সমকালীন সংবাদপত্রে বিধবাবিবাহ 

ঊনিশ শতকের বাংলায় বিধবাবিবাহ আন্দোলনের সময় থেকেই বাংলার জনচিত্ত যে প্রকৃত অর্থে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল, একথা তখনকার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত জনমতের আধিক্য থেকেই বুঝতে পারা যায়। এপ্রসঙ্গে ১৮৫২ সালের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় সর্বপ্রথম একটি মজার চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল বলে দেখা যায়। বিধবাবিবাহের বিষয়ে মতামত প্রকাশের অভিনবত্বের বিচারে এবং বর্তমানে রীতিমত দুষ্প্রাপ্য হওয়ার কারণে উক্ত চিঠিটির কিছুটা অংশ এখানে অবশ্য উল্লেখ্য। অহল্যাদাসী, দ্রৌপদীদাসী, তারাদাসী, মন্দোদরীদাসী ও কুন্তীদাসীর জবানীতে লেখা এই পত্রটিতে বলা হয়েছিল—
“প্রভাকর সম্পাদক মহাশয়। অস্মদাদির আবেদন পত্র প্রকটন পূর্ব্বক আশ্রয়বিহীনাদিগ্যে আশ্রয় দিবেন।
বিধবার বিবাহের উপায়।
ওলো দিদী তোয়ের হও।

শুনেছিস পাথুরেঘাটা নিবাসিনী এক বিধবা ব্রাহ্মণ সমান্তিনী এ নারির নিকটে ভাগড়া হইয়াছেন। পাত ২।৩ বাঙ্গালা লেখা বাইবেল উলটাইয়া পতিবিয়োগ বিরহ যন্ত্রণা হইতে উদ্ধারের সাধু সেতু সংস্থাপিত করিয়াছেন। বাল্যকালে সাঁজ বিয়ানে এয়োব্রতের ফলে পতিহত হইয়াছিল প্রবল বাইবল সনাতন ধর্ম পুনঃপতি মিলাইয়া দিবে। চল সই তাঁহার শরণ লই। ঘরে আর কি কার্য? মনুদাদার শাস্ত্র অস্ত্রবৎ জর্জরীভূত করিতেছে, তাঁহার কি বিধবা কন্যা এবং ভগিনী ছিল না? বোধহয় তাহা থাকিলে বিধবার দ্বিসংস্কার জন্য ২।১টা শীতল বচন অবশ্যই লিখিতেন, অতএব এমত নিষ্ঠুর ধৰ্ম্ম লইয়া কি ধুয়ে খাব? অপর একজন ব্রাহ্মণতনয়া পিতামহের নিন্দা শ্রবণে কহিলেন। ও সই, মিছে মনুদাদার গ্লানি করিতেছিস, জানিসতো, মনুদাদার মত এক্ষণে বাবুদের মধ্যে চলে আর না চলে। কখন কি এমত শুনেছিস খ্রীষ্টান হইয়া পুনঃ জাত পায়। মনুর দেইনি মনুর বাবাও এমত বিধি দেন নাই। বাবুদের ঘরে আগুন লেগেছে সেই জন্য জল আন জল আন শব্দ করিতেছেন, শ্রীমতী ভগীদিদী এ পক্ষের পথ দেখায়াছেন; বোধ হয় এ পক্ষে এ ক্ষণে সকলে পক্ষপাত বিহীন হইবেন এবং অচিরে বিধবা উদ্ধারিণী নামী সভা স্থাপিতা হইবে। ভাবনা কি? চল, আগে বাবুদের কাছে জানাই। যদি তাঁহারা আমারদের কোন উপায় না করেন তবে বাইবেল সলিলে অবগাহন পূর্ব্বক বিরহানল নির্ব্বান করিব; হরির খুড়া সংপ্রতি স্কাটলেণ্ডে মৃত চামরা পিতামহের পদাভিষিক্ত হইয়াছেন। কে আর আমারদিগ্যে বাইবল দিবে। বাইবল! তোমাকে চিন্তা করিতে করিতে যেন বায়ু বলিষ্ঠ না হয়।” (সংবাদ প্রভাকর, ১১ই নভেম্ব, ১৮৫২ সাল)

লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, উপরোক্ত পত্রটিতে সরসভঙ্গিতে বিধবাবিবাহ এবং খৃষ্টধর্ম—উভয়কেই ব্যঙ্গ তো করা হয়েছিলই, একইসাথে কায়দা করে একথাও বলা হয়েছিল যে—হিন্দুধর্মে বিধবাবিবাহ নেই।

এরপরে ১৮৫৫ সালের ৭ই মার্চ তারিখের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় ‘অহংযথার্থবাদী’ পরিচয়ের আড়ালে সমকালীন জনৈক ব্যক্তির একটি পত্র মুদ্রিত হয়েছিল। এই পত্রপ্রেরক আবার বিধবাবিবাহের সমর্থক ছিলেন। সমকালের ধর্মানুরঞ্জিকা পত্রিকা ও সেটির সম্পাদক নন্দকুমার কবিরত্ন রক্ষণশীলতার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাই উক্ত পত্রিকায় নন্দকুমার-কৃত বিদ্যাসাগরনিন্দার প্রতি নিজের প্রতিবাদ জানিয়েই ‘অহংযথার্থবাদী’ তাঁর এই পত্রটি রচনা করেছিলেন। সেযুগের সাধারণ মানুষকে বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত বাদ-প্রতিবাদ কতটা প্রভাবান্বিত করেছিল—উক্ত প্রতিবাদ থেকেও একথা বুঝতে পারা যায়।

বিদ্যাসাগর যখন তাঁর বিধবাবিবাহ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, রাধাকান্ত দেব যদিও তখন খুবই বৃদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু তবুও তদানীন্তন হিন্দুসমাজে তাঁর প্রভাব তখনও অক্ষুণ্ণ ছিল। বস্তুতঃ তাঁর বিধবাবিবাহবিরোধিতাই সেযুগের রক্ষণশীল মানুষকে প্রেরণা দিয়েছিল। একারণে রাধাকান্ত দেবকে সম্বোধন করে মেদিনীপুরের কয়েকজন ব্রাহ্মণ রমণী তখন বিধবাবিবাহ বিষয়ে একটি পত্র রচনা করেছিলেন। এই পত্রে বিদ্যাসাগরের আন্দোলনকে সমর্থন করা হয়েছিল। তৎকালীন জনচিত্তে বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত আন্দোলনের প্রভাব যে কতটা পড়েছিল, সেটার একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল হওয়ার জন্য এখানে উক্ত পত্রটির কিয়দংশ উল্লেখ করবার প্রয়োজন রয়েছে, যা নিম্নরূপ—
“আমরা অতি শৈশবাবস্থায় পতিরত্ন বিহীনা হইয়া এ পর্যন্ত অসহ্য বৈধব্য-যন্ত্রণায় কাল যাপন করিতেছি, কিন্তু অদ্যাবধি আমারদিগের ক্লেশ নিবারণের কোন সদুপায় প্রচলিত না হওয়াতে অস্মদগণ পক্ষে বিবিধ অনিষ্ট ঘটনা হইতেছে। অধুনা শ্রুত হইলাম দেশহিতৈষীগুণরাশি বিপুল যশস্বী অদ্বিতীয় পণ্ডিতবর গুণসাগর শ্রীযুত ঈশ্বরচন্দ্র বহ্বায়াসে বিবিধ শাস্ত্রান্বেষণ করত পরিশেষে বর্তমান কলিযুগের প্রচলিত শাস্ত্র অর্থাৎ পরাশর সংহিতা হইতে বিধবা বিবাহ হওনের যে শাস্ত্র প্রচার করিয়াছেন, তৎপাঠে বিদিত হইল যে বিধবাদিগের পুনঃপরিণয় কিছু অশাস্ত্রিক নহে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে আমারদিগের দেশীয় পণ্ডিতমহোদয়েরা শ্রীযুত বিদ্যাসাগরের এই উৎকট পরিশ্রমে বাধিত না হইয়া তাহাতে নানা প্রকার ফন্দি তুলিতেছেন, এবং স্থানে স্থানে দলবদ্ধ হইয়া যুক্তিসিদ্ধ শাস্ত্রীয় প্রথা যাহাতে প্রচলিত না হয় তাহারাই (!) চেষ্টায় যত্নশীল হইয়াছেন, …” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৪র্থ খণ্ড, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, পৃ: ৭৬৯-৭৭০)

এছাড়া পূর্বোক্ত পত্রটিতে রাধাকান্ত দেবকে বিধবাবিবাহ সমর্থন করবার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল, এবং একইসাথে একথাও বলা হয়েছিল—
“ভগবান পরাশর বাক্য প্রচলিত করিতে যত্নশীল হউন, নচেৎ মহাশয়কে ভবিষ্যতে শতশত ভ্রূণহত্যা পাপে জড়িত হইতে হইবে, …” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৪র্থ খণ্ড, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, পৃ- ৭৭০)

পত্রটির এই অংশ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, উপরোক্ত পত্রটির লেখিকারা বিধবাবিবাহ নিয়ে বৃদ্ধ রাধাকান্ত দেবের ওপরে পরোক্ষভাবে যে চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই পত্রটি যথার্থ কোন মহিলার রচনা ছিল কিনা, এবিষয়ে তখনও প্রশ্ন উঠেছিল এবং আজও প্রশ্ন রয়েছে। তবে সমকালীন জনচিত্তে বিধবাবিবাহের প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ নির্ণয়ের ব্যাপারে এই পত্রটির ঐতিহাসিক মূল্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সেযুগের অনেক মানুষ যেমন বিধবাবিবাহ আইনের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার কথা শুনে খুশি হয়েছিলেন, তেমনি এবিষয়ে অখুশি মানুষের সংখ্যাও তখন কম কিছু ছিল না; শুধু সেটাই নয়, এবিষয়ে উপযুক্ত আইনের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার সংবাদে তাঁরা তখন খুবই বিক্ষুব্ধও হয়ে উঠেছিলেন। বিধবাবিবাহের বিরুদ্ধে তাঁদের এই বিক্ষোভ ও বিরোধিতা প্রসঙ্গে সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় সেকালের একজন মহিলা যে পত্রটি লিখেছিলেন তাতে—এবিষয়ে সমকালীন ব্যক্তিদের বিক্ষোভ ও পত্রলেখিকার পত্ররচনা—উভয়ের মধ্যেই তখনকার জনচিত্তের প্রতিফলনই লক্ষ্য করা যায়। এই পত্রলেখিকা তাঁর পত্রে এবিষয়ে বিক্ষোভকারীদের নির্দয় বলে অভিহিত করেছিলেন এবং বিধবাবিবাহ আইন যাতে খুব শীঘ্রই বিধিবদ্ধ হয়—এর জন্য পত্রিকার সম্পাদক মহাশয়কে লেখনী ধারণ করবার অনুরোধও জানিয়েছিলেন। (সংবাদ প্রভাকর, ১৪ই ডিসেম্বর, ১৮৫৫ সাল) অবশ্য এই পত্রটিও সত্যিই সেযুগের কোন মহিলা লিখেছিলেন কিনা—এবিষয়ে বিতর্ক রয়েছে।

এপ্রসঙ্গে এখানে সেযুগের আরেকজন মহিলার পত্রের কথাও বলবার প্রয়োজন রয়েছে, যাঁর পত্রটি সম্বাদ ভাস্কর পত্রিকায় ‘বিদ্যাদেবী’ নামে মুদ্রিত হয়েছিল। মাত্র সাত বছর বয়সে এই বিদ্যাদেবীর চল্লিশ বছর বয়স্ক একজন ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল, এবং এই বিবাহের মাত্র একবছরের মধ্যেই তিনি বিধবা হয়েছিলেন। তাই পরবর্তী সময়ে তিনি যখন বিধবাবিবাহ বিষয়ক আইন পাসের সম্ভাবনা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে উঠেছিলেন, তখন তাঁর মধ্যেও এবিষয়টি নিয়ে একটি প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল, এবং আলোচ্য পত্রটিতে এবিষয়ে তাঁর সেই প্রতিক্রিয়ায় তাঁর বেদনা ও আনন্দ উভয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি লিখেছিলেন—
“আপনারদিগের উদ্যোগে এদেশের দারুণ কুসংস্কার পরাভূত হইয়া বিধবাবিরাহ চালিত হইবে বটে কিন্তু এক্ষণে তাহার অনেক বিলম্ব দেখা যাইতেছে, আমার শরীরে স্বামী সুখের সম্ভাবনা নাই, কারণ ততদিন যে বাঁচিয়া থাকিব এমত আশা নাই, তথাপি এই সুখ হইল যে মরিবার সময় পরমানন্দে প্রাণত্যাগ করিব, কারণ যদিচ আমি ঐ সুখ হইতে বঞ্চিতা হইলাম তথাপি আমার ন্যায় শত ২ স্বামিহীনা কামিনীর যে সুখ হইবে ইহাই স্মবণ করিয়া মরিব, …” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, পৃ- ৪৮৪)

বিধবাবিবাহ আইন প্রবর্তিত হওয়ার পরে প্রথম অনুষ্ঠিত বিধবাবিবাহের পাত্রীকে নিয়ে তৎকালীন সমাজে নানা কুৎসা প্রচার করা হয়েছিল। বিধবাবিবাহের জন্য ভদ্রসমাজের কন্যা পাওয়া দুর্লভ—একথা প্রচার করাই সেসব কুৎসারটনাকারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করবার জন্য তখনকার প্রগতিশীল ব্যক্তিরাও এগিয়ে এসেছিলেন, এবং নানা তথ্যসংগ্রহ করে তাঁরা প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছিলেন যে, প্রথম বিধবাবিবাহের পাত্রী আসলে একজন সম্ভ্রান্ত বংশেরই কন্যা। এসবের ফলে সেযুগের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এবিষয়ে জোরালো মতামত বিনিময় ঘটেছিল। এবিষয়ে ১৮৫৬ সালের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় যে ব্যঙ্গাত্মক পত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে বিধবাবিবাহ বিরোধী জনমত স্পষ্টভাবেই দেখতে পাওয়া যায়। উক্ত পত্রটির কিছুটা অংশ নিম্নরূপ ছিল—
“সংপ্রতি এক শুভজনক সংবাদ শ্রবণে বড়ই সন্তোষিত হইয়াছি, শুনিলাম যে চক্রবর্তি, ঘোষাল, হড়, গুড়, গড়াগডি ইত্যাদি উপাধিবিশিষ্ট ব্যক্তি ব্যুহের উপকারক শ্রীযুত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শ্রীচরণ প্রসাদাৎ এ রাজ্যে Second Hand (সেকেণ্ড হেণ্ড) রমণী অর্থাৎ দ্বোজবোরে কোনে চলন হইবেক, এ কারণ ভরসা করি যে আমরা অতি সুলভ মূল্যেই মনোহরা মহিলালাভ করিতে সমর্থ হইব, আর চারি পাঁচশত মুদ্রা সংগ্রহ করিয়া অশীতি ও নবতী বৎসরে পঞ্চম বর্ষীয় বালিকা বিবাহ করিতে হইবে না, …” (সংবাদ প্রভাকর, ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৫৬ সাল)

বস্তুতঃ তখন বিধবাবিবাহ আন্দোলনের সামাজিক প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হয়েছিল বলেই এবিষয়ে আইন প্রবর্তিত হওয়ার পরেও সেযুগে প্রবলভাবে বিধবাবিবাহের বিরোধিতা করা হয়েছিল। একথার উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, ১৮৭২ সালের আষাঢ় সংখ্যার হালিসহ পত্রিকায় ‘বঙ্গদেশীয় সমাজ সংস্করণ’ শিরোনামের যে প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে এবিষয়ে বিরোধিতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এছাড়া সেযুগে বঙ্গদর্শন, নবজীবন, সাধারণী প্রভৃতি পত্র-পত্রিকাতেও বিধবাবিবাহবিরোধী জনমত প্রকাশিত হয়েছিল।

বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহের বিষয়ে সক্রিয় হয়ে উঠবার অনেক আগে থেকেই ঊনিশ শতকের বাংলায় বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত বিতর্কমূলক রচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেসব রচনাগুলির মধ্যে ১৮৪২ সালের এপ্রিল মাসের বেঙ্গল স্পেক্টেটর পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বিধবার পুনর্বিবাহ’ শিরোনামের প্রবন্ধটির কথা এখানে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। উক্ত রচনাটি সেকালের একজন জনৈক পত্রপ্রেরকের কাছ থেকে পত্রিকায় প্রেরিত হয়েছিল। সেই পত্রদাতা বিধবাবিবাহের সমর্থক ছিলেন। এবিষয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল যে—নারদ, শঙ্খলিখিত বা অন্যান্য কয়েকজন ঋষির শাস্ত্রে ব্যবহৃত পুণর্ভূ শব্দের ব্যবহার থেকে বোঝা যায় যে, প্রাচীন ভারতে বিধবার বিবাহ অপ্রচলিত ছিল না। এছাড়া এই লেখক তাঁর প্রবন্ধে যাজ্ঞবল্ক্যের এই বক্তব্যও তুলে ধরেছিলেন যে, বিধবার বিবাহ ঘটলেও তাঁর সতীত্ব কোনভাবেই নষ্ট হয় না। এরপরে পত্র রচয়িতা জানিয়েছিলেন যে, যদিও মনুসংহিতাতেও বিধবাবিবাহের উল্লেখ রয়েছে, তবুও সেখানে এধরণের বিবাহে ‘দান নিষিদ্ধ’–সংস্কারই বিধেয়; তাঁর কথিত দ্বাদশ প্রকার পুত্রের মধ্যে পৌনর্ভবেরও উল্লেখ রয়েছে। এরপরে পত্রদাতা নানা শাস্ত্রীয় বচনের মধ্যে দিয়ে বিধবাবিবাহ বিষয়ে বিরোধের মীমাংসা করে বলেছিলেন—
“গুণবান পৌনর্ভব পুত্রের একাংশ ভাগিতা (পিতার সম্পত্তিতে) এবং দায়াদত্ব সংস্থাপন করা যায়। আর যদ্যপিও তাঁহার আংশিক কিম্বা সময়ানুসারে সম্পূর্ণ ধনাধিকারিত্ব আছে তথাপি ঔরস পুত্রাদির অসত্ত্বেও কদাপি রাজ্যাধিকার নাই ও অসবর্ণ হইলে কেবল গ্রাসাচ্ছাদন প্রাপ্তি মাত্র। কিন্তু শূদ্রের প্রতি উক্ত পুত্র সকলের অংশ দানের বিভিন্ন মত খণ্ডিত হইয়া ঔরস পুত্রের সহিত তুল্যাংশিতা ব্যবস্থাপিতা হইয়াছে।” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, পৃ- ৭৮)

এই পত্রদাতা পরিষ্কার করেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তন্ত্রশাস্ত্রেও বিধবাবিবাহকে নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হয় নি; এমনকি বেণরাজার আমলেও বিধবাবিবাহ প্রচলিত ছিল ও পরবর্তীকালে এই বিবাহ অন্যদের জন্য নিষিদ্ধ হলেও শূদ্রের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ হয়নি। বরং প্রাচীন ভারতে অন্ত্যজদের মধ্যেই এই ধরণের বিবাহের প্রচলন বেশি ছিল। এসব তথ্য খতিয়ে দেখে শেষপর্যন্ত পত্ররচয়িতা এই সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে, বিধবাবিবাহ—
“শাস্ত্রামূলক নহে কিন্তু বহুকাল পর্যন্ত সাধারণে অপ্রচলিত থাকাতে দ্বেষ্য হইয়াছে এবং উক্ত পুণর্ভূ বিবাহ পুনঃস্থাপিত হইলে তৎপুত্রের দায়াধিকারক্রম অস্মদ্দেশীয় শাস্ত্র হইতে উদ্ধৃত হইতে পারে।” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, পৃ- ৭৯)

পরিশেষে একথাও উল্লেখ্য যে, এই পত্ররচয়িতাও কিন্তু বিধবাবিবাহের বিষয়ে তৎকালীন দেশের সরকারের সাহায্য গ্রহণ করবার পক্ষপাতী ছিলেন। গবেষকদের মতে, যদিও এই পত্রদাতার বক্তব্য খুব যে ব্যাখ্যামূলক বা বিশ্লেষণাত্মক ছিল—সেটা নয়, কিন্তু তবুও সেকালের হিসেবে প্রগতিশীল বক্তব্যের প্রকাশ ঘটবার জন্য এই পত্রটির একটি ঐতিহাসিক মূল্যও রয়েছে। তাছাড়া সমকালীন ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, এই পত্রদাতার বক্তব্য তখন দেশের কোন কোন মহলে বেশ আলোড়নের সৃষ্টিও করেছিল। আর একারণেই এরপরে ১৮৪২ সালের ২৬শে এপ্রিল তারিখের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় উপরোক্ত পত্রের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পত্রপ্রেরক জানিয়েছিলেন যে, একবার সম্প্রদান করা হয়ে গেলে সেই কন্যার ওপরে পিতামাতার আর কোন স্বত্ব থাকে না, অতএব বিধবাকন্যাকে দ্বিতীয়বার সম্প্রদান করা সম্ভব নয়।

কিন্তু এই পত্রপ্রেরকের বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ১৮৪২ সালের পঞ্চম সংখ্যার বেঙ্গল স্পেক্টেটর পত্রিকায় প্রকাশিত আরেকটি পত্রে প্রতিবাদকারী লেখক জানিয়েছিলেন যে, মনুর মত অনুযায়ী বিধবাবিবাহে দান না থাকলেও সংস্কার কিন্তু রয়েছে; তাছাড়া বিধবা নিজেই নিজেকে দান করতে পারেন। এছাড়া স্পেক্টেটরের পত্রলেখক একইসাথে একথাও জানিয়েছিলেন যে, নবাবী আমলে রাজা রাজবল্লভ সেনের বিধবাকন্যার বিবাহের বিষয়ে ভারতের নানা জায়গা থেকে আগত পণ্ডিতেরা—
“স্বামীর দেশান্তর গমন, মরণ, সন্ন্যাস ধর্মাবলম্বন, ক্লীবত্ব এবং পাতিত্ব এই পঞ্চ প্রকার আপদে স্ত্রীলোকের প্রতি বিবাহান্তর করণের বিধি আছে” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, পৃ- ৯১)

—এই প্রমাণের ওপরে ভিত্তি করে বিধবাবিবাহের অনুকূলে রায় দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে এখানে একথাও উল্লেখ্য যে, যদিও স্পেক্টেটর পত্রিকার এই প্রতিবাদকারী পত্রদাতা বিধবাবিবাহের সমর্থক ছিলেন, কিন্তু তবুও পুণর্ভূ পুত্রের ধনাধিকার বিষয়ে তিনি সরকারের সহায়তা গ্রহণ করবার পক্ষপাতী ছিলেন না।

এছাড়া সমকালীন রক্ষণশীল ব্যক্তিদের ধারণা ছিল যে, আইন পাস হলেও বিধবাবিবাহ বাস্তবে আদৌ ঘটা সম্ভব নয়; আর ১৮৫৬ সালের ১৫নং আইন, অর্থাৎ—বিধবাবিবাহ আইন বিধিবদ্ধ হওয়ার অব্যবহিত পরেই কোন বিবাহের ঘটনা অনুষ্ঠিত না হওয়ার জন্য তাঁদের সেই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। এই কারণে দেশে তখন বিধবাবিবাহ নিয়ে নানাধরণের গুজব রটে গিয়েছিল এবং এই আইনের বিরোধীপক্ষীয়রা নানা কথা বলবার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এই আইন পাস হওয়ার পরে বিদ্যাসাগর খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন আর এজন্য তখন তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁর এই বিশ্রাম নেওয়ার সময়েই বিরোধীপক্ষীয়রা এবিষয়ে এমনতর কথা বলবার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে এবিষয়ে তখন যে-ই যা কিছু অনুমান করুন না কেন, আইনানুগ বিধবাবিবাহ দেওয়ার জন্য বিদ্যাসাগর ঠিকই চিন্তা করে নিয়েছিলেন, এবং সেইমত ১৮৫৬ সালের ৭ই ডিসেম্বর তারিখে খোদ কলকাতাতেই তাঁর সেই চিন্তা সফলতা লাভ করেছিল। এদিনই বিদ্যাসাগরের প্রযত্নে শ্রীশচন্দ্র ভট্টাচার্য বিধবাকন্যা কালীমতী দেবীকে বিবাহ করেছিলেন। বিধবাবিবাহ আন্দোলনের ইতিহাসে এই দিনটি তাই নিঃসন্দেহে স্মরণীয়।

প্রথম বিধবাবিবাহের ঘটনাটি যে তৎকালীন বাংলায় প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল, একথার ঐতিহাসিক পরিচয় সমকালীন সংবাদপত্রাদিতে পাওয়া যায়। সমসাময়িক সংবাদপত্রাদিতে পূর্বোক্ত বিবাহঘটনার বিস্তৃত পরিচয় যেমন বর্ণিত হয়েছিল, তেমনি সমকালীন কোন কোন পত্রিকা এই বিবাহ বর্ণনা করতে গিয়ে কিছু কিছু অসত্য তথ্যও পরিবেশন করেছিল বলে দেখা যায়। যেমন—এই বিবাহের প্রসঙ্গে সম্বাদ ভাস্কর পত্রিকা জানিয়েছিল—
“গত রবিবাসরীয় রজনীযোগে লক্ষ্মীমণি দেবী শ্রীশচন্দ্র বরে ঐ কন্যা সম্প্রদান করিরাছেন, বিবাহের পূর্বদিনে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের বিস্তর চলিতপত্র বিতরণ হইয়াছিল উপস্থিত পণ্ডিতগণকে পত্র দিতে অবকাশ হয় নাই। অনেকে উপস্থিত হইয়াছিলেন অধ্যক্ষ মহাশয়েরা তাঁহারদিগের নাম লিখিয়া লইয়াছিলেন, বরযাত্র, কন্যাযাত্র, প্রায় দুই সহস্র লোকের সমাগম হইয়াছিল বিবাহকালে স্ত্রী আচারাদি যে সকল হইয়া থাকে এ বিবাহে সে সকলের কোন অংশে ত্রুটি হয় নাই। যথাশাস্ত্র মন্ত্রপাঠ পূর্বক কন্যা সম্প্রদান হইয়াছে।” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, ১ম সংস্করণ, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, পৃ: ৩৪৪-৪৫)

কিন্তু সংবাদ প্রভাকর পত্রিকা আবার এই বিবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিল—
“পাঠকগণ! আমরা পূর্বেই লিখিয়াছি এবং এইক্ষণেও লিখিতেছি যে হিন্দুবিধবার এই প্রথম বিবাহ কোন ক্রমেই সর্বাঙ্গসুন্দররূপে বাচ্য হইতে পারে না, যেহেতু বিবাহস্থলে দম্পতির পরিবার বা জ্ঞাতিকুটুম্ব কেহই উপস্থিত হয় নাই, এবং কন্যার খুড়া কিম্বা ভ্রাতা ইত্যাদি কেহই তাঁহাকে পাত্রস্থ করেন নাই, তাঁহার জননী চক্রাকার রূপচাঁদের মোহনমন্ত্রে মুগ্ধা হইয়া তাঁহাকে সম্প্রদান করিয়াছেন, বর-পাত্রও কেবলমাত্র রাজদ্বারে প্রিয়পাত্র হইবার প্রত্যাশায় এতদ্রূপে ত্রিকুল পবিত্র করিলেন, পরিশেষে কি হয় তাহা অনির্বচনীয়, যাহা হউক তিনি প্রধানতঃ সাহসিকরূপে বুক বান্দিয়া ততদ্বিষয়ে প্রবৃত্ত হওয়াতে বিধবারবিবাহ পক্ষগণ অবশ্য তাঁহাকে সাধুবাদ প্রদান করিবেন।” (বিদ্যাসাগর, বিহারীলাল সরকার, ১৩০২ বঙ্গাব্দ, পৃ: ৩৪৮-৩৪৯)

উপরোক্ত বক্তব্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সংবাদ প্রভাকর নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই মন্তব্যটি করেছিল। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, তখন যিনি সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদক ছিলেন, তিনি বিধবাবিবাহের ব্যাপারে একেবারে অনুদার না হলেও যেভাবে বিধবাবিবাহ আইন বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল, সেটা তাঁর মনঃপূত হয়নি। আর খুব সম্ভবতঃ একারণেই, সংবাদ প্রভাকর এমন উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ পরিবেশনা করেছিল। তবে বিধবাবিবাহের এই ঘটনায় সেকালের অনেকে উৎসাহিত হয়ে এবিষয়ে সমর্থন জানানোর জন্য এগিয়েও এসেছিলেন। এমনকি যে বর্ধমানের মহারাজা এর আগে কোন একসময়ে বিধবাবিবাহের বিরোধিতা করেছিলেন, তিনিও কিন্তু এই ঘটনার পরে বিধবাবিবাহকে সমর্থন করবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, ১ম সংস্করণ, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, পৃ: ৩৫৫-৩৫৬) বস্তুতঃ শ্রীশচন্দ্রের বিবাহের পরে বহু মানুষের ধারণা হয়েছিল যে, বিধবাবিবাহ বুঝি শেষপর্যন্ত সত্যিই চালু হয়ে গিয়েছে। এমনকি এই বিবাহের পরে অল্পদিনের মধ্যে আরও তিনজন বিধবানারীর বিবাহ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চতুর্থটির পরে পঞ্চম বিবাহটির ব্যবধান একটু বেশি সময়ের হওয়ার ফলে বিধবাবিবাহ নিয়ে সেযুগের গোঁড়া মনোভাবসম্পন্ন মানুষেরা পুনরায় সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। সেযুগের রক্ষণশীল মানুষের এমনতর চিন্তা সম্পর্কে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় লেখা হয়েছিল—
“কয়েকমাস আর বিবাহ হয় নাই। ইহাতে অনেকেই সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছেন, এবং সর্বত্র প্রচার করিতে আরম্ভ করিয়াছেন, যে বিধবাবিবাহের আইন রহিত হইয়া গিয়াছে আর বিধবার বিবাহ হইবেক না।” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ২য় খণ্ড, ১ম সংস্করণ, পৃ- ২০৩)

অবশেষে ১২৬৪ বঙ্গাব্দের ২৮শে অগ্রহায়ণ তারিখে পঞ্চম বিধবাবিবাহটি ঘটেছিল; কিন্তু এরপরে ষষ্ঠ বিধবাবিবাহটি ১২৬৫ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে সম্পন্ন হয়েছিল। এই দুই বিবাহের মধ্যে যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান ছিল, সেটার কারণ হল—সিপাহীবিদ্রোহ। বাস্তবে রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের চাপেই তখন বিধবাবিবাহের ব্যবস্থা চাপা পড়ে গিয়েছিল।

সেযুগের রক্ষণশীল হিন্দুরা কিভাবে এই রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়কে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনের কাজে ব্যবহার করেছিলেন—প্রসঙ্গক্রমে এখানে সেকথারও উল্লেখ করবার প্রয়োজন রয়েছে। তখন তাঁরা প্রচার করেছিলেন যে, ইংরেজরা বিধবাবিবাহ আইন প্রবর্তনের মধ্যে দিয়ে হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করেছিলেন বলেই দেশীয় সিপাহীরা তাঁদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন! অবশ্য সমকালীন কোন কোন বিদেশীও বিধবাবিবাহকে সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম কারণ হিসেবে অনুমান করেছিলেন বলে দেখা যায়। কিন্তু এখানে একইসঙ্গে একথাও মনে রাখবার দরকার রয়েছে যে, বিধবাবিবাহ তখন যেভাবে প্রচলিত হওয়া উচিত ছিল কিংবা যেভাবে এই বিবাহ প্রচলিত হবে বলে আশা করা হয়েছিল, সেটা কিন্তু সেযুগে সত্যিই হতে পারেনি। আর সেটার অন্যতম কারণ ছিল যে, সেযুগের উদারপন্থী প্রগতিশীল মানুষেরা এবিষয়ে উদাসীনতা দেখিয়েছিলেন বা অসহযোগিতা করেছিলেন।

বিধবাবিবাহকে উৎসাহিত করবার জন্য কালীপ্রসন্ন সিংহ বিদ্যোৎসাহিনী সভার পক্ষ থেকে কোন একসময়ে সম্বাদ ভাস্কর পত্রিকার পাঠকদের জানিয়েছিলেন যে, প্রতি বিধবাবিবাহকারীকে সহস্র মুদ্রা পুরস্কার দেওয়া হবে। (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, ১ম সংস্করণ, পৃ- ৫০৩) কিন্তু শেষপর্যন্ত এই প্রতিশ্রুতি আর রক্ষা করা হয়নি। এতে তখন পরোক্ষভাবে বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়ার পক্ষে বাধারই সৃষ্টি হয়েছিল। প্রসঙ্গক্রমে এখানে কালীপ্রসন্ন সিংহকে এবিষয়ে অভিযোগ করে লেখা একটি পত্রের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে, যেটা নিম্নরূপ ছিল—
“মহাশয় ভাস্করপত্রে প্রকাশ করিয়াছিলেন বিদ্যোৎসাহিনী সভা সম্পাদক শ্রীযুত বাবু কালী প্রসন্ন সিংহ মহাশয় ভাস্কর যন্ত্রালয়ে গমনপূর্বক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করত বিজ্ঞাপন ছাপাইয়া দিয়াছিলেন সংবৎসর মধ্যে বিধবাবিবাহের সাহায্য ও উৎসাহ বর্ষনাথে প্রত্যেক বিবাহে সহস্র মুদ্রা পারিতোষিক প্রদান করিবেন সে বিজ্ঞাপন এইক্ষণে কোথায় থাকিল, বাবু মহাশয়ের বাক্য শবৎকালের মেঘ গর্জনের ন্যায় কেবল ডাক হাঁক সার হইল, আমি বিধবা রমণীর পাণি পীড়ন করিয়া মহাবিপদগ্রস্ত হইয়াছি, কোন ব্যক্তির পরামর্শ ক্রমে উক্ত মহাশয়কে পত্র লিখিয়া বিস্তারিত জ্ঞাপন করিয়াছি, অনুমান ছিল বাবু মহাশয়ের বদান্যতা সফল হইবেক তাহা কৈ হইল, সে পত্র প্রাপ্ত হইলেন কিনা তাহাই বা কিসে জানিতে পারিব।” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, ৩য় খণ্ড, ১ম সংস্করণ, পৃ- ৩৭৭)

এছাড়াও ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, যাঁরা এবিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে বিদ্যাসাগরকে সাহায্য করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন ও চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন—তাঁরাও তখন ধীরে ধীরে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। ফলে বিধবাবিবাহের সবধরণের দায়িত্ব তখন একা বিদ্যাসাগরেরই ঘাড়ে গিয়ে চেপে বসেছিল। ওই সময়ে অসহায় বিদ্যাসাগরের মানসিক অবস্থার পরিচয়—দুর্গাচরণ বন্দোপাধ্যায়কে লেখা তাঁর একটি চিঠি থেকে জানা যায়। বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহের জন্য দুর্গাচরণের কাছ থেকে তখন কিছু অর্থ ধার করেছিলেন। পরে দুর্গাচরণ নিজের সেই টাকার জন্যে তাঁকে তাগাদা দিলে বিদ্যাসাগর তাঁকে প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছিলেন যে, এবিষয়ে সাহায্যদানের অঙ্গীকার করেও অধিকাংশ অঙ্গীকারকারী তাঁকে আর কোন সাহায্য করেননি। বস্তুতঃ এরপরে ধীরে ধীরে এমন একটা সময় এসেছিল যখন বিদ্যাসাগর এবিষয়ে প্রায় কারোর সহযোগিতাই পাননি। সেই সময়ে তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন বলে একাকী সেই অবস্থায় তাঁর পক্ষে এবিষয়ে বেশি কিছু করবার উপায় ছিল না। বিধবাবিবাহ আইনপাস হওয়ার পরে প্রথম বিধবাবিবাহটি ১৮৫৬ সালের ৭ই ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত হলেও তারপরে কখনও তীব্র বেগে, তো কখনও আবার মন্দগতিতে এই বিবাহের ধারা—১৮৭০ সালের ১১ই আগস্ট তারিখে বিদ্যাসাগরপুত্র নারায়ণচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের বিবাহের সময় পর্যন্ত প্রসূত হয়েছিল বলে দেখা যায়। কিন্তু এরপরে কদাচিৎ বিধবাবিবাহের দু’-একটি ঘটনা ঘটে থাকলেও বিধবাবিবাহ তেমনভাবে প্রচলিত হতে পারেনি। অবশ্য এজন্য বিদ্যাসাগরের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ব্যক্তিদের অসহযোগিতাই যে শুধুমাত্র দায়ী ছিল তা নয়, তৎকালীন দেশবাসীর দেশাচারবশ্যতাও এর পিছনে অন্যতম কারণ ছিল। বিধবাবিবাহের বিষয়ে যুক্তি ও শাস্ত্রের কথা অনুধাবন করলেও দেশাচারকে দেশবাসীরা শেষপর্যন্ত অগ্রাহ্য করতে পারেন নি। আর সমকালীন দেশবাসীর এই দেশাচারপ্রিয়তা দেখেই বীতশ্রদ্ধ বিদ্যাসাগর একটাসময়ে অত্যন্ত খেদের সঙ্গে বলেছিলেন—
“আমি আশা করিয়াছিলাম, কোনো সামাজিক ক্রিয়াকে শাস্ত্রসম্মত বলিয়া প্রমাণ করিতে পারিলেই এদেশের লোক তাহা অবনত মস্তকে গ্রহণ করিবে, কিন্তু আমার সে বিশ্বাস বিনষ্ট হইয়াছে। এদেশে শাস্ত্র এবং দেশাচার এক পথে না চলিয়া পরস্পর বিভিন্ন পথে চলিয়াছে।” (বিদ্যাসাগর, চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৩৭৬ বঙ্গাব্দ, পৃ- ২৫৮)

আজও এদেশের মানুষের সম্বন্ধে বিদ্যাসাগরের উপরোক্ত কথাগুলি পরিপূর্ণভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায়নি। যদিও বিদ্যাসাগরের যুগ থেকে বর্তমানযুগের মানুষেরা অনেক উন্নত চিন্তার অধিকারী ও অনেক বিজ্ঞানসম্মত চিন্তার ধারকবাহক হয়েছেন; কিন্তু তবুও এখনও কি অধিকাংশ মানুষ মনেপ্রাণে বিধবাবিবাহের সমর্থক হতে পেরেছেন?

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!