ডেমরা ও সাতানিখিল গণহত্যা: ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও বুদ্ধিজীবী নিধন

১৯৭১ সালের ১৪ মে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আরও একটি ভয়াবহ দিন। সমগ্র দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধ তখন তীব্র আকার নিয়েছে, আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা একের পর এক গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে সেদিন ডেমরা ও সাতানিখিল অঞ্চলে ঘটে নির্মম হত্যাকাণ্ড।

ডেমরা গণহত্যা:
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার বড়াল নদীর তীরে হিন্দু অধ্যুষিত একটি অঞ্চল ছিল ডেমরা। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে আশপাশের অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারও এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলটি হয়তো তাদের নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু ১৪ মে সেই বিশ্বাস চূর্ণ হয়ে যায়।

স্থানীয় রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বড়াল নদীপথে বোটে চড়ে ডেমরা অঞ্চলে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে বাঁশগাড়ী ও রূপসী গ্রাম ঘিরে ফেলে, যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, আসাদ নামে স্থানীয় এক যুবক পাকিস্তানি সেনাদের বাঁশগাড়ী গ্রামে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৩ মে রাত থেকে শুরু হয় পরিকল্পিত অভিযান। হানাদার ও রাজাকারেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রামের পুরুষদের টেনে-হিঁচড়ে বাইরে বের করে আনে এবং খোলা জায়গায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। পরিবারের সদস্যদের সামনে দাঁড় করিয়ে সৃষ্টি করা হয় এক ভয়ংকর আতঙ্কের পরিবেশ। এরপর রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা উন্মুক্ত স্থানে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের পর নারী, পুরুষ নির্বিশেষে বহু মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

হত্যাযজ্ঞের পর ঘরবাড়িতে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যে গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আগুন, ধোঁয়া আর মানুষের আর্তনাদ। ডেমরার সেই রাত পরিণত হয় এক বিভীষিকাময় গণহত্যায়। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডে প্রায় ৩৫০ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী নিরস্ত্র গ্রামবাসী শহীদ হন। মতান্তরে নিহতের সংখ্যা ৮০০ বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এভাবে ডেমরা গণহত্যা সনাতন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর পরিচালিত এক পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ হিসেবেও ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে।

সাতানিখিল গণহত্যা:
একই দিনে মুন্সিগঞ্জের সাতানিখিলেও সংঘটিত হয় আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড। একই সময় মুন্সিগঞ্জের সাতানিখিল অঞ্চলেও নেমে আসে একই নির্মমতা। হরগঙ্গা কলেজ দখল করে পাকিস্তানি সেনারা সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। এর আশপাশে কেওয়ার চৌধুরীবাড়িতে আশ্রয় নেয় স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়ের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।

১৪ মে ভোর আনুমানিক চারটার দিকে প্রায় ৭০ জন পাকসেনার একটি দল চৌধুরীবাড়ি ঘিরে ফেলে। তারা জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করে ২২ জন মানুষকে জিম্মি করে। ওই বাড়ি থেকে ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা ও তার দুই ছেলে শিক্ষক সুনিল কুমার সাহা, দ্বিজেন্দ্র লাল সাহা এবং প্রফেসর সুরেশ ভট্টাচার্য, শিক্ষক দেব প্রসাদ ভট্টাচার্য, পুলিশের সাব-ইনসপেক্টর শচীন্দ্র নাথ মুখার্জীসহ ১৭ জন বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে আসে। ওইদিনই সকাল দশটায় কেওয়ার সাতানিখিল গ্রামের খালের পাড়ে নিয়ে চোখ বেঁধে ১৬ জনকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়। ১৪ জন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। জিতু ভৌমিক নামে একজন বুদ্ধির জোরে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

কেদারেশ্বর চৌধুরী এবং ড. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে হরগঙ্গা কলেজ সেনাক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্যাতনে পর কলেজের পিছনে পাচঘড়িয়াকান্দি (চর শিলমন্ডি) গ্রামের একটি বাগানবাড়ির গাছে ঝুলিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে তাকেও হত্যা করে হানাদাররা। পরবর্তীতে সেই মরদেহ দেখতে গেলে দুইজন রিকশাচালককেও হত্যা করা হয়। বাকি চারজনের মধ্যে কেউ কেউ কৌশলে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন, তাদের একজন চন্দন আম্বুলি নিজের পরিচয় আড়াল করে রক্ষা পান।

সাতানিখিল গণহত্যা সংখ্যায় ডেমরার তুলনায় ছোট হলেও এর তাৎপর্য ছিল গভীর। এখানে পাকিস্তানি বাহিনী মূলত বুদ্ধিজীবী ও প্রভাবশালী সংখ্যালঘু  ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হত্যা চালায়। ফলে একটি জনপদের জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডেমরা ও সাতানিখিল গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার স্পষ্ট উদাহরণ। একদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশানা করে পরিকল্পিত হত্যা, অন্যদিকে সমাজের শিক্ষিত ও নেতৃত্বদানকারী মানুষদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের এই গণহত্যা ছিল বাঙালির সংস্কৃতি, পরিচয় এবং অস্তিত্বের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক নির্মম সহিংসতা। আজও ডেমরা ও সাতানিখিলের মাটি সেই রক্তাক্ত স্মৃতি বহন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এই গণহত্যাগুলো অসংখ্য পরিবার হারানোর বেদনা এবং স্বাধীনতার জন্য দেওয়া চরম আত্মত্যাগের স্মারক হয়ে বেঁচে আছে।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!