সম্প্রতি আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের এক নতুন দণ্ডবিধি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ‘বৈধতা’ দিয়েছে। আইনের ধারা অনুযায়ী, ‘হাড় না ভাঙা’ পর্যন্ত স্ত্রীকে মারতে পারবে স্বামী। এই আইন এক ধরনের আইনভিত্তিক সহিংসতার প্রণোদনা, যা নারীর মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতি অবহেলার প্রতিফলন।
এই আইনটি আরও নিকৃষ্ট কারণ একই অপরাধের শাস্তি নির্ভর করছে সামাজিক অবস্থানের ওপর। ধনী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত মুক্ত, নিম্ন শ্রেণির মানুষ কঠোর শাস্তির মুখোমুখি। এটাও সামাজিক অসাম্যকে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই বিষয়টি সতর্কবার্তা দেয়। দেশের কিছু পুরুষতান্ত্রিক গোষ্ঠীর মধ্যে মনোভাব স্পষ্ট যে, নারীর স্বাধীনতা সীমিত করা, ধর্ম ও প্রথার আড়ালে নারী ও শিশুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। আফগানিস্তানের ঘটনা আমাদের দেখায় যে ধর্ম বা পুরনো সামাজিক কাঠামোর নামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা উপেক্ষিত হলে সহিংসতা আইনসম্মত রূপ নিতে পারে।
আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি ধর্মীয় উন্মাদনা, খাদ্য ও ঔষধে ভেজাল, হাসপাতাল দুর্নীতি, জমি-সম্পত্তি দখল, নারী ও শিশু নির্যাতন। ধর্মীয় লেবাস ধারণ করলে অপরাধ কমে না, বরং বাড়ে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাফত মজলিসের নেতা মামুনুল হক আফগানিস্তান সফর করেছেন। এরপর ২০২৬ সালের শুরুতে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেল নূর আহমদ নূর সহ উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতারা বাংলাদেশ সফর করেছেন।
এই সফরগুলোর লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক যোগাযোগ, রাজনৈতিক মতবিনিময় এবং বাংলাদেশের খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। তবে আফগানিস্তানের মতো নারীর অধিকার সংকটাপন্ন একটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। প্রশ্ন জাগে: ধর্ম বা রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালে কি নারীর অধিকার সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে? আমরা জানি যে, নীরবতা ও আপস অনেক সময় বড় বিপদের সূচনা করে।
একটি দেশের সভ্যতা জানা যায় নারী ও শিশুর প্রতি আচরণের মাধ্যমে। আফগানিস্তানের উদাহরণ স্পষ্ট বার্তা দেয়: নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষার জন্য শক্তিশালী আইন এবং সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য। তা না হলে সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে উঠতে সময় লাগে না।
আমরা আহ্বান জানাচ্ছি সকল সভ্য রাষ্ট্রকে যে আফগানিস্তানের সরকার যদি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ না করে এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা না করে, তবে আন্তর্জাতিকভাবে আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের শর্তাবলী পুনর্বিবেচনা করা উচিত। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিহত করা একটি নৈতিক এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। এটা শুধুমাত্র আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, মানবতার প্রশ্ন।
কিন্তু কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের নিজেদের সমাজের ভেতরেও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ধর্মীয় মঞ্চে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্ট করে বলতে হবে যে নারীও মানুষ, সম্পত্তি নয়; তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা সভ্যতার অন্যতম শর্ত।
নীরবতা কখনও নিরপেক্ষতা নয়; অনেক সময় তা সহিংসতার পক্ষেই দাঁড়ায়। তাই প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব, নারী নির্যাতন দেখলে প্রতিবাদ করা, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিকভাবে নির্যাতনকারীদের বয়কট করা। ধর্মের নামে, সংস্কৃতির নামে কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার আড়ালে কোনোভাবেই নারীর অধিকার খর্ব করা চলতে পারে না।
আজ আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করে। আমরা কি সমতা ও মানবিক সমাজ গড়ব, নাকি নীরব থেকে অন্যায়ের বিস্তার হতে দেব? সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল আইনের দায়িত্ব নয়, এটা আমাদের সম্মিলিত দায়।#




