায় চলে উৎসবের মরশুম। বইমেলা, শিল্পমেলা, খাদ্যমেলা, ফুলের মেলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য মালিকের বড় বড় প্যান্ডেলের বায়না ধরা থাকেই। ফলে জসিম কেন, তাদের কোনো লেবারই ছুটি পায়নি। আজ প্রায় মাস তিনেক ধরেই কলকাতায় মালিকের তৈরি ডেরায় তাদের বসবাস।
জসিম ভাবে, তাদের বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রামে জসিমের মেয়ে রাইসাই এই প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। তাই গ্রামে নিশ্চয়ই বেশ হৈচৈ ব্যাপার ঘটছে। অথচ সে থাকতে পারল না। মেয়েটার মন নিশ্চয়ই খুব খারাপ। তবুও শুধু জসিম বা রাইসার মা রোশেনারার নয়, গ্রামের সবারই খুব আনন্দ। রাইসা তো শুধু জসিমউদ্দিন আর রোশেনারার নয়, সারা পাড়ারই সে যে নয়নের মণি। জসিমের অনেক অনেক স্বপ্ন তার মেয়ে রাইসাকে নিয়ে।
অন্যদিকে রাইসাও কিছু কম যায় না। সে নীরবে তার বুকের মধ্যে একটি স্বপ্নকে সব সময় লালনপালন করে যায়। রাইসা তার স্কুলের দিদিমণিদের অনুপ্রেরণায় স্বপ্ন দেখে—সেও একদিন উচ্চশিক্ষিত হয়ে স্কুলের টিচার হবে। আর যেদিন সে তার চাকরিতে জয়েন করবে, সেদিনই সে তার আব্বুকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে এনে বাড়িতে শুধু ফুলবাগানের দেখভালের দায়িত্ব দেবে। আর কোনো পরিশ্রমের কাজ করতেই দেবে না।
কোনো দিনই সে তার আব্বুকে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বা কখনো কখনো রাত্রি পর্যন্ত মালিকের খেদমত খাটতে দেবে না। তাদের সংসারটা দেখতে গিয়ে তো আব্বু প্রায় সারা জীবনই বাড়ির বাইরে থেকে গেল। তার মা তো তেমনভাবে আব্বুকে পেলই না! আব্বু পায়নি তার মাকে। সেও তো তেমনভাবে পায়নি তার আব্বুর সাহচর্য। জীবনকে সচল রাখার জন্য তাদের এই না-পাওয়াটা চলে গেছে জীবনেরই পর্দার আড়ালে।
(তিন)
দুটো পরীক্ষা বেশ ভালো হয়েছে রাইসার। সে পরীক্ষা দিয়ে খুশি। আগামী দুদিন পরীক্ষা নেই। ভীষণভাবে তার আব্বুর কথা মনে পড়ছে। ঠিক তখনই খবরটা তাদের বাড়িতে এসে পৌঁছল।
কলকাতার এক প্যান্ডেল মালিক তার লেবারদের থাকার ঘরে রাতে বাইরে থেকে তালা দিয়ে নিজের বাড়িতে নিশ্চিন্ত আরামে ঘুমোতে গেছে। এদিকে লেবারদের ঘরে রাতে আগুন লাগায় কেউ ভিতর থেকে বেরোতে পারেনি। বাঁচার জন্য আর্তনাদ ও চিৎকার করে কোনো লাভ হয়নি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রায় সাতাশ থেকে আঠাশ জন লেবার, যারা ওই ঘরে ছিল, সবাই পুড়ে মারা গেছে।
বিভিন্ন খবরের চ্যানেল ও কাগজে এ নিয়ে তুমুল হইচই। বিভিন্ন সামাজিক ও গণসংগঠন এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জন্য সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি এবং মৃতদের পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক সাহায্য, এবং পরিবারের একজন সদস্যকে কর্মসংস্থানের দাবিতে মিছিল-মিটিং করছে কলকাতার রাজপথে।
রাস্তা-ঘাটে, ট্রেনে-বাসে সর্বত্রই এই আলোচনা। এই আলোচনায় কান পাতলে মনে হবে, হয়তো এই কারণে প্রায় সব বাড়িতেই অরন্ধন চলছে। কিন্তু শহরের ফুটপাতের খাবারের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট—সব জায়গাতেই মানুষ খাবারের জন্য লাইন লাগিয়েছে।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে মাইকে “শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে”র সুর ইথারে ভেসে বেড়াচ্ছে।
(চার)
রাইসা বা রোশেনারার চোখে জল নেই। আছে শুধু এক অনন্ত শূন্যতা। তাদের মতো অন্যান্য লেবারদের পরিবারের মানুষজনও সেই জতুগৃহের সামনে বসে আছে একরাশ হতাশা আর হাহাকারকে বুকের মধ্যে গুঁজে দিয়ে। প্রত্যেকেই তাদের প্রিয়জনের মৃতদেহ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু শুধুমাত্র কালো ছাই ছাড়া কোনো মৃতদেহেরই অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল না। শুধুমাত্র গোটা ছয়েক না-ছাই হয়ে যাওয়া মানুষের হাড় পাওয়া গেল। খবরের কাগজে এবং টেলিভিশনের পর্দায় সেই ছবি দেখে মানুষ শিউরে উঠল। অথচ কলকাতার রাজপথে ও বিভিন্ন অঞ্চলে উৎসবের এবং মাতামাতির কোনো খামতি কোথাও দেখা গেল না।
জতুগৃহের চারদিকে পুলিশে পুলিশে ভর্তি। তদন্তকারীর দল ভীষণভাবে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর এক পুলিশ আধিকারিক ঘোষণা করলেন যে, দেহ শনাক্ত করার জন্য মৃত মানুষের ছাই ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হবে। ওইখান থেকে রিপোর্ট এলে তবে তারা মৃতদের পরিবারের হাতে তাদের ছাই তুলে দেবেন। এর জন্য প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের হাতে স্ট্যাম্প মেরে সই করে একটা হলুদ কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হলো। ফরেনসিক তদন্ত সম্পূর্ণ হলে এবং রিপোর্ট এলে এই হলুদ কাগজ নিয়ে এসে পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রিয়জনের দেহভস্ম সংগ্রহ করতে পারবে।
তার আব্বুর শরীরে একটু মাটি দেওয়ার আগেই আব্বুর শরীর ছাই হয়ে মাটির সঙ্গে এমনভাবে, একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষের জন্য, মাটিতেই মিশে গেল সারা জীবনের জন্য! রাইসা কিছু ভাবতেই পারে না। তার হাতে ধরে রাখা হলুদ কাগজটার উপর যেন একটা পরিবারের এবং সমাজের এক ভীষণ ও ভয়ানক পাণ্ডুরোগের ছায়া উথলে উঠতে দেখল রাইসা। তাদের জীবনটা সবুজ থেকে হলুদ হয়ে গেল নিমিষেই!




